উত্তরাধিকার
রাসেল একজন প্রতিভাবান তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার বাবা মরহুম আহমেদ সাহেব ছিলেন শহরের একজন সৎ ও সাধারণ ব্যবসায়ী। বাবা মারা যাওয়ার পর রাসেল যখন তার পুরনো ড্রয়ার গোছাচ্ছিল, তখন সে একটা প্রাচীন কাঠের বাক্স খুঁজে পায়। বাক্সের ভেতরে কোনো সোনা-দানা বা টাকা ছিল না, ছিল শুধু একটা পুরনো ডায়েরি আর একটা অদ্ভুত চাবি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখায় লেখা ছিল:
"বাবা রাসেল, আমি তোমাকে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে যেতে পারলাম না। তবে এই চাবিটা শহরের এক কোণে থাকা আমাদের পুরনো মাটির ঘরের সিন্দুকের। সেখানে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ রেখে গিয়েছি। কিন্তু মনে রেখো, সিন্দুকটি খোলার আগে তোমাকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে।"
তিনটি শর্ত
রাসেল কৌতুহলী হয়ে উঠল। ডায়েরিতে লেখা শর্ত তিনটি ছিল:
১. আগামী এক মাসের মধ্যে তোমাকে এমন একজনকে সাহায্য করতে হবে, যে তোমাকে কোনোদিন প্রতিদান দিতে পারবে না এবং এই সাহায্যের কথা দ্বিতীয় কেউ জানবে না।
২. তোমার কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় লোভনীয় কিন্তু অসৎ সুযোগটি তোমাকে স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
৩. এই এক মাস তোমাকে প্রতিদিন ফজরের সালাত জামাতে আদায় করতে হবে এবং ব্যবসার প্রতিটি লেনদেনে শতভাগ সত্যি কথা বলতে হবে।
রাসেল কিছুটা অবাক হলো। সিন্দুকে এমন কী গুপ্তধন আছে যার জন্য বাবা এই শর্তগুলো দিলেন? সে শর্তগুলো পূরণ করা শুরু করল।
পরিবর্তনের এক মাস
প্রথম সপ্তাহে সে রাস্তার ধারের এক বৃদ্ধ অন্ধ ভিক্ষুককে, যার কেউ নেই, তাকে গোপনে এক মাসের খাবার কিনে দিল। দ্বিতীয় সপ্তাহে রাসেলের অফিসে একটা বড় প্রজেক্ট এলো, যেখানে ক্লায়েন্ট তাকে গোপনে অনেক টাকা ঘুষ দিতে চাইল একটা ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যার পাস করিয়ে দেওয়ার জন্য। রাসেল তার বাবার শর্তের কথা মনে করে বুক ফুলিয়ে সেই কোটি টাকার অফার রিজেক্ট করে দিল, যদিও তার টাকার খুব দরকার ছিল। আর প্রতিদিন ভোরে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া এবং সত্য কথা বলার কারণে তার মনের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি হতে লাগল।
এক মাস পার হলো। রাসেলের সততা দেখে তার অফিসের বস তাকে বড় একটা প্রমোশন দিলেন। আর যে অন্ধ বৃদ্ধকে সে সাহায্য করেছিল, তার দোয়ায় রাসেলের মনটা অন্যরকম এক সুখে ভরে গেল।
আসল গুপ্তধন (The Twist)
অবশেষে শর্ত পূরণ করে রাসেল সেই পুরনো মাটির ঘরে গেল। চাবি দিয়ে সিন্দুকটি খুলল। ভেতরে মখমলের কাপড়ে মোড়ানো একটা জিনিস। রাসেল অধীর আগ্রহে কাপড়টা সরালো।
সেখানে কোনো হিরে-জহরত ছিল না। ছিল শুধু একটা সুন্দর করে বাঁধানো পবিত্র আল-কুরআন আর তার নিচে একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল:
"প্রিয় ছেলে, তুমি যখন এই চিঠিটা পড়ছ, তার মানে তুমি তিনটি শর্তই পূরণ করেছ। তুমি গোপনে দান করতে শিখেছ যা রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত) থেকে মুক্ত। তুমি লোভ সামলাতে শিখেছ যা তোমাকে হারাম উপার্জন থেকে বাঁচিয়েছে। আর
তুমি আল্লাহর দরবারে নিয়মিত হয়েছ যা তোমার জীবনকে বরকতময় করেছে।
একজন বাবা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, আমি মারা যাওয়ার পর আমার সন্তান যেন দুনিয়ার লোভে পড়ে ইমান না হারায়। এই সিন্দুকে কোনো পার্থিব ধন-সম্পদ নেই বাবা, কারণ দুনিয়ার সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যায়। আমি তোমাকে যে চরিত্র, সততা আর আল্লাহর প্রতি অনুগত হওয়ার অভ্যাস উপহার দিয়ে গেলাম—এটাই আমার রেখে যাওয়া আসল 'উত্তরাধিকার'। এই কুরআন অনুযায়ী জীবন গড়ো, দুনিয়া এবং আখিরাত দুই জায়গাতেই তুমি সফল হবে।"
রাসেলের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার বাবা তাকে কোটি টাকার চেয়েও দামী একটা সম্পদ দিয়ে গেছেন—তা হলো একজন সৎ ও মুমিন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার শক্তি। সে পরম মমতায় কুরআন শরীফটি বুকে জড়িয়ে ধরল।