Posts

গল্প

কারাগারে শেষ চিঠি

June 9, 2026

Md Josam

7
View

মৃত্যুর চিঠি
কারাগারের স্যাঁতসেঁতে সেল নম্বর ১৭-এ বসে জিম হপকিন্স চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির শব্দ শুনছিল। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। যেন আকাশও তার নির্দোষতার সাক্ষী হয়ে কাঁদছে। চার দেয়ালের মাঝে আটকে থাকা এই জীবন এখন শুধুই অপেক্ষা—মৃত্যুর অপেক্ষা।
জিমের বয়স ৪২। একসময় সে ছিল শহরের একটা মাঝারি আকারের আইটি কনসালটেন্সি ফার্মের সহ-মালিক। তার স্ত্রী এলেনা আর ৭ বছরের ছেলে টমি—তাদের সাথে সাধারণ জীবন। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল সেই ভয়ংকর রাতে, যখন এলেনা আর টমিকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। পুলিশ বলেছিল, জিমই করেছে। প্রমাণ? তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট অস্ত্রে, তার মোটিভ—ব্যবসায়িক ঝামেলা আর এলেনার সাথে ঝগড়া। আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আপিল সব খারিজ। এখন শুধু অপেক্ষা।
এই ঘটনা অনেকটা বাস্তবের মাইকেল মর্টন কেসের মতো—যেখানে স্ত্রীকে খুনের দায়ে স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছিল, পরে প্রকৃত খুনি ধরা পড়ে। কিন্তু জিমের ক্ষেত্রে এখনো সত্য বের হয়নি।
আজ সকালে জেলার এসেছিলেন। মুখ গম্ভীর। “জিম, তোমার জন্য অফিসিয়াল চিঠি।” একটা সাদা খাম দিয়ে চলে গেলেন। খামে লেখা: “মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নোটিশ”। জিমের হাত কাঁপছিল। সে খাম খুলল।
ভিতরে কাগজ:
“জিম হপকিন্স,
তোমার মৃত্যুদণ্ড আগামী ১৫ জুন ভোর ৫টায় কার্যকর করা হবে। ফাঁসি। কোনো আপিল গ্রহণযোগ্য নয়।
—জেলা প্রশাসক”
কিন্তু নিচে অতিরিক্ত একটা লাইন, ভিন্ন হাতের লেখায়:
“সত্য জানতে চাইলে, এলেনার পুরনো ল্যাপটপের কথা মনে করো। জর্জ কী লুকিয়েছিল?”
জিমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। জর্জ? তার ব্যবসার পার্টনার জর্জ ম্যাকলিন। সে তো দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে খবর ছিল। জিম চিঠি উল্টেপাল্টে দেখল। কোনো অফিসিয়াল সিল নেই, শুধু একটা ছোট কালো পাখির ছাপ—তাদের কোম্পানি ‘ফ্লাইট টেক’-এর পুরনো লোগো।
রাতে ঘুম আসছিল না। জেলারকে জিজ্ঞাসা করল, চিঠি কোথা থেকে এসেছে। জেলার বললেন, “সাধারণ ডাক। কিন্তু কেউ যেন তোমাকে দেখছে।” জিম জানত, এটা সাধারণ নয়।
পরের দিন সেলের খাবারের ট্রেতে আরেকটা ছোট কাগজ: “জর্জ ম্যাকলিন মরেনি। সে তোমাকে ফাঁসিয়েছে। প্রমাণ সেলের নিচের আলগা ইটের নিচে। সাবধান, তার লোক এখনো আছে।”
জিম ইট সরাল। নিচে একটা USB ড্রাইভ আর ছোট নোট। নোটে লেখা: “আমি তোমার উকিলের সহকারী। তোমার উকিল মার্ক রিভার্স এখনো লড়ছেন। কিন্তু সময় কম।”
জিম USB-টা লুকিয়ে রাখল। রাতে সেলের ছোট আলোয় সে কল্পনা করল কী আছে এতে। বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটে—যেমন অনেক ভুল সাজানো মামলায় গোপন প্রমাণ পরে বের হয়।
পরদিন জেলারের সাথে কথা বলে জিম USB-টা বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করল। উকিল মার্ক রিভার্সকে। মার্ক তার পুরনো বন্ধু, যিনি আপিল লড়ছিলেন কিন্তু নতুন প্রমাণের অভাবে আটকে ছিলেন।
দুদিন পর আরেকটা চিঠি এল, এবার জর্জের হাতের লেখায় নকল করে:
“তুমি ভেবেছিলে সব শেষ? কোম্পানির ২ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ আমি করেছি। এলেনা জেনে ফেলেছিল। জর্জ আমার পুরনো নাম। আমি এখনো জীবিত। তোমাকে ফাঁসাতে সহজ ছিল—তোমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আগে থেকে নিয়ে রেখেছিলাম।”
রহস্য গভীর হচ্ছিল। জিম মনে করল সেই রাতের কথা। সে ব্যবসার কাজে বাইরে ছিল। ফিরে দেখে বাড়িতে রক্তের ছড়াছড়ি, তার হাতে অস্ত্র। পুলিশ বলেছিল সে নেশা করে করেছে। কিন্তু সে কখনো নেশা করত না।
মার্ক রিভার্স USB থেকে পাওয়া ফাইল দেখে অবাক। এতে এলেনার লুকানো অডিও রেকর্ডিং—জর্জের সাথে ঝগড়া, যেখানে জর্জ হুমকি দিচ্ছে। কোম্পানির অ্যাকাউন্টে জালিয়াতির প্রমাণ। জর্জ আসলে পালিয়ে ছিল, নতুন পরিচয় নিয়ে। সে জিমকে সরিয়ে কোম্পানি দখল করতে চেয়েছিল।
কিন্তু জর্জের লোক এখনো সক্রিয়। এক রাতে সেলের বাইরে ছায়া। কেউ জিমকে হুমকি দিল: “চুপ করো, নয়তো তোমার শেষ দিন আগেই আসবে।”
জিম ভয় পেল না। সে মার্ককে আরও তথ্য পাঠাল। বাস্তবের অনেক কেসের মতো—যেখানে জেল থেকে লুকানো প্রমাণ বের করে নির্দোষ প্রমাণিত হয়। কিন্তু সময় কম। ১৫ জুন ঘনিয়ে আসছে।
একদিন জেলার গোপনে বললেন, “এক মহিলা এসেছিল। এলেনার বোন। সে বলেছে জর্জ এখনো শহরের কাছে আছে। পুলিশের কিছু লোক তার সাথে জড়িত।”
জিম লিখল শেষ চিঠি মার্ককে: “যদি আমি না বাঁচি, তাহলে জর্জ ম্যাকলিনকে খুঁজো। সত্য বের করো।”
রাত গড়াতে থাকল। জিম ঘুমের মধ্যে এলেনা আর টমির মুখ দেখছিল। সে জানত, এই চিঠিগুলো হয়তো তার শেষ আশা। বাস্তব জীবনে অনেকে বছরের পর বছর ডেথ রোতে কাটিয়ে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে—DNA প্রমাণ, নতুন সাক্ষী, গোপন ফাইল। জিমের ক্ষেত্রেও সেটা হতে পারে।
১৪ জুন রাত। আরেকটা চিঠি এল: “প্রমাণ পৌঁছে গেছে। মার্ক নতুন আপিল দাখিল করেছে। জর্জের ছবি আর অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার রেকর্ড পাওয়া গেছে। ধৈর্য ধরো।”
জিমের চোখে জল। হয়তো এবার সত্য জয়ী হবে। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ এখনো অপেক্ষায়। রহস্যময় চিঠিগুলো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে—এক অজানা বন্ধুর কাছ থেকে, যে হয়তো জেলের ভিতরেই ছিল।
সকাল হল। জেলার এসে বললেন, “এক্সিকিউশন স্থগিত। নতুন প্রমাণ এসেছে।”
জিম জানত না এটা শেষ, নাকি নতুন শুরু। কিন্তু মৃত্যুর চিঠি এবার হয়তো জীবনের চিঠিতে বদলে যাবে।

Comments

    Please login to post comment. Login