ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৬: অভিশপ্ত জন্ম ও চিরকালের বিচ্ছেদ
নাদিয়ার গর্ভকাল নয় মাস পূর্ণ হয়েছে। ঢাকার গরমে টিকাটুলির ছোট্ট মেসবাড়িটা যেন একটা চাপা কফিনের মতো লাগছিল। আদিত্য রাত জেগে নাদিয়ার পাশে বসে থাকত। তার হাতে সবসময় একটা লাল ফুল — পরীর দেওয়া। নাদিয়ার পেট এখন অস্বাভাবিকভাবে বড়, যেন ভিতরে দুটো প্রাণ নয়, একটা মানুষ আর একটা অতিপ্রাকৃত শক্তি লড়াই করছে।
জন্মের রাত
১৫ই জুন। আদিত্যর জন্মদিন। ঠিক তার জন্মের ২৬ বছর পর। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। নাদিয়ার প্রসব ব্যথা উঠল রাত দুটোর সময়। সুমনকে ফোন করা হল। সে দ্রুত একজন নার্স নিয়ে চলে এল। কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার পথে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। অদৃশ্য শক্তি।
“এখানেই হবে,” নাদিয়া কষ্টে বলল। “ও চায় না আমরা বাইরে যাই।”
ঘরের মাঝখানে চাদর পেতে নাদিয়াকে শোয়ানো হল। সুমন ডাক্তারি সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত। রাহাত দরজা আটকে রেখেছিল। আদিত্য নাদিয়ার হাত ধরে বসে ছিল। তার চোখে ভয়, আশা আর অপরাধবোধ মিশে ছিল।
প্রসব শুরু হতেই ঘরের তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে গেল। বাতাস ঠান্ডা, যেন শীতকাল। নাদিয়া চিৎকার করছিল। তার পেটের ভিতর থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসছিল — যেন কোনো শিশু নয়, কোনো প্রাচীন আত্মা জন্ম নিতে চাইছে।
সুমন হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “আদিত্য! দেখো!”
নাদিয়ার পেটের চামড়ার উপর লেখা উঠছিল রক্ত দিয়ে: “আমি আসছি, বাবা।”
এক ঘণ্টা পর, মধ্যরাতে, একটা মেয়ে জন্ম নিল। কিন্তু সে সাধারণ শিশু ছিল না। তার চোখ দুটো পরীর মতো গভীর কালো, ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সে কাঁদল না। বরং ঘরের সব আলো নিভে গেল, তারপর আবার জ্বলে উঠল।
নার্স পিছিয়ে গেল। “এই শিশুর শরীরে... অস্বাভাবিক শক্তি।”
নাদিয়া ক্লান্ত গলায় বলল, “ওর নাম রাখ... আয়েশা।”
আদিত্য মেয়েকে কোলে নিতেই পরী স্পষ্ট হয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার তার রূপ পুরোপুরি মানুষের মতো, কিন্তু আরও শক্তিশালী। তার শরীর থেকে একটা আলো বেরোচ্ছিল।
“এখন আমরা চারজন। তুমি, আমি, নাদিয়া আর আমাদের মেয়ে।”
পরীর পূর্ণ শক্তির উন্মোচন
জন্মের পর তিন দিনের মাথায় আয়েশা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে লাগল। তিন দিনে সে তিন মাসের শিশুর মতো দেখাতে লাগল। সে কথা বলতে শুরু করল। তার গলা ছোট্ট, কিন্তু স্বর পরীর মতো। “বাবা, মা-কে ছেড়ে দাও। আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকব।”
রাহাত আর সুমন ভয় পেয়ে গেল। তারা একজন প্রখ্যাত ওঝার কাছে গেল। ওঝা সব শুনে কেঁপে উঠলেন। “এটা সাধারণ ভূত নয়। এটা একটা প্রাচীন প্রেতাত্মা, যে পুনর্জন্ম নিয়েছে। তোমাদের বন্ধুকে বাঁচাতে হলে মেয়েটাকে... অথবা নাদিয়াকে ত্যাগ করতে হবে।”
কিন্তু আদিত্য কোনোটাই করতে চাইল না।
চরম বিপর্যয়
এক সন্ধ্যায় নাদিয়া আয়েশাকে কোলে নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ আয়েশার চোখ লাল হয়ে গেল। সে তার মায়ের গলা চেপে ধরল। নাদিয়া চিৎকার করতে করতে মেঝেতে পড়ে গেল। আদিত্য ছুটে এসে মেয়েকে সরাতে গেল, কিন্তু অদৃশ্য শক্তি তাকে দেয়ালে ছুড়ে ফেলল।
পরী হাসতে হাসতে বলল, “নাদিয়া শুধু জন্ম দিয়েছে। এখন তার আর দরকার নেই।”
রাহাত আর সুমন দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকল। তিন বন্ধু মিলে পরীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করল। সুমন তার মেডিকেল ব্যাগ থেকে কিছু ধর্মীয় তাবিজ বের করল। রাহাত লোহার রড নিয়ে আঘাত করতে গেল। কিন্তু পরীর শক্তির সামনে তারা অসহায়। রাহাতের হাত ভেঙে গেল, সুমনের চোখ থেকে রক্ত পড়তে লাগল।
আদিত্য চিৎকার করে বলল, “থামো! আমি তোমার কাছে চলে আসব। নাদিয়া আর আয়েশাকে ছেড়ে দাও!”
পরী তার সামনে এসে দাঁড়াল। “তাহলে প্রমাণ দাও। নাদিয়াকে নিজ হাতে শেষ করো।”
আদিত্য কেঁপে উঠল। তার হাতে একটা ছুরি চলে এল অদৃশ্যভাবে। নাদিয়া মেঝেতে শুয়ে কাঁদছিল, “আদিত্য... আমাকে মেরো না। আমাদের মেয়েকে বাঁচাও।”
সেই মুহূর্তে আদিত্যর ভিতরের দুই আদিত্য লড়াই করছিল। একজন মানুষ, যে নাদিয়াকে ভালোবাসে। আরেকজন অন্ধকারের, যে পরীর টানে অসহায়।
অপ্রত্যাশিত ট্র্যাজেডি
আদিত্য ছুরি ফেলে দিল। “আমি পারব না।”
তখনই আয়েশা হাসতে হাসতে তার মায়ের দিকে হাত বাড়াল। নাদিয়ার শরীর হঠাৎ উঠে বাতাসে ভাসতে লাগল। তার গলা থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। আদিত্য ছুটে গিয়ে নাদিয়াকে ধরতে চাইল, কিন্তু পরী তাকে আটকে রাখল।
“তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছ। তাই আমি তোমার সবকিছু নিয়ে নেব।”
নাদিয়া শেষবারের মতো আদিত্যর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমাকে ভুলে যেয়ো না... আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।”
নাদিয়ার শরীর মেঝেতে পড়ে গেল। মৃত। তার চোখ খোলা, যেন আদিত্যকে দেখছে।
আদিত্য চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে পড়ল। আয়েশা তার গালে হাত দিয়ে বলল, “বাবা, এখন আমরা তিনজন। মা চলে গেছে।”
রাহাত আর সুমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। ঘরের দেয়ালে রক্ত দিয়ে বড় বড় করে লেখা: “এখন থেকে তুমি সম্পূর্ণ আমার।”
অন্ধকারের গভীরে
নাদিয়ার মৃত্যুর পর আদিত্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। সে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিল। লেখা বন্ধ করে দিল। শুধু আয়েশাকে নিয়ে থাকত। মেয়েটা দ্রুত বেড়ে উঠছিল। ছয় মাসে সে পাঁচ বছরের মেয়ের মতো দেখাতে লাগল। সে আদিত্যকে গল্প শোনাত পরীর অতীতের।
একদিন আদিত্য গ্রামে গিয়ে তার বাবার কাছে সব বলল। করিম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তোর মা’র আত্মা তোকে রক্ষা করুক।” কিন্তু সেই রাতেই করিম মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক।
আদিত্য এখন একদম একা। শুধু পরী আর আয়েশা। পরী তার শরীরে আরও বেশি করে ঢুকে পড়ছিল। আদিত্য কখনো কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলত। সে রাতে পরীর সঙ্গে থাকত, দিনে আয়েশাকে স্কুলে পাঠাত।
কিন্তু তার ভিতরে একটা ছোট্ট আগুন এখনও জ্বলছিল। প্রতিশোধের আগুন। নাদিয়ার মৃত্যুর প্রতিশোধ।
রাহাত আর সুমন এখনও তার পাশে ছিল, যদিও তারা আহত। তারা গোপনে একটা পরিকল্পনা করছিল — পরীকে চিরতরে বিদায় করার।
এক বর্ষার রাতে আদিত্য জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, “পরী... তুমি জিতেছ। কিন্তু এই জয় তোমাকে শেষ করে দেবে।”
অন্ধকার থেকে পরীর হাসি ভেসে এল। “দেখি।”
(পর্ব ৬ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: আদিত্যর প্রতিশোধের যাত্রা, আয়েশার অন্ধকার শক্তির পূর্ণ বিকাশ, বন্ধুদের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াই, নতুন এক প্রেমের ছোঁয়া (যা আবার বিপদ ডেকে আনবে), এবং গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বড় রহস্য উন্মোচন।
7
View