শেষ জমানায়
আকাশটা আর নীল ছিল না। ধূসর মেঘের আস্তরণে ঢাকা, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি পৃথিবীর উপর একটা ভারী চাদর চাপিয়ে দিয়েছে। ২০৪৭ সাল। Adrian তার ছোট অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। নিচে রাস্তায় গাড়ির হর্নের আওয়াজ আর নিয়ন বাতির ঝলকানি মিলেমিশে এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর সঙ্গীত তৈরি করছিল।
Adrian-এর বয়স তেত্রিশ। একসময় সে বিশ্বাস করত মানুষ মূলত ভালো। কিন্তু এখন সে জানত, এটা শুধু একটা মিথ্যা আরামের কথা। শেষ জমানা এসে গেছে। কিয়ামতের আগের সেই সময়, যার কথা বুড়োরা আগে বলত। এখন কেউ বলে না। কারণ কেউ আর শোনে না।
সকালে উঠেই Adrian তার ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে প্রথম নোটিফিকেশন: “তোমার প্রতিবেশী আজ রাতে আত্মহত্যা করেছে। লাইভ দেখো।” সে সোয়াইপ করে অন্য খবরে চলে গেল। একজন ধনী ব্যবসায়ী তার তিন সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমের জন্য। কমেন্টে হাজারো লোক লিখছে— “ভালো করেছে, টাকা তো লাগবে।” Adrian-এর বুকটা কেঁপে উঠল। এটা নতুন কিছু না। গত পাঁচ বছরে মানুষের মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ভয়ংকর।
একসময় মানুষ লজ্জা পেত। এখন লজ্জা বলে কিছু নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় মেয়েরা নিজেদের শরীর বিক্রি করে লাইক কেনে। ছেলেরা ভিডিও বানায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে অপমান করে। ধর্মকে বলা হয় “পুরনো ফ্যাশন”। মসজিদগুলোতে লোক কমে গেছে। যারা যায়, তারা ফটো তুলে পোস্ট করে— “আজ ঈমান রিফ্রেশ করলাম।”
Adrian বের হলো। রাস্তায় একটা ছেলে তার বোনকে চড় মারছিল। কেউ থামায়নি। একজন লোক হেসে বলল, “ফ্যামিলি ম্যাটার, ভাই।” পাশের দোকানে টিভিতে চলছিল নতুন আইনের ঘোষণা— “সমকামিতা এখন বাধ্যতামূলক শিক্ষার অংশ। যারা আপত্তি করবে, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত।” লোকজন করতালি দিচ্ছিল।
Adrian একটা চায়ের দোকানে বসল। পাশে দুই যুবক কথা বলছিল।
“ভাই, কাল আমার গার্লফ্রেন্ডকে শেয়ার করলাম। নতুন ট্রেন্ড। সবাই করছে।”
“আরে, আমি তো আমার মাকে নার্সিংহোমে রেখে এসেছি। বুড়ি তো টাকা খায় শুধু।”
তারা হাসছিল। Adrian চুপ করে চা খেল। তার মনে পড়ল তার বাবার কথা। বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “বাবা, শেষ জমানায় মানুষের হৃদয় পাথর হয়ে যাবে। তারা সত্য দেখেও অস্বীকার করবে।”
সন্ধ্যায় Adrian তার পুরনো বন্ধু Marcus-এর বাসায় গেল। Marcus এখন বড় ব্যবসায়ী। তার বাসায় পার্টি চলছিল। মেয়েরা প্রায় নগ্ন, ছেলেরা মদ আর ড্রাগে ডুবে। এক কোণে একজন ইমামকে ডেকে এনে তাদের বিয়ের অনুকরণ করানো হচ্ছিল— কিন্তু বিয়ে নয়, শুধু এক রাতের জন্য। Marcus Adrian-কে দেখে হাসল।
“আরে আয়! এখনো ঈমানের পেছনে পড়ে আছিস? দুনিয়া তো শেষ হয়ে যাচ্ছে, উপভোগ কর।”
Adrian বলল, “তুই কি ভুলে গেছিস? হাদিসে বলা আছে— মানুষ যখন সুদ খাবে, জিনা করবে, মিথ্যা বলবে, তখন কিয়ামত নিকটবর্তী।”
Marcus হেসে উঠল। “ওসব পুরনো কথা। এখন AI বলছে আমরা দেবতা হয়ে যাব। মরার পরেও লিভিং ফরএভার।”
রাত বাড়ার সাথে সাথে শহর আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। Adrian হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কে গেল। সেখানে এক বৃদ্ধ বসে ছিল। তার চোখে জল।
“বাবা, আমি আমার সারা জীবন কুরআন পড়েছি। কিন্তু এখন আমার নাতি-নাতনিরা বলে আমি পাগল। তারা বলে ঈশ্বর নেই, শুধু অ্যালগরিদম আছে।”
Adrian তার পাশে বসল। “চাচা, কতদূর এগিয়েছে সব?”
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, “ছেলেরা মায়ের সাথে সম্পর্ক করে। মেয়েরা বাবার সাথে। ভাই বোনকে বিক্রি করে। মানুষ আর মানুষকে চিনতে পারে না। সবাই শুধু নিজের সুখ চায়। আল্লাহর কথা বললে লোকে হাসে। এটাই শেষ জমানা।”
হঠাৎ আকাশে একটা আলো ফুটে উঠল। লালচে, ভয়ংকর। মোবাইলে অ্যালার্ট এলো: “সূর্যের দিক থেকে অদ্ভুত বিকিরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাকৃতিক।” কিন্তু Adrian জানত এটা প্রাকৃতিক নয়। সূর্য পশ্চিম দিকে উঠবে— একটা নিদর্শন। লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে ছবি তুলছিল, লাইভ করছিল। কেউ ভয় পাচ্ছিল না। তারা বলছিল, “কুল ইফেক্ট!”
পরের কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। ব্যাংকগুলোতে সুদের হার আকাশছোঁয়া। মানুষ টাকার জন্য খুন করছে। হাসপাতালে রোগীদের না দেখে ডাক্তাররা ভিডিও বানাচ্ছে কনটেন্টের জন্য। স্কুলে শিক্ষকরা ছাত্রীদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রাখছে খোলাখুলি। আর কেউ কিছু বলছে না। কারণ “ব্যক্তিগত স্বাধীনতা”।
Adrian একদিন তার ছোট বোনের সাথে দেখা করতে গেল। বোন এখন একটা বড় কোম্পানির মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। তার অ্যাপার্টমেন্টে শুধু বিলাসিতা। কিন্তু তার চোখে শূন্যতা।
“ভাইয়া, আমি সুখী। প্রতি সপ্তাহে নতুন পার্টনার। টাকা আসছে। কিন্তু... কেন যেন ঘুম আসে না।”
Adrian বলল, “তোর হৃদয়টা মরে গেছে, Emily। আমরা সবাই মরে যাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের সতর্ক করছেন।”
Emily হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কান্না মিশে ছিল। “ভাইয়া, সবাই বলে ঈমান মানে পিছিয়ে পড়া। আমি তো চাই না পিছিয়ে পড়তে।”
এক রাতে Adrian স্বপ্ন দেখল। এক বিশাল মাঠ। লক্ষ লক্ষ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখ অন্ধ। তারা হাত বাড়িয়ে কিছু খুঁজছে। হঠাৎ আকাশ ফেটে গেল। একটা আওয়াজ এলো— “যথেষ্ট হয়েছে।”
জেগে উঠে Adrian দেখল তার ফোন বন্ধ। বিদ্যুৎ নেই। বাইরে চিৎকার। লোকজন রাস্তায় ছুটছে। খবর এলো— পূর্ব দিক থেকে এক অদ্ভুত ধোঁয়া উঠছে। পশ্চিমে সূর্য উঠছে। মানুষ এখনো বিশ্বাস করতে চায় না। তারা বলছে “ক্লাইমেট চেঞ্জ”। কিন্তু Adrian জানত। সময় শেষ।
সে তার পুরনো কুরআন খুলল। প্রথম পাতায় লেখা তার বাবার হাতে: “শেষ জমানায় সত্য বলা কঠিন হবে। কিন্তু যারা বলবে, তারাই বাঁচবে।”
Adrian বের হলো। রাস্তায় একদল যুবক তাকে ঘিরে ধরল।
“কী রে, এখনো নামাজ পড়িস? পাগল!”
Adrian শান্ত গলায় বলল, “তোমরা দেখছ না? আল্লাহর নিদর্শন সামনে। ফিরে এসো।”
একজন হাসতে হাসতে তার দিকে পাথর ছুড়ল। অন্যরা যোগ দিল। Adrian মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু সে হাসছিল। কারণ সে জানত, এই খারাপির মধ্যেও কিছু আলো থাকবে। যারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।
আকাশ আরও লাল হয়ে উঠল। দূরে কোথাও একটা শিঙ্গা বাজার আওয়াজ ভেসে এলো— খুব দূর থেকে, খুব কাছ থেকে। মানুষ এবার ভয় পেল। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।
শেষ জমানা শেষ হতে চলেছে। আর কিয়ামত খুব কাছে।