Posts

উপন্যাস

৩০ বছর পর যুগির কান্দা লঞ্চঘাটে আবার হলো দেখা।

June 11, 2026

Shafin pro

17
View

মেঘ-রোদ্দুরের ৩০ বছর (প্রথম খণ্ড)পরিচ্ছেদ ১:

 ৩০ বছর পরের সেই ঘাটউজবুক এই নিয়তি মানুষকে কোথায় কখন দাঁড় করিয়ে দেয়, তা কেউ জানে না।সুজন তখন যোগীর কান্দা লঞ্চ ঘাটের কাঠের চটিটার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ২০২৬ সালের জুন মাসের এই সকালটায় মেঘলা আকাশ থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ৩০টা বছর পার হয়ে গেছে। পলেস্তারা খসা পুরনো ঘাটটার চেহারা বদলেছে। কিন্তু সন্ধ্যার নদীর সেই চেনা গন্ধটা বদলায়নি। সুজন এখন মধ্যবয়সী। চুলে পাক ধরেছে। চোখে চশমা। ঠিক তখনই ঘাট থেকে একটা ট্রলার ছেড়ে যাওয়ার শব্দ হলো—ভট-ভট-ভট-ভট।সেই শব্দের মাঝেই সুজনের চোখ আটকে গেল একটা অবয়বের ওপর।ধূসর রঙের শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলা ঘাটের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। সুজনের বুকের ভেতরটা আচমকা মোচড় দিয়ে উঠল। এই চোখ, এই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, চিবুকের সেই চেনা তিল! ৩০ বছর আগে, ঠিক এই যোগীর কান্দা লঞ্চ ঘাটেই সুজন প্রথম দেখেছিল তাকে।"ময়ূরী?"খুব মৃদু স্বরে ডাকল সুজন। বাতাসে শব্দটা হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তীব্র কোনো এক মায়ায় ভদ্রমহিলা ঘুরে তাকালেন। ৩০ বছরের দূরত্ব এক পলকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ময়ূরীর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল তার।"সুজন? তুমি... তুমি এখানে?"৩০ বছর পর আবার দেখা হলো। মাঝখানের তিনটা দশক যেন এক নিমিষে উবে গেল নদীর বাতাসে।

পরিচ্ছেদ ২: 

ট্রলারের সেই প্রথম দেখাস্মৃতির পাতাগুলো তরতর করে ৩০ বছর পিছিয়ে গেল। তখন ১৯৯৬ সাল।সুজন তখন বানারীপাড়া শেরে বাংলা কলেজের ডিগ্রির ছাত্র। আর ময়ূরী সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। উজিরপুরের যোগীর কান্দা থেকে বানারীপাড়া যাওয়ার প্রধান বাহনই ছিল ট্রলার।সেদিন ছিল খটখটে রোদ। ট্রলারে উপচে পড়া ভিড়। কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, বাজারের ব্যাপারী, সাধারণ মানুষে ঠাসা। সুজন ট্রলারের গলুইয়ের কাছে বসে একমনে একটা বই পড়ছিল। এমন সময় তড়িঘড়ি করে ট্রলারে উঠল এক ঝাঁক মেয়ে। তাদেরই মাঝে একজন নীল সালোয়ার-কামিজ পরা, চোখে চঞ্চলতা। সে-ই ময়ূরী।ট্রলারের ইঞ্জিন চালু হতেই একটা বড় ঝাঁকুনি দিল। ভারসাম্য সামলাতে না পেরে ময়ূরী সরাসরি এসে পড়ল সুজনের ওপর। ময়ূরীর হাতের খাতা-পত্র সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল ট্রলারের তক্তায়।"আই অ্যাম সো সরি!" ময়ূরী লজ্জায় লাল হয়ে গেল।সুজন মুচকি হেসে খাতাগুলো কুড়িয়ে দিতে দিতে বলল, "ঠিক আছে। ট্রলারের ঝাঁকুনি তো, অভ্যাস হয়ে যাবে।"সেই প্রথম চোখাচোখি। যোগীর কান্দা ঘাটের সেই ট্রলারের ভটভট শব্দের মাঝেই দুটি হৃদয়ের প্রথম স্পন্দন শুরু হয়েছিল।

পরিচ্ছেদ ৩: 

রিকশা আর বাসের টুকরো গল্পধীরে ধীরে পরিচয়টা রূপ নিল গভীর সখ্যে। কলেজ যাওয়ার দিনগুলো হয়ে উঠল এক একটা উৎসব।কখনো ট্রলার মিস হলে তারা ধরত লোকাল বাস। ভাঙাচোরা রাস্তা, বাসের ভেতরে গাদাগাদি ভিড়। কিন্তু সুজন আর ময়ূরী যখন পাশাপাশি সিটে বসার সুযোগ পেত, তখন সেই ঝাঁকুনি ভরা বাসের জার্নিটাও মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক সফর। বাসের জানলা দিয়ে আসা বাতাস ময়ূরীর চুলগুলো উড়িয়ে সুজনের মুখে ফেলত। সুজন মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকত।বানারীপাড়া নেমে কলেজ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য তারা প্রায়ই রিকশা নিত।"হুডটা ফেলে দিন না মামা," ময়ূরী বলত।টুপটাপ বৃষ্টি নামলে রিকশার সেই ছোট্ট জায়গায় দুজনে একদম ঘেঁষে বসত। ময়ূরী সুজনের কাঁধের ওপর আলতো করে হাত রাখত। রিকশাওয়ালার প্যাডেলের ছন্দের সাথে সাথে তাদের ভালোবাসার গল্পটাও এগোত। রিকশার জরাজীর্ণ সিটটাই ছিল তখন তাদের রাজপ্রাসাদ।পরিচ্ছেদ ৪: 

ভ্যান গাড়ির খটখটানি আর হারিয়ে যাওয়াসবচেয়ে বেশি আনন্দ হতো যখন তারা ভ্যানে চড়ত।যোগীর কান্দার মেঠো পথ ধরে যখন কাঠের তৈরি ভ্যান গাড়িগুলো চলত, চাকার খটখট শব্দে কান পাতা যেত না। সুজন আর ময়ূরী ভ্যানের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে বসত। ঝাঁকুনিতে পড়ে যাওয়ার ভয়ে ময়ূরী শক্ত করে চেপে ধরত সুজনের হাত।"সুজন, আমরা সারাজীবন এভাবে ভ্যানে করে ঘুরে বেড়াব না?" ময়ূরী হেসে জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।"সারাজীবন কেন? পরের জন্মেও!" সুজন উত্তর দিয়েছিল।কিন্তু নিয়তি সেই সুযোগ দেয়নি। ডিগ্রির ফাইনাল পরীক্ষার পর হঠাৎ করেই ময়ূরীর পরিবার সপরিবারে ঢাকা চলে যায়। মোবাইল ফোন তখনো সাধারণ মানুষের হাতে আসেনি। চিঠির যুগও শেষের দিকে। কোনো এক অজানা অভিমানে, যোগাযোগের অভাবে সুজন আর ময়ূরী একে অপরের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। কেটে যায় দীর্ঘ ৩০টি বছর।পরিচ্ছেদ ৫: 

আবার সেই ঘাটে"তুমি কি এখনো বানারীপাড়াতেই আছ সুজন?" ময়ূরীর কণ্ঠের কাঁপুনি সুজনকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।"না, চাকুরির সূত্রে এখন বরিশালে থাকি। একটা কাজে আজ উজিরপুর এসেছিলাম। ভাবলাম যোগীর কান্দা ঘাটটা একটু দেখে যাই। তুমি?" সুজন জিজ্ঞেস করল।"আমিও একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে এসেছি। আজই ঢাকা ফিরব। ভাবলাম যাওয়ার আগে একবার আমাদের সেই ঘাটটা দেখে যাই," ময়ূরী নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।দুজনের চোখেই এখন ৩০ বছরের জমে থাকা জল। তারা এখন আর সেই কলেজের তরুণ-তরুণী নয়। দুজনেরই আলাদা সংসার, আলাদা জীবন, আলাদা দায়িত্ব। কিন্তু এই যোগীর কান্দা লঞ্চ ঘাটে দাঁড়িয়ে, ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দের মাঝে তারা দুজনেই আবার ফিরে গেছে সেই ১৯৯৬ সালের শেরে বাংলা কলেজের দিনগুলোয়।ভালোবাসা হয়তো হারিয়ে যায় না। তা কেবল সময়ের ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকে। ৩০ বছর পর যোগীর কান্দা ঘাটের বৃষ্টিভেজা বাতাস সেই ধুলো সরিয়ে দিল। #পড়ার মান যদি ভাল হয় তাহলে বাকি পর্বগুলো লিখতে পারবো।#

Comments

    Please login to post comment. Login