'হালালা সেন্টার' নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মালিক এক মহিলা তালাকপ্রাপ্ত নারীদের পুনরায় আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার সুবিধার্থে ‘হিল্লা’ বিয়ে করার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা করে।
হাজারখানেক লোক তাতে আবেদনও করে বসে। এরমধ্যে ৮০ জনের ইমেইলের স্ক্রিনশট ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস হয়। ওই তালিকায় যেমন আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী; তেমনই আছেন হাফেজ, আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসাশিক্ষক, মাদ্রাসা পরিচালক। দুঃখজনক সত্যিটা হলো প্রকাশিত ছবিগুলোর বড় অংশ ধর্মীয় লেবাসের মানুষ।
ফেসবুকে ‘হালালা সেন্টার’ নামের কাল্পনিক ওই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং তা ঘিরে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া আমাদের সমাজের ভেতরে থাকা এক জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনে দিল।
প্রত্যেকটি মানুষেরই আলাদা সংসার, সন্তান ও সম্মান আছে। সেসব পেছনে ফেলে বিপাকে পড়া একজন নারীর সুযোগ নিয়ে তাকে উপভোগের বাতিক পেয়ে বসা মানসিক অসুখ ছাড়া একে আর কীইবা বলা যায়।
এই ঘটনাটি নিছক একটি অনলাইন কৌতুক বা প্রতারণা নয়; বরং এটি সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একাধিক গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয় -বিশেষত নৈতিকতা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, লিঙ্গ সম্পর্ক এবং ডিজিটাল আচরণবিধি নিয়ে।
এখানে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে আসে তা হলো সামাজিক কাঠামোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা পিতৃতান্ত্রিক প্রবণতা। নারীর বৈবাহিক সম্পর্ককে 'ফিরিয়ে আনা' বা 'পুনর্বিন্যাস' করার ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রেই নারীর স্বতন্ত্র সত্তাকে নয়, বরং পুরুষের সম্পর্ক-নিয়ন্ত্রণের কাঠামোকেই কেন্দ্রে রাখে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি পিতৃতন্ত্রের সেই দীর্ঘস্থায়ী রূপ, যেখানে পরিবার ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভেতর দিয়ে লিঙ্গ-ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হয়।
ধর্মীয় ধারণার ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় বিধানের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে যখন সামাজিক বা অনলাইন পরিসরে বিকৃত বা সরলীকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন তা সহজেই আকর্ষণীয় অথচ বিতর্কিত সামাজিক আচরণে পরিণত হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার দেখিয়েছেন, ধর্ম মানুষের আচরণকে কাঠামোবদ্ধ করলেও তার ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সময় ও সমাজভেদে পরিবর্তিত হয়। এই ঘটনাটি সেই ব্যাখ্যাগত সংকটেরই একটি উদাহরণ। অপরদিকে সামাজিক নৈতিকতার দুর্বলতা বা ভাঙন -যাকে ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম 'অ্যানমি' বলে উল্লেখ করেছেন। যখন সামাজিক নিয়ম, নৈতিক মানদণ্ড ও ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানুষ সহজেই অস্পষ্ট বা বিতর্কিত পরিস্থিতিতেও অংশ নিতে দ্বিধা করে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনায় বিভিন্ন পেশাজীবী ও ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষদের অংশগ্রহণের অভিযোগ উঠে এসেছে, যা সামাজিক নৈতিকতার সার্বজনীন সংকটকেই ইঙ্গিত করে।
ডিজিটাল পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে -অনলাইন ডিসইনহিবিশন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে পরিচয়ের আড়ালে মানুষ অনেক সময় বাস্তব জীবনের তুলনায় ভিন্নভাবে আচরণ করে। গোপনীয়তা ও জবাবদিহিতার দুর্বলতার কারণে অনেকেই এমন সিদ্ধান্ত নেয় বা প্রতিক্রিয়া জানায়, যা অফলাইন সামাজিক বাস্তবতায় তারা হয়তো করত না।
এই ঘটনাটি রিলেশন ও সেক্সুয়ালিটির সামাজিক ধারণার এক ধরনের বাণিজ্যিকীকরণের দিকও তুলে ধরে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা যখন 'সিভি' বা 'প্রস্তাবের' মতো কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়ে, তখন তা সম্পর্কের অন্তর্নিহিত মানবিক দিককে আড়াল করে একটি লেনদেনভিত্তিক ধারণায় রূপ নেয়।
কথিত হালালা সেন্টারের এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ভণ্ডামি ও দ্বৈত আচরণের প্রশ্ন। প্রকাশ্যে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলা হলেও, ব্যক্তিগত ও গোপন আচরণ সবসময় সেই ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না -এই ফারাকই সমাজে এক ধরনের বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে। ফলে ‘হালালা সেন্টার’ বিতর্ক কেবল একটি ফেসবুক ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, নৈতিকতা, ডিজিটাল আচরণ এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার ব্যবহারের ওপর একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে অবৈধ ও অনৈতিক সংসর্গের নেশায় বাঙালি মানুষ বিচিত্র ও বিকৃত মনস্তত্ত্ব আত্মস্থ করবার দিকে পঙ্গপালের মতো ধাবিত হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশের এই মানুষের ঠিকানা অতল অন্ধকার ছাড়া আর কোথাও তো দেখি না।
লেখক: সাংবাদিক
১১ জুন ২০২৬