ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৭: প্রতিশোধের আগুন ও ছায়ার নতুন খেলা
নাদিয়ার মৃত্যুর পর ছয় মাস কেটে গেছে। টিকাটুলির মেসবাড়িটা এখন যেন একটা কবরখানা। আদিত্য দিনের বেশিরভাগ সময় বিছানায় শুয়ে থাকে। তার চোখের নিচে কালি, চুল উসকোখুসকো, শরীর ভেঙে পড়েছে। আয়েশা এখন দেখতে ছয়-সাত বছরের মেয়ের মতো। সে দ্রুত বেড়ে উঠছে। তার চোখে পরীর সেই গভীর কালো দৃষ্টি, কথায় একটা অদ্ভুত পরিপক্কতা।
প্রতিদিন সকালে আয়েশা আদিত্যর কপালে হাত রেখে বলে, “বাবা, কাঁদো না। মা তো চলে গেছে, কিন্তু আমি আছি। আমরা তিনজন চিরকাল একসঙ্গে থাকব।”
আদিত্য মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকে। কিন্তু তার ভিতরে আগুন জ্বলছে। নাদিয়ার শেষ কথাগুলো তার কানে বাজে — “আমাকে ভুলে যেয়ো না...”। সে প্রতিশোধ নিতে চায়। পরীকে চিরতরে ধ্বংস করতে চায়।
রাহাত ও সুমনের ফিরে আসা
রাহাত তার ভাঙা পা নিয়ে এখনও ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চলে। সুমনের চোখের ক্ষত এখনও সারেনি। এক শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনজন পুরোনো আমগাছের নিচে (গ্রামে ফিরে) বসল। আদিত্য প্রথম কথা বলল, “আমি আর এভাবে বাঁচতে পারব না। পরীকে শেষ করতে হবে।”
সুমন একটা পুরোনো বই বের করল। “আমি অনেক খুঁজেছি। এটা একটা প্রাচীন তান্ত্রিক গ্রন্থের কপি। পরীকে বাঁধতে হলে তার ‘আত্মার নোঙ্গর’ খুঁজে বের করতে হবে। তার অতীতের কোনো জিনিস — হাড়, চুল বা তার মৃত্যুর স্থানের মাটি।”
রাহাত বলল, “কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা আয়েশা। সে পরীর অংশ। তাকে ছাড়া পরীকে শেষ করা যাবে না।”
আদিত্য চুপ করে রইল। তার মেয়েকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যে ভয়ও আছে।
আয়েশার অন্ধকার বিকাশ
আয়েশা এখন স্কুলে যায় না। সে বাড়িতেই থাকে। কিন্তু তার ক্ষমতা ভয়ংকরভাবে বাড়ছে। একদিন আদিত্য দেখল, আয়েশা ঘরের মাঝখানে বসে খেলনা নিয়ে খেলছে। খেলনাগুলো নিজে নিজে উড়ছে। মেয়েটা হাসতে হাসতে বলল, “বাবা, আমি মাকে ফিরিয়ে আনতে পারি। কিন্তু তার জন্য তোমাকে আরও শক্তিশালী হতে হবে।”
সেই রাতে আদিত্য স্বপ্ন দেখল। পরী তাকে নিয়ে গেল ১৮১২ সালে। সে দেখল, পরীকে কীভাবে তার প্রেমিক নদীতে ডুবিয়ে মেরেছিল। মৃত্যুর আগে পরী তার রক্ত দিয়ে শপথ করেছিল — “আমার প্রেমিক ফিরে আসবে, আর আমি তাকে চিরকালের জন্য পাব।”
স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে আদিত্য দেখল তার হাতে একটা পুরোনো সোনার লকেট। পরীর লকেট। ভিতরে তার চুল আর এক ফোঁটা রক্ত জমাট বাঁধা।
নতুন ছায়া ও বিপদ
প্রতিশোধের পরিকল্পনা করতে গিয়ে নতুন এক বিপদ এল। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র ছাত্রী, সামিয়া, আদিত্যর সঙ্গে যোগাযোগ করল। সে একজন প্যারানর্মাল রিসার্চার। নাদিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে সে আদিত্যকে খুঁজে বের করেছে।
“আমি জানি তোমার সঙ্গে কী হচ্ছে,” সামিয়া বলল। “আমার বোনও এরকম একটা আত্মার শিকার হয়ে মারা গেছে। আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই।”
সামিয়া সুন্দরী, সাহসী এবং জ্ঞানী। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আদিত্যর মনে প্রথমবারের মতো একটা হালকা আলো ফুটল। কিন্তু পরী তা সহ্য করতে পারল না। একদিন সামিয়া আদিত্যর মেসে এলে হঠাৎ ঘরের সব আয়না ফেটে গেল। সামিয়ার হাত কেটে রক্ত পড়তে লাগল। আয়েশা দরজার আড়াল থেকে হাসছিল।
“বাবা, এই মেয়েটাও কি মা’র মতো চলে যাবে?” আয়েশা নিরীহ গলায় জিজ্ঞাসা করল।
প্রতিশোধের প্রথম পদক্ষেপ
তিন বন্ধু আর সামিয়া মিলে একটা পরিকল্পনা করল। তারা নদীর ধারে পরীর মৃত্যুস্থলে যাবে। সেখানে একটা তান্ত্রিক অনুষ্ঠান করবে। কিন্তু আয়েশাকে সঙ্গে নিতে হবে।
গ্রামে ফিরে তারা পুরোনো আমগাছের নিচে রাতে অনুষ্ঠান শুরু করল। সুমন মন্ত্র পড়ছিল, রাহাত লোহার চাকু দিয়ে বৃত্ত আঁকছিল। সামিয়া আদিত্যর হাত ধরে শক্তি দিচ্ছিল। আয়েশা চুপ করে বসে ছিল।
হঠাৎ ঝড় উঠল। পরী এবার তার পুরো ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হল। তার শরীর বিশাল, চুল আকাশ ছুঁয়েছে, চোখে আগুন। “তুমি আমার বিরুদ্ধে যাচ্ছ, আদিত্য? আমি তোমাকে সব দিয়েছি!”
আয়েশা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে কালো আলো বেরোতে লাগল। “মা, বাবাকে কষ্ট দিও না। আমরা সবাই এক হয়ে যাই।”
সেই মুহূর্তে আদিত্য বুঝতে পারল — আয়েশা পরীর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মেয়েটা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আদিত্যর শরীর অবশ হয়ে আসছিল। সে অনুভব করছিল, পরী তার শরীরের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে।
সামিয়া চিৎকার করে বলল, “আদিত্য! লকেটটা ভাঙো! এখনই!”
আদিত্য কোনোমতে লকেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চাপ দিল। একটা তীব্র চিৎকারে চারপাশ কেঁপে উঠল। পরীর শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস হল না। সে আয়েশার শরীরে ঢুকে গেল আরও গভীরভাবে।
রাহাত আর সুমন আহত হয়ে পড়ে গেল। সামিয়ার কপাল কেটে রক্ত পড়ছে। আদিত্য মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে।
এক নতুন রহস্য
অনুষ্ঠান শেষে সামিয়া আদিত্যকে একটা পুরোনো কাগজ দেখাল। “আমি আরও খুঁজেছি। পরী একা নয়। তার প্রেমিকও পুনর্জন্ম নিয়েছে। আর সেই প্রেমিক... তুমি নও, আদিত্য। তুমি শুধু তার টার্গেট। আসল প্রেমিক এখনও লুকিয়ে আছে।”
আদিত্য অবাক হয়ে তাকাল। “তাহলে আমি কে?”
সামিয়া চুপ করে রইল। “সেটা জানতে হলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে। কিন্তু সাবধান। এই খেলায় তুমি শুধু শিকার নও, তুমি একটা চাবি।”
সেই রাতে আদিত্য একা নদীর ধারে বসেছিল। আয়েশা তার পাশে এসে বসল। মেয়েটার চোখে এখন পরীর হাসি। “বাবা, আমরা এখন আরও শক্তিশালী। কিন্তু তুমি যদি আবার অন্য কাউকে ভালোবাসো, তাহলে সামিয়াকেও আমি মেরে ফেলব।”
আদিত্য আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু নতুন দৃঢ়তা। “আমি লড়ব। তোমার জন্যও, আয়েশা।”
দূরে বজ্রপাত হল। গল্প এখন আর শুধু প্রেমের নয়, এটা একটা বড় ষড়যন্ত্রের, পুনর্জন্মের এবং চিরকালের যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।
(পর্ব ৭ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: আসল প্রেমিকের পরিচয়, আদিত্যর শক্তির বিকাশ, সামিয়ার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, আয়েশার আরও ভয়ংকর রূপ এবং একটা বড় ধরনের ট্র্যাজেডি।
5
View