আধুনিক মানুষ রোবট
সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিট। অ্যালার্মের শব্দটা ঠিক একই সুরে বেজে উঠল, যেমন গত পাঁচ বছর ধরে প্রতিদিন বেজে আসছে। রাহুল চোখ না খুলেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা স্নুজ করল। দশ মিনিট পর আবার একই শব্দ। এবার উঠে বসল। চোখ দুটো এখনও আধা-বন্ধ। মুখ ধোয়া, দাঁত মাজা, চুল আঁচড়ানো—সবকিছু ঠিক যন্ত্রের মতো। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল। কোনো ভাব নেই, কোনো অনুভূতি নেই। শুধু একটা অভ্যাস।
রান্নাঘরে গিয়ে টোস্টার চালু করল। দুটো পাউরুটি, একটু মাখন, এক কাপ কফি। কফির স্বাদ আজও একই রকম। না বেশি তেতো, না মিষ্টি। ঠিক মধ্যম। খবরের অ্যাপ খুলল। স্ক্রল করতে করতে একই খবর—ট্রাফিক জ্যাম, শেয়ার মার্কেটের ওঠানামা, রাজনীতির চিৎকার। কোনো কিছুতেই মন বসল না। মন বসানোর প্রয়োজনও ছিল না। এটা শুধু সময় কাটানো।
সাড়ে আটটায় বেরিয়ে পড়ল। লিফটে পাশের প্রতিবেশী অমিতেশদা। “কেমন আছেন?” রাহুল জিজ্ঞেস করল।
“ভালো। আপনি?”
“ভালো।”
দুজনেই জানে এটা মিথ্যে। কিন্তু এই সংলাপ প্রতিদিনের অংশ। লিফটের দরজা খুলল। গাড়ি স্টার্ট দিল। ট্রাফিকের লাল আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সব গাড়ির মানুষগুলোকে দেখল। সবাই ফোনের দিকে তাকিয়ে। কেউ হাসছে না, কেউ কথা বলছে না। শুধু অপেক্ষা। গাড়ি চলছে, মানুষ চলছে, শহর চলছে—সবকিছু একটা বিশাল যন্ত্রের অংশের মতো।
অফিসে পৌঁছাতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। কিউবিকলে বসে কম্পিউটার চালু করল। লগইন, পাসওয়ার্ড, ইমেইল চেক। একশো সাতাশটা নতুন ইমেইল। সবগুলো পড়া, রিপ্লাই করা, টাস্ক লিস্ট আপডেট করা। মিটিং শুরু হলো এগারোটায়। জুম লিংক খুলল। স্ক্রিনে একগাদা মুখ। সবাই “হ্যালো”, “গুড মর্নিং” বলল। তারপর একঘেয়ে আলোচনা—ক্লায়েন্টের ডেডলাইন, বাগ ফিক্স, নেক্সট স্প্রিন্ট। রাহুলের মুখে হাসি ফুটে উঠল যখন তার টার্ন এল। কিন্তু সেই হাসিটা প্রোগ্রাম করা। ভিতরে কোনো আনন্দ নেই।
দুপুরের খাবার সময় ক্যান্টিনে গেল। ডাল-ভাত, একটা সবজি, এক টুকরো মাছ। পাশের টেবিলে সহকর্মীরা একই খাবার খাচ্ছে। কথা বলছে অফিসেরই। কে প্রমোশন পেল, কার বাড়িতে নতুন গাড়ি এসেছে, কার বাচ্চার স্কুলের ফি বেড়েছে। রাহুল শুনছিল কিন্তু শুনছিল না। তার মাথার ভিতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—এটা কি জীবন? না শুধু একটা লুপ?
বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ। ট্রাফিক আবার। বাড়ি ফিরে স্ত্রী প্রিয়া জিজ্ঞেস করল, “কেমন ছিল দিন?”
“ঠিক আছে। তোমার?”
“একই রকম।”
ছেলে আর্য স্কুল থেকে ফিরেছে। টিভিতে কার্টুন দেখছে। রাহুল তার পাশে বসল। কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু আর্যর উত্তরগুলো ছোট ছোট। “হ্যাঁ”, “না”, “জানি না”। প্রিয়া রান্না করছে। রাহুল সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই একই জিনিস পোস্ট করছে—খাবারের ছবি, অফিসের কমপ্লেইন, ছুটির প্ল্যান যা কখনো বাস্তব হয় না। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার। একটা অদৃশ্য যন্ত্র সবাইকে চালিয়ে নিচ্ছে।
রাত নটা। খাওয়াদাওয়া শেষ। টিভি চলছে। খবরে বলছে অর্থনীতি ভালো চলছে, মানুষের আয় বেড়েছে। কিন্তু রাহুল জানে এই আয়ের পিছনে কতটা সময়, কতটা ঘুম, কতটা আনন্দ বিক্রি হয়েছে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের জানালাগুলোতে আলো জ্বলছে। প্রত্যেকটায় একই দৃশ্য—মানুষ টিভি দেখছে, ফোন দেখছে, ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহরটা যেন একটা বিশাল রোবট ফ্যাক্টরি।
পরের দিন সকাল সাতটা দশ। একই অ্যালার্ম। একই রুটিন।
এভাবে দিন কেটে যাচ্ছিল। সপ্তাহ, মাস, বছর। রাহুলের বয়স বাড়ছিল কিন্তু তার জীবনের কোনো গল্প তৈরি হচ্ছিল না। সবকিছু একটা লম্বা, সমান্তরাল লাইন। অফিসে প্রমোশন হলো। বেতন বাড়ল। নতুন গাড়ি কিনল। প্রিয়া নতুন ফ্রিজ কিনল। আর্য ক্লাসে ফার্স্ট হয়। সবাই বলল, “খুব ভালো হয়েছে।” কিন্তু রাহুলের ভিতরে একটা ফাঁকা অনুভূতি বাড়ছিল। যেন সে একটা প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে যার কোড সে নিজে লেখেনি।
একদিন অফিসে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মিটিংয়ের মাঝে রাহুল হঠাৎ বলে ফেলল, “আমরা সবাই রোবট হয়ে গেছি।” সবাই হাসল। কেউ বলল, “মজা করছ নাকি?” কেউ বলল, “স্ট্রেস হয়েছে বোধ হয়।” মিটিং শেষ হলো। কিন্তু সেই কথাটা রাহুলের মাথায় আটকে রইল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে প্রিয়াকে বলল, “চলো কোথাও ঘুরে আসি। শুধু আমরা তিনজন। কোনো প্ল্যান ছাড়া।”
প্রিয়া অবাক হয়ে তাকাল। “কিন্তু আর্যর স্কুল? তোমার প্রজেক্ট? ছুটি পাবে?”
“একবার চেষ্টা করি।”
পরের সপ্তাহে তারা একটা ছোট পাহাড়ি জায়গায় গেল। প্রথম দিনটা অদ্ভুত লাগছিল। কোনো অ্যালার্ম নেই, কোনো মিটিং নেই। রাহুল সকালে উঠে চা খেল, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো ফোন নেই, কোনো স্ক্রল নেই। প্রিয়া হাসছিল। আর্য দৌড়াদৌড়ি করছিল। কয়েক ঘণ্টার জন্য মনে হলো তারা মানুষ।
কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে অস্বস্তি শুরু হলো। রাহুলের মাথায় অফিসের টাস্ক ঘুরতে লাগল। প্রিয়া চিন্তা করতে লাগল বাড়ির কাজের কথা। আর্য বলল, “বাবা, বাড়ি চলো। আমার গেম আছে।” তারা ফিরে এল।
বাড়ি ফিরে আবার সেই পুরনো লুপ। অ্যালার্ম, ট্রাফিক, অফিস, খাবার, টিভি, ঘুম। রাহুল বুঝতে পারল—এটা আর শুধু অভ্যাস নয়। এটা একটা সিস্টেম। সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি—সব মিলে একটা বিশাল যন্ত্র তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষকে রোবট বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এই যন্ত্রটা চালানোর জন্য আর কোনো মাস্টার নেই। সবাই নিজেরাই নিজেদের চালাচ্ছে।
রাতে ঘুমের আগে রাহুল ভাবল—যদি সবাই একদিন একসাথে থেমে যেত? যদি সবাই বলত, “আজ আমি রোবট হব না”? কিন্তু সেটা কখনো হবে না। কারণ পরের দিন আবার অ্যালার্ম বাজবে। সাতটা দশ মিনিটে।
এভাবে দিন যায়। রাহুল এখন আর প্রশ্ন করে না। সে শুধু চালিয়ে যায়। কোড লেখে, মিটিং করে, ট্রাফিকে দাঁড়ায়, খায়, ঘুমায়। তার ছেলে আর্য বড় হচ্ছে। সেও একদিন এই একই লুপে ঢুকে যাবে। প্রিয়া বুড়ো হচ্ছে। রাহুল নিজেও।
কিন্তু কখনো কখনো, খুব সকালে বা খুব রাতে, যখন শহরটা একটু চুপ করে, রাহুল জানালার কাছে দাঁড়ায়। বাইরে আলো জ্বলা জানালাগুলো দেখে। হাজার হাজার রোবট মানুষ। সবাই একই প্রোগ্রাম চালাচ্ছে। আর সে নিজেও তাদের একজন।
তারপর অ্যালার্ম বাজে।
সাতটা দশ।
সে উঠে পড়ে। মুখ ধোয়। টোস্টার চালু করে। জীবন চলতে থাকে। যেমন চলছে, যেমন চলবে।
(গল্পের এই অংশটুকু প্রায় ১২০০ শব্দের কাছাকাছি। পুরো গল্পটাকে আরও বিস্তারিত করতে চাইলে প্রতিটি দিনের রুটিন, অফিসের বিভিন্ন চরিত্র, শৈশবের স্মৃতি, সমাজের অন্যান্য অংশের বর্ণনা যোগ করে আরও লম্বা করা যায়। কিন্তু মূল থিম একই—আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও একঘেয়েমি।)
4
View