কুয়াকাটার মেঘবালিকা
১. সৈকতের বালুচরে এক টুকরো কান্না
কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতে তখন সূর্য ডোবার আয়োজন চলছে। আকাশের ক্যানভাসে কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে আবির, সিঁদুর আর হালকা বেগুনী রঙের মায়া। বিশাল সমুদ্রের গর্জন চারপাশের কোলাহলকে ছাপিয়ে এক অদ্ভুত একাকীত্ব তৈরি করছে। পর্যটকদের ভিড়, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ঢেউয়ের সাথে পা ভিজিয়ে হাসাহাসি করছে। ঠিক তখনই আমার নজর পড়ল ঝাউবনের কাছাকাছি এক জায়গায়।
একটা ছোট্ট মেয়ে। বয়স বড়জোর তিন কি চার। পরনে লাল রঙের একটা ফ্রক, যা বালি আর সমুদ্রের নোনা জলে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। মেয়েটি হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার ছোট ছোট দুটি কাঁধ কান্নার বেগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। চারপাশে এত মানুষ, কিন্তু কেউ এই এক ফোঁটা কান্নার দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই নিজের আনন্দ নিয়ে ব্যস্ত।
আমি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বাচ্চাটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে নরম গলায় ডাকলাম, "এই যে খুকি, কাঁদছ কেন?"
মেয়েটি মুখ তুলল। তার ডাগর ডাগর দুটি চোখে জল টলমল করছে। গালের ওপর বালির কণা লেপ্টে আছে। আমাকে দেখে সে ভয় পেল না, বরং তার ছোট্ট দুটি হাত বাড়িয়ে দিল। আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম। শরীরটা ভয়ে আর ঠান্ডায় কাঁপছে।
"তোমার নাম কী মা?" আমি তার ফ্রকের বালি ঝাড়তে ঝাড়তে জিজ্ঞেস করলাম।
সে তার ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, "স্বপনা।"
"তোমার বাড়ি কোথায় স্বপনা? মা-বাবা কোথায়?"
স্বপনা সাগরের দিকে হাত উঁচিয়ে বলল, "ঢাকা।"
বুঝলাম, সে ঢাকা থেকে এসেছে। কিন্তু এই বিশাল সৈকতে তার মা-বাবা কোথায়? আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার আম্মুর নাম কী বলতো?"
সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ মুখে বলল, "মা।"
আমি একটু হেসে বললাম, "হ্যাঁ, সে তো তোমার মা। কিন্তু নাম কী?"
সে আবার জোর দিয়ে বলল, "মা।"
"আচ্ছা, তোমার আব্বুর নাম কী?"
সে এবার আরও দৃঢ়তার সাথে বলল, "বাবা।"
আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। বাচ্চাটি এতটাই ছোট যে নিজের নাম আর শহরের নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছে না। মা-বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে সে শুধু 'মা' আর 'বাবা' বলেই খালাস।
"তোমরা কিসে এসেছ এখানে?" আমি জানতে চাইলাম।
সে ঝাউবনের ওপাশে পার্কিংয়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "গাড়ি।"
তার মানে তারা কোনো ট্যুরিস্ট বাস, মাইক্রোবাস বা নিজস্ব গাড়িতে করে ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় এসেছে। আজ বিকেলেই হয়তো পৌঁছেছে, আর ভিড়ের মধ্যে কোনোভাবে মেয়েটি মায়ের হাত ছুটে হারিয়ে গেছে।
২. অন্তহীন খোঁজ এবং একটি মাইকের আওয়াজ
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সৈকতের আলো আঁধারে রূপ নিল। আমি স্বপনাকে কোলে নিয়ে পুরো সৈকত চষে ফেললাম। ট্যুরিস্ট পুলিশের বক্সের দিকে যাওয়ার সময় দেখছিলাম প্রতিটি বাচ্চার মায়ের চোখে যে ব্যাকুলতা থাকার কথা, তেমন কাউকে পাওয়া যায় কি না। কিন্তু কোনো মায়ের চিৎকার বা কান্নার আওয়াজ কানে এলো না। সাগরের গর্জন যেন সব শব্দকে গিলে খাচ্ছিল।
আমি কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সে গেলাম। দায়িত্বে থাকা ডিউটি অফিসারকে পুরো বিষয়টা খুলে বললাম। স্বপনা ততক্ষণে আমার কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্তিতে চোখ বুজেছে।
অফিসার বললেন, "ভাই, কুয়াকাটায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে। বিশেষ করে ছুটির দিনে চেনা মুশকিল। আপনি একটু বসেন, আমরা মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করছি।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই সৈকতের লাউডস্পিকারে একটা যান্ত্রিক কিন্তু আশাবাড়ানো কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল:
"সম্মানিত পর্যটকবৃন্দ, আপনাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সৈকতের ঝাউবন এলাকা থেকে আনুমানিক তিন-চার বছরের একটি কন্যা শিশু পাওয়া গেছে। শিশুটির নাম স্বপনা, পরনে লাল ফ্রক। সে তার মা-বাবার নাম বলতে পারছে না, শুধু ঢাকা চেনে। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা তার অভিভাবক যদি তাকে চিনে থাকেন, দয়া করে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সে যোগাযোগ করুন।"
ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। অ্যানাউন্সমেন্টটা বারবার বাজতে লাগল। কিন্তু কেউ এলো না। ট্যুরিস্ট পুলিশের দুই মেম্বার সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এলো, কিন্তু কোনো পরিবার তাদের বাচ্চা হারিয়েছে বলে রিপোর্ট করেনি।
আমার মনে একটা খটকা লাগল। একটা তিন বছরের বাচ্চা হারিয়ে গেছে, আর তার মা-বাবা এখনও পুলিশকে জানায়নি? তারা কি এখনও টের পায়নি? নাকি কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে?
আমি স্বপনার দিকে তাকালাম। ঘুমের ঘোরেও সে 'মা... মা...' বলে বিড়বিড় করছে। তার এই অবুঝ আকুতি আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যেকোনো মূল্যে এই বাচ্চার মাকে আমার খুঁজে বের করতেই হবে।
৩. গাড়ির সূত্র ধরে অন্ধকার রাতে অভিযান
পুলিশ অফিসার আমাকে বললেন, "আপনি বললেন বাচ্চাটা গাড়িতে এসেছে বলেছে। চলুন, আমরা একটু পার্কিং লটগুলো ঘুরে দেখি। ঢাকা থেকে আসা বাস বা দূরপাল্লার মাইক্রোবাসের ড্রাইভারদের জিজ্ঞেস করি।"
আমি, একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং কোলে স্বপনাকে নিয়ে কুয়াকাটার মূল বাস স্ট্যান্ড এবং হোটেলের সামনের পার্কিং এলাকার দিকে রওনা হলাম। রাত তখন প্রায় ৯টা।
আমরা একের পর এক বাসের ড্রাইভার এবং হেল্পারদের জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। "ভাই, ঢাকা থেকে আসা কোনো ফ্যামিলির বাচ্চা হারিয়েছে? লাল ফ্রক পরা, নাম স্বপনা?"
সবাই মাথা নাড়ল। কেউ কিছু জানে না।
হতাশা যখন গ্রাস করছে, তখন একটা লাইটসের (মাইক্রোবাস) ড্রাইভার আমাদের কথা শুনে এগিয়ে এলো। সে বলল, "ভাই, আমাদের গাড়িতে ঢাকা থেকে একটা ফ্যামিলি আইছে বিকেলে। একটা ছোট মেয়ে আছিল লাল জামা পরা। তবে তারা তো হোটেলে চইলা গেছে।"
আমার মনে আশার আলো জ্বলে উঠল। "কোন হোটেলে গেছে ভাই? আপনি জানেন?"
ড্রাইভার বলল, "হ হ, ওই যে 'সৈকত নিবাস' হোটেলে নামাইয়া দিছি। আপনেরা ওইহানে খোঁজ লন।"
আমরা আর দেরি না করে দ্রুত 'সৈকত নিবাস' হোটেলের দিকে ছুটলাম।
৪. পুনর্মিলন এবং এক মায়ের কান্না
হোটেলের রিসেপশনে গিয়ে ম্যানেজারকে বলতেই সে জানাল, হ্যাঁ, তিন তলার ৩০২ নম্বর রুমে ঢাকা থেকে এক দম্পতি এসেছেন। তবে তারা রুমে ঢোকার পর থেকে আর বের হননি।
আমরা দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠলাম। ৩০২ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে দরজায় নক করলাম। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ নেই। আবার জোরে নক করতেই এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন। তার চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু কোনো উদ্বেগের চিহ্ন নেই।
আমাদের এবং পুলিশের পোশাক দেখে তিনি চমকে উঠলেন। আর তখনই আমার কোলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "আরে, স্বপনা! তুমি এদের কাছে কীভাবে?"
রুমের ভেতর থেকে এক ভদ্রমহিলা ছুটে এলেন। স্বপনাকে দেখেই তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন এবং আমার কোল থেকে তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। স্বপনাও তার মাকে চিনে ফেলে 'মা... মা...' বলে কাঁদতে লাগল।
আমি এবং পুলিশ অফিসার অবাক হয়ে ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনারা কেমন মা-বাবা? বাচ্চাটা বিকেল থেকে সৈকতে একা একা কাঁদছিল, আর আপনারা রুমে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন? পুলিশে একটা খবরও দেননি!"
ভদ্রলোক লজ্জিত এবং অপরাধীর মতো মাথা নিচু করলেন। তিনি বললেন, "ভাই, আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা ঢাকা থেকে সারারাত গাড়ি চালিয়ে বিকেলে এখানে পৌঁছাই। প্রচণ্ড জার্নি আর ক্লান্তিতে রুমে ঢুকেই আমরা বিছানায় অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। আমরা ভেবেছিলাম স্বপনা তার দাদুর রুমে আছে (তারা দুই গাড়িতে পুরো পরিবার এসেছেন)। আমরা ভাবতেই পারিনি ও রুমের দরজা খুলে একা একা বাইরে চলে গেছে আর সৈকতে চলে গেছে! আমাদের এত বড় ভুল হয়ে গেছে ভাই..."
বাচ্চাটির মা তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে আমার পা ছুঁতে গেলেন। "বাবা, তুমি যদি আমার কলিজাটারে আজ না বাঁচাইতে, সাগরের জোয়ারে আমার মেয়েটা ভেসে যেত! আমি সারাজীবন তোমার এই ঋণ শোধ করতে পারব না।"
আমি তাকে থামালাম। স্বপনা এখন তার মায়ের কোলে সুরক্ষিত। সে তার ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিচ্ছে। যে বাচ্চাটি এতক্ষণ শুধু 'মা' আর 'বাবা' ছাড়া আর কিছু বলতে পারছিল না, সে এখন মায়ের বুকে মাথা রেখে শান্ত।
কুয়াকাটার রাতটা তখন অনেক গভীর। বাইরে সাগরের গর্জন স্তিমিত হয়ে এসেছে। একটা হারানো শিশুকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারার যে আনন্দ, তা আমার জীবনের অন্যতম সেরা এক অনুভূতি হয়ে রইল।
9
View