Posts

গল্প

মেরি গল্পটি হয়তো এ শহরেরই আরো এক দৃশ্য

June 12, 2026

সাজ্জাদুল হক

138
View

"মেরি"

‎পুরাতন দোতলা বাড়িটার রান্না ঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে অনবরত বিভিন্ন রান্নারত খাবারের উগ্র ঝাঝ ঝাঝালো বাতাস হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে । তামাটে রঙের একজন বয়স্ক  মহিলা প্রত্যহ রান্নাঘরের রন্ধন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কাজে এটা ওটা করতে দেখা যায় । রান্নাঘরের জানালাটির পাশেই একটা  ব্যাচেলর ছেলেদের মেস সেখান হইতে একটা পুরাতন হিন্দি গানের মৃদু সুর ভেসে আসছে রান্নাঘর অবধি ।

সকল নয়টা। ডাইনিং রুমের টেবিলে কয়েকজন বসে আছে ।  তীব্র হাস্য রসাত্মক কথা চালাচালির সরব ডাইনিং রুমটিতে , খুশির মাতম । রান্নাঘরের সিন্কের মধ্য হতে বয়স্ক মহিলাটির কাচের বাসন-কোসন আর কাপ পিরিচ ধোয়ার কচর মচড় শব্দের সাথে মেসের ওপাশ থেকে ভেসে আসা পুরাতন দিনের হিন্দি গানের সুর মিশে আর ডাইনিং রুম থেকে অস্পষ্ট আবছা অট্টহাসির রোল যোগ হয়ে যেন এক অদ্ভুত বিরল সংগীতের মঞ্চ তৈরি করে চলছিল ।

খানিকক্ষণ বাদে ডাইনিং রুম থেকে হেরে গলায় একজন মহিলা বয়স ছত্রিশ কি সাইত্রিশ হবে , হাক মেরে চেঁচিয়ে মেকি আদুরে গলায় বলল ও মেরি খালা আরো এক কাপ চা দাও না খালা । মেরি তৎক্ষণাৎ উত্তর করে না , শুনতে পেয়েছে কিনা কে জানে ?  রান্নাঘরে রান্নারত বয়স্ক মহিলাটির নাম মেরি । মেরি এখনো একনাগারে লিকুইড পরিষ্কারক মাখানো সিনকের মধ্যে তৈজসপত্র গুলো ধুয়েই চলছে ।

মেরি কখনোই তার কাজ নিয়ে তাড়াহুড়ো করে না শান্তভাবে ধীরে খুব মনোযোগ নিয়ে হাতের কাজটি শেষ করে । তার যেন কোন উদ্দেশ্য নেই , কিছু নতুন নেই , স্থির করে যাওয়াই , বিদ্যমানোতাই সত্য । রন্নাঘরে চুলোর উপরে চাপানো হাড়ির ভেতর টপ টপ ঝাঝালো ঝোলের ব্লক উঠতে থাকে , রান্না ঘরটির বাহির থেকে জানালার ভেতর দিয়ে চুলোয় চাপানো হারিটির উপর দিয়ে তরকারির উড্ডীয়মান ধূমায়িত বাষ্পের অপরদিকে মেরির শান্ত মুখটি আবছা হয়ে দেখা দেয় । মাঝে মাঝে দাপটা বাতাস জানালায় টোকা দেয় , জানালার কবাডটিতে টুক করে আওয়াজ হয় , আর মেরির স্থবিরতা ভেঙে দিয়ে আবার নিশ্চুপ চারদিক ।

কিছুক্ষন আগে ডায়নিং হতে চায়ের  জন্য যে অনুরোধ এসেছিল তার জন্য রান্নাঘরের মধ্যে এখনো কোন প্রকারের কর্মতৎপরতা দেখা গেলো না। মেরি ঘামার্ত মুখে দাড়িয়ে , তার সামনে হাড়ির ভেতর একটি কাঠের লম্বা বড়ো চামচ দিয়ে নাড়ছিল । ক্ষানিকবাদে আবার ডায়ানিং হতে চায়ের জন্য উচ্চস্বরে রব আসে , এবার আর একজন নয় , বেশ কয়েক কাপ চায়ের জন্য অনুরোধ আসে , মেরি হয়তো এই মুহূতের জন্যই অপেক্ষা করছিল , যখন একসাথে অনেক কাপ চায়ের দরকার পড়বে  । যেন সে পুনরায়া পাতিলে থাকা চা একসাথে গরম করে সবটা সবাইকে খাইয়ে দিতে পারে ।

‎[দুই]

‎ ডায়ানিং রুমটি তুলনামূলক বেশ বড়ো । খাবারের টেবিলটির সামান্য দূরেই তিন সিটের একটি পুরাতনী জামানার কালো কাঠের  সোফা , তাতে শাহানুর বেগম বসে ডাইনিং টেবিলের  সকলের খাওয়া বিশেষ পর্যবেক্ষন করছেন । শাহানুর বেগমই  এই  বাড়িটির প্রধান কর্তি । স্বামী সোহরাব সাহেব গত  হয়েছেন  আজ বহু বৎসর । তাকে কি স্বামী থাকতে যেমন এই সংসারটি শাহানুর বেগম আর মেরি মিলে সাঝিয়ে গুছিয়ে তকতকে করে রেখেছেন , আজও এতদিনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি কোনদিন।

শাহানুর বেগমের ছেলে মেয়েগুলো , এবং মেয়েদের স্বামীগুলো যখন সবাই মিলে ডাইনিং এ খেতে বসে একসাথে , তখন শাহানুর বেগম এভাবেই কালো কাঠের সোফাটিতে বসে সবার খাওয়া তদারকি করেন , মন ভরে দেখেন এবং একে ওকে খাবার উঠিয়ে দেওয়ার জন্য মেরিকে ফরমাশ দেন । শাহানুর বেগম অবশ্য রান্নাবান্নার কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন তাও প্রায় অনেক বছর হল । তবে ঘরোয়া কিছু নিদিষ্ট কাজ সে এখনো একাই নিজে করতে পছন্দ করে , কাউকে সে কাজের দায়িত্ব দিতে চাননা ,  

যদিও বাড়িতে নানান কাজের সাহায্য করার জন্য আরো দুজন মানুষ রয়েছে , একজন নয়নের মা , সে ছুটা বুয়া বাড়ির সকলের জামাকাপড় ধুয়ে দিয়ে সাহায্য করে। অন্যজন কুন্তী , বয়স সতেরো কি উনিশ হবে , সবার এটা ওটা ফরমাশ খাটা এবং বাহিরে অর্থাৎ দোকানপাটে কারো কিছুর প্রয়োজন পড়লে কুন্তি বিশেষ প্রয়োজনীয়। শাহানুর বেগম কালো কাঠের সোফাটিতে বসে বসে এখনো সবার খাওয়া , বিশেষ করে তার মেয়ের জামাইদের খাওয়া মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।

সেই কোন কতদিন আগে পনের ষোল বৎসর বয়সে সোহরাব সাহেবের সাথে পারিবারিক সূত্রে বিবাহ ,
তারপর নতুন বর কনে হয়ে রুপাপুরের মফস্বলের নিজ বাপ-মা ভাই-বোনদের ছেড়ে সোহরাব সাহেবের সরকারি চাকরির  সুবাদে ঢাকা শহরে চলে আসা । ঢাকাতে ভাড়া বাসায় উঠে প্রথম ছয় মাস শাহানুর বেগম বিভিন্ন আসবাবে ঘর সাঝাতে গুছাতে কিভাবে যে পার করলো টেরই পেলনা ।

ওই যেমন শোবার ঘরটি কেমন হবে , ডাইনিং ঘরটি কেমন হবে , বাকিগুলো রান্নাঘর , বারান্দা, ফ্লোর , বিভিন্ন ঘরোয়া তৈজসপত্র, আসবাব, ফার্নিচার ওই সব কিছু কিছু গুছিয়ে উঠতে বেশ অনেকদিন লেগে যায়। শাহানুর বেগমের এখন যেন স্বামী সোহরাম সাহেবের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে  তাদের দুজনে থাকার ঘরটি বসার ঘরটি। সমস্ত ঘরটি , গোটা ঘরটির চিন্তা তার মাথায় চেপে বসে । 

[‎তিন]

‎প্রত্যহদিন সারা বাড়ি ধুয়ে মুছে সাজিয়ে গুছিয়ে তকতকে ঝকঝকে করে রাখতেন , কোথাও সামান্য ধুলোর কণাও পরতে দিতেন না। সারাদিন শাহানুর বেগমের ওই এক সংসার সংসার কেবলি সংসার। সংসারটি যেন তার কাছে আস্ত একটা দেবালয় আর শাহানুর বেগম যেন এই দেবালয়ের এক ভক্তিময়ী মায়াধারনকারিনি পরিচারিকা ।

এভাবেই দিন অতিবাহিত হতে থাকে । সোহরাব সাহেব অল্পদিনের মধ্যেই বুজতে পেরে গিয়েছেন তার সদ্য বধূটির কাছে আপন স্বামী সংগের চেয়ে তার নিজের নতুন গৃহটি অথাৎ দুজনার এ সংসারটি যেন বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সোহরাব সাহেব প্রথমে ভেবেছিলেন এই মফসলের মেয়েটি বাপের বাড়ির বন্ধন ছেড়ে এত দূরের এত বড়ো শহরে একলা বাড়িতে বিশেষ কোনঠাসা হয়ে পড়বে । কেননা সোহরাব সাহেবকে দিনের প্রায় বেশি অংশটাই কাজের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে থাকতে হয়  । তাই সোহরাব সাহেব সহজেই অনুমান করে নিয়েছিলেন তার স্ত্রীর পক্ষে এই শহরে ঘরকন্না পাতিয়া লইতে কিছু কঠিনই হইবে । সারাদিন অফিসে থাকিলে বউটি বাড়িতে  একলা একাকিত্বে হয়তো মাথা কুটে পড়ে থাকবে ।

কিন্তু মানুষ সাঝতে চায় একরকম আর সাঝ হইয়া ওঠে অন্য । হিসেব মিললো তার উল্টো। এখন শাহানুর বেগব এই ক্ষুদ্র সংসারটির প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়িয়াছে যে সারা দিনরাত ঘরের নানান ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে এতই উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে যে প্রায় মাঝে মাঝে সোহরাব সাহেব হেসে হেসে ‎বলতেন শাহানুর তুমি সারা দিনরাত ঘরের নানান কাজে এতই মজে যাচ্ছো তোমার কাজের বিশেষ সুবিধার্থে কোনদিন হয়তো আমাকেই বলে বসবে,  এই নাও তোমার বিছানা বালিশ কাল থেকে সারা সন্ধ্যাটা তুমি অফিসেই বিশ্রাম করো। কথাটি শেষ হবার পর শাহানুর বেগম মিটিমিটি চোখে রাগের ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতেন।

‎তারপর অনেকদিন এভাবেই কেটে যায় , সোহরাব সাহেব বুঝতে পারেন তিনি ঘরে একজন বেশ পটু স্ত্রীর পাশাপাশি উপরন্তু কিছু শক্ত অসুখও বাড়িতে ঢুকিয়েছেন। কেননা শাহানুর বেগমের ছিল বাতের বেরাম এবং আরো নানাবিধ শারীরিক বিমারী । সময় সময় বিশেষ ঘটা করে ভুগতে হয়। সঙ্গত কারণেই সোহরাব সাহেব এখন অফিসে গিয়ে খুব একটা স্বস্তি পান না । অসুখে পড়ে থাকলেও, পরে সামান্য সুস্থ হয়ে বিশ্রাম করে নিয়ে যদি শাহানুর বেগম শরীরকে একটু শান্তি দিতেন তাহলে ও বোধহয় সোহরাব সাহেবের কোন প্রকার উদ্বিগ্নতা থাকতো না।

কিন্তু স্ত্রীটি হয়েছে একরখো , সংসারের কাজের ক্ষেত্রে সারাদিন খেটেই যাচ্ছে তো খেটেই যাচ্ছে , যেখানে একগুণ কাজ করার দরকার সে সেখানে তিনগুণ কাজ করতে প্রবৃদ্ধ হয় , আর এই দুঃখটাই সোহরাব সাহেবের মনে বেশি বাজে । তিনি এসব নিয়ে আগে থেকেই সন্ধিহান ছিলেন আর এখন শাহানুর বেগমের বিশেষ অসুখের তৎপরতায় বেশ চিন্তিত বোধ করলেন আর মনে মনে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন অনুভব করলেন না নিজের জন্য নয় শাহানুর বেগমের জন্য।  

গ্রাম থেকে যদি কোন মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসা যায় তাহলে তিনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত মনে অফিসে বসতে পারেন । সারাটা দিন অফিসে এই ভাবনার মধ্যে পাক খেতে খেতে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে কথাটি পারলেন , বুঝছো শাহানুর কয়েকদিন ধরে ভাবলাম বাসায় সারাদিন কত কাজ করো একা একা, তারপরও ঠিক কুলিয়ে উঠতে পারছো না,  কাজ শেষ হয় না তোমার,  শারীরিক কন্ডিশান ও খুব একটা ভালো থাকে না আজকাল তোমার,  তাই বলছি যদি পারুলকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা যায় তাহলে তোমার একজন সঙ্গী ও হয় আবার দুজন মিলে সহজেই ঘরদোর ফকফকে করে  নিকিয়ে রাখতে পারো।

[চার]

শাহানুর বেগম স্বামীকে চিনতেন তাই বুঝতে পারেন উনি ঠিকই বলেছেন । সব ঠিক আছে কিন্তু পারুলটা যেন কে বলোত ? সোহরাব সাহেব মৃদু হেসে আরে আমাদের পারুকে চিনলে না বিয়ের পরপরই হেলেনপুরে আমার মেজো মামার বাসায় তোমাকে নিয়ে গেলাম , মামা বাড়িতে আশ্রিতা ওই যে মেয়েটি পারুল মনে নেই তোমার , শাহানুর বেগম এতক্ষণে বললেন ও হ্যাঁ মনে পড়েছে । শাহানুর বেগম বসে ছিলেন বিছানায় পাশেই ঘুরে টি টেবিলটির উপর নিজের চায়ের খালি কাপটি রাখতে রাখতে বলল, এমন যখন বলছো তাহলে তো মেরিকে ই নিয়ে আসতে পারি ।

রুপাপুর শাহানুর বেগমদের বাড়ি অর্থাৎ সরকার বাড়ির দু`বাড়ী পরেই মেরিদের বাড়ি। বেচারীর বাপ মা নেই কেউ থাকার মধ্যে আছে দুই ভাই । মেরি তাদের ছোটা। ভাইয়েরা দুজনই বিবাহিত।
মেরি এখন বড়ো ভাইয়ের সংসারেই থাকে । মেরি বয়সে শাহানুর বেগমের চেয়ে বছর তিনেকের একটু বেশি ছোট হইবে । মেরির যখন আট কি নয় বছর বয়স তখনো তার মা বেঁচে ছিলেন । ছোট মেরির মায়ের সাথে শাহানুর বেগমদের সরকার বাড়িতে রোজই যাতায়াত ছিল । শাহানুর বেগমের মা মেরিকে বিশেষ স্নেহ করতেন এবং নিত্য তৈরিকৃত নানান খাবার দাবার তরিতরকারি যাই রান্না হত বাড়িতে তার কিছু কিছু মেরির মায়ের হাতে দিতেন সকলের অগোচরে ।

তখন মেরির বাবা সদ্য নিখোঁজ হয়েছেন কাজেই মেরির মা তাদের তিন ভাই বোনকে নিয়ে বিশেষ বিপাকের মধ্যে পড়ে যান।মেরি তখন থেকেই শাহানুর বেগমের বিশেষ নেওটা ছিল, সব সময় শাহানুর বেগমের সাথে ছায়ার মতন লেগে থাকতে শুরু করে । তখন থেকেই মেরি শাহানুর বেগমকে বুবু বলে ডাকতো শুরু করে । এই বুবু ই এখন তার সব । বুবুর কাজ কিছু কিছু মেরী তখন থেকে করে দিতে শুরু করে । সকাল বিকেল বুবুর কাছে না আসতে পারলে কিছুতেই যেন তারা আর চলছিল না । ছোট থেকেই মেরি ছিল শাহানুর বেগমের অন্যতম সহচর বা ভৃত্যর মতো ও বলা যেতে পারে ।

তারপর একদিন অভাবের ঘূর্ণির মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মেরির মাও পরলোকগমন করেন তাতে মেরীর জীবনে যা গোলযোগ ঘটেছিল তার চেয়ে বেশি বিপত্তি ঘটেছিল শাহানুর বেগমের বিয়ের পর ঢাকায় আগমন। খবর পাওয়া যায় বেচারি মেরি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে সারাদিন শাহানুর বেগমের জন্য বিলাপ করতে করতে থাকে রাতদিন।

‎ঐদিন সন্ধ্যায় তারপর এই নিয়ে দু-চারটি কথার পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অনেকদিন আর এ নিয়ে কথা উঠে না । তারপর একদিন বুলু ডাক্তার কি যেন কি একটা কাজে ঢাকায় আসেন।রুপাপুরের বড় বাজারের মাড়োয়ারির মোরের নিকট বুলু ডাক্তারের ওষুধের ডিসপেন্সারি । সরকার বাড়ী থেকে সামান্য একটু দূরে । বুলু ডাক্তার সন্ধ্যার দিকে বাসায় ঢুকেন সোহরাব সাহেব সেদিন দুপুর থেকেই বাসায় ছিলেন । বুলু ডাক্তার বেশিক্ষণ দেরি করেননি সামান্য কুশল বিনিময়ের পরেই  দুজনের সাথে যাওয়ার সময় শাহানুর বেগমের হাতে মায়ের দেয়া ছোট্ট চিরকুটটি দিয়ে দ্রুতই রুপাপুরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ান । শাহানুর বেগম তৎক্ষণাৎ তা খুলে পড়তে থাকেন।

[পাঁচ]

তার সারমর্ম এই—

‎"মেরির ভাইপোটি মরিয়াছে । মেরির বড় ভাইয়ের একমাত্র ছেলে , সেখানেই মেরি এতকাল থাকিয়া আসিতেছে । বেচারি অল্প বয়সে নিজ মাকে হারাইলো বাপের কোন হদিস এখনো কোনদিন মেলেনি , তুমি চলিয়া যাইবার পর বেচারী এই ছোট্ট ভাইপোটিকে আশ্রয় করিয়া মাতৃস্নেহের পসরা সাজাইয়া হাসিয়া খেলিয়া নিজে বাঁচিয়া ছিল আজি সে অতখানি অবলম্বনটুকু হারাইলো । যাহা কিছুকেই আশ্রয় করিয়া এই বালিকাটি চতুর্পাশে ঘুরে তাহাই বিধাতা বারে বারে তাহার পাস হইতে কারিয়া লয় । তোমার কাছে আমার নির্দেশ তুমি অতিসত্বর জামাইকে লইয়া রুপা পুড়ে আসিয়া তোমার বাড়িতে মেরিকে লইয়া যাও আমার এই নির্দেশ অলঙ্ঘনীয় বলিয়া গণ্য করিবে
‎                                             ইতি , 
‎                                             তোমার মাতা ।

ঢাকাতে এসে মেরি কিছুদিন ভাইপোর জন্য শোক তাপ করে , তারপর শাহানুর বেগমের সান্নিধ্যে তার ছোট্ট সংসারটিতে পরিয়া শোক কাটিয়া উঠতে থাকে , রুপাপুরের জীবনের সবটুকু হাতছানি ভুলে এখন দুটিতে মিলে তাদের ঘরদোর গৃহস্থালির যত কার্যক্রম সুনিপুন গৃহপরিচারিকার মতন অধিকতর ব্যস্ত হইয়া ওঠে । পূর্বে এইসব গৃহিনীপনা নিয়ে তোরঝোপ করার প্রাণী মূলে ছিল একজন এখন দুই এর সম্মিলিত বিপুল কর্মযজ্ঞ চলতে থাকে।

খুব সকাল সকাল দুজনে চটপটে ঘুম থেকে উঠে যায়,  সোহরাব সাহেবকে সকালের নাস্তা খাইয়ে অফিসে বিদায় করার পর শুরু হয় দুজনের কর্মতৎপরতা , সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পরেও যেন শাহানুর বেগম খুঁটে খুঁটে কাজের লেজ বার করে নিজে করার জন্য ।

সারা ঘরের ইলেকট্রিক ফ্যান গুলো থেকে শুরু করে সমস্ত  ফার্নিচার গুলো প্রত্যেকদিন পরিস্কার করা চাই এক এক করে। আরো অন্যান্য কাজগুলো তো বাকী আছেই ।

শাহানুর বেগমের বিশেষ উৎসাহ পেয়ে এবং  
কাজ করার পার্টনার হিসেবে শাহানুর বেগমকে পেয়ে মেরি ও যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তি কাজের জন্য হামলে পরে ।
‎যেন কোন ক্লান্তি নিয়ে কারোরই । এভাবেই একটা দিন কেটে যায় আরো একটি দিন আসে এভাবেই চলতে থাকে ,

সময় কেটে যায় দুটি প্রাণীর ঘরোয়া কাজের টানাটানির মাঝে আরো এক মহ উপলক্ষ আসিয়া হাজির হয় , একটি ছোট্ট মেয়ে মানুষ্য শাবক, পৃথিবীর বুকে নবাগতা । সোহরাব সাহেব প্রথমবারে তখন বাবা হন । এই বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে আবার শুরু হয় পাহাড় পর্বত বাড়াবাড়ি । এইটুকুন মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে, আর সারা ঘরময় তো নানান চড়াই উতরাই আছেই ।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই সংসারই হয়তো কিছু কিছু মানুষকে মুক্তি দেয় , কাজই কোন কোন মানুষকে মুক্তি দেয় হয়তো ,আশ্রয় দেয় , বাঁচিয়ে রাখে । এই স্নেহের ঘরোয়াপনাই বেশিরভাগ বাঙালিদের বাঁচিয়ে  রাখে ।

‎তারপর অনেকদিন পরে একদিন সোহরাব সাহেবের নিকট রুপাপুর হইতে মেরির বিবাহের জন্য একখানা পাত্রের সন্ধান আসে , রুপাপুর থেকে মাত্র কুড়ি মাইল দূরে গোপীপুরে পাত্রের পৈত্রিক বাড়ি । যথাস্থানে তলব করিয়া পাত্রের বৃত্তান্ত জানিয়া সোহরাব সাহেব শাহানুর বেগমকে বুঝিয়ে মানিয়ে মেরীর বিবাহের ব্যবস্থা করে মেরিকে গোপিপুরে পাঠিয়ে দেবার সকল বন্দোবস্ত করেন।

‎একটা হৃদয় কি বারে বারে কত নতুন কিছুকেই হৃদয়ের মধ্যে বসিয়ে দিতে পারে ? পূর্বেরটা ছেড়ে  হারিয়ে নতুন ঠিকানাটি হৃদয়ে জুড়িয়া লেপ্টে থাকিতে পারে ? আপন করে লইতে পারে ? হয়তো কেউ কেউ পারেনা । ঘন ঘন হৃদয়ের ছেদ সবাই হয়তো সইতে পারেনা । সহেও না কারো কারো । সংসারে মাঝে মাঝে কতক একরোখা বিমূর্তজনা আমরা দেখতে পাই , একটা মাত্র জীবনে এদিক-ওদিক সবখানে নিজেকে তালি পট্টি দিয়ে জুড়িয়ে দেওয়া সবার হয়তো সম্ভব হয় না । মেরিরও হয়নি ।

মহামতি মেরি অতিসত্বর গোপিপুরের নিজ স্বামীর ছয় মাসের সংসারের পাট চুকিয়ে বুলু ডাক্তারের বিশেষ সহযোগিতায় সোহরাব সাহেবের বাড়িতে পুনরায় ফিরে আসে । শাহানুর বেগম এবং তাদের ছোট্ট মেয়ে লিলির প্রতি বিশেষ দুর্বলতাই মেরির এরূপ খাপছাড়া কর্মের ইন্ধন জুগিয়েছে বলে ধারণা করি ।

‎এতদিনে সোহরাব সাহেব ভাড়া বাসা ছেড়ে স্ত্রী আর ছোট্ট কন্যাটি সহ ঢাকায় আজিমপুরের তাদের জমির উপর নিজের তৈরিকৃত দোতলা বাড়িটিতে উঠে যান । বাড়িটির কিছু কাজ তখনো বাকি । সোহরাব সাহেবকে মেরি বড় ভাইয়ের মতই শ্রদ্ধা ও ভক্তি করত , সোহরাব সাহেব ও মেরিকে আপন ছোট বনের মতই স্নেহ করতেন । মেরির এই নিজের সংসারকে উপেক্ষা করে চলে আসাটা সোহরাব সাহেব প্রথমে ভালোভাবে নেয়নি, পরে হয়তো স্নেহের জোরই তিনি তা ক্ষমা করেন ।

[ছয়]

পরের দিন সন্ধ্যায় মেরি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চুলোয় চা তৈরি করছিল , শাহানুর বেগম পাশেই নুডলস রান্নার জন্য সবজি কাটছিল । কাটতে কাটতে বলল হ্যাঁ রে মেরি তোর হইবে কি বলতো ? এত ঘনঘটা কইরা তোরে পাঠাইলাম গোপিপুরে স্বামী সংসার করবি , আর তুই করলি কি বলতো ? তোর জিন্দেগি কি আমার সঙ্গে সঙ্গে থাইকাই কাটবো । নারী ধর্ম সংসার করা তা  জানিস না । হু হু মেরি হাসিয়া উত্তর দেয় ঐতো ওই হল রান্না করাই তো, তাইতো করিব বুবু তাই করিব ।

এইখানেই সবকিছুকে কেন্দ্র করিয়া মেরি তার আপন ঘরকন্যা পাতিয়া লইয়াছে ।
‎নতুন বাড়ি চারদিক সদ্য চুন সিমেন্ট , আর রং এর চিটচিটে ভুর ভুরে গন্ধ । মেরি আর শাহানুর বেগম আবার নতুন উদ্যমে ঘরদোর সাজাইবার উদ্যোগে এবার যুদ্ধরত সৈনিকের ন্যায় কোমর বেঁধে নেমেছে ।

দিনে দিনে নতুন বাড়িটির ভেতর বাহির তকতকে চকচকে হয়ে ওঠে । চারদিক চুন সুরকির ছড়াছড়িতে ভরা সোহরাব সাহেবের দোতলা বাড়িটি সংসারের উপযোগী ঘর হয়ে সেজে উঠে । শাহানুর বেগমের পুরাতন বাতিক অর্থাৎ গৃহিনিপনার মাত্রাধিক বাতিক যেন আর বিদায় হয় না , বরং দিনে দিনে তা আরো বহুগনে বাড়িয়া চলে।

‎সারা দিনরাত অবধি ঘরের কাজকর্ম নিয়ে অবাধে মেতে থাকা চাই , আর তাহাতে উপরন্ত ঘি ঢালার সঠিক মানুষটি অর্থাৎ মেরি তো আছেই । এই নতুন বাড়িটিকে কেন্দ্র করে আবার তাতে শুরু হলো তাদের নতুন সংবিধান আইন বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ । আর চলমান পরিবর্তিত গৃহসজ্জা । প্রতিনিয়তই ঘরের আসবাব গুলো এদিক ওদিক পরিবর্তন চলছেই সকালে একরকম তো বিকেল আরেকরকম । মেরি এখন অতন্দ্র প্রহরীর মত রান্নাঘরটি সামলায় ,

অপরদিকে শাহানুর বেগমের  নতুন নতুন উদ্ভাবনকৃত বিভিন্ন কার্যের বাড়তি চাপ ও সামলায়। অল্পদিনের মধ্যেই বাড়িটি সংসারের অতীব উপযোগী হয়ে উঠে । সোহরাব সাহেব এই দুটি প্রাণীর সাংঘাতিক সাংসারিক আর গৃহস্থালীপনার বারবাড়ন্ত তৎপরতায় বিহবল হয়ে পড়েন । তিনি এদের এসকল রকম কর্মযজ্ঞের বিশেষ বাড়াবাড়িতে নিজেকে কোথাও হারিয়ে ফেলেন ,

এবং মাঝে মাঝে শাহানুর বেগমের সম্বন্ধে তিনি নিকট আত্মীয়দের কাছে হেসে হেসে আফসোসের সুরে বলতেন ওর খালি ওই সংসার আর সংসার। সোহরাব সাহেব প্রায়ই ভাবতেন হ্যা আমি একটা সাংসারিক স্ত্রী পেয়েছি বটেই তবে এই মেয়েটি অতি মাত্রায় সাংসারিক যা কিনা রীতিমতো উৎপাত ।

সারা দিনরাত কাজই করে চলছে কাজ কাজ , কাজই এর ধ্যান জ্ঞান প্রেম স্বস্তি  , এ অতটা সাংসারিক বোধহয় না হলেই ভালো হতো, একা একা তিনি হাসতেন আর আফসোস করতেন ।

তারপরও কোন কিছুতেই যেন সোহরাব সাহেবের কোনদিন কিছু বিপত্তি নেই , থেমে যাওয়া নেই, বাড়তি আক্ষেপ বা সহজেই মেজাজ হারানো নেই । নিজের মধ্যে অসুখী হওয়া নেই, সংসার বিমুখী হওয়ায় নেই । সব অনুৃমান গুলি ব্যর্থ হইবার পরও আজানা অনুমান চালু রাখিয়া ও যে সংসারে স্থির হইয়া থাকা যায়,  ভালোবাসিয়া যাওয়া যায় সোহরাব সাহেব যেন তাহার মূর্ত প্রতিক।

তথাপি সংসারে কত রকম মানুষই তো আমরা দেখতে পাই তার আর ইয়াত্তা নেই। ‎ 
মানুষের স্থূল দেহটা পাহাড় সমান , 
আর মানুষের চেতনা আকাশ সমান । 
মানুষের দুঃখগুলো ভেসে থাকা মেঘ ক্ষণস্থায়ী সুখের মতোই ।
জুম ঝরে যাওয়া বৃষ্টি হলো মানুষের লুকোনো বাসনা হারানো স্বপ্ন । 
তবু মানুষ সময় কাল কালান্তর পার হয়ে যায় অজানা অচেনা আবেদনকে পাওয়ার আশায় দূরে আরো দূরে সামনে চলে ।

‎তারপর এভাবেই সময় বহিয়া যায় । শাহানুর বেগমের বাকি সন্তানগুলো সব এ বাড়িতে এখানেই বেড়ে ওঠে,  এবং বিয়ে হবার পরও প্রতেকে এখানেই রয়ে যায়, কেউ আর আলাদা বা অনত্র তাদের সংসার সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেনি । এবং তাদের ছেলেমেয়ে গুলোও দিব্বি এবাড়িতেই সাচ্ছন্দে বেড়ে উঠছে একেকজন , কারো ইউনিভার্সিটি পড়া চলছে , কারো স্কুল কলেজ পড়া চলছে কোন কোন বাচ্চা এখনো পড়া শুরু করেনি।

‎এরই মধ্যে  লিলির বড়ো ছেলে পল্লব বিয়ে করেছে , তাও বৎসর তিনেক । বহুবার যাই যাই করে আর যাওয়া হয়না, পল্লব সাহেবও স্ত্রী নিয়ে র‍য়ে গেলেন মা নানীর সংসারটিতে। কে জানে কি মায়ায় পড়ে প্রতিবারেই অনত্র বাসা ভাড়া করে, যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলে আর যাওয়া হয়না।

[সাত]

‎আজো এই এতগুলো মানুষকে রান্না করে খাওয়ানোর একমাত্র দায়িত্ব মেরিরই । বিশেষ অধিকার ও বলা যেতে পারে । কেননা অধিকার এই কারণে যে বাড়িতে বিবিধ কাজে সাহায্য করার আরো দুজন পরিচারিকা রয়েছে।

নয়নের মা থাকে দূরের ঐ বস্তিতে , সে বাড়ির সকলের ময়লা জামা কাপড় সাফ করে চলে যায় নিজের বাড়িতে , আর কুন্তীর বয়স সতেরো কি উনিশ , সঠিক হিসেব কারোরই জানা নেই । সে এ বাড়িতেই আছে তাও বছর দুয়েক হবে , পল্লব সাহেবের স্ত্রী রৌজি তার নিজের কাজের সুবিধার্থে তার বাপের বাড়ি থেকে কুন্তীকে নিয়ে এসেছে।

তাতে কি , এখন বাড়ির প্রায় সকলেরই এটা ওটা ফরমাস খাটে , ঘরদোর গুছিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে বাড়ির বাহিরের অর্থাৎ টুকিটাকি বাজার বা দোকান পাটে কারো যে কোন প্রয়োজনে কুন্তী বিশেষ দরকারি ।

বাড়িতে এ দুজন থাকা সত্ত্বেও মেরি রান্নাবান্নার কাজের জন্য কারো হস্তক্ষেপে বিশেষ রেগে যায় , এমনকি যদি বাড়ির কেউ কোনদিন কিছু রান্নার উদ্দেশ্যে রান্না ঘরে ঢুকেছে মেরি তখন রেগে মেগে ঘেমে অস্থির হয়ে তাকে জোরজবস্তি করে রান্নাঘর থেকে সরিয়ে সে কাজটি নিজেই নিয়েই করতে থাকবে ।
‎মেরি আজও মনে এই ভাবে যে এ বাড়িতে রান্না ঘরের কতৃত তার একারই ,আর সে এটা আমরণ করে যেতে চায় । সে বেঁচে থাকা পর্যন্ত এ কাজ বা দায়িত্ব অন্য কারোর হস্তগত হওয়া মানে তার সবটাই হস্তগত হওয়া ।

কেননা এতোটুকুন বয়সে এই সংসারের রান্নাঘরে ঢুকেছে , এবং সাহানুর বেগমের সাথে রসই ঘর সহ বাড়ির সমস্ত কাজে অতন্দ্র  প্রহরীর মতন সারাক্ষণ লেগে থেকেছে । পরবর্তীতে বিভিন্ন জনের হাজারো অনুরোধে বিয়ের জন্য তাকে আর রাজি করানো গেলনা।

মেরি এই সংসারটির মায়ার মধ্যে পড়ে এখানেই এই রান্না করতে করতে কখন যে কৈশর যৌবন পৌড়া পেরিয়ে বয়স্কা হয়েছে , মেরির হয়তো নিজেরই সেই খবর নেই । মেরির কি সে কথা মনে পড়ে না একবারেই ,

‎ সেই কবে শীতের হিম সন্ধ্যায় কিশোরী নিজ গ্রামের বুলু ডাক্তারের বিশেষ হস্তক্ষেপে গোপিপুর পেরিয়ে , রুপাপুর পেরিয়ে , স্বামী , কাঁচা সংসার পেরিয়ে , নিজ সংসারের একান্ত স্বাচ্ছন্দতা পেরিয়ে , কত অপূরণীয় স্বাদ আহ্লাদ পেরিয়ে , সুখের ঘর কন্যা মাড়িয়ে , নিটল ফর্সা ভোলাভালা চেহারার গোল গাল মেরি আজিকার এই চেনা শহর কবেকার কোন অচেনা আবেদনে ধরা দিয়েছিল নিশ্চয় ।

গায়ে একখানা মলিন পাখিদের পালকের মতন খয়রী রং সেই দীর্ঘ অতিশয় চাদরখানি গায়ে ফেলে সমস্ত মুখমণ্ডল চাদরে ঢেকে পা রেখেছিলো আধোঘুমন্তরত ঢুলুঢুলু মূর্ছায়িত দুটো চোখে , সদ্য ঘুম থেকে জেগে উঠা তিতিরের মতন এই জনবৈচিত্রের শহরে । 
যেখানে ক্লান্ত মধ্য রজনীর ল্যামপোস্টগুলোর সোনালী উলঙ্গ আলো চেয়ে থাকে হালকা বাতাসে উড়তে থাকা শিমুল তুলোর মতন শনশনে আস্তরিত কুয়াশার দিকে । এই চাওয়া চাওইর একটা ইতিহাস আছে , একটা ঘাঢ় আবেদন আছে শহুরে বায়ুর একটা অতীব টান আছে ।

‎মেরির আজ বয়স হয়েছে মুখে ত্রিবলীর মতন তামাটে আচ্ছরন পড়েছে , আজো রেধেই চলছ রেধেই চলছে । অবশ্য এর মধ্যে অনেকদিন অনেকবার মেরির ভাইয়েরা এসেছিল সঙ্গে করে মেরিকে নিয়ে যেতে চাইলে মেরি যেতে রাজি হয়নি। বাড়ির সকলকে খাইয়েই যেন তার পরম সুখ ,পরম যৌবনা । মেরি সেই কবে এই বাড়িটির রান্না ঘরে ঢুকেছিল আজো প্রায় বুড়ো হয়ে গিয়েছে তবু যান্ত্রিক রোবটের মতো বিশ্রামহীন , সংকোচহীন,অসুখহীন রান্না করেই চলছে । খাওয়াচ্ছে সবাইকে।

বহুদিন বহুবার শাহানুর বেগম এবং বাড়ির মেয়েরা এমনকি মেয়েদের জামাইয়েরাও অনুরোধ করে বলেছিল , তোমার তো এখন বয়স হয়েছে খালা , আর কত ? এবার রান্নাটা ছেড়ে দাও । মেয়েরা বলাবলি করছিল সেই ছোট্টবেলা থেকেই তো মেরি খালাকে দেখছি বাড়ির রান্না ঘরটি আগলে রেখেছে , বাবাকে খাইয়ে টাইম মত অফিস পাঠিয়েছেন , মায়ের প্রায়শই  অসুস্থতার সময় বিছানায় মায়ের সামনে খাবারের থালা পেতে দিয়েছেন , আমাদের ভাই বোনগুলোকে টাইম মত নাস্তা খাইয়া স্কুলে পাঠিয়েছেন আর এখন আমাদের সন্তানগুলোর খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমাদের বাড়তি ভাবনা করতে হয় না ।

[আট]

তারপর সবাই মিলে অনেক দিন অনেকবার এও বলল খালা তুমি রান্না থেকে অবসর নিয়ে বাকিটা জীবন আমাদের এখানেই থেকে যাও । যদিও মেরির রুপাপুরে ফিরে গেলে আপনার লোকের অভাব নেই । আশ্রয়ের জায়গার অভাব নেই । লোকমুখে শুনতে পাওয়া যায় তার আপন দুই ভাইয়েরা এখন ভালোই সচ্ছল ব্যবসা পাতিতে তাদের এখন ভালই পসার।  

কিন্তু তাদের কাছে ফিরে যাওয়ার কোন আগ্রহী দেখা যায় না মেরির , এবং রান্নাঘর থেকেও অবসর নেয়ার ও নয়। সে বাদবাকি  জীবনটুকু এই রান্নাঘরটিকে কেন্দ্র করে কাটাইয়া দিতে চায়।  

‎বাড়ির লোকজন আজকাল খুব চাপাচাপি করে, রান্না ছেড়ে দাও , ছেড়ে দাও , অবসর নাও । মেরি উদাস হয়ে রান্নাঘরে কুটকুট শব্দে সজনে ডাটা কাটে, পেঁয়াজ কাটে।  চুলায় চাপানো রান্নারত ডালের হাঁড়ির গরম ঢাকনাটি গলায় ঝুলতে থাকা ওড়না পেঁচিয়ে সরায় । ঢাকনাটি সরে গেলে ধোয়ায় জানালাটি দিয়ে বাড়িটা আবছা লাগে, কপালের জমে থাকা হালকা ঘাম মেরি গায়ের জামার একাংশ দিয়ে মুছতে মুছতে জানালাটি দিয়ে  দূরে ওই বড় পাকুর গাছটির ভাঙ্গা  ডালটিতে, কয়েকটি বুলবুলি একবার এসে বসছে আবার উড়ছে, আবার বসছে পরক্ষণেই উড়ছে, 
তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে, এতদিনের নিত্য অভ্যাস তার চাইলেই এত সহজে এসবের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া যায় ? এতদিনের নিত্যকর্ম তার।  

‎সেদিন সন্ধ্যা থেকেই গরমের গুমোট ভাবটা বেড়ে গিয়ে যেন  দগদগে শূল  ছড়িয়ে পড়ছিল সারা শহরের ঘরে ঘরে। পল্লবের চাকরিতে বিশেষ পদন্নোতি  হওয়ার দরুন রাতে বাড়িতে ভালো মন্দ  খাওয়া-দাওয়ার আমেজ চলছিল। বোধ করি গরমের  দগদগে শূলের খোচা শহরের মানুষগুলোর শরীরের চেয়ে মেজাজের ওপর বেশি প্রতিক্রিয়া করে চলছে।

রাতে ডাইনিং এ খেতে আসে সকলেই, পল্লবের কয়েকবার ডাকাডাকির পড়ও শাহানুর বেগমকে একসাথে সকলের সঙ্গে খাওয়ার জন্য  টেবিলে বসানো গেলনা । শাহানুর বেগমের ওই চিরন্তন নিত্য অভ্যেস,  বাড়ির সকলে যখন একসাথে খেতে বসে শাহানুর বেগম তখন ওই কালো কাঠের সোফাটিতে  বসে সকলের খাওয়া বিশেষ পর্যবেক্ষণের চোখে দেখতে থাকেন।

মেয়েরা সব মিলি, লিলি, ও সুরভী তাদের স্বামীগন সহ পল্লব ও তার স্ত্রী রৌজি একসাথে রাতের খাবার খাচ্ছিল, মেরি রান্নাঘর থেকে কিছুক্ষণ পরপর এটা ওটা আনছিল টেবিলে খাওয়া চলছে, সাথে গল্পও।

‎হঠাৎ ই শাহানুর বেগমের বড় জামাই হারুন সাহেব বলে উঠলেন, এই রে , কতবড়ো একটা চুল দেখো মিলি , এই বলে তার প্লেটের ওপর সবজি ভাজিটার মধ্যে হতে বিশাল এক চুলের আবিষ্কার করলেন। হারুন সাহেব চুলটি টেনে বার করতে করতে মিলির দিকে চেয়ে সামান্য ঝুকে কড়া গলায় বলতে লাগলেন জানোনা মিলি তুমি , খাবারের মধ্যে চুল পেলে সে খাবার খেতে আমার রুচি হয়না।  

মিলি প্রথমে কিছুটা হন্তদন্ত হয়ে, পরে মেরির দিকে কড়মড় কড়মড় চোখে তাকিয়ে খাবার সমেত প্লেটটি চেঞ্জ করতে বললেন জলদি , কিন্তু হারুন সাহেব তাতে একদমই দমে গেলেন না ইনিয়ে বিনিয়ে নানান প্রকারের কটু কথা বলেই চললেন।

সামান্য দূরে সোফাতে বসে শাহানুর বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। হারুন সাহেব বলেই চলছেন। হারুন সাহেবের অনবরত মুখ চলতে দেখলে মিলিও আর চুপ থাকতে পারলো না , সেও বেশ উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো হারুন সাহেবের উপর।

ডাইনিং টেবিলটিতে এখন  আর ঘরোয়া মুখরোচক খাবারের পরিবেশ বজায়া থাকলো না। টেবিলের উপরে একের পর এক খোলা পাশাপাশি পেয়ালা গুলোর  মধ্যে হতে উড়ন্ত ধুমায়িত সুস্বাদু গন্ধের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের টক্সিক টকশোর গা ঘিনঘিন করা অনুষ্ঠানের মতন ঘৃণা উগ্রে পড়ছে, ঘৃনাগুলো ডাইনিং টেবিলের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত গড়াগড়ি খেলছে যেন।

‎কি কথায় কি কথা বাহির হইয়া আসিল। দুজনের মেজাজ হারানো চেঁচামেচিতে টেবিলটিতে খাওয়ার পরিবর্তে এখন টালমাটাল কথার তর্কাতর্কি চলছে , অবস্থা বেগতিক। বাবা প্লিজ, পল্লব বলে উঠলো। চুপ করো না প্লিজ এবার , হলো তো ,  এইতো তোমার প্লেট চলে এসেছে অনেকক্ষন , খেয়ে নাও এবার। হারুন সাহেব ছেলেকে ধমকের সুরে বলল , তুই চুপ কর , তারপর মুখের ভঙ্গি কিছুটা বাঁকা করে বললো, সারাদিন তো তোরা থাকিস বাড়ির বাহিরে, খাবারটা ও ঐ বাহিরেই খাস, আমাদের মত বাড়িতে খেতিস সবসময় , দেখতাম কেমন চুপ করে খেয়ে নাও তোমরা ।

তারপর কতক্ষণ ধরে চলছিল ওই রাত্রিরে এসব তার খবর জানিনে।

‎এগুলো এখন আর নতুন নয় এই বাড়িতে। আজকাল প্রায়শই খাবার টেবিলে বিভিন্ন আলোচনার চেয়ে খাবারের দোষ ত্রুটি নিয়ে বেশি আলোচনা হয় , আপত্তি বাড়তে থাকে।

এইতো আবার গত সপ্তাহে সেদিন দুপুরেই তো টেবিলে কি একটা কাণ্ডই না ঘটে গেল। শাহানুর বেগমের ছোট জামাইয়ের নাকি পাবদা মাছটি ভীষণ প্রিয়, তাতে লবণের অতিরিক্ত উপস্থিতির ধরুন মুখে তোলা যাচ্ছিল না, তাই ছোট জামাই তৎক্ষণাৎ যাহা ভাষা মুখে তুলিতে পারিলেন তাহাই বলিয়া চলিলেন। স্বামীর মেজাজের ভাবটা লক্ষ্য করে অতিরিক্ত রুক্ষতার সম্ভাবনায় , সুরভী ধমকের সুরে মেরি কে বলল খালা তুমি রান্নাটা ছেড়ে দিলেই হল , রোজ রোজ খাবার টেবিলে আর তাহলে আমাদের এসব ঝামেলা পোহাতে হয় না।

[নয়]

কালো কাঠের সোফাটির উপর হতে বসে থাকা শাহানুর বেগমের আবার  দীর্ঘশ্বাস নামলো, ডাইনিং রুমে থাকা একটি প্রাণীও তাহা লক্ষ্য করে নাই । তারপর খাওয়া শেষ হলে বেসিনে হাত ধুতে ধুতে সুরভী সাফ সাফ  জানিয়ে দেয়,  তুমি খবরদার খালা কাল থেকে রান্না করে যেও না। কুন্তী রান্না করবে কাল থেকে ।

যদিও ইহা অসম্ভব কথা তা ডাইনিং এ বসে থাকা প্রত্যেকের জানা। রান্নার উদ্দেশ্যে কুন্তী যদি রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে যায়ও শুধু রান্নাঘরের দরজা পেরোনো বাকি অমনি মেরির তীব্র আক্রমাত্মক ধমকের মুখে কুন্তি যে  দুদণ্ড ও দাঁড়াতে পারবেনা টেবিলে খাওয়ারত সকলেই তা অবগত , তাই সেদিনের মতো খাওয়া শেষে যে যার মত উঠে পড়ল। যদিও সেদিনকের মত টেবিলের ব্যাপারটি এক প্রকারের মিটেই গেলো কিন্তু  কুন্তীকেও  আমরা পরবর্তীতে তারপরের দিন  রান্নাঘরের আশেপাশে দেখতে পাই নাই । তাহলে হয়তো ছোটখাটো আরো একখান নাটিকা দেখিয়া যাইতাম।

মধ্যে একদিন রুপাপুর হইতে মেরির এক ভাইপো সকাল সকাল বাড়িতে আসিয়া হাজির। বাড়ির সকলে তখনও ঘুমে। ছোরাটির বয়স বিশ কিংবা একুশ হইবে। কি নব্য বাবুগিরি পোষাকে সকাল সকাল শহরে হাজির তা দেখবার মতো।

আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য রাখিয়া ঠিক পোষাকটি পড়িয়া না আসার দরুন খাপছারা হাস্যকর মনে হইতাছে । কথা কইবার সময় ডান হাতের আঙুলে তুরি বাজাইয়া বাজাইয়া কথা কহে। ভীষনই হালচাল। মেরি দূর থেকে গোয়েন্দার চোখে এই ভাইপোটির  হাব ভাব সবটাই লক্ষ করছে । মেরির দিকে চোখ পড়তেই ছোকরাটি পা থেকে পা নামিয়ে, দুম করে বলে বসলো ও ফুফু চলো তোমাকে নিতে এসেছি, বাবা পাঠিয়েচেন।

আরে ছাই এখানে কেবলার মতো খেটে মরছো। আমাদের কম আছে নাকি। আরে এখানে পড়ে থাকলে গ্রামে আমাদের মান থাকে বলতো।? মেরি একনজরে ছোকরাটির আগা গোড়া প্রত্যক্ষ করে ।

চিরা ফাটা বিশেষ স্টাইলের প্যান্ট টিতে বহু পকেটের সমারোহ। দু হাতের মধ্যে কব্জি পর্যন্ত চুরিসহ নানান ধরনের  ব্রেসলেট ঝুলছে। মাথার বড়ো বড়ো লম্বা চুলগুলো কানের উপরে কুচি কুচি কাটিং করে কাটার দরুন মাথার চামরা দেখা যায়। মাথার উপরে ভনভন করে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের  এলোমেলো বাতাসের কারনে মাথার বাড়বাড়ন্ত অবাধ্য চুলগুলা বারে বারে কপাল ছাপিয়া নাকের ওপর আসিয়া পড়ে।

মেরি বাটিতে কয়েকটি রুটি আর তাতে কিছুটা সবজি ভাইপোটির সামনে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,  এই নে খেয়ে তারাতারি বিদায় হও। এক্ষনি পল্লব উঠবে ঘুম থেকে, আমাকে নিতে এসেছিস শুনলে আবার ও কানমলে বিদায় করবে।

গেলো বছর এই ভাইপোটি মেরিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিল ,  কি কান্ডটাই না হলো বাড়িতে সেদিন। দুপুরে খাওয়া শেষ হবার কিছু পর থকেই শুরু করে ঘ্যানর ঘ্যানর ও ফুফু চলো বাড়িতে সকলে তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে। মেরি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না। বিকেলের দিকে জোরজবরদস্তি আরো তীব্র হয়ে এলে পল্লব নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । দেখছো যেতে চাচ্ছে না তারপরও কেন জোরাজোরি করছো , পল্লবের এ কথার কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করেই পুনরায় ছোকরাটি মেরি কে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্ত হলে, পল্লব রেগে গিয়ে মেরির ভাইপোর কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে রান্নাঘর থেকে বার করে। তারপর অনেকদিন আর কেউ এদিকে আসেনি। ওইদিন আবার আসিয়া ও মেরিকে নিয়ে যেতে পারেনি।

‎কিন্তু মেরির অদৃষ্টে কি এই ছিল? এখন প্রায়ই এটা ওটার মধ্যে লবন মরিচ কম বা বেশি অথবা রান্নার নানান ত্রুটি সকলের চোখে যেন একটু বেশি করেই ধরা পড়িতেছে । এ সকল অনিয়মের প্রধান হেতু একমাত্র মেরির  বয়সের অধিক্য , বলে বাড়ির অনেকে ধরে নিয়েছে।

‎হয়তো হতেও পারে , জানিনে।

‎এইতো গতকাল রাতেই আরো এক লজ্জাকর কান্ড বাধিয়া  গেল ডাইনিং টেবিলে , তারপর সে লজ্জা আবার মুছিয়া ও  গেলো বহুক্ষন।

‎ শাহানুর বেগমের এই বসে থাকাটা যেন আজকাল বেড়ে চলছে বহুগুনে । অতিরিক্ত নিশ্চুপ প্রাণহীন নিরস হয়ে নির্জীবের মত বসে থাকাটা যেন বেড়েই চলছে।  কি যেন ভাবে বসে বসে সময়ে অসময়ে। 
তবু সুখের কথা এইযে—

‎বাড়িতে এখনো সবাই অন্ততপক্ষে তিন বেলা খাওয়ার সময় খেতে বসে সবগুলো একসাথে , কথাবার্তা আলাপ পরামর্শ চলে, হাসি গরাইয়া পড়ে  অতগুলো মানুষের জন্য এ বাড়িটি হয়তো নিতান্তই ছোট বলে মনে হয় এখন কারো কারো।

শাহানুর বেগম ও চাননি কখনো ছেলে মেয়েগুলো অন্যত্র সরে পড়ুক এ সংসার থেকে।  তথাপি সন্তানরা কেউ আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করেনি কখনো । শাহানুর বেগম ওই কালো কাঠের সোফাটিতে বসে এখনো মন ভরে সকলের খাওয়া দেখেন ,  

সময় বয়ে যায়। কখনো কখনো বসে টলতে টলতে শরীর ঝিমিয়ে যায় সোফাটিতে বসেই পা এলিয়ে ঘুৃমিয়ে পড়ে।  পরিবারের বাকি লোকজন শরীর ক্ষয় , শরীর ক্ষয় , বলে মাতামাতি করে । নানাবিধ শরীর বৃত্তীয় উপকারী খাবারের ফর্দ তৈরি করা হয় । মেয়ে গুলো সব ঘুরঘুর করে সোফাটির পাশে পাশে । কমলা লেবুর খোসা ছাড়িয়ে শাহানুর বেগমের মুখের ভেতর পুড়ে দেবার প্রতিযোগীতা চলে কিছুদিন ।  

দিন কেটে যায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে , শীত পেরিয়ে আবার গরমে ভাজা ভাজা হয় শহরের পথঘাট ।

‎এদের এ বাড়িটির পাশেই কম প্রশস্ত পাকা একখানি রাস্তা সামান্য দূরে ডানে মোড় নিয়ে ওই দূরের রাজপথের সাথে মিশে গেছে । কথাটি ওই বড়ো রাজপথের নয় , কথাটি এই বাড়িটির পাশে ছোট্ট রাস্তাটি ঘেষিয়া দাড়ানো লাল কৃষ্ণচূড়ার । 
‎ছোট রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চারদিক ডালপালা ছড়িয়ে বাড়িটির দিকে অনেকটাই ঝুকে বাড়িটিকে আগলে রাখার ভঙ্গিতে দাড়িয়ে রয়েছে বহু বৎসর। মাঝে মাঝে দুই চারিজন পথিক হয়তো ইহার সৌন্দর্য বুজিয়া থাকিতে পারেন , বাকিরা  অন্ধের মতো চলিয়া যায় ।

[দশ]

‎সংসারে এমন কত মানুষ কতই না ছোটখাটো জিনিস বুঝিবার মতন অত বড় হৃদয়ের অনুপস্থিতি থাকার দরুন কতইনা তুচ্ছ অনুভবের হালকা আচ হইতে নিজেদের সরাইয়া রাখে বেরসিক পথিকের অবিস্ফোরিত চক্ষুর ন্যায় ।

‎সেদিন পল্লব অফিস থেকে ফিরে বাসায় না ঢুকে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ। পল্লবের মনে হইল টকটকে  কৃষ্ণচূড়াটার পাশে তাদের পুরাতন বাড়িটা যদি আরো ধবধবে সাদা শুভ্র হইয়া দাঁড়িয়ে থাকে তাহাতে চোখ ফোটা পথিকগণের  বিশেষ ধাধা লাগাইয়া যাইবে। ভাবনা মত পরের দিন কয়েকজন  রংমিস্ত্রি বাড়ির বাহিরে মোটা রশির উপর ঝুলিয়া ঝুলিয়া সাদা রংয়ের আবরণ দিয়া বাড়ির বাহিরটা সাদা আবরনে ঢাকিয়া দেয়। 
‎লেটা চুকে গেলো  !

‎বয়স হলেই কি মানুষের আক্ষেপের পরিমাণ বাড়ে নাকি এদিক ওদিক থেকে টান মারিয়া কিছু কিছু ধার করিয়া আক্ষেপ করবার কাজ চলে।

সঠিক বলতে পারিনা।

শাহানুর বেগমের আজকাল অত্যন্ত আক্ষেপ । বয়স হয়েছে মেরির , আর কত আগলাইয়া রাখা , নানা ধরনের কটু কথা সহ্য করা। ওইযে এলো আর বেরুতে পারলো না রান্নাঘর ছেড়ে , নিজের সবটা দিয়ে সারাটা জীবন তো এই একই রান্নাঘরটিতে পরে রইলো বেচারি জানিনা কি পেলো ও। ওর ওইসব আজও মাথায় ঢুকেনা শাহানুর বেগমের  ।

‎শাহানুরব বেগম অনেক ভাবনা চিন্তার পর তার মনে শেষে এই   কথাই আজ বারে বারে বাজতে থাকে, আমার ঘরের মানুষগুলোই বা কেমন, বাপরে বাপ মাঝে সাঝে একটু খাবারে উনিশ কি বিশ হওয়া চলবেনা অমনি তাদের চাছা চাছা কথা শুনিয়ে দেয়া চাই । 

‎আরেকদিনের কথা খাবার টেবিলে কি যেন কি একটা খাবারের ত্রুটি নিয়ে মেঝো জামায়ের সেকি তিব্র  ক্ষোভে ফেটে পড়া । শ্রাব্য - অশ্রাব্য সব রকমের বাক্যই তিনি সুনিপন চালাইতে জানেন ।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে বিকেলের পর শাহানুর বেগম কিছুক্ষন নিজের ঘরে বসে কি যেন কিসব চিন্তা করে তারপর  হন্তদন্ত হয়ে রান্না ঘরের দিকে অগ্রসর হন । মেরি তখন রান্নাঘরের মেঝেতে একটা ছোট্ট পিরির উপর বসে বটিতে পাকা টুকটুকে একটা মিষ্টি কুমড়া ফালা ফালা করে কাটছিল।

শাহানুর বেগম রান্নাঘরে ঢুকে প্রথমে ছোট্ট  জানালাটি দিয়ে বাহিরটা দেখার ভান করছিলেন । তারপর পেছন ঘুরে বললেন মেরি দিনে দিনে তোর রান্না নিয়া জামাইদের আপত্তি বাড়তাছে। দেখলি না মাংসে লবণ কম দিছিলি তাই মেজো জামাই কেমন কথাগুলো শুনাইলো । আমার বাপু রোজ এসব নিয়ে ঝামেলা ভালো লাগছে না ।

আমাকে আরো নানান কিছু নিয়া চিন্তা করতে হয় সংসারের। শাহানুর বেগম মেরির হাতে কাটতে থাকা কুমড়োটার দিকে তাকিয়ে এতক্ষণ কথাগুলো বলছিল , সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার জানালাটির দিকে ঘুরে বাইরে তাকিয়ে উদাস নয়নে বলতে থাকলেন , আমি কাল থেকে কুন্তীকে বলে রেখেছি , কুন্তী রান্না করবে কাল থেকে । তোর এখন বিশ্রাম দরকার ,অনেক করেছিস, অনেক খেটেছিস। আজও খেটেই চলছিস , এখন অন্য কেউ এসব করুকগে তোমার এখন এই বয়সে আর এত চিন্তা  কেন বাপু ।

শাহানুর বেগম যখন কথাগুলো বলে চলছিল মেরি তখন কোন  প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করে আপন ধ্যানে চুপচাপ কোন দিকে লক্ষ্য না করে কুমড়োর লম্বালম্বি ভাগ করা টুকরো গুলোর থেকে বিচি ছাড়িয়ে নিচ্ছিল । আচমকাই শাহানুর বেগম হাতে থাকা মেলামাইনের গ্লাসটি সিনকে উপর দ্রুতই রাখলো যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি শব্দ করে ।  সে শব্দ ও বোধহয় মেরির কান অবধি পৌছাল না । মাথা তুলে চাইলোও না ।  

তুই শুনছিস না মেরি , কিছুতেই শুনছিস না । কেন শুধু শুধু খাবার টেবিলে লোকের কথা শুনা বলতো । শাহানুর বেগম কিছুটা থেমে আবার বলে চললেন এ নিয়ে তোকে আমি কয়েকশো বার বলেছি , তুই তোর মতো একগুঁয়ে হয়ে রয়েছিস ।

তারপর শাহানুর বেগম যেতে যেতে ধমকের সুরে আবার  বললেন আমি কুন্তীকে বলে রেখেছি , কাল থেকে কুন্তী ই সমস্ত  রান্না করবে বুঝলি । মেরি তখনও ওই কুমড়োটা নিয়েই পড়েছিল । কোন প্রকারের কথাই যেন সে শুনতে পায় নাই । কুন্তীর রান্না ঘরে প্রত্যাবর্তনে যেন তার কোন প্রকারের মাথাব্যাথা নেই ।

বলে রাখা কৌতকপ্রদ — যেদিনই  কুন্তী  বাড়ির কারো মৌখিক ছাড়পত্রে  সকাল সকাল বিশেষ ঘনঘটায় রান্নার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে অগ্রসর হতো , রান্নাঘরটিতে ঢুকার দরজা পেড়োন বাকি অমনি মেরি রুটি সেকার খুন্তি নিয়ে কুন্তীর দিকে  সবেগে তেরে যেত , এই মারে তো সেই মারে , নানান হামাড়ি তুমাড়ি । হতবিহ্বল কুন্তী প্রথমে ক্ষানিকটা ভয়ে পিছু হটে  তারপর দূতই  রান্নাঘর ছেড়ে বের হয়ে নিরাপদ অঞ্চলে অর্থাৎ ডায়নিং রুমটির মধ্যে এসে বাঁকা হয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মুখ চালানে শুরু করে ।

ইনিয়ে বিনিয়ে মেরির বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ে মুখ বেকিয়ে বেকিয়ে নানান ধরনের কথাবার্তা জুড়ে দেয় । মেরীও তখন রান্নাঘর থেকে বার হয়ে , দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে অদ্ভুত যত ভঙ্গিতে কুন্তীর কথার জবাব দেয় । এহেন  শরীর দোলানোর রঙ্গময় সব কায়দা কানুন আর ঝগড়া করার বিচিত্র সং এর ভঙ্গিময়তায় সারা বাড়িময় কৌতুকের ছন্দে ফাটিয়া পড়ে ।

[এগারো]

বাড়িখানা যেন এখন কোন শহুরে কমেডিয়ান রিহার্সেল আখড়া। বিভিন্ন ঘরের মধ্যে অবস্থানরত বাড়ির অন্যান্য  জনেরা , পুরো তর্ক যুদ্ধ আর  দুজনের শরীরবৃত্তীয়  অদ্ভুত যত হেলানো দুলানো মুদ্রা গুলো নিজ চোখে দেখার জন্য  দ্রুতই ডাইনিং রুমে এসে ভীর করে ।  

রুমটিতে এক উচ্চ হাসির উচ্ছাস বহিয়া যায় । এক জীবন্ত  সার্কাসের  মতন উল্লাস ফেটে পড়ে গোটা বাড়িময় । তখন আর কারোরই রান্নার ত্রুটির বিষয়টি মুখ্য হয়ে থাকেনা ।

কৌতুক আর রঙ্গ , সঙ এ ,পুরো ব্যাপারটা সেদিনকার মত মিটে যায় । কাজেই কুন্তী আর একবারের জন্য রান্নাঘরের পথ মারায় না । বৃথা চেষ্টার ফলও নাই , সে জন্যই হয়তো কুন্তী ও আর আগ্রহ দেখাইবে না।  

মধ্যে একদিন 

‎বৈশাখের দুপুর । বাড়িটাসহ গোটা শহরটা ঝিমিয়ে পরেছে যেন । অল্পক্ষনের জন্য আম্রমুকুলের চুকাভী গন্ধ শহুরে বাড়ির বারান্দাগুলো দিয়া মাঝে মাঝে মাথাগুলানো মাদকতা ছড়িয়ে দিয়ে আবার গায়েব হয়ে যায় বহুক্ষন ।  

‎তীব্র গরমের দরুণ বাড়ির অন্যান্যরা এমনকি বাচ্চাগুলোও  আর এদিক ওদিক ছুটছে না । সবাই নিজ নিজ ঘরে।  সারা বাড়ি জুড়ে  কারো তেমন কোন সাড়া শব্দটি নেই । শাহানুর বেগম একটা স্টিলের পাত্র হাতে তার মধ্যে কতগুলো মসলা মাখানো কাঁচা আমের টুকরো ছাদে রোদে  দিবে , তাই মেরিকে ডাকতে ডাকতে স্টোর  রুম থেকে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছিল  ।  হঠাৎই  কিসে যেন হোঁচট খেয়ে মুহূর্তে টাল সামলে নিলেন ,  কিন্তু হাতের পাত্রটি প্রায় অনেকটাই কাথ হয়ে একপাশে ঝুকে কয়েক  টুকরো আম নিচে মেঝেতে পড়ে যায়।  

শাহানুর বেগম তৎক্ষণাৎ পাত্রটি নিচে রেখে আমগুলো তুলতে শুরু করেন , একটি একটি করে । পাশেই মেঝো মেয়ে মিলির রুমের দরজাটা হালকা ফাকা হয়ে থাকার কারনে ভেতরের কথাবার্তা বাহিরে থেকে স্পষ্টই শোনা যাচ্ছে।

‎" কি বলতে চাও তুমি ? এ কথার উত্তরে বেশ ঝাঝের স্বরে মিলির স্বামী বললো , তোমার মা মেরি খালাকে রান্নাঘর থেকে ছাড়িয়ে কেন নিচ্ছে না শুনি ? যা ইচ্ছে তা-ই তো আর খেতে পারিনা  তাইনা , আমাদেরও তো একটা সম্মান থাকা উচিৎ এ বাড়িতে তাইনা । তোমার মা প্রতিবারে খাওয়ার সময় সোফাতে বসেন কি এসব তামাশা দেখতে আজকাল ? শাহানুর বেগম আমের  টুকরোগুলো তুলতে তুলতে এতোটুকু কথা শুনতে পেয়ে আর এক মুহূর্ত ওখানে দাঁড়ায়নি ।  

কথাগুলো যেন হজম করতে আজ খুব কষ্ট হচ্ছিল তার  । শাহানুর বেগম রান্না ঘরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হতে ভাবতে লাগলেন ডাইনিং টেবিলের অশান্তি এখন মেয়েদের শোবার ঘর অবধি পৌছাইয়া গেছে , এবার থামাতেই হবে। শাহানুর বেগম এখনো ডাইনিং পর্যন্ত পৌছুতে পারেনি ডাইনিং এর গলিপথ পেড়িয়ে তারপর রান্নাঘরের পথ তার প্রাচীন পা দুটো যেন  অসার হয়ে আসছে চলতে চায়না আর ।

ডাইনিং রুম পর্যন্ত এসে ডাকতে থাকলো মেরি, মেরি । 
কারো কোন সারা শব্দটি নেই কোথাও । এতটুকুই তো তার এই  জীবন সংসারের আপন ঘরের চিরচেনা গলি তাহলে পেরুতে এত সংগ্রাম করতে হচ্ছে কেন আজ । রান্নাঘর হইতে অনবরত সিনকের উপর পড়তে থাকা টেপের পানির বিরামহীন  টপ টপ শব্দ আর ছোট টেবিল ফ্যানটির একটানা ভোঁভোঁ করা আওয়াজ ভেসে আসছে । মেরির কোন প্রকার সারা শব্দ না পেয়ে শাহানুর বেগম সোজা রান্নাঘরে ঢুকে পড়লো । মেরি রান্নাঘরের শুকনো তকতকে মেঝেতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে , হয়তো ঘুমোচ্ছে ।

শাহানুর বেগম দাড়ানো থেকে অনেকটা নুইয়ে মেরির দিকে  ঝুকে বললে , মেরি ঘুমাচ্ছিস , মেরির দু চোখের পাতা হালকা  নড়ে কেপে উঠলো যেন । মেরি জেগে উঠেছে বুঝতে পেরে শাহানুর বেগম এবার মেরির মাথার কাছে আরো ঝুঁকে এসে মিনতির  সুরে যেন চুপি চুপি বলল ,  হ্যা রে মেরি শোন এবার রান্নার ঝক্কিটা ছেড়েদেনা রে ।  আর আমি  জানি তুই ভাইদের  কাছেও ফিরে যেতে চাস না , মেরি শোন তোকে আর এ বয়সে অন্য কোথাও ফিরে যেতে হবে না । রুপা পুড়ে ভাইদের সংসারে তোর বেস সুবিধের জায়গা রয়েছে তা আমি জানি ।

তারা তোকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে ও এসেছিল কয়েকবার , গত বছরও তারা এসেছিল তোকে নিয়ে যেতে তুই যাসনি ।  মেরি ও মেরি শোন রান্নটা ছেড়ে দেনা এবার । মেরি এবার নড়ে চরে উঠে শোয়া অবস্থাই বাম কাথ থেকে ডান হতে হতে অস্পষ্ট ভাঙা ভাঙা ঝড়ানো গলায় তার যে চিরায়িত সুর টানা টানা গলায় বললো —  অ্যা , তোমরা কইলেই হইয়া গেলো , আমি রান্দন বান্ধন ছাইড়া দেই আর বাড়ির পোলাপাইন গুলায় সব না খাইয়া থাউক । না খাইয়া সবগুলানে সক্কাল সক্কাল ইসকুলে যাউক , কালেজে যাউক। তোমরা কইলা আর হইয়া গেলো । এই বলতে বলতে মেরি ডান কাথ থেকে অন্যদিকে ঘুরে আগের মতো চুপচাপ চোখ বন্ধ করে নির্জীব পড়ে রইলো । 

‎টলবে না মেরি , কিছুতেই টলবে না।

‎শাহানুর বেগমের সেই কবেকার কোন দিনের কথা মনে এসে  গেল । শাহানুর বেগম এখন মেরির পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে  কোন দিকে বিশেষ লক্ষ্য না করে রান্নাঘর হতে বার  হয়ে গেল।

 চলচ্চিত্রের মতন সেই কবেকার চিত্রগুলো তার মনের মধ্যে চলতে থাকলো , তিনি অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে রয়েছেন তার ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোর কাধে ইস্কুল ব্যাগ ঝুলছে ,  মেরীর হাতে প্লেটে মাখানো ভাত , একেক জন মুখে তুলে নিচ্ছে আর স্কুলের উদ্দেশ্যে দৌড়োচ্ছে  , এরকম আরো একটার পর একটা ছবি মনের মধ্যে ভেসে চলছে , যেন কয়েক জনমের স্মৃতি আছড়ে পড়ছে শাহানুর বেগমের সমস্ত শরীরের উপর।

এসব ভাবতে ভাবতে শাহানুর বেগম ভীষণ ই  ক্ষিপ্র গতিতে ঘরের একটার পর একটা দরজা পার হচ্ছে , পায়ের ভাড়ী ভাড়ী হওয়া ভাবটা যেন কোথায় উবে গেল। একবার ডাইনিং এর দরজা , তারপর ড্রয়িং রুমের দরজা , এভাবে তার সামনের সবকটি দরজা পেরিয়ে , বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে কখন বাহিরের সেই হেলে থাকা কৃষ্ণচূড়াটার সামনে চলে এসেছিলো বাড়ির কারো সে খবর নেই । হয়তো পুরো শহরের একজনও সে খবর রাখেনি । কোনদিন রাখবেও না। 
‎       —সমাপ্ত      
‎               
‎                         * লিখা  —সাজ্জাদুল হক
‎ 
‎[ ইচ্ছেকৃতভাবে গল্পের মধ্যে সাধু ও চলিত ভাষার পাশাপাশি   মিশ্রণ ঘটিয়েছি ]           
‎    

Comments

    Please login to post comment. Login