ভয়ংকর প্রেম কাহিনী
পর্ব ৮: আসল প্রেমিক ও রক্তের নতুন চুক্তি
নদীর ধারের সেই রাতের পর আদিত্য আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। তার শরীরে এখন পরীর ছায়া আরও গভীরভাবে মিশে গেছে। কখনো সে নিজেকে চিনতে পারে না। আয়নায় তাকালে মনে হয় অন্য কেউ তার চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে। আয়েশা এখন দেখতে দশ-এগারো বছরের মেয়ের মতো। তার বুদ্ধি প্রখর, কিন্তু হৃদয় অন্ধকার। সে প্রতিদিন আদিত্যকে বলে, “বাবা, তুমি যদি সামিয়া আন্টিকে বেশি ভালোবাসো, তাহলে আমি তাকেও মা’র কাছে পাঠিয়ে দেব।”
সামিয়া কিন্তু হাল ছাড়েনি। সে তার পুরোনো বাড়িতে আদিত্যকে নিয়ে গিয়েছিল। ঢাকার পুরোনো অংশে একটা বড় দোতলা বাড়ি। সেখানে তার প্যারানর্মাল ল্যাব আছে — পুরোনো বই, তাবিজ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি আর অসংখ্য ফাইল।
আসল প্রেমিকের উন্মোচন
এক বর্ষণমুখর রাতে সামিয়া একটা পুরোনো খাতা খুলে আদিত্যর সামনে রাখল। খাতার পাতায় হলদে হয়ে যাওয়া লেখা আর একটা ছবি। ছবিতে ১৮১২ সালের এক যুবক — লম্বা, সুপুরুষ, চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি।
“তার নাম ছিল রাহিম উদ্দিন,” সামিয়া শান্ত গলায় বলল। “জমিদারের ছেলে। পরীকে সে ভালোবেসেছিল। কিন্তু সম্পত্তির লোভে তাকে নদীতে ডুবিয়ে মেরে ফেলে। মৃত্যুর আগে পরী শপথ করেছিল যে সে তার প্রেমিককে চিরকালের জন্য পাবে। কিন্তু সেই প্রেমিক তুমি নও, আদিত্য।”
আদিত্য কেঁপে উঠল। “তাহলে আমি কে?”
সামিয়া তার হাত ধরল। “তুমি হলে ‘বাহক’। পরীর আত্মা তোমার শরীরে ঢুকে রাহিমের পুনর্জন্মকে টেনে আনছে। রাহিম এখনও জন্মায়নি... অথবা জন্ম নিয়েছে কিন্তু লুকিয়ে আছে। যদি রাহিম জেগে ওঠে, তাহলে পরী তোমাকে আর দরকার মনে করবে না। সে তোমাকে শেষ করে দেবে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়েশা ঘরে ঢুকল। তার চোখ লাল। “মিথ্যা কথা! বাবা আমার। কেউ তাকে নিতে পারবে না।”
হঠাৎ ঘরের সব আলো নিভে গেল। বইগুলো উড়তে শুরু করল। সামিয়ার গলায় অদৃশ্য হাত চেপে ধরল। আদিত্য চিৎকার করে আয়েশাকে থামাতে গেল, কিন্তু মেয়েটা তার দিকে হাত তুলতেই আদিত্যর শরীর অবশ হয়ে গেল। সে দেখল, তার নিজের হাত দিয়ে সামিয়ার গলা টিপে ধরছে।
“থামো আয়েশা!” আদিত্য কোনোমতে চিৎকার করল।
আয়েশা হাসল। “এটা আমি নই, বাবা। এটা তোমার ভিতরের পরী। সে জেগে উঠছে।”
সামিয়া কোনোমতে বেঁচে গেল। তার গলায় নীল দাগ পড়ে গেছে। সে কাঁপা গলায় বলল, “আমাদের সময় খুব কম। রাহিমের পুনর্জন্ম যদি পূর্ণ হয়, তাহলে সব শেষ।”
প্রতিশোধের নতুন পথ
তিন বন্ধু আর সামিয়া মিলে নতুন পরিকল্পনা করল। তারা পরীর আসল কবর খুঁজে বের করবে। নদীর তলায় যেখানে পরীকে ডুবানো হয়েছিল, সেখানে একটা বিশেষ অনুষ্ঠান করতে হবে। কিন্তু এবার আয়েশাকে সঙ্গে নেওয়া যাবে না।
রাহাত বলল, “ভাই, আয়েশাকে কোনো নিরাপদ জায়গায় রেখে যাই। সে এখন পরীর অস্ত্র।”
কিন্তু আয়েশা সব শুনেছিল। সেই রাতে সে রাহাতের স্বপ্নে ঢুকে তাকে ভয় দেখাল। রাহাত সকালে উঠে দেখল তার বুকে নখের দাগ। সুমনের মায়ের শরীরে হঠাৎ অসুস্থতা দেখা দিল। সবাই বুঝল, আয়েশা এখন তাদের সবার উপর নজর রাখছে।
সামিয়ার সঙ্গে জটিল সম্পর্ক
সামিয়ার সঙ্গে আদিত্যর সম্পর্ক গভীর হচ্ছিল। সে আদিত্যকে প্রথমবারের মতো সত্যিকারের মানুষের ভালোবাসা দিচ্ছিল। এক রাতে বৃষ্টির মধ্যে তারা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। সামিয়া আদিত্যকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি তোমাকে হারাতে চাই না। পরী যদি তোমার শরীর নিয়ে নেয়, তাহলে আমিও তোমার সঙ্গে চলে যাব।”
আদিত্য প্রথমবার পরীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। সে সামিয়াকে চুমু খেল। কিন্তু চুমুর মাঝখানে তার শরীর কেঁপে উঠল। পরী জেগে উঠল। আদিত্যর চোখ লাল হয়ে গেল। সে সামিয়াকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে বলল, “তুমি আমার আদিত্যকে ছোঁবে না!”
সামিয়া ভয় পেল না। সে আদিত্যর কপালে একটা তাবিজ ছুঁইয়ে দিল। আদিত্য জ্ঞান হারাল। জ্ঞান ফিরে সে দেখল সামিয়া তার পাশে কাঁদছে।
চরম বিপদ ও ট্র্যাজেডি
তারা সিদ্ধান্ত নিল পরের শুক্রবার নদীতে অনুষ্ঠান করবে। কিন্তু আয়েশা তাদের আগেই চলে গেল। সে নদীর ধারে একা দাঁড়িয়ে পরীর পুরো শক্তি জাগিয়ে তুলছিল। আকাশ কালো হয়ে গেল। নদীর পানি উথলে উঠল।
আদিত্য, সামিয়া, রাহাত আর সুমন যখন পৌঁছাল, তখন আয়েশা তাদের ঘিরে ধরেছে। মেয়েটার শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। “তোমরা সবাই মরবে। বাবা শুধু আমার।”
লড়াই শুরু হল। সুমন মন্ত্র পড়ছিল, রাহাত লোহার অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করছিল। সামিয়া একটা বিশেষ ধূপ জ্বালিয়েছিল যা পরীর শক্তি কমিয়ে দিচ্ছিল। আদিত্য আয়েশার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আয়েশা, তুমি আমার মেয়ে। ফিরে এসো!”
এক মুহূর্তের জন্য আয়েশার চোখ স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবা... আমাকে বাঁচাও। পরী আমার ভিতরে...”
কিন্তু পরী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল। নদী থেকে একটা বিশাল ঢেউ উঠে এল। সেই ঢেউয়ে রাহাত ভেসে গেল। সুমনকে একটা গাছের ডাল আঘাত করল। সামিয়া আদিত্যকে জড়িয়ে ধরে বলল, “যাই হোক, আমি তোমার সঙ্গে আছি।”
আদিত্য শেষ শক্তি দিয়ে পরীর লকেটটা নদীতে ছুড়ে ফেলল। বিস্ফোরণের মতো শব্দ হল। আয়েশা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। কিন্তু পরী পুরোপুরি যায়নি। সে আদিত্যর শরীরের আরও গভীরে ঢুকে পড়েছে।
নতুন রহস্য
অনুষ্ঠান শেষে সামিয়া একটা ভয়ংকর সত্য বলল, “রাহিমের পুনর্জন্ম হয়েছে। সে... আমাদের খুব কাছের কেউ। হয়তো আমাদের মধ্যেই একজন।”
আদিত্য চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখে সন্দেহ। রাহাত? সুমন? নাকি সামিয়া নিজেই?
আয়েশা জ্ঞান ফিরে আদিত্যর কোলে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “বাবা, সাবধান। সবাই শত্রু। শুধু আমি তোমার।”
বৃষ্টি থামছিল না। আদিত্য বুঝতে পারছিল, এই খেলা এখন শুধু পরীর সঙ্গে নয়। এটা তার নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে, তার মেয়ের সঙ্গে, এবং তার চারপাশের সবার সঙ্গে এক ভয়ংকর যুদ্ধ।
(পর্ব ৮ সমাপ্ত)
পরবর্তী পর্বে: রাহিমের পরিচয় উন্মোচন, আদিত্যর শরীরে পরীর পূর্ণ দখলের চেষ্টা, বন্ধুদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা, সামিয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত প্রেম এবং এক অপ্রত্যাশিত মৃত্যু যা সবকিছু ওলটপালট করে দেবে।