Posts

ফিকশন

ধন সম্পদ অতিরিক্ত

June 13, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

8
View

অতিরিক্ত ধন সম্পদ

ঢাকা শহরের হৃদয়ে, গুলশানের সবচেয়ে উঁচু আকাশছোঁয়া টাওয়ারের পেন্টহাউসে রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। আশিস চৌধুরী বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা দামি কিউবান সিগার টানছিলেন। নিচে শহরের আলোকমালা যেন তার পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়ছে। তার হাতে ক্রিস্টাল গ্লাসে বিশ বছরের পুরনো স্কচ হুইস্কি, যার এক বোতলের দামই লাখ টাকার ওপর। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স, কিন্তু চেহারায় এখনো সেই কঠিন যৌবনের ছাপ। প্রাইভেট জিম, বিদেশি সাপ্লিমেন্ট আর ইউরোপিয়ান ডাক্তারদের কসমেটিক ট্রিটমেন্টের জোরে শরীর এখনো ফিট। তার চৌধুরী গ্রুপের মালিকানায় রয়েছে বেশ কয়েকটা জাহাজ কোম্পানি, বিশাল রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল ফ্যাক্টরি, একটা প্রাইভেট ব্যাংকের বড় অংশীদারিত্ব এবং আরও অনেক কিছু। দেশের অর্থনীতিতে তার প্রভাব এতটাই যে অনেক মন্ত্রী তার ফোনের অপেক্ষায় থাকতেন। সম্পদের সঠিক হিসাব কেউ জানত না, কিন্তু ফোর্বস লিস্টে না থাকলেও দেশের ভেতরে তিনি ছিলেন অদৃশ্য রাজা।

তার স্ত্রী রুমা চৌধুরী পাশের মাস্টার বেডরুমে ঘুমের ওষুধ খেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে আছেন। একসময় তিনি ছিলেন জনপ্রিয় মডেল। বিয়ের পর থেকে শুধু বিলাসিতা। তার ড্রেসিং রুমটা একটা ছোট মলের মতো—ইতালির গুচ্চি, ফ্রান্সের চ্যানেল, দুবাইয়ের ডিজাইনার পোশাকের স্তূপ। প্রতি মাসে তার স্পা ট্রিটমেন্ট আর প্লাস্টিক সার্জারির খরচ কয়েক লাখ টাকা। ছেলে আরাভ চব্বিশ বছরের। মেয়ে অনন্যা একুশ। দুজনেই বিদেশে পড়তে গিয়েছিল, কিন্তু কেউই কোর্স শেষ করেনি। টাকার জোরে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যেত।

আশিসের জীবন শুরু হয়েছিল একেবারে নিচ থেকে। বাবা ছিলেন সাধারণ স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী। ঢাকার পুরনো অঞ্চলের ছোট্ট দোতলা বাড়িতে কষ্টের সংসার। প্রথম ব্যবসা শুরু করেন ছোট ইম্পোর্টের দোকান দিয়ে। তারপর রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ, বিদেশি কোম্পানির সাথে লবিং, কিছু সন্দেহজনক ডিল—সব মিলিয়ে চৌধুরী গ্রুপ গড়ে ওঠে। কিন্তু সাফল্যের সাথে সাথে এসেছে অন্ধকার। টাকা যত বেড়েছে, মানুষের ভেতরের শূন্যতা তত বেড়েছে।

সকালে তার দিন শুরু হতো ঠিক সাড়ে নয়টায়। পেন্টহাউসের প্রাইভেট জিমে এক ঘণ্টা ওয়ার্কআউট। জিমের দেয়াল জুড়ে বিশাল মিরর, ফ্লোরে ইতালি থেকে আনা মার্বেল, যন্ত্রপাতি সব আমেরিকান। তারপর ব্রেকফাস্ট টেবিলে ইতালিয়ান শেফ তৈরি করে দিত অর্গানিক অ্যাভোকাডো টোস্ট, ফ্রেশ বেরি স্মুদি, ফ্রান্স থেকে আনা চিজ, কলম্বিয়ার স্পেশালিটি কফি। গ্যারেজে রোলস রয়েস কুলিনান, ল্যাম্বরগিনি উরুস, ফেরারি ৪৫৮, বিএমডব্লিউ আই৮—প্রতি দু-তিন মাসে নতুন গাড়ি আসত প্রাইভেট জেটে করে। রুমা তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়ে মিলান বা প্যারিসের শপিং ট্রিপে উড়ে যেতেন। তাদের কক্সবাজারের সমুদ্রতীরের বিশাল ভিলায় প্রাইভেট বিচ, হেলিপ্যাড, সুইজারল্যান্ডের লেকের পাশের চালেটে শীতকাল কাটানো, মালদ্বীপে ওভারওয়াটার ভিলা—সবই তাদের।

কিন্তু এই সোনার খাঁচার ভেতরে পরিবারটা ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছিল। আরাভকে কখনো কোনো নিয়মে বাঁধা হয়নি। ছোটবেলা থেকে “বাবার টাকা, যা খুশি কর” — এটাই তার শিক্ষা। লন্ডনে পড়তে গিয়ে প্রথমে বন্ধুদের সাথে মদের নেশা শুরু। তারপর কোকেইন, এমডিএমএ, এমনকি হেরোইন পর্যন্ত। পার্টিতে পার্টিতে ঘুরে বেড়াত। একবার ইউনিভার্সিটির একটা মেয়েকে ড্রাগ দিয়ে অজ্ঞান করে অপমান করার অভিযোগ উঠেছিল। আশিস টাকা ঢেলে, লবিস্ট লাগিয়ে সব চাপা দেন। দেশে ফিরে আরাভকে চৌধুরী গ্রুপের একটা ডিভিশনের হেড করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে অফিসে যাওয়ার চেয়ে গুলশানের হাই-এন্ড ক্লাব, বনানীর প্রাইভেট পার্টিতে ড্রাগের আসর বসাত। তার বন্ধু সার্কেলে ছিল ড্রাগ ডিলার, রাজনৈতিক নেতাদের ছেলে, বিদেশি মডেল আর কল গার্ল। এক রাতে তার পার্টিতে প্রচুর মেয়ে এসেছিল। আরাভ একটা মেয়েকে জোর করে ড্রাগ খাইয়ে নাচাতে নাচাতে অপমান করছিল। কেউ মোবাইলে ভিডিও করে ফেলে। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওতে আরাভ হাসতে হাসতে বলছে, “টাকা দিয়ে সব কিনে নেওয়া যায়। এই মেয়েটা? এক রাতের জন্য কিনেছি।” মেয়েটির নাম রিয়া। সে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, চৌধুরী গ্রুপে ইন্টার্ন করছিল। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার সাথে সাথে দেশজুড়ে আগুন জ্বলে উঠল। #JusticeForRiya হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিংয়ে চলে আসে। ছাত্ররা, যুবকরা রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদে শহর কাঁপতে থাকে। আশিস প্রথমে তার প্রভাব খাটিয়ে ভিডিও সরানোর চেষ্টা করেন। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ফোন করে চাপ দেন, মিডিয়ার মালিকদের টাকা দেন। কিন্তু এবার আর চাপা যায়নি। একটা স্বাধীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল পুরো ঘটনা তুলে ধরে। তদন্ত শুরু হয়। আরাভকে গ্রেপ্তার করা হলো। জেলের ভেতরে তার নেশার জন্য শরীর ভেঙে পড়ে। সে চিৎকার করে কাঁদত, “বাবা, আমাকে বাঁচাও! আমি আর পারছি না।” তার লিভার নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, শরীরে ইনফেকশন। জেলের ডাক্তার বলেছিলেন, আর কয়েক মাস এভাবে চললে মৃত্যু অনিবার্য।

অনন্যার জীবনটা ছিল আরও বেশি প্রকাশ্য এবং ধ্বংসাত্মক। সে ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার। লাখ লাখ ফলোয়ার। প্রতি পোস্টে শর্ট স্কার্ট, ক্রপ টপ, বিকিনি—এমন পোশাক যা দেশের সাধারণ মানুষের চোখে অশ্লীল। মালদ্বীপের ওভারওয়াটার ভিলায় বিকিনি পরে ছবি, দুবাইয়ের মলে শপিং করে প্রকাশ্যভাবে ছেলেদের সাথে জড়িয়ে ছবি। তার বয়ফ্রেন্ডের সংখ্যা অগণিত। একেকজনের সাথে কয়েক সপ্তাহ বা মাস। কখনো ধনী ছেলে, কখনো মডেল, কখনো ড্রাগ ডিলার। একবার একটা ছেলের সাথে ঝগড়া হয়। ছেলেটা তাকে মারধর করে হাসপাতালে পাঠায়। অনন্যার মুখ ফুলে যায়, চোখ কালশিটে। খবর চাপা দেওয়া হয় টাকা দিয়ে, কিন্তু লিক হয়ে যায়। সে ঘুমের ওষুধ, অ্যালকোহল আর কোকেইন মিক্স করে নেশা করত। এক রাতে তার বন্ধুর ফ্ল্যাটে ওভারডোজ হয়। তাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। আশিস ডাক্তারদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেন, কিন্তু মিডিয়া ছাড়েনি। অনন্যার পুরনো ইনস্টাগ্রাম পোস্টগুলো নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মেয়েরা বলতে শুরু করে, “ধনীদের মেয়েরা এভাবে শরীর বিক্রি করে, নেশা করে সমাজকে নষ্ট করছে।”

রুমা চৌধুরী এসব দেখে নিজের বিশাল রুমে বসে কাঁদতেন। তার জীবনও খালি। সারাদিন শপিং, স্পা, পার্টি। স্বামীর সাথে সম্পর্ক শুধু টাকা আর সামাজিক মর্যাদার জন্য। তার একটা অ্যাফেয়ার চলছিল এক ইয়ং বিজনেসম্যানের সাথে। সেটাও একদিন লিক হয়ে যায়। পরিবারের ভেতরে কোনো আস্থা, ভালোবাসা ছিল না। সবাই নিজের নিজের অন্ধকার জগতে ডুবে ছিল।

চৌধুরী গ্রুপের ভেতরের কেলেঙ্কারি আরও ভয়ংকর। তদন্তে বেরিয়ে আসে ফার্মাসিউটিক্যাল ফ্যাক্টরিতে নকল ওষুধ তৈরি হতো। সেই ওষুধ গরিব মানুষদের কাছে বিক্রি হয়েছে। অনেক রোগী মারা গেছে। সেই টাকা দিয়ে আরাভ বিদেশ থেকে ড্রাগ আমদানি করত। অনন্যা তার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক দিয়ে অদ্ভুতভাবে সেই ড্রাগের প্রচার করত। কর্মচারীদের শোষণ করা হতো। ছোট সাপ্লায়ারদের টাকা না দিয়ে চাপ দেওয়া হতো, অনেককে দেউলিয়া করে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের ঘুষ দিয়ে অনেক অন্যায় চাপা পড়েছিল।

ভাইরাল ভিডিওর পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ তীব্র হয়। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল। ছাত্ররা স্লোগান দেয়, “এলিটদের বিচার চাই! ধনীরা দেশ লুটছে, তাদের সন্তানরা যুবকদের নষ্ট করছে!” টেলিভিশনে ডিবেট, সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার পোস্ট। একটা বড় চ্যানেল আরাভ আর অনন্যার পুরো জীবনের ডকুমেন্টারি করে। আরাভের ড্রাগ পার্টির ভিডিও, অনন্যার প্রকাশ্য ছোট পোশাকের ছবি, রুমার অ্যাফেয়ারের খবর—সবকিছু দেখে পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্মার্টফোন কেড়ে নেয়। সমাজে ধনীদের প্রতি ঘৃণা বেড়ে যায়।

আশিস চৌধুরী তার বিশাল অফিসে বসে স্টক মার্কেটের পতন দেখছিলেন। তার কোম্পানির শেয়ার ৫০% নেমে গেছে। ইনভেস্টররা টাকা তুলে নিচ্ছে। সরকার চাপে পড়ে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, গাড়ি, বাড়ি সিল করে দেওয়া হয়। একদিন আশিস তার পুরনো বাড়িতে গেলেন। সেই ছোট দোতলা বাড়ি, যেখানে বাবা-মা’র সাথে কাটিয়েছেন। সেখানে বসে প্রথমবার খোলাখুলি কাঁদলেন। “আমি কী করলাম? টাকার লোভে সব হারালাম। ছেলেকে নেশায় ডুবিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি। মেয়েকে শরীর বিক্রির জীবন দিয়েছি। স্ত্রীকে শূন্য করে দিয়েছি।”

আরাভ জেলে কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। নেশার অভাবে শরীর কাঁপত। সে অন্য বন্দিদের সাথে ঝগড়া করত, কখনো আত্মহত্যার চেষ্টা করত। অনন্যা রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি। সেখানে বসে সে তার পুরনো জীবনের কথা ভাবত। কীভাবে ছোট পোশাক পরে ছেলেদের সাথে ঘুরে, নেশা করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শরীর দেখিয়ে সব হারিয়েছে। রুমা ডিভোর্সের মামলা করেছেন। তিনি এখন একা, তার সৌন্দর্যও ফিকে হয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত আশিস সব হারান। কোম্পানি লিকুইডেশনে যায়। তিনি একটা ছোট ফ্ল্যাটে চলে যান। সেখান থেকে একটা ছোট এনজিও শুরু করেন। স্কুলে স্কুলে গিয়ে বক্তৃতা দেন—“বন্ধুরা, অতিরিক্ত ধন সম্পদ মানুষকে খেয়ে ফেলে। এটা আমার পরিবারকে ধ্বংস করেছে। নেশা, অনৈতিক সম্পর্ক, শোষণ, নকল ওষুধ—সবকিছুর মূলে টাকার লোভ। মানুষ হও, টাকার দাস হয়ো না।”

এই ঘটনা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। সরকার নতুন আইন করেছে ধনী পরিবারের সন্তানদের জন্য বাধ্যতামূলক সামাজিক শিক্ষা ও দায়িত্ব। মিডিয়ায় মাসের পর মাস আলোচনা চলেছে। তরুণ প্রজন্ম নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে—সফলতা শুধু টাকা নয়, মানবতা ও নৈতিকতাও জরুরি। অনেক ধনী পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে সতর্ক হয়েছে। আশিস চৌধুরী এখন একা বসে সেই পুরনো বারান্দার স্মৃতি ভাবেন। সোনার খাঁচা আসলে মৃত্যুর ফাঁদ। 

Comments

    Please login to post comment. Login