Posts

ফিকশন

MD samim sikdar

June 13, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

6
View

ডিপ্রেশনি মোবাইল
আধুনিক শহরের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি বাড়ির ঘরে, প্রতিটি অফিসের টেবিলে একটি ছোট্ট কালো আয়না বিরাজ করছে। তার নাম মোবাইল। এই আয়নায় মানুষ নিজেকে দেখে না, দেখে অন্যদের। আর সেই দেখায় ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে ছোট, অর্থহীন, ব্যর্থ মনে হয়। এই গল্প কোনো একজনের নয়। এ গল্প হাজারো মানুষের, যারা প্রতিদিন এই আয়নায় ডুবে যায় এবং উঠতে পারে না।
সকাল হয়। শহর জেগে ওঠে। কিন্তু মানুষের চোখ প্রথমে খোলে মোবাইলের স্ক্রিনে। বিছানায় শুয়ে, চোখ মুছতে মুছতে তারা স্ক্রল করে। ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে, টিকটকে অসংখ্য জীবন ঝলমল করছে। কেউ বিদেশে বেড়াতে গিয়ে ছবি দিয়েছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনে পোস্ট করেছে, কেউ জিমে শরীর গড়ে সেলফি তুলছে। যারা দেখছে, তাদের নিজের সকালটা হঠাৎ করে ধূসর লাগে। “আমার জীবনটা কেন এমন?” — এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরতে থাকে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে পরিবার বসে, কিন্তু কথা হয় না। সবাই নিজ নিজ মোবাইলে ডুবে। খবর পড়া হয়, কিন্তু সত্যিকারের কথা বলা হয় না।
অফিসে যাওয়ার পথে বাসে, ট্রেনে, রিকশায় সবার হাতে মোবাইল। কেউ রিল দেখছে, কেউ গেম খেলছে, কেউ অন্যের সাফল্যের গল্প পড়ছে। সময় চলে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অফিসে পৌঁছে কাজ শুরু করার কথা, কিন্তু নোটিফিকেশনের আওয়াজ থামে না। একটা মেসেজ, একটা লাইক, একটা কমেন্ট — এগুলোই এখন জীবনের সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ফাইল খুলে রেখে, প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে করতে মাঝে মাঝে স্ক্রিনে চোখ চলে যায়। “অন্য ডিপার্টমেন্টের ছেলেটা কত তাড়াতাড়ি প্রমোশন পেয়ে গেল। আমি এখনও একই জায়গায়।” তুলনা শুরু হয়। আর তুলনার সাথে সাথে আসে অস্থিরতা, হতাশা।
ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাসে বসে। শিক্ষক পড়াচ্ছেন, কিন্তু তাদের চোখ মোবাইলের দিকে। নোটিফিকেশন বন্ধ করা হয়েছে, তবু মন চলে যায়। “আমার বন্ধুরা কত সহজে সব পেয়ে যাচ্ছে। আমি কেন পারছি না?” পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকে, কিন্তু মোবাইলের আলোয় চোখ জ্বলে। রাত দুটো পর্যন্ত রিল দেখে, সকালে উঠতে পারে না। পরীক্ষার আগের রাতে ঘুমের বদলে স্ক্রিনের আলোয় চোখ লাল হয়। ফলাফল খারাপ হলে আরও তুলনা। “অন্যরা কত ভালো করল। আমি শুধু...” এই “শুধু” শব্দটা ধীরে ধীরে মনের ভিতর গেঁথে যায়।
যুবক-যুবতীরা প্রেম করে। কিন্তু প্রেমের বেশিরভাগ সময় কাটে চ্যাটে। সামনাসামনি দেখা হলে কথা ফুরিয়ে যায়, কারণ সব কথাই তো টাইপ করা হয়েছে। একজন আরেকজনের পোস্ট দেখে ঈর্ষা করে। “ওর সাথে কত ছবি, কত ঘুরে বেড়ানো। আমাদের তো শুধু মেসেজ।” সম্পর্ক ভাঙে, নতুন সম্পর্ক শুরু হয়, কিন্তু মোবাইল সবসময় মাঝখানে থাকে। একা লাগলে স্ক্রল করা, দুঃখ হলে রিল দেখা, আনন্দ হলে পোস্ট করা। আসল অনুভূতি আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
বয়স্ক মানুষেরাও বাদ যায় না। ছেলেমেয়েরা বিদেশে, নাতি-নাতনিরা ব্যস্ত। তারা ভিডিও কলে কথা বলে, কিন্তু কল শেষ হওয়ার পর আবার মোবাইল হাতে নিয়ে অন্যদের পরিবারের ছবি দেখে। “ওদের পরিবার এত সুখী। আমাদের তো সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।” বাস্তবে ছেলেমেয়েরা হয়তো নিজেরাই একই সমস্যায় ভুগছে, কিন্তু মোবাইলের আয়নায় সবকিছু পারফেক্ট দেখায়। তাই হতাশা বাড়ে।
মোবাইল শুধু তুলনা করে না, সময়ও কেড়ে নেয়। একটা রিল দেখতে দুই মিনিট, কিন্তু তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। ঘণ্টা পার হয়ে যায়। কাজের সময় নষ্ট হয়। উন্নতির সুযোগ চলে যায়। যে ছেলেটি নতুন স্কিল শিখতে চেয়েছিল, সে কোর্স কিনে রেখে রিল দেখে। যে মেয়েটি ব্যবসা শুরু করবে বলে পরিকল্পনা করেছিল, সে প্রতিযোগীদের পোস্ট দেখে নিজেকে অযোগ্য মনে করে বসে থাকে। যে কর্মচারী প্রমোশনের জন্য প্রস্তুতি নেবে, সে লিঙ্কডইন দেখতে দেখতে সময় নষ্ট করে।
ডিপ্রেশনের ছায়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ হাসিমুখে পোস্ট করে “লাইফ ইজ গুড”, কিন্তু ভিতরে ফাঁকা। ঘুম কমে, খাওয়া কমে, কথা বলা কমে। মাথায় সবসময় একটা চাপ। “আমি যথেষ্ট নই।” ডাক্তারের কাছে গেলে বলে “অ্যাংজাইটি”, “ডিপ্রেশন”। ওষুধ খায়, কিন্তু মোবাইল ছাড়ে না। কারণ মোবাইলই তো এখন সবচেয়ে সহজ সঙ্গী। একা লাগলে স্ক্রিন জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু সেই সঙ্গীই তো বিষ।
শহরের রাস্তায় দেখা যায়, মানুষ হাঁটছে কিন্তু চোখ নিচে। গাড়ি চালাচ্ছে কিন্তু এক হাত মোবাইলে। দুর্ঘটনা বাড়ছে। সম্পর্ক ভাঙছে। উৎপাদনশীলতা কমছে। দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে। কিন্তু কেউ স্বীকার করে না যে ছোট্ট একটা যন্ত্র এত বড় ক্ষতি করছে। কোম্পানিগুলো নতুন নতুন ফিচার বের করছে — আরও আকর্ষক নোটিফিকেশন, আরও সুন্দর ফিল্টার, আরও অ্যাডিক্টিভ অ্যালগরিদম। মানুষ আটকে যাচ্ছে।
একদিন একটা বড় ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ চলে যায় সারা শহরে। মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যায় ধীরে ধীরে। হঠাৎ মানুষ বাইরে বের হয়। পার্কে বসে কথা বলে। ছেলেমেয়েরা খেলে। প্রতিবেশীরা একে অপরের সাথে দেখা করে। হাসি ফিরে আসে। কিন্তু বিদ্যুৎ আসার সাথে সাথে আবার সবাই ঘরে ঢুকে মোবাইল চার্জে লাগায়। আয়না আবার জ্বলে ওঠে। তুলনা আবার শুরু হয়।
এই চক্র চলতেই থাকে। কেউ কেউ বুঝতে পারে। তারা মোবাইলকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। অ্যাপ লক করে, সময় সীমা বেঁধে, বই পড়ে, বাইরে হাঁটে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ পারে না। কারণ অভ্যাস হয়ে গেছে। ডিপ্রেশনি মোবাইল এখন তাদের অংশ হয়ে গেছে।
যারা পড়ছে এই গল্প, তাদের কাছে একটা প্রশ্ন রইল। আজ সন্ধ্যায় যখন মোবাইল হাতে নেবেন, একবার থামবেন কি? দেখবেন কতক্ষণ স্ক্রল করছেন? কতটা সময় নষ্ট হচ্ছে? কতটা তুলনা করছেন নিজেকে অন্যের সাথে? আর কতদিন এভাবে চলবে?
মোবাইল খারাপ নয়। কিন্তু তার আয়নায় যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলা হয়, তখন সেটা হয়ে যায় ডিপ্রেশনের সবচেয়ে বড় কারণ। সময় নষ্টের সবচেয়ে মিষ্টি ফাঁদ। উন্নতির পথে সবচেয়ে নীরব বাধা।
গল্প শেষ হয় না। কারণ এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন এই আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে ছোট করে ফেলছে। হয়তো একদিন সবাই বুঝবে। হয়তো বুঝবে না। কিন্তু যতদিন না বোঝা যায়, ডিপ্রেশনি মোবাইল রাজত্ব করশক্তিশা

Comments

    Please login to post comment. Login