Posts

উপন্যাস

বিয়ে বাড়িতে ডাকাতি করতে এসে বউ ডাকাতি হয়ে গেল।

June 14, 2026

Shafin pro

7
View

আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। আষাঢ়ের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার উপক্রম। মীরপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বনেদি চৌধুরী বাড়িতে তখন উৎসবের আলো। চারদিকে জাঁকজমক, সানাইয়ের সুর আর আত্মীয়-স্বজনদের কোলাহল। আজ চৌধুরীর বাড়ির বড় মেয়ে রূপার বিয়ে।বাড়ির উঠোনে মস্ত প্যান্ডেল। ভেতরে লাইটের রোশনাই। রূপার বাবা আমজাদ চৌধুরী এবং মা রাবেয়া বেগম তটস্থ হয়ে তদারকি করছেন। রূপার খালা, ফুফু, মামা, চাচারা সবাই হাজির। বোন নূপুর সারাক্ষণ রূপার পাশে পাশে ঘুরছে, বেনারসির কুঁচি ঠিক করে দিচ্ছে, কখনো বা গহনা এগিয়ে দিচ্ছে। রূপা সেজেগুজে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য তৈরি। লাল বেনারসি, কপালে চন্দনের ফোঁটা, আর গা ভর্তি সোনার গহনায় তাকে পরীর মতো লাগছে। কিন্তু তার চোখে আনন্দের চেয়ে এক অদ্ভুত বিষাদের ছায়া।কারণ একটাই—যাকে সে বিয়ে করতে যাচ্ছে, সেই পাত্র আসিফ। আসিফ উচ্চশিক্ষিত, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং দেখতে সুপুরুষ হলেও ভেতরে ভেতরে সে এক চরম অহংকারী, লোভী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের আগেই সে আমজাদ চৌধুরীর কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা যৌতুক হিসেবে আদায় করেছে। শুধু তাই নয়, রূপাকে সে মানসিকভাবেও নির্যাতন করত, হুমকি দিত যে মনের মতো উপঢৌকন না পেলে বাসর রাতেই রূপার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। রূপা তার বাবা-মায়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে মুখ বুজে সব সহ্য করছিল। আসিফ এই কাহিনীর আসল খলনায়ক, যে ভালোবাসার নাটক করে একটা পরিবারকে ধ্বংস করার ছক কষছিল। বরপক্ষ এখনো এসে পৌঁছায়নি। তারা শহর থেকে রওনা দিয়েছে, আসতে আরও ঘণ্টাখানেক বাকি।ঠিক এই সময়েই চৌধুরী বাড়ির চারপাশটা হঠাৎ থমথমে হয়ে গেল। ঝড়ের বেগে ধেয়ে এল একদল সশস্ত্র মানুষ। মুখে কালো কাপড়ের মুখোশ, হাতে ধারালো রামদা আর দেশি বন্দুক। গ্রামের পাহারাদারদের বেঁধে রেখে তারা সরাসরি ঢুকে পড়ল বিয়ে বাড়ির প্যান্ডেলে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের চিৎকার রূপান্তরিত হলো আতঙ্কের আর্তনাদে। সানাইয়ের সুর বন্ধ হয়ে গেল।ডাকাত দলের সর্দার বখতিয়ার খা। সে সাধারণ কোনো ডাকাত নয়। রবিন হুডের মতো তার খ্যাতি—ধনীদের লুণ্ঠন করে গরিবদের বিলিয়ে দেয়, আর অন্যায় দেখলে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। লম্বা চওড়া গড়ন, চোখে এক তীব্র তীক্ষ্ণতা, আর কণ্ঠে সিংহের গর্জন। বখতিয়ারের এক হুঙ্কারে পুরো বিয়ে বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল।"খামোশ! কেউ নিজের জায়গা থেকে নড়বে না!" বখতিয়ারের গম্ভীর গলা গমগম করে উঠল। "আমরা এখানে কারো রক্ত ঝরাতে আসিনি। আমজাদ চৌধুরী, আপনার সব সোনাদানা আর ক্যাশ টাকা এক জায়গায় জড়ো করুন। জলদি!"আমজাদ চৌধুরী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "বাবা, আমার মেয়ের বিয়ে। সব গহনা ওর গায়ে। আমাদের সব নিয়ে নাও, কিন্তু বিয়েটা ভেঙে দিও না।"বখতিয়ার রূপার দিকে তাকাল। রূপা তখন ভয়ে ও অপমানে কাঁপছে। কিন্তু বখতিয়ারের চোখ শুধু রূপার গহনার দিকে গেল না, সে লক্ষ্য করল রূপার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল। সেই জল ভয়ের নয়, এক গভীর মুক্তির আকুলতার। বখতিয়ারের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না যে, মেয়েটি যেন এই বিপদেও এক প্রকার স্বস্তি পাচ্ছে।ইতিমধ্যে বখতিয়ারের ডান হাত, ছোটু নামের এক ডাকাত, ফিসফিস করে সর্দারকে বলল, "ওস্তাদ, এই বাড়ির হবু জামাই আসিফ তো সেই লোক, যে আমাদের গাঁয়ের গরিব চাষীদের জমি জবরদখল করেছে! ওই যে শহরের বড় লোকটা, যে আজ বর সেজে আসছে।"বখতিয়ারের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। সে আসিফের আসল রূপ আগে থেকেই জানত। সে জানত আসিফ একটা লম্পট এবং অত্যাচারী। বখতিয়ার আমজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল, "চৌধুরী সাহেব, আপনি এই জানোয়ারের হাতে আপনার মেয়েকে তুলে দিচ্ছেন? ও তো টাকার লোভে আপনার মেয়েকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে।"রাবেয়া বেগম কেঁদে উঠে বললেন, "আমরা নিরুপায় বাবা। সমাজ কী বলবে? বরপক্ষ আসার সময় হয়ে গেছে।"বখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মাথায় তখন অন্য এক পরিকল্পনা খেলছে। সে ডাকাতির উদ্দেশ্যে এসেছিল, কিন্তু এখন তার ভেতরের ন্যায়বোধ জেগে উঠেছে। সে রূপার দিকে তাকাল এবং সরাসরি প্রশ্ন করল, "মেয়ে, তুমি কি এই বিয়েতে খুশি?"রূপা প্রথমে চুপ করে রইল, তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মাথা নেড়ে 'না' বলল। সে বলল, "উনি ভালো মানুষ নন। আমাকে বাঁচান।"বখতিয়ারের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে রূপার বাবাকে বলল, "চৌধুরী সাহেব, আজ এই বাড়িতে ডাকাতি হবে। তবে সোনাদানার নয়। আজ বখতিয়ার খা এই বাড়ির 'বউ' ডাকাতি করে নিয়ে যাবে!"পুরো বিয়ে বাড়ির মানুষ স্তব্ধ। মামা, চাচা, ফুফুরা চিৎকার করে উঠলেন, "এ কী সর্বনাশ! ডাকাত বউ নিয়ে যাচ্ছে!" নূপুর তার বোনকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু বখতিয়ারের আদেশে ডাকাত দল রূপাকে আলতো করে ধরে প্যান্ডেলের বাইরে নিয়ে গেল। কোনো জোরজুলুম নয়, অত্যন্ত সম্মানের সাথে রূপাকে ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হলো। বখতিয়ার আমজাদ চৌধুরীকে বলল, "আপনার সোনাদানা আপনার কাছেই থাক। আপনার মেয়েকে আমি আসিফের মতো খলনায়কের হাত থেকে মুক্ত করলাম। যদি ক্ষমতা থাকে, তবে জামাইকে বলবেন বখতিয়ার খাঁর আস্তানা থেকে বউ উদ্ধার করতে।"ডাকাত দল রূপাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বর পক্ষ আসার ঠিক আধা ঘণ্টা আগে বিয়ে বাড়ি ফাঁকা, কনে গায়েব!কিছুক্ষণ পর আসিফ তার সাঙ্গপাঙ্গ আর বরযাত্রী নিয়ে ধুমধাম করে এসে পৌঁছাল। কিন্তু বাড়ির থমথমে পরিবেশ দেখে সে চমকে গেল। আমজাদ চৌধুরী মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। আসিফ চিৎকার করে বলল, "এসব কী হচ্ছে? কনে কোথায়? সানাই বাজছে না কেন?"রূপার মামা আমতা আমতা করে বললেন, "বাবা আসিফ, সর্বনাশ হয়ে গেছে। ডাকাত দল এসে রূপাকে ডাকাতি করে নিয়ে গেছে!"আসিফের মুখ ক্রোধে কালো হয়ে গেল। সে রূপাকে ভালোবাসত না, কিন্তু তার অহংকারে চরম আঘাত লেগেছে। তাছাড়া রূপার সাথে যে বিপুল যৌতুক পাওয়ার কথা ছিল, তাও হাতছাড়া হচ্ছে। সে চিৎকার করে বলল, "একটি ডাকাত আমার হবু বউকে নিয়ে গেল আর আপনারা দাঁড়িয়ে দেখলেন? কোন ডাকাত ওটা?""বখতিয়ার খা!" নূপুর পেছন থেকে ঘৃণাভরা গলায় বলল।আসিফ তার কোমরে থাকা রিভলবার বের করে বলল, "আমি আসিফ চৌধুরী। আমার জিনিস কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আমি এখনই পুলিশ ফোর্স নিয়ে যাব। ওই ডাকাত সর্দারকে আমি টুকরো টুকরো করব আর রূপাকে ফিরিয়ে এনে এই রাতেই জোর করে বিয়ে করব।" আসিফ তার আসল খলনায়কের রূপ প্রকাশ করে ফেলল। সে রূপার বাবা-মাকে হুমকি দিল যে রূপাকে উদ্ধার করার পর সে চৌধুরীর বাড়ির সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেবে, অন্যথায় সবাইকে জেলে পাঠাবে।এদিকে, বখতিয়ার খাঁর পাহাড়ি আস্তানায় রূপাকে নিয়ে আসা হয়েছে। রূপা ভেবেছিল ডাকাতরা হয়তো তার ক্ষতি করবে। কিন্তু আস্তানায় পৌঁছানোর পর সে দেখল সম্পূর্ণ অন্য চিত্র। বখতিয়ারের মা এবং বোনেরা রূপাকে পরম যত্নে বরণ করে নিল। বখতিয়ার তাকে একটি নিরাপদ ও সুসজ্জিত ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিল।পরদিন সকালে বখতিয়ার রূপার ঘরে এলো। রূপা তখনো লাল বেনারসি পরে বসে আছে। বখতিয়ার বলল, "চৌধুরী বাড়ির মেয়ে, তুমি এখানে সম্পূর্ণ নিরাপদ। আমি জানি আসিফ কেমন মানুষ। সে আমার এলাকার বহু মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে। তোমাকে তার হাত থেকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল।"রূপা বখতিয়ারের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো পঙ্কিলতা নেই, আছে এক অসীম সাহসিকতা আর সততা। রূপা বলল, "আপনি আমার সম্মান বাঁচিয়েছেন। কিন্তু আমার পরিবারের কী হবে? আসিফ ওদের ছেড়ে দেবে না।"বখতিয়ার হাসল। "আসিফকে আমি চিনি। সে লোভী এবং কাপুরুষ। সে নিজেই এখানে আসবে। আর সেটাই হবে তার শেষ খেলা।"পরের কয়েকদিনে আসিফ পুলিশ প্রশাসন এবং নিজের গুন্ডাবাহিনী নিয়ে বখতিয়ারের আস্তানা ঘেরাও করার পরিকল্পনা করল। সে আমজাদ চৌধুরী এবং রাবেয়া বেগমকে জিম্মি করে নিজের গাড়িতে তুলে নিল, যাতে বখতিয়ারের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা যায়।অবশেষে সেই রাত এলো। বখতিয়ারের আস্তানার চারপাশ আসিফের সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে ফেলল। আসিফ মেগাফোনে চিৎকার করে বলল, "বখতিয়ার, রূপাকে আমার হাওয়ালা কর। নইলে তোর আস্তানা আমি গুঁড়িয়ে দেব। আর দেখ, তোর কারণে রূপার মা-বাবাও আজ আমার কবজায়।"বখতিয়ার আস্তানা থেকে একা বেরিয়ে এলো। তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল অসীম সাহস। সে আসিফের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, "আসিফ, তুমি টাকার জোরে অন্ধ। ক্ষমতার লোভে তুমি একটা মেয়ের জীবন ধ্বংস করতে চেয়েছিলে। আজ তোমার সব পাপের হিসাব হবে।"আসিফ হাসল। "আইন আমার পকেটে, পুলিশ আমার সাথে। তুই একজন সাধারণ ডাকাত। তোর শেষ সময় চলে এসেছে।" আসিফ বন্দুক তাক করল বখতিয়ারের দিকে।কিন্তু ঠিক তখনই পাশ থেকে এক ঝাঁক গ্রামবাসী লাঠিসোঁটা আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসিফের বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। এরা সেই সব সাধারণ মানুষ, যাদের জমি আসিফ জবরদখল করেছিল। বখতিয়ার আগে থেকেই তাদের সংগঠিত করে রেখেছিল। একই সাথে জেলা পুলিশের সৎ বড় কর্মকর্তা, যাকে আসিফ এতকাল ঘুষ দিয়ে হাত করতে পারেনি, তিনি এক বিরাট পুলিশ ফোর্স নিয়ে হাজির হলেন। বখতিয়ার আগেই আসিফের সমস্ত দুর্নীতির এবং জোরজুলুমের প্রমাণ পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল।আসিফের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। তার ভাড়াটে গুন্ডারা গ্রামবাসীদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে গেল। আসিফ একা হয়ে পড়ল। বখতিয়ার এগিয়ে গিয়ে আসিফের হাত থেকে বন্দুকটি কেড়ে নিল এবং এক জোরালো ঘুষিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিল।"এটি সেই সব গরিব মানুষের পক্ষ থেকে, যাদের তুমি কাঁদিয়েছ," বখতিয়ার বলল।পুলিশ আসিফকে হাতকড়া পরাল। আসিফ চিৎকার করতে করতে বলতে লাগল, "আমি তোমাদের দেখে নেব!" কিন্তু খলনায়কের পতন তখন সুনিশ্চিত।আমজাদ চৌধুরী এবং রাবেয়া বেগমকে বখতিয়ার সসম্মানে মুক্ত করল। রূপা ঘর থেকে বের হয়ে এসে তার বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। আমজাদ চৌধুরী বখতিয়ারের হাত ধরে বললেন, "বাবা, তুমি ডাকাত নও, তুমি আমাদের রক্ষাকর্তা। আজ যদি তুমি আমার মেয়েকে ডাকাতি না করতে, তবে ও এক জীবন্ত লাশের মতো বেঁচে থাকত।"বখতিয়ার বিনম্রভাবে মাথা নত করল। সে রূপার দিকে তাকাল। রূপার চোখে এখন আর বিষাদ নেই, সেখানে এখন বখতিয়ারের জন্য এক গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার আলো।রূপার মা রাবেয়া বেগম বখতিয়ারের হাত ধরে বললেন, "বিয়ের প্যান্ডেল তো এখনো সাজানো আছে বাবা। বরযাত্রী হিসেবে না হয় আমার গ্রামের মানুষরাই যাবে। তুমি কি আমার রূপার দায়িত্ব নেবে?"বখতিয়ার রূপার দিকে তাকাল, রূপা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। বখতিয়ার হাসিমুখে বলল, "যে বউ আমি নিজে ডাকাতি করে এনেছি, তাকে আজীবন আগলে রাখার দায়িত্বও আমার।"অবশেষে, ডাকাত সর্দার বখতিয়ার খাঁ রূপাকে বিয়ে করে চৌধুরী বাড়ির আসল জামাই হয়ে ঘরে তুলল। আর খলনায়ক আসিফ নিজের পাপের শাস্তিস্বরূপ অন্ধকার জেলের কুঠুরিতে দিন গুনতে লাগল। 

Comments

    Please login to post comment. Login