Posts

উপন্যাস

বাবার কারনেই ভালোবাসার মানুষটি আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্চা লরছে।

June 15, 2026

Shafin pro

11
View

প্রথম পরিচ্ছেদ: মেঘে ঢাকা তারার আলো (কলেজ জীবন)ঢাকা কলেজের সবুজ চত্বর তখন কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে রঙিন। বসন্তের মাতাল হাওয়া তখন তরুণ হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। আমার নাম অরণ্য। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যার একমাত্র সম্বল ছিল পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা এবং এক বুক স্বপ্ন। আর রত্না ছিল ঠিক তার বিপরীত। ওর পুরো নাম রত্নাবলী চৌধুরী। ঢাকার নামকরা শিল্পপতি, অহংকারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আসাফউদ্দৌলা চৌধুরীর একমাত্র কন্যা। রত্না যেমন রূপবতী, তেমনই মেধাবী ছিল। তবে ওর বাবার মতো ওর মনে কোনো অহংকার ছিল না। ও ছিল এক শান্ত, দীপ্তিময় নদীর মতো।আমাদের পরিচয়টা হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরিতে। অ্যানাটমি আর ফিজিওলজির মোটা মোটা বইয়ের আড়ালে আমাদের চোখাচোখি হতো। একদিন একটি জটিল নোট তৈরি করতে গিয়ে রত্না বেশ হিমশিম খাচ্ছিল। আমি নিজে থেকেই এগিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করেছিলাম। সেই থেকে শুরু। ধীরে ধীরে আমাদের সাধারণ পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে রূপ নিল। আমরা একসঙ্গে ক্লাসের ফাঁকে কলেজের পেছনের কদম তলায় বসে গল্প করতাম। রত্না ভালোবাসত কবিতা শুনতে, আর আমি ভালোবাসতাম ওর সেই মুগ্ধ হয়ে শোনার চপলতা দেখতে।আমাদের দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো। ক্যান্টিনের সস্তা চা আর সিঙ্গারা ভাগ করে খাওয়ার মাঝে যে আনন্দ ছিল, তা হয়তো কোনো দামি রেস্তোরাঁতেও পাওয়া সম্ভব নয়। রত্না আমাকে প্রায়ই বলত, "অরণ্য, তুমি যখন বড় ডাক্তার হবে, তখন গরিব মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করবে। আমি তোমার সেই হাসপাতালের পুরো দায়িত্ব নেব।" ওর চোখে তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অদ্ভুত আলো জ্বলজ্বল করত।কিন্তু সুখের দিনগুলো কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমাদের এই সম্পর্কের কথা একসময় পৌঁছে যায় আসাফউদ্দৌলা চৌধুরীর কানে। তিনি একদিন নিজেই গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে তার গুলশানের আলিশান প্রাসাদে ডেকে পাঠান। বিশাল ড্রয়িংরুমে আমি যখন ভয়ে আর সংকোচে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন তিনি সোফায় বসে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। তার চোখ দুটো ছিল শিকারি বাজের মতো।তিনি আমাকে আপাদমস্তক দেখে এক চরম উপহাসের হাসি হাসলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "তুচ্ছ এক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হয়ে তুমি আমার মেয়ের দিকে চোখ বাড়ানোর সাহস কীভাবে পেলে, অরণ্য? তোমার পুরো পরিবারের যা সম্পত্তি, তা দিয়ে আমার গাড়ির একটা চাকাও কেনা সম্ভব নয়। রত্না চৌধুরীর যোগ্য কোনো রাজপুত্র হবে, তোমার মতো কোনো পথের ভিখারি নয়। যদি নিজের ভালো চাও, তবে আজ থেকেই রত্নার জীবন থেকে চিরতরে সরে দাঁড়াও। অন্যথায় তোমার কেরিয়ার, তোমার জীবন—সব আমি এক নিমেষে ধ্বংস করে দেব।"সেই অপমান আমার বুকে তীরের মতো বিঁধেছিল। আমি রত্নাকে ভালোবাসতাম, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। রত্না অবশ্য তার বাবার এই আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। ও আমার হাত ধরে কেঁদে বলেছিল, "অরণ্য, তুমি চলে যেও না। আমরা একসাথে সব লড়াই করব।" কিন্তু আমি জানতাম, আসাফউদ্দৌলা চৌধুরীর মতো মানুষের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব। তাছাড়া, আমার পরিবারের সুরক্ষাও আমার কাছে বড় ছিল। আমি নিজেকে রত্নার থেকে দূরে সরিয়ে নিলাম। কলেজ জীবন শেষ হতে না হতেই আমি দিনরাত এক করে পড়াশোনা শুরু করলাম। আমার লক্ষ্য ছিল একটাই—নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করা। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি জার্মানির একটি বিখ্যাত মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার জন্য সম্পূর্ণ স্কলারশিপ পেয়ে যাই। দেশ ছাড়ার দিন রত্না বিমানবন্দরে এসেছিল, কিন্তু আমি তার মুখোমুখি হইনি। এক বুক ভাঙা কষ্ট আর অভিমান নিয়ে আমি জার্মানির বিমানে চড়ে বসেছিলাম।দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জার্মানির দিনগুলি এবং নিয়তির ডাকজার্মানির মিউনিখ শহরের জীবনটা প্রথম প্রথম খুব কঠিন ছিল। কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়া, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি এবং নতুন ভাষা শেখার চাপ—সব মিলিয়ে এক চরম ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটছিল। কিন্তু আমার মনের এক কোণে সবসময় একজনই বাস করত, সে হলো রত্না। প্রতিটি সফল অস্ত্রোপচার, প্রতিটি গবেষণাপত্রের সাফল্যের পেছনে এক অবাধ্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করত ওর সেই পুরনো স্মৃতি।দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে গেল। আমি এখন কার্ডিওলজি এবং নিউরোসার্জারির ওপর বিশেষ ডক্টরেট ডিগ্রিধারী একজন পুরোদস্তুর সার্জন। জার্মানির একটি বড় হাসপাতালেই কনসালট্যান্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। তবে দেশের মাটির টান আর মায়ের অসুস্থতার খবর আমাকে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। আমি কয়েক মাসের ছুটি নিয়ে এবং দেশে পাকাপাকিভাবে একটি চ্যারিটি হাসপাতাল খোলার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন আমার ফ্লাইটটি অবতরণ করল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় একটা। ঢাকা শহরের চেনা বাতাস গায়ে লাগতেই এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম। লাগেজ নিয়ে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন আমি ভিআইপি এক্সিট গেট দিয়ে বের হচ্ছি, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় ঘটনার মুখোমুখি হলাম।বাহিরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ কুড়ি-বাইশ বছরের এক সুদর্শন কিন্তু অত্যন্ত বিধ্বস্ত চেহারার ছেলে ভিড় ঠেলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে এক চরম অসহায়ত্ব আর আকুলতা। সে আমার দিকে তাকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "আপনিই কি জার্মানি থেকে আসা ডক্টর অরণ্য আহমেদ?"আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, "হ্যাঁ, আমিই। কিন্তু আপনি কে? আর আমাকে কীভাবে চিনলেন?"ছেলেটি আমার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরা এগিয়ে আসতে চাইলে আমি তাদের হাত ইশারায় থামালাম। ছেলেটিকে টেনে তুলে বললাম, "শান্ত হোন। কী হয়েছে খুলে বলুন।"ছেলেটি চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, "ডক্টর, আমার নাম আরিয়ান। আমি গত তিন দিন ধরে জার্মানির হাসপাতালে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। ওখান থেকে জানতে পারলাম আপনি আজই দেশে ফিরছেন। তাই আমি এখানে চাতক পাখির মতো বসে আছি। আমার বোন... আমার একমাত্র বোন ঢাকার একটি অ্যাপোলো হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তার হার্ট এবং ব্রেইনে এক অত্যন্ত জটিল টিউমার ধরা পড়েছে। দেশের কোনো ডাক্তার এই অপারেশনের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছেন। জার্মানির চিকিৎসকরা বলেছেন, এই পৃথিবীতে যদি কেউ এই অপারেশন সফলভাবে করতে পারে, তবে সে একমাত্র আপনি। দয়া করে আমার বোনের চিকিৎসার ভার নিন, ডক্টর! তাকে বাঁচান!"আমি ক্লান্ত ছিলাম, তাছাড়া দেশে ফেরার পর আমার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল আমার নিজের পরিবার। আমি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীরভাবে বললাম, "দেখুন আরিয়ান, আমি মাত্রই বারো ঘণ্টার একটা দীর্ঘ ফ্লাইট শেষ করে দেশে ফিরলাম। আমি অত্যন্ত ক্লান্ত। তাছাড়া আমি এখানে কোনো অফিসিয়াল অ্যাসাইনমেন্টে আসিনি। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ছুটিতে এসেছি। এই অবস্থায় কোনো জটিল সার্জারির দায়িত্ব নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি অন্য কোনো বড় সার্জনের সাথে যোগাযোগ করুন।"আমার কথা শুনে আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে মরিয়া হয়ে আমার হাত চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর তখন এক অদ্ভুত জেদ আর হাহাকারে রূপ নিল। সে বলল, "ডক্টর অরণ্য, আপনি টাকার কথা ভাবছেন? আপনি যত কোটি টাকা চান, আমি দেব। এক কোটি, পাঁচ কোটি, দশ কোটি—আপনার ফি কত? আমার বাবা বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী। আমাদের টাকার কোনো অভাব নেই। আপনি শুধু মুখ ফুটে বলুন, কত টাকা দিলে আপনি এখনই আমার সাথে হাসপাতালে যাবেন? আমার বোনের জীবনের মূল্যের কাছে এই টাকা কিছুই না!"টাকার এই অহংকারী প্রদর্শন আমার পুরনো ক্ষতকে জাগিয়ে তুলল। আসাফউদ্দৌলা চৌধুরীর সেই দাম্ভিক চেহারাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমার মনে হলো, এই ধনীক শ্রেণীর মানুষগুলো সবকিছুই টাকা দিয়ে কিনতে চায়—এমনকি একজন চিকিৎসকের মানবিকতাকেও।আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আরিয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম, "টাকা? আপনারা ধনীরা মনে করেন টাকা দিয়ে দুনিয়ার সবকিছু কেনা যায়, তাই না? দুঃখিত আরিয়ান, আপনার এই কোটি কোটি টাকা আমার জুতার নোখের সমানও নয়। আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব না। আপনি এখন আসতে পারেন।"আমি যখন মুখ ফিরিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগোতে যাব, তখন আরিয়ান পেছনে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। সে পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, "টাকা দিয়ে যদি সব হতো ডক্টর, তবে আমার আপু আজ মরতে বসত না। যে বাবার অহংকারের কারণে আজ আমার আপুর এই অবস্থা, সেই বাবাই আজ হাসপাতালের বারান্দায় দেয়ালে মাথা কুটে কাঁদছেন। ওগো আল্লাহ, তুমি আমার রত্না আপুকে বাঁচাও! আমার রত্না আপুকে আমাদের বুক থেকে কেড়ে নিও না..."'রত্না' নামটি শোনার সাথে সাথে আমার পুরো শরীর যেন বরফের মতো জমে গেল। আমার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। রত্না? রত্নাবলী চৌধুরী? আসাফউদ্দৌলা চৌধুরীর মেয়ে?আমি উল্টো ঘুরে আরিয়ানের সামনে গিয়ে বসলাম। তার কাঁধ দুহাতে শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম, "কী বললে তোমার বোনের নাম? রত্না? ওর বাবার নাম কি আসাফউদ্দৌলা চৌধুরী?"আরিয়ান চোখের জল মুছতে মুছতে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। সে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, আপনি কীভাবে চিনলেন?"আমার চারপাশের সবকিছু যেন ঘুরতে লাগল। বিমানবন্দরের আলো আঁধারি যেন এক নিমিষে মিলিয়ে গেল। যে মানুষকে আমি সাতটি বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি, যে মানুষটি আমার প্রথম প্রেম, আমার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা—সে আজ মৃত্যুর মুখোমুখি! আমি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে আরিয়ানকে বললাম, "গাড়ি কোথায় তোমার? জলদি চলো! আমাদের এখনই হাসপাতালে যেতে হবে!"তৃতীয় পরিচ্ছেদ: হাসপাতালের করিডোরে অহংকারের অবসানআরিয়ানের ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িটি ঢাকার বৃষ্টিভেজা রাস্তা ভেদ করে তিরের বেগে ছুটে চলল অ্যাপোলো হাসপাতালের দিকে। পেছনের সিটে বসে আমি জানালার বাইরে তাকিয়েছিলাম, কিন্তু আমার মন চলে গিয়েছিল সেই সাত বছর আগের দিনগুলোতে। রত্নার সেই হাসিমুখ, তার অভিমানী চোখ—সবকিছু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। আরিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ও জানাল, গত ছয় মাস ধরে রত্না তীব্র মাথাব্যথা এবং বুকে ব্যথায় ভুগছিল। প্রথমে সাধারণ বিষয় মনে করলেও তিন মাস আগে ধরা পড়ে তার মস্তিষ্কের গভীরে একটি অত্যন্ত জটিল অ্যানিউরিজম এবং সেই সাথে কার্ডিয়াক আর্টারিতে ব্লকেজ রয়েছে।হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আড়াইটা বেজে গেল। আমরা যখন হাসপাতালের আইসিইউ (ICU) ব্লকের সামনে পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা ছিল একদম নিস্তব্ধ। করিডোরের এক কোণে একজন বৃদ্ধ মানুষ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তার পরনে দামি স্যুট থাকলেও, তা এখন কুঁচকে গেছে। মাথার চুলগুলো উসকোখুসকো। এই কি সেই আসাফউদ্দৌলা চৌধুরী? যার এক ইশারায় ঢাকার ব্যবসা জগত কাঁপত? যার অহংকারের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল আমার এবং রত্নার স্বপ্ন? আজ তাকে এক জরাজীর্ণ, অসহায় পিতার মতো দেখাচ্ছিল।আরিয়ান আমাকে নিয়ে তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, "বাবা, দেখ কাকে নিয়ে এসেছি। জার্মানি থেকে ডক্টর অরণ্য আহমেদ এসেছেন।"আসাফউদ্দৌলা চৌধুরী ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকাতেই তার চোখের দৃষ্টিতে এক মস্ত বড় ধাক্কা লাগার আভাস পেলাম। তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। তার সেই চিরচেনা অহংকারী মুখাবয়ব মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় আর অপরাধবোধে ম্লান হয়ে গেল। তিনি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমার সামনে হাত জোড় করলেন। যে হাত একদিন আমাকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, সেই হাত আজ আমার সামনে ভিক্ষুকের মতো প্রসারিত।তিনি কেঁদে ফেললেন। তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো স্পষ্ট শব্দ বের হচ্ছিল না। তিনি বললেন, "অরণ্য... বাবা অরণ্য! আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি অন্ধ ছিলাম, আমি অহংকারী ছিলাম। টাকার গরমে আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছিলাম। আমি তোমার আর রত্নার পবিত্র ভালোবাসাকে অপমান করেছি। আজ আমার সেই পাপের শাস্তি আমার মেয়ে পাচ্ছে। রত্না মরে যাচ্ছে, অরণ্য! চিকিৎসকরা বলেছেন ওর হাতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় আছে। তুমি তো অনেক বড় ডাক্তার হয়েছ, বাবা। দয়া করে আমার রত্নাকে ফিরিয়ে দাও। তুমি যদি চাও, আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার নামে লিখে দেব। আমি রাস্তায় ফকির হয়ে বেঁচে থাকব, তাও আমার মেয়েকে বাঁচাও!"আমি তার দিকে তাকালাম। আমার মনে কোনো প্রতিশোধের আগুন ছিল না, ছিল শুধু এক চরম হাহাকার। আমি গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "চৌধুরী সাহেব, শান্ত হোন। আমি এখানে কোনো প্রতিশোধ নিতে আসিনি, আর আপনার সম্পত্তি কেনার জন্যও আসিনি। আমি একজন চিকিৎসক, আর রত্না... রত্না আমার কে, তা হয়তো আপনার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আপনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।"আমি আর সময় নষ্ট না করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাথে দেখা করলাম। রত্নার কেস ফাইল, এমআরআই (MRI) এবং অ্যানজিওগ্রামের রিপোর্টগুলো খুব দ্রুত পর্যালোচনা করলাম। পরিস্থিতি সত্যিই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। মস্তিষ্কের প্রধান ধমনীতে যে টিউমারটি রয়েছে, তা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে গিয়ে ইন্টারনাল হেমোরেজ হতে পারে। একই সাথে তার হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি এক অত্যন্ত জটিল 'কম্বাইন্ড কার্ডিও-নিউরো সার্জারি'। মৃত্যুর ঝুঁকি ৯০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু অপারেশন না করলে মৃত্যু অবধারিত।আমি ওখানকার মেডিকেল বোর্ডকে বললাম, "আইসিইউ থিয়েটার প্রস্তুত করুন। আমরা এখনই অপারেশনে যাচ্ছি।"চতুর্থ পরিচ্ছেদ: জীবনের দীর্ঘতম যুদ্ধ (অপারেশন থিয়েটার)রাত ঠিক ৩টা ১৫ মিনিটে রত্নাকে অপারেশন থিয়েটারে (OT) নেওয়া হলো। আমি যখন ওটি ড্রেস পরে, স্ক্রাব করে রত্নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন আমার হাত দুটি সামান্য কেঁপে উঠল। সাত বছর পর আমি ওকে দেখছি। কিন্তু এই দেখা যে এতটা নিষ্ঠুর হবে, তা আমি কখনো ভাবিনি।

Comments

    Please login to post comment. Login