Posts

ফিকশন

বিশ্বকাপের ফাঁদ

June 15, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

6
View

বিশ্বকাপের ফাঁদ
প্রতি চার বছর পর পর, যখন বিশ্বকাপের সময় আসে, তখন পৃথিবীর নিচের তলার লোকেদের জীবনে এক অদ্ভুত জাদু নেমে আসে। কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ গলিতে, ঢাকার বস্তিতে, লাহোরের চায়ের দোকানে, রিও ডি জেনেইরোর ফাভেলায়—সর্বত্র একই ছবি। টেলিভিশনের সামনে ভিড়, মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকা, আর রাস্তায় রাস্তায় সবুজ-হলুদ-নীল জার্সির ঢেউ। কেউ জানে না, এই জাদুর পেছনে কী বিশাল একটা ফাঁদ লুকিয়ে আছে। ফাঁদটা এমন, যা নিচের মানুষগুলোকে বোকা বানিয়ে রাখে, তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়, সময় নষ্ট করায়, আর উপরের মহলের লোকেরা নীরবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পাহাড় গড়ে তোলে।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাসখানেক আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো, বিজ্ঞাপন কোম্পানিগুলো—সবাই মিলে একটা বিশাল প্রচারযজ্ঞ চালায়। “এবারের বিশ্বকাপ হবে সবচেয়ে বড়!” “এই তারকা খেলবে না তো দেশ হারবে!” “ঐ দলের সাথে আমাদের শত্রুতা চিরকালের!” এইসব শব্দবন্ধে নিচের তলার মানুষের মাথা ভরে যায়। যে লোকটা সারাদিন রিকশা চালিয়ে বা কারখানায় কাজ করে কোনোমতে সংসার চালায়, সে রাতে ঘুমের বদলে ম্যাচের আলোচনায় বসে। তার সন্তানের পড়াশোনার সময় নষ্ট হয় টিভির সামনে। তার স্ত্রী একা রান্নাঘরে বসে থাকে, কারণ স্বামী “দেশের সম্মান” রক্ষায় ব্যস্ত।
এই ফাঁদের প্রথম অংশ হলো সময়ের চুরি। একটা বিশ্বকাপ মানে প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে মানুষের জীবন থেকে সময় কেড়ে নেওয়া। ধরো, একজন সাধারণ শ্রমিক। সে দিনে দশ-বারো ঘণ্টা কাজ করে। তারপরও রাতে ম্যাচ দেখতে বসে। পরের দিন কাজে গিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে, উৎপাদন কমে, বসের বকুনি খায়। কিন্তু সে কিছু বলতে পারে না। কারণ তার মনে হয়েছে, “দেশ খেলছে তো!” এভাবে কোটি কোটি মানুষের সময় নষ্ট হয়। যে সময়টা তারা নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে, নতুন কাজ শিখতে, পরিবারের সাথে কাটাতে বা সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারতো, সেটা চলে যায় একটা চামড়ার বলের পিছনে ছোটাছুটি দেখতে দেখতে।
দ্বিতীয় অংশটা আরও বিপজ্জনক—ঝগড়া আর বিভেদের বীজ বপন। বিশ্বকাপ আসার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে কৃত্রিম শত্রুতা তৈরি হয়। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, ফ্রান্স-জার্মানি, ভারত-পাকিস্তানের ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে (যদিও ভারত খেলে না, তবু কেউ না কেউ “আমাদের ছেলেরা” বলে সমর্থন করে) ঝগড়া লেগে যায়। চায়ের দোকানে, অফিসে, রাস্তায় তর্ক বাঁধে। কখনো কখনো হাতাহাতি, পাথর ছোড়াছুড়ি পর্যন্ত হয়। একদল বলে “মেসি সেরা”, অন্যদল বলে “রোনালদো গড”। যে মানুষগুলো একই বস্তিতে থাকে, একই কারখানায় কাজ করে, একই দারিদ্র্যের যন্ত্রণা ভোগ করে—তারা পরস্পরের শত্রু হয়ে যায় শুধু একটা খেলার জন্য।
উপরের মহলের লোকেরা এই বিভেদকে খুব সুন্দর করে ব্যবহার করে। যখন নিচের লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে, তখন তারা রাজনৈতিক দল, কর্পোরেট কোম্পানি আর মিডিয়া মালিকরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করে। কোনো দেশের সরকার যদি দুর্নীতি করে, দাম বাড়ায়, চাকরি কমায়—তখন বিশ্বকাপের সময় সবকিছু চাপা পড়ে যায়। মানুষ রাস্তায় নামে না, প্রতিবাদ করে না। তারা বলে, “আগে দেশ জিতুক, তারপর দেখা যাবে।” এভাবে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে একটা বড় ফাঁদ, যা জনগণের ক্ষোভকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়।
এই ফাঁদের অর্থনৈতিক দিকটা আরও ভয়ংকর। ফিফা আর স্পনসর কোম্পানিগুলো (কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস, ম্যাকডোনাল্ডস, বেটিং অ্যাপস) প্রতি বিশ্বকাপে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামায়। টেলিভিশন রাইটস থেকে শুরু করে মার্চেন্ডাইজ, টিকিট, অ্যাডভারটাইজমেন্ট—সবকিছুতে টাকার বন্যা বয়ে যায়। একটা সাধারণ ফ্যান জার্সি কিনতে গিয়ে তার মাসের খরচের অংশ ব্যয় করে। বেটিং অ্যাপগুলোতে গরিব ছেলেরা শেষ টাকা ঢেলে দেয়, “এবার জিতবোই” বলে। যখন হারে, তখন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু উপরের লোকেরা? তারা সুইটে বসে শ্যাম্পেন খায়, লাভের হিসাব করে। খেলোয়াড়রা কোটি কোটি ডলারের চুক্তি করে, ক্লাব মালিকরা আরও ধনী হয়। আর নিচের মানুষ? তারা শুধু চিৎকার করে, আনন্দ করে, হতাশ হয়—কিন্তু কিছুই পায় না।
বিশ্বকাপের সময় আরেকটা খারাপ দিক স্পষ্ট হয়—ভোক্তাবাদের উন্মাদনা। প্রতিটি ম্যাচের আগে বিজ্ঞাপন চলে। “এই সোডা খেলে তোমার টিম জিতবে!” “এই জুতো পরলে তুমি তারকা হয়ে যাবে!” নিচের তলার যুবকরা এসব কিনতে গিয়ে ঋণ করে। পরিবারের খাবারের টাকা চলে যায় অপ্রয়োজনীয় জিনিসে। আর যখন বিশ্বকাপ শেষ হয়, তখন সেই জার্সিগুলো পুরনো হয়ে যায়, কিন্তু ঋণ থেকে যায়। এভাবে কর্পোরেটরা শুধু খেলা বিক্রি করে না, একটা পুরো লাইফস্টাইল বিক্রি করে, যা নিচের মানুষকে আরও গরিব করে।
একটা বিশ্বকাপের পুরো সময়জুড়ে এই চক্র চলে। গ্রুপ স্টেজে উত্তেজনা, নকআউটে টেনশন, ফাইনালে উন্মাদনা। যখন একটা দল জেতে, তখন রাস্তায় আনন্দের মিছিল হয়। কিন্তু সেই আনন্দ কয়দিনের? দু-তিনদিন পর আবার একই পুরনো জীবন। বেকারত্ব, দাম বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার অভাব—সবকিছু ফিরে আসে। কিন্তু উপরের লোকেরা ততদিনে নতুন প্রজেক্ট শুরু করে ফেলেছে। পরের বিশ্বকাপের স্পনসরশিপ, নতুন স্টেডিয়াম, নতুন টিভি চুক্তি। তাদের জন্য এটা একটা অবিরাম লাভের চাকা।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, বিশ্বকাপ কীভাবে জাতীয়তাবাদের নামে মানুষকে বিভক্ত করে। “আমাদের দেশ সেরা!” বলে চিৎকার করে যারা, তারা ভুলে যায় যে খেলোয়াড়রা নিজেরাই বিভিন্ন দেশে খেলে ক্লাব ফুটবলে। টাকার জন্য দেশ বদলায়, এজেন্টদের সাথে ডিল করে। কিন্তু নিচের মানুষ এই সত্য দেখতে চায় না। তারা চায় শুধু আবেগ, শুধু উত্তেজনা। এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদরা ভোট চায়, কর্পোরেটরা পণ্য বিক্রি করে। ফলে নিচের মানুষের আসল সমস্যা—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—কখনো সমাধান হয় না।
বিশ্বকাপের ফাঁদ এতটাই সূক্ষ্ম যে, অনেকে এটাকে “বিনোদন” বলে মেনে নেয়। কিন্তু বিনোদন যখন মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলে, তখন সেটা আর বিনোদন থাকে না। এটা হয়ে যায় আফিম। নিচের তলার লোকেরা এই আফিম খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে, আর উপরের লোকেরা তাদের পকেট কেটে নেয়। একটা ম্যাচে কয়েক কোটি দর্শক যখন চোখ রাখে, তখন বিজ্ঞাপন থেকে যে টাকা আসে, তার একটা অংশও নিচের মানুষের উন্নয়নে যায় না। বরং আরও বড় স্টেডিয়াম হয়, আরও বড় পার্টি হয় উপরের লোকেদের জন্য।
প্রতি বিশ্বকাপের পর একটা শূন্যতা নেমে আসে। মানুষ ফিরে যায় তার দৈনন্দিন যন্ত্রণায়। কিন্তু চার বছর পর আবার একই খেলা শুরু হয়। আবার একই ফাঁদ। আবার সময় নষ্ট, আবার ঝগড়া, আবার টাকা খরচ। এই চক্র কখনো থামে না। কারণ ফাঁদটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, মানুষ নিজেই এতে ঢুকে পড়ে। তারা মনে করে এটা তাদের আনন্দ, তাদের গর্ব। কিন্তু আসলে এটা তাদের শৃঙ্খল।
যদি কখনো এই ফাঁদ থেকে বেরোনো যায়, তাহলে হয়তো নিচের মানুষগুলো একসাথে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু বিশ্বকাপের আলো যতদিন জ্বলবে, ততদিন এই অন্ধকার চলতেই থাকবে। উপরের মহল হাসবে, আর নিচের মানুষ চিৎকার করবে—“গোল! গোল!” বলে।

Comments

    Please login to post comment. Login