অনেক দিন আগের কথা। পাহাড়, নদী আর সবুজ বনঘেরা এক সুন্দর রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের নাম ছিল সোনাপুর। সোনাপুরের রাজা ছিলেন রাজা রুদ্রপ্রতাপ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনী, কিন্তু তার একটি বড় দোষ ছিল—তিনি খুব লোভী ছিলেন।
রাজার প্রাসাদে সোনা, রূপা, হীরা, মুক্তা—কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবুও তিনি কখনো সন্তুষ্ট হতেন না। প্রতিদিন তিনি তার ধনভাণ্ডারে গিয়ে সোনার মুদ্রা গুনতেন এবং ভাবতেন, "আমার আরও ধন চাই, আরও সোনা চাই।"
রাজ্যের মানুষ প্রথমে রাজার প্রতি সম্মান দেখাত। কিন্তু ধীরে ধীরে রাজার লোভ বেড়ে গেল। তিনি প্রজাদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করলেন। কৃষকদের ফসলের বড় অংশ রাজকোষে জমা দিতে হতো। ব্যবসায়ীদেরও বেশি কর দিতে হতো।
একদিন একজন বৃদ্ধ কৃষক রাজার কাছে এসে বলল,
"মহারাজ, আমরা খুব কষ্টে আছি। এত কর দিলে আমাদের পরিবারের খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়ে।"
রাজা রাগ করে বললেন,
"আমার ধনভাণ্ডার আরও ভরতে হবে। তোমাদের কষ্টের কথা শুনে আমার লাভ কী?"
বৃদ্ধ কৃষক হতাশ হয়ে ফিরে গেল।
দিন যেতে লাগল। প্রজারা আরও গরিব হয়ে পড়ল। অনেকেই খাবারের অভাবে কষ্ট পেতে লাগল। কিন্তু রাজা শুধু নিজের ধনসম্পদ বাড়াতেই ব্যস্ত রইলেন।
এক রাতে রাজা ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে এক জাদুকর তার সামনে এসে দাঁড়াল।
জাদুকর বলল,
"মহারাজ, আমি তোমাকে একটি বর দিতে এসেছি। আগামীকাল সকাল থেকে তুমি যা স্পর্শ করবে, তা সোনায় পরিণত হবে।"
রাজার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
"সত্যি? তাহলে তো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজা হয়ে যাব!"
জাদুকর বলল,
"ভালো করে ভেবে দেখো। সব কিছুরই ফল আছে।"
কিন্তু রাজা কোনো সতর্কবাণী শুনলেন না।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি বিছানা স্পর্শ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিছানা সোনায় পরিণত হলো। তিনি খুব খুশি হলেন।
তিনি টেবিল ছুঁলেন, চেয়ার ছুঁলেন, দরজা ছুঁলেন—সব সোনায় পরিণত হয়ে গেল।
"অসাধারণ!" রাজা চিৎকার করে উঠলেন।
তিনি বাগানে গেলেন। ফুল ছুঁতেই ফুল সোনার ফুল হয়ে গেল। গাছের পাতা পর্যন্ত সোনায় পরিণত হলো।
সারা দিন তিনি আনন্দে কাটালেন।
কিন্তু দুপুরে যখন খাবার খেতে বসলেন, তখন সমস্যা শুরু হলো।
তিনি একটি আপেল হাতে নিতেই সেটি সোনার আপেলে পরিণত হলো।
রুটি ধরতেই সেটিও সোনা হয়ে গেল।
তিনি পানি পান করতে গেলেন, কিন্তু পানির পাত্র ঠোঁটে লাগানোর আগেই তা সোনায় পরিণত হয়ে গেল।
রাজা অবাক হয়ে গেলেন।
"এ কী হলো! আমি তো কিছুই খেতে পারছি না!"
ঠিক তখন তার একমাত্র মেয়ে রাজকুমারী মেঘলা বাবার কাছে ছুটে এল।
"বাবা! বাবা! দেখো আমি তোমার জন্য ফুল এনেছি।"
রাজা মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে গেলেন।
কিন্তু স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই রাজকুমারী সোনার মূর্তিতে পরিণত হয়ে গেল।
রাজা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
"মেঘলা! আমার মেয়ে! এ কী হলো!"
তিনি কাঁদতে লাগলেন। সারা প্রাসাদে শোক নেমে এল।
এখন তার চারপাশে শুধু সোনা, কিন্তু তার প্রিয় মেয়ে নেই। খাবার নেই, পানি নেই, সুখ নেই।
তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে ধনসম্পদ সব কিছু নয়।
রাজা কান্না করতে করতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"হে জাদুকর, আমি ভুল করেছি। আমার এই বর চাই না। আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও।"
সেই রাতে আবার জাদুকর তার সামনে উপস্থিত হলো।
জাদুকর বলল,
"তুমি কি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছ?"
রাজা মাথা নিচু করে বললেন,
"হ্যাঁ। আমি লোভের কারণে মানুষের কষ্ট বুঝিনি। আমি শুধু ধনসম্পদের পেছনে ছুটেছি। এখন বুঝেছি, ভালোবাসা, দয়া আর মানুষের সুখই সবচেয়ে বড় সম্পদ।"
জাদুকর মৃদু হাসল।
"যদি সত্যিই অনুতপ্ত হও, তাহলে তোমাকে আরেকটি সুযোগ দিচ্ছি।"
সে একটি জাদুকরী কলস দিল।
"এই কলসের পানি যেখানে ছিটাবে, সব আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।"
রাজা তাড়াতাড়ি পানি ছিটালেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমারী আবার জীবিত হয়ে উঠল। সোনার ফুল আবার আসল ফুল হয়ে গেল। প্রাসাদের সব জিনিস আগের মতো হয়ে গেল।
রাজা আনন্দে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
এরপর থেকে তিনি সম্পূর্ণ বদলে গেলেন।
তিনি অতিরিক্ত কর বাতিল করলেন। গরিবদের সাহায্য করলেন। কৃষকদের জন্য নতুন সেচব্যবস্থা তৈরি করলেন। ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য নিয়ম চালু করলেন।
ধীরে ধীরে রাজ্যের মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।
একদিন সেই বৃদ্ধ কৃষক আবার রাজার কাছে এল।
রাজা তাকে সম্মানের সঙ্গে বসালেন এবং বললেন,
"আমি এক সময় খুব লোভী ছিলাম। কিন্তু এখন বুঝেছি, একজন রাজার প্রকৃত সম্পদ তার প্রজাদের ভালোবাসা।"
বৃদ্ধ কৃষক হাসলেন।
"মহারাজ, আপনি আজ সত্যিকারের রাজা হয়েছেন।"
এরপর রাজা রুদ্রপ্রতাপ বহু বছর ন্যায় ও দয়ার সঙ্গে রাজ্য শাসন করলেন। তার নাম ইতিহাসে একজন জ্ঞানী ও দয়ালু রাজা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রইল।
3
View