বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ছিল একটি পুরোনো বন। গ্রামের মানুষ সেই বনকে বলত "অন্ধকার বন"। দিনের বেলায়ও সেখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাত না। বিশাল বিশাল গাছ, ঝোপঝাড় আর রহস্যময় নীরবতা জায়গাটিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল।
বনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির দেয়াল ভেঙে গিয়েছিল, জানালার কাচগুলো চূর্ণ হয়ে মাটিতে পড়ে ছিল। গ্রামের মানুষ বলত, সেখানে বহু বছর আগে এক ধনী জমিদার বাস করতেন। কিন্তু এক ভয়াবহ ঘটনার পর পুরো পরিবার রহস্যজনকভাবে মারা যায়। তারপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে।
গ্রামের কেউ সেই বাড়ির কাছে যেত না। অনেকেই দাবি করত, গভীর রাতে বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়। কখনো আবার জানালায় সাদা পোশাক পরা এক নারীর ছায়া দেখা যায়।
একদিন গ্রামের চার বন্ধু—আরিফ, সোহান, রাকিব এবং মেহেদী—সিদ্ধান্ত নিল তারা এই রহস্যের সত্যতা খুঁজে বের করবে।
এক সন্ধ্যায় তারা টর্চলাইট, মোবাইল ফোন আর কিছু খাবার নিয়ে রওনা দিল অন্ধকার বনের দিকে।
বনের ভেতরে ঢুকতেই তাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা। শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল।
রাকিব বলল,
—আমার মনে হয় আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।
আরিফ হেসে বলল,
—ভূত বলে কিছু নেই। সব মানুষের বানানো গল্প।
তারা এগিয়ে চলল।
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল সেই পুরোনো বাড়ির সামনে।
বাড়িটি কাছ থেকে আরও ভয়ংকর লাগছিল।
বড় লোহার গেটটি মরিচা পড়ে প্রায় ভেঙে গেছে। বাতাসে গেটটি কেঁপে কেঁপে কর্কশ শব্দ করছিল।
চারজন সাহস করে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তাদের নাকে এল।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে "ধপ" করে একটা শব্দ হলো।
মেহেদী ভয় পেয়ে বলল,
—কে ওখানে?
কোনো উত্তর এল না।
তারা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
ওপরের একটি ঘরের দরজা অল্প খোলা ছিল।
দরজাটি ঠেলে খুলতেই তারা দেখতে পেল ঘরজুড়ে পুরোনো আসবাবপত্র।
এক কোণে ছিল একটি বিশাল আয়না।
হঠাৎ সোহান আয়নার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।
—ওই দেখ!
সবাই আয়নার দিকে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কিছুই ছিল না।
সোহান কাঁপা গলায় বলল,
—আমি শপথ করে বলছি, এক মুহূর্তের জন্য একজন সাদা কাপড় পরা মহিলাকে দেখেছিলাম।
আরিফ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তারা বুঝতে পারল, কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটছে।
হঠাৎ ঘরের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
বিকট শব্দে দরজাটি আছড়ে পড়তেই সবাই চমকে উঠল।
তারা দরজা খুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু দরজা খুলল না।
ঠিক তখনই ঘরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল।
চারজনের নিঃশ্বাস থেকে কুয়াশার মতো ধোঁয়া বের হতে লাগল।
এরপর তারা শুনতে পেল এক নারীর কান্না।
কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে আরও জোরে হতে লাগল।
মনে হচ্ছিল শব্দটি ঠিক তাদের পাশ থেকেই আসছে।
মেহেদী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—আমরা ভুল করেছি।
হঠাৎ আয়নার ভেতর একটি ছায়ামূর্তি দেখা দিল।
একজন নারী।
তার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
সে ধীরে ধীরে হাত তুলল।
আর আয়নার কাচে রক্তের মতো লাল অক্ষরে ভেসে উঠল—
"চলে যাও..."
চারজন ভয়ে জমে গেল।
পরক্ষণেই দরজাটি নিজে থেকেই খুলে গেল।
তারা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
কিন্তু করিডোরে এসে তারা আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করল।
যে সিঁড়ি দিয়ে তারা ওপরে উঠেছিল, সেটি যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে।
চারদিকে শুধু অন্ধকার।
তারা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে পথ খুঁজতে লাগল।
একসময় তারা একটি বন্ধ দরজা দেখতে পেল।
দরজার ওপর ধুলো জমে ছিল।
আর সেখানে খোদাই করা ছিল—
"নিষিদ্ধ কক্ষ"
কৌতূহলবশত তারা দরজাটি খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি পড়ে ছিল।
ডায়েরিটি জমিদারের মেয়ের।
তারা পড়তে শুরু করল।
ডায়েরিতে লেখা ছিল—
"বাবা লোভের বশে এক দরিদ্র পরিবারকে অত্যাচার করেছিলেন। সেই পরিবারের অভিশাপ আমাদের ওপর নেমে এসেছে। প্রতি রাতে আমি সেই সাদা পোশাকের নারীকে দেখি। তিনি আমাকে ডেকে বলেন, আমাদের পাপের শাস্তি হবে।"
আরও লেখা ছিল—
"আজ রাতে তিনি আবার এসেছেন। আমি ভয় পাচ্ছি। মনে হচ্ছে কাল সূর্য ওঠার আগেই ভয়ংকর কিছু ঘটবে।"
এরপর আর কোনো লেখা ছিল না।
হঠাৎ ঘরের ভেতর ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল।
টর্চের আলো টিমটিম করতে লাগল।
তারপর তারা দেখতে পেল ঘরের মাঝখানে ধীরে ধীরে একটি নারীর ছায়া তৈরি হচ্ছে।
নারীটি সাদা পোশাক পরা।
তার লম্বা চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।
সে কোনো কথা বলছিল না।
শুধু ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।
চার বন্ধু ভয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল।
তখনই আরিফ সাহস করে বলল,
—তুমি কে?
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নারীর কণ্ঠ শোনা গেল।
—আমি প্রতিশোধ নিতে আসিনি...
তার কণ্ঠে ছিল গভীর দুঃখ।
—আমি মুক্তি চাই।
চারজন অবাক হয়ে গেল।
নারীটি বলল,
—বহু বছর আগে অন্যায়ের শিকার হয়েছিলাম। আমার আত্মা এখনো এই বাড়িতে বন্দী।
হঠাৎ চারপাশে অসংখ্য ফিসফিস শব্দ শোনা গেল।
মনে হচ্ছিল শত শত অদৃশ্য মানুষ কথা বলছে।
নারীটি বলল,
—বাড়ির পেছনের কুয়োর নিচে আমার কবর আছে। আমাকে সঠিকভাবে সমাহিত করা হয়নি। আমার হাড়গুলো মাটির নিচে পড়ে আছে। সেগুলো উদ্ধার করে দাফন করো।
এরপর ছায়ামূর্তিটি মিলিয়ে গেল।
বন্ধুরা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
ভয় পেলেও তারা সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন সকালে গ্রামের কয়েকজন মানুষকে নিয়ে তারা বাড়ির পেছনের পুরোনো কুয়োর কাছে গেল।
অনেক খোঁড়াখুঁড়ির পর সত্যিই মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেল।
গ্রামের বৃদ্ধরা অবাক হয়ে গেলেন।
কঙ্কালটি যথাযথভাবে দাফন করা হলো।
সেই রাতের পর থেকে আর কখনো বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ শোনা যায়নি।
কেউ আর জানালায় সাদা পোশাকের নারীকেও দেখেনি।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
দাফনের এক সপ্তাহ পরে চার বন্ধু আবার সেই বাড়িতে গেল।
তারা দেখতে পেল বাড়িটি আগের চেয়ে অনেক শান্ত।
ভয়ের অনুভূতি নেই।
কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় তারা একটি ঘরে পুরোনো আয়নাটি দেখতে পেল।
আয়নাটির ওপর ধুলো জমে ছিল।
হঠাৎ সেখানে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটি মুখ ভেসে উঠল।
সেই সাদা পোশাকের নারী।
তবে এবার তার মুখে ছিল শান্তির হাসি।
তারপর মুখটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
চার বন্ধু বুঝতে পারল, অবশেষে আত্মাটি মুক্তি পেয়েছে।
সেদিনের পর থেকে অন্ধকার বন আর অভিশপ্ত বলে পরিচিত ছিল না।
তবুও গ্রামের বৃদ্ধরা আজও বলেন—
গভীর রাতে যদি কেউ সেই বনের ভেতর যায়, মাঝে মাঝে দূর থেকে একটি নারীর মৃদু হাসির শব্দ শোনা যায়।
সে আর ভয় দেখাতে আসে না।
সে শুধু মনে করিয়ে দেয়—
অন্যায় একদিন না একদিন বিচার পায়, আর অশান্ত আত্মাও একসময় শান্তির পথ খুঁজে নেয়।
20
View