Posts

গল্প

নীলাচল ধারাবাহিক গল্প

June 16, 2026

Shafin pro

11
View

নীলাচল’—নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অফুরন্ত নীল দিগন্ত। আমাদের রায় পরিবারের জন্য এই নীল রঙ শুধু কোনো রঙ নয়, এটি আমাদের বংশের আভিজাত্য, ঐতিহ্য আর সৌভাগ্যের প্রতীক। আমার দাদী, মা, আর আমার নিজের বউ—সবাই বিয়ের পর এই বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছিল নীল শাড়ি পরে। আজ আমার বাসর রাতের পরের সকাল। ঘুম থেকে উঠতেই দাদা আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, "শংকর, তুই তো জানিস না, এই নীল শাড়ির রহস্য কী! আজ তোকে আমাদের শিকড়ের গল্প বলি।"দাদার মুখে ইতিহাস শুনছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আমার দাদা, শিশির চন্দ্র রায়, যিনি ব্রিটিশ আমলের এক দাপুটে জমিদার ছিলেন। তার সময়ে এই বাড়ির নামডাক ছিল চারদিকে। এরপর সময়ের পরিবর্তনে আমার বাবা, পূর্ব গৌতম কুমার রায়, পাকিস্তান আমলে দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়বিচারের চেয়ারে বসেন, ছিলেন নামকরা বিচারপতি। আর আজ আমি, শংকর কুমার রায়, স্বাধীন বাংলাদেশে একজন সফল শিল্পপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যুগ বদলেছে, শাসনভার বদলেছে, কিন্তু রায় পরিবারের ঐতিহ্য আর একতা এক চুলও নড়েনি।দাদা বলছিলেন, "আমাদের এই তিন প্রজন্মের রাজকীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে ঘরের লক্ষ্মীদের আশীর্বাদ, যারা সবাই নীল শাড়ি পরে এই বাড়িতে আলো এনেছিল। আজ তোর ছোট ভাইয়ের পালা।"হ্যাঁ, আজ আমাদের বাড়িতে আনন্দের ধুম। আমার একমাত্র ছোট ভাইয়ের বিয়ের কথা পাকা করতে আজ আমরা কনের বাড়িতে যাচ্ছি। শুধু পাকা কথা নয়, আজ সরাসরি আংটি বদল হবে! রায় পরিবারের নিয়ম হলো, কোনো শুভ কাজ লুকিয়ে বা ছোট করে হয় না। আমাদের বিশাল পরিবার—আমার চাচা, ভাইজান, ফুফু, ফুপাতো ভাই-বোন—সবাই খবর পেয়ে রাতেই এসে হাজির হয়েছে। রায় বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠানে আমরা সবাই এক হয়ে যাই, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।সকাল থেকেই বসার ঘরে চাঁদের হাট। চাচারা মিলে চায়ের কাপে আড্ডা জমাচ্ছেন, ফুফুরা ব্যস্ত কনের জন্য কেনা গহনা আর মিষ্টির ডালা সাজাতে। আমার মা আর দাদী ঘরের এক কোণে বসে ফিসফিস করে হাসছেন। দাদী মায়ের কানে কানে বলছেন, "বৌমা, কনের জন্য তো ঢাকাই জামদানী কেনা হলো, কিন্তু আমাদের রায় বাড়ির নিয়মটা মনে আছে তো? কনে যেন নীল রঙের কিছু একটা পরে!" মা হেসে বললেন, "মা, সব ব্যবস্থা করা আছে। আংটি বদলের পর কনেকে যে উপহার দেওয়া হবে, তাতে প্রথম শাড়িটাই নীল রঙের!"দুপুর গড়াতেই আমাদের গাড়ির বহর রওনা হলো কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। জমিদারী হয়তো আজ নেই, কিন্তু আমাদের রাজকীয় চালচলন এখনো আগের মতোই আছে। গাড়িতে যেতে যেতে বাবা (বিচারপতি সাহেব) গম্ভীর গলায় আমাকে বললেন, "শংকর, ব্যবসা তো অনেক বড় করেছিস, আজ কনের বাড়িতে গিয়ে তোর শিল্পপতির গাম্ভীর্য ধরে রাখিস। রায় পরিবারের মান-সম্মান যেন বজায় থাকে।" আমি হেসে বাবার কাঁধে হাত রাখলাম।কনের বাড়িতে পৌঁছামাত্রই আমাদের রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানো হলো। চারদিকে সুগন্ধি ফুল আর আতরের সুবাস। কিছুক্ষণ পর কনেকে যখন সবার সামনে আনা হলো, রায় পরিবারের সবার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। মেয়েটি দেখতে যেন ঠিক যেন এক টুকরো শান্ত আকাশ।দাদী কনের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তারপর বাবা আর চাচাদের সম্মতিতে আংটি বদলের পর্ব শুরু হলো। আমার ছোট ভাই যখন কনের আঙুলে হীরার আংটিটি পরিয়ে দিল, পুরো ঘর হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠল। ফুফুরা উলুধ্বনি দিতে লাগলেন।ঠিক তখনই মা কনের হাতে তুলে দিলেন আমাদের রায় পরিবারের সেই ঐতিহ্যবাহী উপহারের বাক্স। বাক্সটি খুলতেই বেরিয়ে এল এক অপূর্ব, জমকালো নীল রঙের শাড়ি।

Comments

    Please login to post comment. Login