Posts

ফিকশন

রহমত ছাড়া দুনিয়া

June 16, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

18
View

রহমত ছাড়া দুনিয়া

সকালের প্রথম আলো ফুটতেই আবদুল্লাহর চোখ খুলে গেল। কিন্তু আজকের আলোটা অন্যরকম। জানালার বাইরে আকাশ ধূসর, যেন কোনো অদৃশ্য পর্দা সূর্যের উষ্ণতা ঢেকে দিয়েছে। পাখির ডাক নেই। রাস্তায় গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো মানুষের হাসি বা কথার আওয়াজ নেই। আবদুল্লাহ উঠে বসল। তার নাম আবদুল্লাহ, কিন্তু সবাই তাকে ‘রহমান’ বলে ডাকত। কারণ তার হৃদয়ে ছিল অসীম দয়া। সে কখনো কাউকে কষ্ট দিত না, বরং অন্যের কষ্ট দেখলে নিজের ঘুম হারাত। কিন্তু আজ তার মনের ভিতরটা শূন্য লাগছে। যেন কেউ তার হৃদয় থেকে ‘রহমত’ নামের আলোটা কেড়ে নিয়েছে।
সে চা বানাতে রান্নাঘরে গেল। তার স্ত্রী ফাতেমা চুলায় ভাত ফুটাচ্ছিল। সাধারণত সে হাসিমুখে বলত, “আজ কী খাবে বলো?” কিন্তু আজ সে মুখ না তুলেই বলল, “তোমার জন্য আলাদা রান্না করিনি। গতকাল তুমি আমার কথা শোনোনি। এখন নিজে দেখো।”
আবদুল্লাহ অবাক হয়ে বলল, “ফাতেমা, কী হয়েছে তোমার? আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।”
“ভালোবাসা?” ফাতেমা তিক্ত হাসি হাসল। “এই দুনিয়ায় ভালোবাসা বলে কিছু নেই। শুধু লাভ-লোকসান। তুমি যদি আমার জন্য কিছু না করো, আমিও করব না।”
আবদুল্লাহ চুপ করে বেরিয়ে গেল। তার ছোট ছেলে ইমরান ঘরের কোণে বসে খেলনা নিয়ে খেলছিল। সে ছেলের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলাতে গেল। ইমরান ধাক্কা দিয়ে সরে গেল। “বাবা, আমাকে ছুঁয়ো না। তুমি গতকাল আমার খেলনা কিনে দাওনি।”
আবদুল্লাহর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এ কেমন পরিবর্তন? সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল।
রাস্তায় একটা দৃশ্য দেখে তার পা আটকে গেল। একটা বৃদ্ধা রাস্তার পাশে পড়ে আছেন। তার হাতে লাঠি, কিন্তু কেউ তাকে তুলছে না। দু’জন যুবক পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, একজন বলল, “ও তো বুড়ি, মরুক গে। আমাদের কী?” আরেকজন হাসল, “ঠিক বলেছিস। এই দুনিয়ায় নিজেরটা দেখ।”
আবদুল্লাহ এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধাকে তুলল। “আম্মা, কোথায় যাবেন?”
বৃদ্ধা কঠিন চোখে তাকালেন। “তুমি কেন সাহায্য করছ? কী চাও তুমি? টাকা? নাকি অন্য কিছু?”
আবদুল্লাহ অবাক। “আম্মা, আমি শুধু সাহায্য করতে চাই।”
“সাহায্য? এই দুনিয়ায় কেউ কাউকে সাহায্য করে না। রহমান ছাড়া এই দুনিয়া।” বলে বৃদ্ধা চলে গেলেন।
অফিসে পৌঁছে দেখল পরিবেশ আরও ভয়ংকর। তার সহকর্মী রশিদ, যে সাধারণত তার সাথে চা খেত, আজ চেয়ার ঘুরিয়ে বসে আছে। “আবদুল্লাহ, তোমার ফাইলটা আমি নিয়ে নিয়েছি। বসকে বলেছি এটা আমার কাজ।”
“কিন্তু রশিদ ভাই, এটা তো আমার প্রজেক্ট!”
“তো? এখানে ভাই-টাই নেই। যে পারে সে নেয়।”
বস মি. করিমের ঘরে ঢুকতেই চিৎকার শুরু হল। “তুমি গত মাসের টার্গেট মিস করেছ। বেরিয়ে যাও! চাকরি চলে যাবে!”
আবদুল্লাহ অনুরোধ করল, “স্যার, একটা সুযোগ দিন।”
“সুযোগ? হাহ! এই দুনিয়ায় সুযোগ কেউ দেয় না। নিজে বাঁচো, অন্যকে মরতে দাও।”
দুপুরে লাঞ্চের সময় ক্যান্টিনে একটা ঝগড়া বেধে গেল। দুই কর্মচারী খাবার নিয়ে মারামারি করছে। একজনের হাত কেটে গেল, রক্ত পড়ছে, কিন্তু কেউ ব্যান্ডেজ এগিয়ে দিল না। সবাই শুধু দেখছে আর ফিসফিস করছে।
বিকেলে আবদুল্লাহ বাড়ি ফেরার পথে দেখল একটা ছোট মেয়ে রাস্তায় কাঁদছে। তার মা তাকে মারছে। “তুই না খেয়ে থাক। আমার টাকা নেই তোর জন্য।”
আবদুল্লাহ মেয়েটিকে একটা চকলেট দিতে গেল। মা ধমক দিল, “আপনি কে? আমার মেয়েকে নষ্ট করবেন না। যান!”
সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে দেখল তার বুড়ো বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন। আবদুল্লাহ পানি এগিয়ে দিল। বাবা বললেন, “তুই এসেছিস কেন? তোর তো নিজের সংসার। আমি তো শুধু বোঝা। গত সপ্তাহে তুই আমার ওষুধ কিনে দিসনি।”
“বাবা, আমি ভুলে গিয়েছিলাম। ক্ষমা করো।”
“ক্ষমা? এই দুনিয়ায় ক্ষমা বলে কিছু নেই। রহমান চলে গেছে।”
রাত গভীর হলে আবদুল্লাহ ছাদে গিয়ে বসল। আকাশে তারা নেই। চাঁদের আলো ম্লান। নিচে শহরটা যেন মৃত। কোনো মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে না। মানুষের হৃদয় থেকে আল্লাহর রহমত উঠে গেছে যেন।
সে ভাবতে লাগল। এই দুনিয়া কেমন হবে যদি সত্যিই আল্লাহ তাঁর রহমান নামের রহমত তুলে নেন? মানুষ একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে। প্রকৃতি শুকিয়ে যাবে। পাখিরা গান গাইবে না। ফুল ফুটবে না। শুধু ঘৃণা, লোভ, হিংসা আর অন্ধকার।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে শিরোনাম: “শহরে দাঙ্গা, দোকান লুট, কোনো পুলিশ হস্তক্ষেপ করেনি।” হাসপাতালে রোগীরা মারা যাচ্ছে টাকার অভাবে। ডাক্তাররা বলছে, “টাকা না দিলে চিকিৎসা নেই।”
আবদুল্লাহ তার প্রতিবেশী আলীর বাড়িতে গেল। আলী একসময় তার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আজ দরজা খুলে বলল, “কী চাই? ধার চাইতে এসেছ? দিতে পারব না।”
“আলী ভাই, আমরা তো বন্ধু।”
“বন্ধু? হাসালি। এই দুনিয়ায় বন্ধু বলে কিছু নেই।”
সারাদিন আবদুল্লাহ ঘুরে ঘুরে দেখল। নদী শুকিয়ে গেছে। ফসলের মাঠে ধান গাছ মরে যাচ্ছে। কৃষকরা একে অপরের জমি দখল করছে। বাজারে দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু কেউ দর কষাকষি করছে না, শুধু ঝগড়া।
রাতে ঘুমের মধ্যে আবদুল্লাহ এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। বিশাল এক মাঠ। চারদিকে অন্ধকার। হাজার হাজার মানুষ একে অপরের সাথে লড়াই করছে। কেউ কাউকে সাহায্য করছে না। একটা ছোট ছেলে ক্ষুধায় চিৎকার করছে, কিন্তু তার মা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। একটা বৃদ্ধ পথের পাশে পড়ে আছেন, লোকজন তার পকেট হাতড়াচ্ছে। আকাশ থেকে একটা উজ্জ্বল আলো নেমে এল। আলোর মধ্যে এক মহান কণ্ঠস্বর: “হে মানুষ! আমি তোমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করতাম। আমার নাম রহমান। যদি আমি সেই রহমত তুলে নিই, তাহলে তোমরা কী করবে? দেখো, এই দুনিয়া কেমন হয়।”
আবদুল্লাহ চিৎকার করে উঠল, “ইয়া আল্লাহ! ফিরিয়ে দিন! আমরা ভুল করেছি!”
স্বপ্ন ভেঙে গেল। কিন্তু তার চোখে জল। সে বুঝল, এটা শুধু স্বপ্ন নয়। এটা একটা সতর্কবার্তা। আল্লাহ যদি সত্যিই তাঁর রহমত উঠিয়ে নেন, তাহলে পৃথিবী এমনই হবে।
সে মসজিদে ছুটে গেল। ইমাম সাহেব মিম্বরে বসে আছেন, কিন্তু মুখে কোনো আলো নেই। “ইমাম সাহেব, নামাজ পড়াবেন না?”
“কী লাভ? মানুষ তো শোনে না। রহমত চলে গেছে।”
আবদুল্লাহ মসজিদের মেঝেতে সেজদায় পড়ে কাঁদতে লাগল। “ইয়া রহমানুর রাহিম! ইয়া আল্লাহ! আমাদের হৃদয় থেকে ঘৃণা সরিয়ে দিন। আমাদের ওপর আবার রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমরা আপনাকে ভুলে গিয়েছিলাম। ক্ষমা করুন।”
তার কান্নার আওয়াজ মসজিদের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল। বাইরে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল। তারপর ঝমঝম করে বৃষ্টি। লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে এল। প্রথমে অবাক, তারপর একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরতে লাগল।
আবদুল্লাহর ফোন বাজল। বসের ফোন। “আবদুল্লাহ, ফিরে এসো ভাই। আমি ভুল করেছি। তোমার প্রজেক্ট তোমার।”
বাড়িতে ফিরে ফাতেমা দরজা খুলে কাঁদতে কাঁদতে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। “আমি কী করেছি! তুমি ছাড়া আমি কিছু না।”
ইমরান ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। “বাবা, আমাকে ক্ষমা করো।”
বুড়ো বাবা বিছানা থেকে উঠে এসে ছেলের হাত ধরলেন। “বাবা, আমার কথাগুলো মাফ করো। তুই আমার চোখের আলো।”
প্রতিবেশী আলী এসে বলল, “ভাই, চলো একসাথে নামাজ পড়ি।”
দুনিয়াটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। নদীতে আবার পানি বইতে শুরু করল। ফসলের মাঠ সবুজ হয়ে উঠল। মানুষ হাসতে শুরু করল। পাখিরা আবার গান গাইল।
কিন্তু আবদুল্লাহ জানত, এটা একটা পরীক্ষা ছিল। আল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর রহমত ছাড়া এই দুনিয়া টিকবে না। মানুষের জীবন অর্থহীন হয়ে যাবে। সে প্রতিদিন তার ডায়েরিতে লিখতে লাগল:
“রহমান ছাড়া দুনিয়া অন্ধকারের সমুদ্র।
হৃদয় পাথর, চোখ শুকনো, হাত নিষ্ক্রিয়।
ক্ষুধার্ত শিশু কাঁদে, কিন্তু কেউ শোনে না।
বৃদ্ধ মা পথে পড়ে, কেউ তুলে না।
ভাই ভাইয়ের শত্রু, স্বামী স্ত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বী।
প্রকৃতি মরে যায়, আকাশ কালো হয়ে যায়।
কিন্তু আল্লাহর রহমত ফিরে এলে সবকিছু বদলে যায়। ফুল ফোটে, হাসি ফোটে, ভালোবাসা ফিরে আসে। তাই প্রতিদিন বলো— ইয়া আল্লাহ, আপনার রহমত আমাদের ওপর ছায়া দিন। আমাদের হৃদয়কে রহমানের গুণে ভরিয়ে দিন।”
সেই ঘটনার পর আবদুল্লাহর জীবন বদলে গেল। সে আরও বেশি করে দান করতে শুরু করল, মানুষের সাহায্য করতে শুরু করল, নামাজ আর দোয়ায় সময় দিতে লাগল। তার চারপাশের মানুষও বদলে গেল। শহরটা আবার সুন্দর হয়ে উঠল।
তবু আবদুল্লাহ কখনো ভোলে না সেই ক’দিনের কথা, যখন রহমান ছিল না। সেই স্মৃতি তাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয়— আল্লাহর রহমতই আমাদের একমাত্র আশ্রয়। তিনি না থাকলে আমরা কিছুই না।
এই গল্প শেষ হয় না। কারণ আল্লাহর রহমতের কাহিনী কখনো শেষ হয় না। তিনি সবসময় আমাদের সাথে আছেন। শুধু আমাদের চোখ খুলতে হবে, হৃদয় খুলতে হবে, তাঁর দিকে ফিরতে হবে।
ইয়া আল্লাহ! আমাদের সবার ওপর রহম করুন। আমিন।

Comments

    Please login to post comment. Login