রাত তখন ঠিক দুইটা। পুরো এলাকা একদম নিঝুম, চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক। তিশা তার পড়ার টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে অফিসের একটা জরুরি প্রেজেন্টেশন তৈরি করছিল। পুরো ফ্ল্যাটে সে একাই থাকে। হঠাৎ করেই তার ঘরের পেছনের বারান্দা থেকে একটা অদ্ভুত ও অস্পষ্ট আওয়াজ এলো। মনে হলো কেউ যেন খুব ধীর পায়ে ভারী বুট জুতো পরে বারান্দার টাইলস করা মেঝেতে হেঁটে বেড়াচ্ছে। খসখস... খসখস...।
তিশা চমকে উঠে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাল। তার পুরো শরীর মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল। তার ফ্ল্যাটটি বহুতল ভবনের চারতলায়, আর বারান্দার লোহার গ্রিলটি সে নিজে সন্ধ্যাবেলা ভালো করে তালা মেরে বন্ধ করেছে। তাহলে এই মাঝরাতে চারতলার লক করা বারান্দায় কে হেঁটে বেড়াবে? সে ভাবল হয়তো কোনো বিড়াল বা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। কিন্তু পায়ের আওয়াজটা এত স্পষ্ট যে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সে সাহসে ভর করে টেবিল ল্যাম্পের সুইচটা বন্ধ করে দিল, যাতে ঘর থেকে বারান্দার বাইরের অংশটা ভালো করে দেখা যায়। তিশা আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বারান্দার কাচের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের ভেতর এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাচের দরজার ভারী পর্দাটা এক ইঞ্চি পরিমাণ সরাতেই তিশার বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল! ভয়ের এক তীব্র শীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল।
সে দেখল, কুয়াশাচ্ছন্ন নিঝুম বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে একটা কুচকুচে কালো দীর্ঘ অবয়ব বা মূর্তির মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে! বাইরের আবছা আলোতে তার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু অবয়বটির লম্বা দুটো হাত গ্রিলের রডগুলো শক্ত করে ধরে আছে। আর সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, অবয়বটির চোখের জায়গায় দুটো লাল আগুনের বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করছে, যা একদৃষ্টে তিশার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তিশা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তীব্র আতঙ্কে তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। তার পা দুটো যেন মেঝের সাথে জমে গেছে। ঠিক তখনই তার হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটি আচমকা তীব্র ভাইব্রেশনে কেঁপে উঠল এবং মেসেজ টোন বেজে উঠল। এই নিস্তব্ধ ঘরে সেই শব্দে তিশা আরেকবার আঁতকে উঠল। সে কাঁপতে থাকা হাতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কোনো নম্বর নেই, একটি নামহীন "Unknown Number" থেকে মেসেজ এসেছে।
মেসেজটি ওপেন করতেই তিশার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল এবং কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝরতে লাগল। সেখানে লেখা ছিল:
"কাচের ওপাশ থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে না দেখে দরজাটা খোলো তিশা, বাইরে বড্ড ঠান্ডা। আমি তোমার জন্যই দীর্ঘ চার বছর পর নরকের দরজা ভেঙে ফিরে এসেছি। তুমি যা লুকিয়েছিলে, তা আমি আজ নিতে এসেছি।"
তিশা ফোনটা হাত থেকে ফেলে দিল। চার বছর আগের সেই কালরাতের কথা তার মনে পড়ে গেল, যা সে চিরকালের জন্য ভুলে যেতে চেয়েছিল। তাহলে কি অতীত সত্যিই তাকে খুঁজে বের করে ফেলেছে?
(চলবে...)