নিষ্ঠুর পড়ালেখা
সামিউলের জন্ম ঢাকার একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন সরকারি অফিসের ক্লার্ক, মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই সামিউলের একটা আলাদা আলো ছিল। পাড়ার সবাই বলতো, “এ ছেলে পড়বে, বড় হবে।” স্কুলে প্রথম থেকেই সে ফার্স্ট বয়। রাত জেগে পড়তো। বইয়ের গন্ধ তার নেশা। বাবা-মা কষ্ট করে টিউশন ফি জোগাড় করতেন। সামিউল কখনো খেলাধুলা করেনি, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যায়নি। তার জগত ছিল শুধু বই আর খাতা।
“বাবা, আমি ডাক্তার হবো,” সে বলতো। বাবা হাসতেন, “পড়, বেটা। আমরা যা পারি করব।”
এসএসসিতে সে গোল্ডেন এ পেল। এইচএসসিতেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো অর্থনীতি বিভাগে। সেখানেও সে টপার। ক্লাসের সবাই তাকে সম্মান করতো। কিন্তু সামিউলের বন্ধু রহিম ছিল একদম উল্টো। ক্লাস বাংক করে বাজারে ঘুরতো। “আরে ভাই, পড়ে কী হবে? চাকরি তো কপালে নেই। ব্যবসা কর।” সামিউল হাসতো, “তুই পাগল। পড়াশোনা ছাড়া কিছু হয় না।”
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো ২০১৮ সালে। সামিউলের সিজিপিএ ৩.৮৫। রেজাল্ট দেখে বাবা-মা কাঁদলেন আনন্দে। “এবার চাকরি পাবি, বেটা।” সামিউলও বিশ্বাস করতো। প্রথম চেষ্টা বিসিএস। লিখিত পরীক্ষায় পাস করলো। মৌখিকে গেল। প্যানেলের সামনে বসে সে সব প্রশ্নের উত্তর দিল। কিন্তু ফলাফল বের হলো—তার নাম নেই। পরে শুনলো, যে ছেলেটা তার পাশে বসেছিল, তার চাচা মন্ত্রণালয়ের অফিসার। টাকা লেনদেন হয়েছে। সামিউল চুপ করে বাড়ি ফিরল।
তারপর শুরু হলো প্রাইভেট চাকরির যুদ্ধ। প্রতিদিন অনলাইনে সিভি পাঠানো। ব্যাংক, এনজিও, কর্পোরেট অফিস। ইন্টারভিউ দিতে গেলে প্রথম প্রশ্নই—“রেফারেন্স আছে?” তার কোনো রেফারেন্স ছিল না। একটা ব্যাংকে ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরে এসে শুনলো, যে ছেলেটা তার সাথে দিল, সে এমডির ভাগ্নে। চাকরি সে পেয়ে গেছে।
সামিউলের বন্ধু রহিম ততদিনে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। তার বাবার ছোট একটা মুদি দোকান ছিল মিরপুরে। রহিম সেটাকে বড় করলো। প্রথমে অনলাইনে ডেলিভারি শুরু করলো। তারপর সাপ্লাই চেইন। দুই বছরের মধ্যে তার তিনটা দোকান। গাড়ি কিনলো। বিয়ে করলো। সামিউলকে বলতো, “ভাই, এখনো পড়িস? চলে আয় আমার সাথে।”
সামিউল যেত না। সে ভাবতো, আরেকটু চেষ্টা করলে চাকরি পাবে। কিন্তু বয়স বাড়ছিল। ২৮ বছর বয়সে সে এখনো বেকার। বাড়িতে চাপ বাড়ছিল। বাবা রিটায়ার করেছেন। মা অসুস্থ। টাকার অভাব। সামিউল রাতে ঘুমাতে পারতো না। বইয়ের স্তূপ দেখে তার গা ঘিনঘিন করতো। সেই বইগুলোই তো তার জীবন নষ্ট করেছে।
একদিন রহিমের দোকানে গেল সে। রহিম তাকে জড়িয়ে ধরলো। “আয়, বস।” দোকানে এখন এসি, ফ্রিজ, অনেক কর্মচারী। রহিম বললো, “দেখ, আমি ম্যাট্রিক ফেল। কিন্তু ব্যবসা বুঝি। মানুষের চাহিদা বুঝি। তুই তো অনেক পড়ছিস, কিন্তু বাস্তব দেখিস না।”
সামিউল চুপ করে শুনলো। সেদিন থেকে সে রহিমের সাথে কাজ শুরু করলো। প্রথমে সাপ্লাইয়ের হিসাব রাখা। কিন্তু তার মাথায় সব তত্ত্ব। ব্যবসার বই পড়ে সে সাজেশন দিতো। রহিম হাসতো, “ভাই, এসব থিওরি বাংলাদেশে চলে না। এখানে সম্পর্ক চলে, টাকা চলে, সাহস চলে।”
সময় যাচ্ছিল। সামিউল দেখলো, তার আরেক বন্ধু কামরুল, যে কলেজেও পাস করেনি, এখন ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের ব্যবসা করে। গুলশানে ফ্ল্যাট, বিদেশে ঘুরে। আরেকজন আসিফ, যে শুধু হাইস্কুল পাস, কনস্ট্রাকশনের ব্যবসায় লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছে। সবাই বলে, “পড়াশোনা করে কী হবে? চাকরির জন্য তো টাকা লাগে, লবি লাগে।”
সামিউলের মনে একটা ক্ষোভ জমছিল। সে যে সারাজীবন নিয়ম মেনে চলেছে, সেটাই তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের এই বাস্তবতা নিষ্ঠুর। এখানে মেধা নয়, কানেকশন বেশি কাজ করে। যে পড়ে, সে চাকরির জন্য দৌড়ায়। যে পড়ে না, সে ঝুঁকি নেয়, ব্যবসা করে, রাতারাতি বড় হয়।
২০২৩ সালে সামিউলের বাবা মারা গেলেন। মায়ের চিকিৎসার টাকা নেই। সে শেষ চেষ্টা করলো একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে লেকচারারের চাকরির জন্য। ইন্টারভিউয়ে ভালো করলো। কিন্তু চেয়ারম্যান বললেন, “আমাদের তো ফান্ডিং লাগবে।” অর্থাৎ টাকা দিতে হবে। সামিউলের কাছে টাকা নেই। চাকরি গেল আরেকজনের, যে টাকা দিয়েছে।
সেদিন বাসায় ফিরে সামিউল তার পুরনো খাতাগুলো দেখলো। হাজার হাজার পাতা নোটস। সব অর্থহীন। সে একটা খাতা নিয়ে ছিঁড়তে শুরু করলো। চোখে পানি। “এই পড়াশোনা আমার জীবনটা নষ্ট করেছে।”
রহিম তাকে ডেকে নিল। “ভাই, এখন থেকে তুই আমার পার্টনার। তোর মাথা আছে, আমার অভিজ্ঞতা আছে। একসাথে বড় কিছু করব।” সামিউল রাজি হলো। তারা একটা অনলাইন গ্রোসারি বিজনেস শুরু করলো। প্রথমে ছোট। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। সামিউল দেখলো, ব্যবসায় তার পড়াশোনা কাজে লাগছে—হিসাব, মার্কেট অ্যানালাইসিস, প্ল্যানিং। কিন্তু সাফল্য আসতে সময় লাগছে।
দুই বছর পর তাদের বিজনেস মোটামুটি চলছে। কিন্তু সামিউলের মনে শান্তি নেই। সে রাতে স্বপ্ন দেখে—সে চাকরি পেয়েছে, অফিসে বসে আছে। জেগে উঠে হাসে। নিজেকে বলে, “স্বপ্ন দেখিস না। বাস্তব এটাই।”
গল্পটা এখানে শেষ করব না। আরও বিস্তারিত বলি।
সামিউলের ছোটবেলার কথা। মিরপুরের একটা সরু গলিতে তাদের বাসা। বৃষ্টি হলে ঘরে পানি ঢুকতো। সে টেবিলের উপর পা তুলে পড়তো। মা বলতেন, “খেয়ে নে, বেটা।” সে বলতো, “মা, পরীক্ষা আছে।” সেই ছেলে এখন ৩২ বছরের যুবক। চুলে পাক ধরেছে। চোখের নিচে কালি।
রহিমের সাথে তার বন্ধুত্বের গল্প। স্কুলে রহিম তাকে নোটস দিতো না, কারণ সে নিজে পড়তো না। কিন্তু খেলার সময় সামিউলকে ডাকতো। সামিউল যেত না। এখন রহিম বলে, “তোর জন্যই আমি এতদূর আসিনি ভাই। তুই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিস। কিন্তু তুই নিজে আটকে গেলি।”
একটা ঘটনা। সামিউল একবার বিদেশি একটা এনজিওতে আবেদন করেছিল। ইন্টারভিউয়ে ডাক পেল। সেখানে একটা বিদেশি সাহেব প্রশ্ন করলেন, “Why do you think you are suitable?” সামিউল তার সব অর্জনের কথা বললো। সাহেব হাসলেন, “Good academic, but we need someone with practical experience.” সেই চাকরি গেল আরেকজনের, যে কোনো ডিগ্রি ছাড়াই ফিল্ডে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের এই বাস্তবতা। হাজার হাজার সামিউল আছে। যারা মেধাবী, কিন্তু সিস্টেম তাদের গিলে খায়। যারা ঝুঁকি নেয়, তারা বেঁচে যায়। রাজনৈতিক সংযোগ, টাকা, চাচা-মামা—এগুলোই এখানে সব।
সামিউল এখন রহিমের সাথে ব্যবসা করে। তাদের কোম্পানির নাম “সমৃদ্ধি সাপ্লাই”। ধীরে ধীরে বাড়ছে। সে মাকে নতুন বাসায় নিয়ে গেছে। কিন্তু তার মনে একটা ক্ষত আছে। সে তার ছোট ভাইকে বলে, “পড়িস, কিন্তু শুধু পড়িস না। বাস্তব শেখ। ব্যবসা শেখ। নেটওয়ার্ক কর।”
গল্পের শেষে সামিউল একটা রাতে ছাদে বসে। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। সে ভাবে, পড়াশোনা নিষ্ঠুর। এটা তোমাকে স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু বাস্তবে ফেলে দেয়। যারা পড়ে না, তারা স্বপ্ন দেখে না, সরাসরি বাস্তবে ঝাঁপায়।
এই গল্পটা বাংলাদেশের হাজারো যুবকের গল্প। যারা পড়ে, কিন্তু পায় না। যারা পড়ে না, কিন্তু পেয়ে যায়। নিষ্ঠুর পড়ালেখা—এই নামটা ঠিকই।
।