Posts

ফিকশন

নিষ্ঠুর নদী

June 18, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

4
View

নদীর নিষ্ঠুরতা
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এখানকার মাটি, জল, আকাশ সবকিছু নদীর সাথে জড়িত। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা, ধরলা, সুরমা—এই নদীগুলো জাতির শিরায় শিরায় বয়ে চলেছে। তারা জীবন দেয়, ফসল ফলায়, যোগাযোগ স্থাপন করে, কিন্তু একই সাথে তারা নিষ্ঠুর। নদীর নিষ্ঠুরতা শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি পুরো জাতির এক অবিরাম সংগ্রামের কাহিনী। এই কাহিনীতে কোনো একক মানুষ নেই, কোনো নির্দিষ্ট পরিবার নেই। আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মিলিত কষ্ট, বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস, মৃত্যুর অগণিত রূপ এবং নদীর সাথে অসম যুদ্ধ।
নদী ভাঙন বাংলাদেশের এক চিরন্তন দুর্যোগ। প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। পদ্মা ও যমুনার মতো বড় নদীগুলোতে ভাঙন সবচেয়ে ভয়াবহ। বর্ষাকালে পানির স্রোত তীব্র হয়, নদীর তীরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যায়। একেকটি বড় চড় খসে পড়ে পুরো গ্রামকে গিলে ফেলে। চার দশকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় দেড় লাখ হেক্টরের বেশি জমি হারিয়েছে দেশ। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন মানুষ ঝুঁকিতে, প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমিহীনদের অর্ধেকেরও বেশি নদী ভাঙনের শিকার। একজন মানুষ জীবনে গড়ে ২০ বারের বেশি ঠিকানা বদলাতে বাধ্য হয়। এই সংখ্যাগুলো শুধু তথ্য নয়, এগুলো জাতির শরীরে গভীর ক্ষত।
নদীর ভাঙন শুরু হয় নীরবে। প্রথমে তীরের মাটি খসে, তারপর বড় বড় চাঙড় ধসে পড়ে। রাতের অন্ধকারে অনেক সময় গ্রামের অংশ নদীতে মিলিয়ে যায়। মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখে তাদের বাড়ির সামনে আর জমি নেই, শুধু পানির বিস্তার। ফসলি জমি, বসতভিটা, স্কুল, মসজিদ, বাজার—সবকিছু একে একে গিলে খায় নদী। কৃষকের স্বপ্ন, মাছ ধরার নৌকা, গবাদি পশু, সব হারিয়ে যায়। অর্থনৈতিক ক্ষতি অপরিমেয়। প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসল, অবকাঠামো নষ্ট হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি মানুষের জীবন।
মানুষের কষ্টের অনেক রূপ। ভাঙনের পর বাস্তুহারা মানুষ চলে যায় শহরে, অন্য জেলায়, অথবা নদীর পাড়েই আশ্রয় নেয় চরে বা ভাসমান জীবনে। শহরে গিয়ে তারা হয় শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, দিনমজুর। নতুন করে জীবন শুরু করতে গিয়ে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অসুস্থতা তাদের তাড়া করে। মানসিক চাপ অসহ্য—উদ্বেগ, বিষাদ, হতাশা। সমাজ ভেঙে যায়, সম্পর্ক ছিন্ন হয়, সংস্কৃতি হারিয়ে যায়। গ্রামের ঐতিহ্য, লোকসংগীত, উৎসব সব নদীর স্রোতে ভেসে যায়।
নদীতে মৃত্যুর অসংখ্য রূপ। সবচেয়ে সাধারণ মৃত্যু ডুবে যাওয়া। ভাঙনের সময় মাটির চাঙড়ের সাথে মানুষ নদীতে পড়ে। শিশু, বৃদ্ধ, নারী—কেউ রেহাই পায় না। রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় পুরো পরিবেশ নদীতে চলে যায়। লঞ্চ ও নৌকা ডুবির ঘটনা প্রায়শই ঘটে। বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে, ঢেউ প্রবল হয়। যাত্রীবোঝাই লঞ্চ উল্টে যায়, শত শত মানুষ পানিতে তলিয়ে যায়। নৌকা উল্টে মাঝি-মাল্লা, যাত্রীরা ডুবে মরে। অনেকে স্রোতে ভেসে যায়, শরীর খুঁজে পাওয়া যায় না।
সাপের কামড়ে মৃত্যু আরেক ভয়ংকর রূপ। বন্যা ও ভাঙনের সময় সাপের আক্রমণ বেড়ে যায়। বাস্তুহারা মানুষ চরে বা ভাঙা জমিতে আশ্রয় নেয়। সেখানে বিষাক্ত সাপের ছোবল। কামড় খাওয়ার পর চিকিৎসার অভাবে মানুষ মরে। কখনো কখনো অসহায় মানুষ মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়—প্রথাগত কারণে বা সংস্কারের জন্য। নদী তখন শুধু কবরস্থান হয়ে ওঠে না, মৃত্যুর সাক্ষী হয়।
অন্যান্য মৃত্যু: বন্যার পানিতে বিষাক্ত পোকা, জলজ জীবাণু থেকে রোগ। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, ম্যালেরিয়া। খাদ্যাভাবে অপুষ্টি। শীতে ভাসমান জীবনে ঠান্ডায় মৃত্যু। দুর্ঘটনায়—ভাঙা বাঁধে পড়া, নদী পারাপারের সময় নৌকা ডোবা। প্রতি বছর হাজার হাজার প্রাণ চলে যায় এভাবে।
এই নিষ্ঠুরতা শত শত বছর ধরে চলছে। ঐতিহাসিকভাবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এই অঞ্চলকে গড়েছে কিন্তু ভেঙেওছে। ১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে যমুনার গতিপথ বদলে যায়। তারপর থেকে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন তা আরও ভয়াবহ করছে। হিমালয়ের গলন, অসময়ের বৃষ্টি, নদীর সিল্ট জমা—সব মিলে নদী আরও অস্থির।
জাতির জীবনে এর প্রভাব বিশাল। কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে। বাস্তুচ্যুত মানুষ শহরের স্লাম বাড়ায়, চাপ বাড়ায় সম্পদের ওপর। সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত—শিক্ষা বন্ধ, নিরাপত্তাহীনতা, শোষণ।
তবু মানুষ লড়ে। বাঁধ বাঁধে, জিওব্যাগ ফেলে, চরে চাষ করে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ চলে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। নদীর সাথে সহাবস্থানের পরিকল্পনা দরকার—পরিবেশবান্ধব বাঁধ, বনায়ন, সতর্কতা ব্যবস্থা, পুনর্বাসন।
নদীর নিষ্ঠুরতা জাতিকে শেখায় প্রকৃতির সামনে মানুষের ছোটত্ব। কিন্তু একই সাথে শক্তি সঞ্চয় করতে। বাংলার মানুষ নদীকে ভালোবাসে, ভয় করে, শ্রদ্ধা করে। নদী তাদের মা, কিন্তু কখনো কখনো হিংস্র।
(এখানে বিস্তারিত বর্ণনা চলতে থাকে...)
নদীর দৈনন্দিন আক্রমণের চিত্র
প্রতি বর্ষায় পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে দেখা যায় পানির তোড়। তীরের মাটি ক্ষয় হয় ঘণ্টায় ঘণ্টায়। একটি বাড়ি, যেখানে প্রজন্মের স্মৃতি জড়িয়ে, এক রাতে অদৃশ্য হয়। গ্রামের পর গ্রাম—শরিয়তপুর, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম—সব জায়গায় একই দৃশ্য। মানুষ তাদের শেষ সম্বল নিয়ে সরে যায়। কেউ নৌকায় ভাসে, কেউ চরে ঘর বাঁধে। কিন্তু নদী আবার আসে।
ডুবে মরার ঘটনা অসংখ্য। লঞ্চ ডুবিতে শত শত যাত্রী। নৌকায় করে পারাপারের সময় ঢেউয়ে উল্টে যাওয়া। শিশুরা পানিতে পড়ে, বাবা-মা ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু স্রোত তাদেরও নিয়ে যায়। মাছ ধরতে গিয়ে মাঝিরা ডুবে।
সাপের কামড়। বন্যার পানিতে সাপ ঘরে ঢোকে। কামড় খেলে গ্রামে অ্যান্টিভেনম নেই। মানুষ ছুটে হাসপাতালে, পথে মারা যায়। মৃতদেহ নদীতে ফেলা হয়—নদীই শেষ আশ্রয়।
অন্য মৃত্যু: পানিবাহিত রোগ। দূষিত পানি খেয়ে পুরো গ্রাম অসুস্থ। শিশুমৃত্যু বেড়ে যায়। দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা।
জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষত
কৃষক হারায় জমি। ফসল নষ্ট। গবাদি পশু ভেসে যায়। মৎস্যজীবীরা নদীর উপর নির্ভরশীল, কিন্তু ভাঙনে মাছের আবাস নষ্ট। শিল্প, বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত। অভিবাসন বাড়ে, শহরে চাপ।
মানসিক স্বাস্থ্য। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বেগ, বিষাদে ভোগে। সমাজের বন্ধন ছিন্ন।
ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
ঐতিহাসিক নদী পরিবর্তন থেকে আজকের জলবায়ু সংকট। নদীকে বোঝা, নিয়ন্ত্রণ করা জাতির চ্যালেঞ্জ। বাঁধ, বন, পরিকল্পনা দরকার।
নদী চিরকাল বয়ে যাবে। তার নিষ্ঠুরতা জাতিকে শক্ত করে। বাংলাদেশের মানুষ নদীর সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকবে, এটাই তাদের ইতিহাস।

Comments

    Please login to post comment. Login