Posts

উপন্যাস

লাল মিয়া ৯০ বছরের জীবন গুলো।

June 19, 2026

Shafin pro

5
View

রক্তের টান ও নিয়তির বাঁধনপ্রথম পরিচ্ছেদ:

 সোনালী সকালের সূচনাসবুজ শস্যে ঘেরা রূপসা গ্রামে লাল মিয়ার নাম ডাক তখন আকাশছোঁয়া। ভরা যৌবনে লাল মিয়া ছিলেন যেমন সুপুরুষ, তেমনই কর্মঠ। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বিস্তর জমিজমা, ধানের গোলা, আর গোয়াল ভরা গবাদিপশু নিয়ে তার সংসার ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। লাল মিয়ার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিল তার প্রথমা স্ত্রী ফাতেমা। ফাতেমা ছিল যেমন রূপবতী, তেমনই গুণবতী। বিয়ের পর প্রথম কয়েকটা বছর তাদের কেটেছিল এক স্বর্গীয় সুখে। একে অপরকে ভালোবেসে, শ্রদ্ধা করে তাদের দিনগুলো যেন ডানায় ভর করে উড়ে যাচ্ছিল। লাল মিয়া মাঠ থেকে ফিরে যখন ফাতেমার হাতের এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত খেতেন, তখন তার সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে যেত। ফাতেমাও লাল মিয়ার সামান্য অবহেলা সহ্য করতে পারত না।কিন্তু মানুষের জীবনে সব সুখ চিরস্থায়ী হয় না। নিয়তি বড়ই নিষ্ঠুর। দেখতে দেখতে তাদের বিয়ের পাঁচ বছর কেটে গেল, কিন্তু ফাতেমার কোলে কোনো সন্তান এলো না। প্রথম প্রথম লাল মিয়া বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি ভাবতেন, আল্লাহর ইচ্ছা হলে একদিন ঠিকই তাদের ঘর আলো করে সন্তান আসবে। কিন্তু গ্রামীণ সমাজ বড়ই নির্মম। চারপাশের মানুষের কানাঘুষা, আত্মীয়-স্বজনদের বাঁকা চাহনি আর প্রতিবেশীদের খোঁচা মারা কথা ফাতেমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে দেরি হলো না। ফাতেমা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে লাগল। প্রতি রাতে লাল মিয়ার বুকে মাথা রেখে সে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিত। লাল মিয়া তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, ফাতেমা, আমার এত সম্পত্তি, এত সুখ সব তোমায় নিয়ে। সন্তান নেই তো কী হয়েছে? আমি তো তোমাকে পেয়েই ধন্য।কিন্তু ফাতেমার মন মানত না। বিশেষ করে যখন সে দেখত লাল মিয়ার বিশাল সাম্রাজ্য দেখাশোনা করার মতো কোনো উত্তরাধিকারী নেই, তখন তার বুকটা ফেটে যেত। গ্রামীণ সমাজে বংশের চেরাগ না থাকাটা এক মস্ত বড় অভিশাপ হিসেবে দেখা হতো। লাল মিয়ার চাচা-জায়ঠারা প্রায়ই বলতেন, লাল মিয়া, তুই মরলে তোর এই বিশাল সম্পত্তি ভোগ করবে কে? সরকারের ঘরে চলে যাবে সব, নয়তো দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা লুটেপুটে খাবে। তোর বংশের নাম নেওয়ার মতো তো কেউ থাকবে না। এই কথাগুলো ফাতেমার মাথায় তীরের মতো বিঁধত। সে সিদ্ধান্ত নিল, নিজের সুখের চেয়ে স্বামীর বংশ রক্ষা করা বেশি জরুরি। ফাতেমা লাল মিয়াকে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য জোর করতে শুরু করল।লাল মিয়া প্রথমে এই প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানালেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ফাতেমা, আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কোনো নারীর কথা ভাবতেও পারি না। সন্তান না হলে না হবে, আমি আর বিয়ে করব না। কিন্তু ফাতেমা দমবার পাত্রী ছিল না। সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিল, সারাদিন ঘরের কোণে কেঁদে কেটে একাকার করল। একদিন সে লাল মিয়ার হাত ধরে কেঁদে বলল, তোমার পায়ে পড়ি, আমার মুখের দিকে চেয়ে তুমি আরেকটা বিয়ে করো। আমি নিজের হাতে তোমার সংসার সাজিয়ে দেব। তোমার সন্তানের মা হতে না পারার এই কলঙ্ক আমি আর সইতে পারছি না। ফাতেমার এই তীব্র জেদ আর চোখের জলের সামনে অবশেষে লাল মিয়ার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল। তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়েতে রাজি হলেন।দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: একের পর এক বিয়ের আবর্তফাতেমা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পাশের গ্রামের এক দরিদ্র ঘরের শান্ত মেয়ে রহিমাকে লাল মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে তুলে আনল। ফাতেমা ভেবেছিল, রহিমা ঘরে এলে হয়তো তাদের দুঃখের দিন শেষ হবে। রহিমার কোলে যখন সন্তান আসবে, তখন সেই সন্তানকে সে নিজের সন্তানের মতোই বড় করে তুলবে। বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস লাল মিয়ার সংসারে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। রহিমার প্রতি লাল মিয়ার তেমন কোনো আকর্ষণ ছিল না, কিন্তু ফাতেমার অনুরোধে তিনি রহিমার দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন।কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন লাল মিয়ার পিছু ছাড়ছিল না। দেখতে দেখতে রহিমার বিয়েরও তিন বছর পার হয়ে গেল। রহিমার কোলেও কোনো সন্তান এলো না। এবার ফাতেমা ও লাল মিয়া দুজনেই চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। গ্রামের কবিরাজ, ওঝা, ডাক্তার সব দেখানো হলো, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। রহিমার নিঃসন্তান থাকার কারণে সংসারে আবার অশান্তির ছায়া নেমে এলো। ফাতেমা বুঝতে পারল না ভুলটা কোথায় হচ্ছে। গ্রামীণ কুসংস্কারের কারণে সবাই ধরে নিল, হয়তো লাল মিয়ার ভাগ্যে কোনো ত্রুটি আছে অথবা নারীদের কোনো দোষ আছে। বংশের উত্তরাধিকারী পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবার লাল মিয়াকেও গ্রাস করতে শুরু করল। তার মনে হতে লাগল, সত্যিই তো, এত সম্পত্তি তিনি কার জন্য রেখে যাবেন?এই সন্তানহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং বংশের নাম টিকিয়ে রাখতে লাল মিয়া ফাতেমা ও রহিমার সম্মতিতে আবার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর শুরু হলো এক নির্মম সিলসিলা। রহিমার পর এলেন তৃতীয় স্ত্রী জুলেখা। জুলেখার ঘরেও দুই বছর কেটে গেল কোনো সুখবর ছাড়াই। এরপর একে একে চতুর্থ স্ত্রী বানু, এবং পঞ্চম স্ত্রী আমেনা লাল মিয়ার সংসারে এলেন। লাল মিয়ার বিশাল বাড়িটা এখন স্ত্রীদের কলহ আর কান্নায় এক নরককুণ্ডে পরিণত হলো। সন্তানের দেখা তো মিললই না, উল্টো সংসারে শুরু হলো তীব্র দ্বন্দ্ব-ফ্যাচাদ।পাঁচজন স্ত্রী একই ছাদের নিচে থাকায় হিংসা, পরনিন্দা আর ঝগড়া ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কে কার চেয়ে বেশি লাল মিয়ার মন জয় করতে পারে, কে সংসারের চাবি নিজের হাতে রাখবে, এই নিয়ে চলত ঠান্ডা লড়াই। ফাতেমা যে সুখের আশায় স্বামীকে আবার বিয়ে করিয়েছিল, সেই সুখ এখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। লাল মিয়া মাঠের কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ভয় পেতেন। ঘরে ঢুকলেই স্ত্রীদের একে অপরের বিরুদ্ধে নালিশ শুনতে শুনতে তার কান ঝালাপালা হয়ে যেত। তিনি মাঝেমধ্যে চিৎকার করে বলতেন, তোরা আমাকে শান্তি দে! আমি সন্তান চাই না, আমি শুধু একটু শান্তি চাই! কিন্তু নারীদের এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থামানোর সাধ্য লাল মিয়ার ছিল না। তার জীবনে ধন-সম্পত্তি যত বাড়ছিল, মানসিক শান্তি ততই তলানিতে গিয়ে ঠেকছিল।তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ষষ্ঠ স্ত্রী ও চরম সিদ্ধান্তপাঁচ স্ত্রীর সংসারে যখন নরক গুলজার, তখন লাল মিয়ার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কোঠায়। গ্রামের মাতব্বররা তাকে পরামর্শ দিলেন, লাল মিয়া, শেষ চেষ্টা হিসেবে আরেকটা বিয়ে করে দেখ। এবার একদম কম বয়সী কোনো মেয়েকে ঘরে তোলো, হয়তো তোমার বংশের প্রদীপ জ্বলে উঠবে। লাল মিয়া নিজের ভাগ্যকে শেষবারের মতো পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি বিয়ে করলেন গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারের তরূণী কন্যা সখিনাকে। সখিনা ছিল লাল মিয়ার ষষ্ঠ স্ত্রী।সখিনা যখন এই সংসারে পা রাখল, তখন অন্য পাঁচ সতিনের নির্যাতন আর কটূক্তি তার জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলল। সখিনা ছিল শান্ত ও বাধ্য। সে মুখ বুজে সব সহ্য করত। লাল মিয়া সখিনাকে একটু বেশি ভালোবাসতেন, কারণ সখিনার সরলতা তাকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে যাওয়ার পরও সখিনার কোলেও কোনো সন্তান এলো না। লাল মিয়া এবার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেন। তিনি বুঝলেন, দোষ স্ত্রীদের নয়, হয়তো তার নিজের ভাগ্যেই কোনো সন্তানের সুখ লেখা নেই।লাল মিয়ার বয়স তখন পঞ্চান্ন ছাড়িয়েছে। তার বিশাল জমিদারির যত্ন নেওয়ার কেউ নেই, শরীরের শক্তিও ধীরে ধীরে কমে আসছে। স্ত্রীদের নিত্যদিনের ঝগড়া আর নিঃসন্তান জীবনের হাহাকার তাকে এক চরম ও অদ্ভুত সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল। গ্রামের এক প্রবীণ মুরুব্বি ও কবিরাজ লাল মিয়াকে গোপনে ডেকে বললেন, লাল মিয়া, একটা কথা বলি মনে কিছু করিও না। তোমার এতগুলো বউ, কারও ঘরেই সন্তান হলো না। হতে পারে দোষটা তোমার নিজের শরীরের। তুমি যদি সত্যিই একটা সন্তান চাও, তবে তোমার এই ছোট বউ সখিনাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তার অন্য ঘরে সন্তান হয়, তবে বুঝবে দোষ তোমার ছিল। আর সখিনাকে তো তুমি ভালোবাসো, তার যদি সন্তান হয়, তবে সেই সন্তানকে তুমি পরে নিজের করে নিতে পারো।এই কথাটি লাল মিয়ার মাথায় গভীরভাবে গেঁথে গেল। তিনি সখিনাকে ডেকে আড়ালে অনেক কাঁদলেন। সখিনাও লাল মিয়াকে খুব শ্রদ্ধা করত। লাল মিয়া সখিনাকে বললেন, সখিনা, আমার এই সংসারে থেকে তোমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। সতিনদের অত্যাচার আর সন্তানের মুখ না দেখার বেদনা তোমাকে শেষ করে দিচ্ছে। আমি তোমাকে এই নরক থেকে মুক্তি দিতে চাই। আমাদের বাড়ির পাশেই থাকে এক গরিব কিন্তু সৎ যুবক, নাম তার কলিম। আমি তোমার সাথে কলিমের বিয়ে ঠিক করেছি। তুমি তাকে বিয়ে করে সুখী হও।সখিনা প্রথমে রাজি হয়নি। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কিন্তু লাল মিয়ার জেদ এবং সংসারের সার্বিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে অবশেষে সখিনা এই অদ্ভুত প্রস্তাবে রাজি হতে বাধ্য হলো। লাল মিয়া নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গ্রামের সমাজকে বুঝিয়ে সখিনাকে তালাক দিলেন এবং তার নিজের খরচে বাড়ির পাশের লোকটির সাথে সখিনার বিয়ে দিয়ে দিলেন। লাল মিয়া সখিনাকে বিয়ের পর কিছু জমিও দান করলেন যাতে তারা সুখে থাকতে পারে।চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সুজনের জন্ম ও নিয়তির খেলাসখিনা কলিমের ঘরে যাওয়ার পর লাল মিয়ার দিনগুলো এক অদ্ভুত শূন্যতায় কাটতে লাগল। বড় পাঁচ স্ত্রীর ঝগড়া আগের মতোই চলছিল, কিন্তু লাল মিয়া এখন আর সেসবে কান দিতেন না। তিনি শুধু দূর থেকে সখিনার খবর নিতেন। বিয়ের এক বছরের মাথায় রূপসা গ্রামে এক আনন্দের হাওয়া বয়ে গেল। খবর এলো, সখিনা গর্ভবতী। এই খবর শুনে লাল মিয়ার বুকে একাধারে আনন্দ ও এক তীব্র বেদনার মোচড় দিয়ে উঠল। আনন্দ হলো এই কারণে যে, সখিনা মা হতে পারছে। আর বেদনা হলো এই ভেবে যে, সত্যিই তবে দোষটা লাল মিয়ার নিজেরই ছিল, তার স্ত্রীদের নয়। তিনি এতদিন ধরে স্ত্রীদের ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি করেছিলেন, তার জন্য নিজের মনেই ক্ষমা চাইলেন।কয়েক মাস পর সখিনা এক ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। পুরো গ্রাম ভেঙে পড়ল সেই শিশুকে দেখতে। লাল মিয়াও লুকিয়ে লুকিয়ে সেই শিশুকে দেখে এলেন। শিশুটির নাম রাখা হলো সুজন। সুজন যখন পৃথিবীতে এলো, তখন তার গায়ের রঙ আর মুখের অবয়ব যেন এক অদ্ভুত মায়ায় ভরা ছিল। লাল মিয়া দূর থেকে সুজনকে দেখতেন আর তার বুকটা এক অজানা স্নেহে ভরে উঠত। তিনি মনে মনে ভাবতেন, এই সন্তান যদি আমার ঘরে হতো!কিন্তু নিয়তির খেলা বড়ই অদ্ভুত ও অলঙ্ঘনীয়। সুজনের জন্মের মাত্র এক বছরের মাথায় এক রাতে হঠাৎ করেই কলিম তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হলো। গ্রামের ডাক্তার ডাকার আগেই, মাত্র তিনদিনের মাথায় কলিম মারা গেল। সখিনা আবার অথই সাগরে পড়ল। এক বছরের এক শিশু সন্তানকে নিয়ে এই তরুণী বিধবা কোথায় যাবে, কী খাবে, তা নিয়ে গ্রামে নানা আলোচনা শুরু হলো। সখিনার বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না যে তারা সখিনা ও তার সন্তানের দায়িত্ব নেবে।সখিনার এই বিপদের কথা শুনে লাল মিয়ার মন কেঁদে উঠল। তিনি ভাবলেন, সখিনা একসময় তার স্ত্রী ছিল। আজ সে অসহায়। আর যে সুজনকে তিনি মনে মনে এত ভালোবেসে ফেলেছেন, সেই সুজন এখন পিতৃহীন। লাল মিয়ার বড় পাঁচ স্ত্রী ততদিনে বয়সের ভারে এবং নানা রোগে কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছে। লাল মিয়া এক মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি গ্রামের মাতব্বরদের ডাকলেন এবং সখিনাকে আবার নিজের ঘরে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, সখিনা আজ অসহায়, তার সন্তানও পিতৃহীন। আমি সখিনাকে আবার বিয়ে করে আমার ঘরে তুলতে চাই। আর সুজনকে আমি আমার নিজের সন্তানের মর্যাদা দেব। আমার এই বিশাল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হবে সুজন।গ্রামের মানুষ লাল মিয়ার এই মহত্ত্ব দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। সখিনাও লাল মিয়ার এই মহানুভবতার সামনে কৃতজ্ঞতায় নতজানু হলো। ধুমধাম করে না হলেও, ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে লাল মিয়া সখিনাকে আবার বিয়ে করলেন এবং সুজনকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। সুজনের জন্মের পর লাল মিয়া যেন এক নতুন জীবন ফিরে পেলেন। তিনি সুজনের আইনি বাবা হয়ে গেলেন এবং কাগজের কলমে নিজের সমস্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ বানিয়ে দিলেন এই ছোট শিশুকে।পঞ্চম পরিচ্ছেদ: কালের খেয়া ও স্ত্রীদের বিদায়সুজন লাল মিয়ার ঘরে আসার পর সংসারের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেল। লাল মিয়া সুজনকে চোখের আড়াল করতে পারতেন না। মাঠে যাওয়ার সময় সুজনকে কোলে নিয়ে যেতেন, রাতে সুজনকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন। সুজনও লাল মিয়াকে নিজের আসল বাবা বলেই জানত এবং তাকে "আব্বা" বলে ডাকতে শুরু করল। সুজনের মুখে "আব্বা" ডাক শুনে লাল মিয়ার এত বছরের নিঃসন্তান জীবনের সমস্ত হাহাকার এক নিমেষে বিলীন হয়ে যেত।তবে সংসারের ভেতরের ঝড় পুরোপুরি থামেনি। লাল মিয়ার বড় পাঁচ স্ত্রী সুজনকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। তারা সুজনকে "পরের রক্ত" বলে কটূক্তি করত এবং সখিনাকে নানাভাবে গালিগালাজ করত। কিন্তু লাল মিয়া এবার ছিলেন কঠোর। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, সুজনের গায়ে যদি কেউ আঁচড় কাটে, তবে তাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে। লাল মিয়ার এই কঠোর রূপ দেখে সতিনরা আর সুজনের ক্ষতি করার সাহস পায়নি।ধীরে ধীরে কালচক্র আবর্তিত হতে লাগল। সুজন যত বড় হতে লাগল, লাল মিয়ার স্ত্রীদের বয়সও তত বাড়তে লাগল। মানুষের জীবন তো চিরস্থায়ী নয়। প্রথম ধাক্কাটা এলো বড় বউ ফাতেমার মৃত্যুর মাধ্যমে। ফাতেমা দীর্ঘকাল রোগে ভুগে এক রাতে লাল মিয়ার হাত ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। মৃত্যুর আগে ফাতেমা সখিনা ও সুজনের হাত লাল মিয়ার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, আমাকে মাফ করে দিও লাল মিয়া। আমি তোমাকে সন্তান দিতে পারিনি, কিন্তু আজ সুজনকে দেখে আমার আত্মা শান্তি পাচ্ছে। তুমি সুজনকে নিয়েই সুখে থাকো। ফাতেমার মৃত্যুর পর লাল মিয়া অনেক কেঁদেছিলেন, কারণ ফাতেমাই ছিল তার জীবনের প্রথম ।

লালমিয়ার জীবনের লেখা লিখতে গিয়ে আমার কাছেও খুব খারাপ লেগেছিল উপন্যাসটি কেমন হলো লিখে জানাতে পারেন।

Comments

    Please login to post comment. Login