পর্ব ১: অন্ধকারের পদচিহ্ন
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
চারদিকে এমন নীরবতা যে নিজের শ্বাসের শব্দও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। গ্রামের শেষ মাথার কাঁচা রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটছিল রাফি। আকাশে মেঘ জমেছে, চাঁদের আলো বারবার মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।
আজ সে ভুল করেছে।
অনেক বড় ভুল।
বন্ধুদের নিষেধ অমান্য করে সে শর্টকাট রাস্তা ধরেছে। এই রাস্তার পাশেই বহু বছর আগে পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া জমিদার বাড়ি। লোকজন বলে, সন্ধ্যার পর ওই পথ দিয়ে কেউ হাঁটে না।
কারণ?
কেউ জানে না।
কেউ বলতে চায় না।
রাফি এসব গল্পে বিশ্বাস করত না।
কিন্তু আজ তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।
হঠাৎ...
খস... খস...
তার পেছনে শুকনো পাতার উপর কারও হাঁটার শব্দ।
রাফি থেমে গেল।
শব্দও থেমে গেল।
সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু রাস্তার দুপাশে কালো গাছ আর বাতাসে দুলতে থাকা ডালপালা।
“মনের ভুল,” নিজেকে বলল সে।
আবার হাঁটা শুরু করল।
খস... খস...
আবার সেই শব্দ।
এবার যেন আরও কাছে।
রাফির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
পেছনের শব্দও দ্রুত হতে লাগল।
এমন মনে হচ্ছিল, কেউ একজন ঠিক তার পেছনে হাঁটছে।
একদম পেছনে।
কিন্তু যখনই সে ফিরে তাকায়—
কেউ নেই।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—সাব্বির।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে সাব্বিরের কাঁপা গলা।
“রাফি... তুই কোথায়?”
“রাস্তার মধ্যে। কেন?”
“তুই কি জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে আসছিস?”
রাফি অবাক হলো।
“হ্যাঁ। কিন্তু তুই জানলি কীভাবে?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সাব্বির ফিসফিস করে বলল—
“তোর পেছনে যে দাঁড়িয়ে আছে... সে কে?”
রাফির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কী বলছিস?”
“ভিডিও কলে আয়।”
রাফি কাঁপা হাতে ভিডিও কল চালু করল।
স্ক্রিনে নিজের মুখ দেখতে পেল।
আর...
নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লম্বা কালো ছায়া।
রাফি ভয়ে চিৎকার করে পেছনে ফিরল।
কেউ নেই।
কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে ছায়াটা তখনও দাঁড়িয়ে।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো—
ছায়াটার মুখ নেই।
চোখ নেই।
শুধু কালো একটা অবয়ব।
হঠাৎ ফোনের স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে গেল।
একটা বিকৃত শব্দ শোনা গেল।
তারপর কানে এল কর্কশ ফিসফিসানি—
“পেছনে তাকিও না...”
রাফির হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।
চারপাশের বাতাস হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।
তার মনে হলো, কেউ একজন তার কানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সে সাহস করে পেছনে তাকাল না।
সে দৌড়াতে শুরু করল।
যত দ্রুত সম্ভব।
কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর সে বুঝতে পারল—
সে একই জায়গায় ফিরে এসেছে।
সামনেই জমিদার বাড়ির ভাঙা গেট।
সে আবার দৌড়াল।
আবার।
আবার।
প্রতিবারই ফিরে এল সেই একই গেটের সামনে।
মনে হচ্ছিল পুরো রাস্তা তাকে বন্দি করে ফেলেছে।
ঠিক তখনই জমিদার বাড়ির ভেতর থেকে একটা আলো জ্বলে উঠল।
বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত বাড়িতে আলো?
রাফি স্থির হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে গেটের ওপাশে একটা মেয়ে দেখা দিল।
সাদা পোশাক।
লম্বা চুল।
মাথা নিচু।
মেয়েটা আস্তে আস্তে মাথা তুলল।
তার মুখ দেখে রাফির বুকের রক্ত যেন জমে গেল।
কারণ—
মেয়েটার চোখ থাকার জায়গায় ছিল শুধু অন্ধকার।
গভীর, শেষহীন অন্ধকার।
আর তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর হাসি।
“তুমি দেরি করে ফেলেছ...”
বলে সে হাত তুলে জমিদার বাড়ির ভেতরের দিকে ইশারা করল।
“ও এখন তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।”
রাফির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
কারণ এবার সে অনুভব করল—
তার ঘাড়ের ঠিক পেছনে কেউ একজন ঠান্ডা হাত রাখল...
চলবে...