Posts

নন ফিকশন

আদর্শ ছেলে

June 21, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

9
View

আদর্শ ছেলে
ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনের সেই সরু, ভিড়ে ভরা গলিটার নাম ছিল ব্লক ডি’র অভ্যন্তরীণ রাস্তা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশার ঘণ্টি, ভ্যানের হর্ন, চায়ের দোকানের আড্ডা আর মসজিদের আজান মিলেমিশে একটা পরিচিত সুর তৈরি করত। সেই গলির মাঝখানে একটা পুরনো তিনতলা বাড়ির দোতলায় থাকত ইনসান আহমেদ। বয়স তখন তার একত্রিশ পেরিয়ে দুই। লম্বা, ছিপছিপে গড়নের মানুষ, চোখে সবসময় একটা শান্ত, বিশ্বাসী দৃষ্টি। মুখে হালকা দাড়ি, পরনে সাধারণ শার্ট-প্যান্ট। পাড়ার প্রায় সবাই তাকে দেখলেই বলত, “ইনসান ভাইয়ের মতো ছেলে হয় না। বড় হয়েও এত নম্র, এত দায়িত্বশীল।” তার নামটা তার বাবা মোঃ রফিকুল ইসলাম রেখেছিলেন—‘ইনসান’, অর্থাৎ মানুষ। আর সে সারাজীবন ধরে সেই নামের যোগ্যতা প্রমাণ করে চলেছিল, কোনো অহংকার ছাড়া, কোনো দেখানো ছাড়া।
আমি এই গল্পটা লিখছি একজন সাধারণ লেখক হিসেবে, যে একই পাড়ায় থাকি অনেক বছর ধরে। ইনসানের পরিবারের কোনো সদস্য নই, কিন্তু তাদের জীবনের অনেক ঘটনা কাছ থেকে দেখেছি, শুনেছি। এটা কোনো সিনেমার নাটকীয় গল্প নয়। এটা আমাদের চারপাশের বাস্তব জীবনের মতোই—ছোট ছোট সংগ্রাম, প্রতিদিনের হাসি-কান্না, পরিবারের দায়িত্ব, অফিসের চাপ, প্রতিবেশীর সমস্যা আর নীরব ত্যাগের গল্প। কোনো অধ্যায় নেই, কোনো পর্ব নেই। শুধু টানা একটা লম্বা বর্ণনা, যেমন আমাদের অনেক পরিবারের জীবন চলে বছরের পর বছর।
ইনসানের শৈশব কেটেছে খুব সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণত্বের মধ্যেই তার চরিত্র গড়ে উঠেছিল। তার বাবা সরকারি অফিসে ক্লার্কের চাকরি করতেন। মা আয়েশা বেগম সারাদিন রান্না, ঘরের কাজ আর ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা করতেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে ইনসান সবার বড়। ছোট ভাই রাহাত আর ছোট বোন সুমি। বাড়িতে অভাব ছিল না ঠিকই, কিন্তু বিলাসিতা বলতে কিছুই ছিল না। নতুন জামা কিনতে হলে বাবার মাসের শেষের টাকা দেখে হিসাব করতে হতো। ইনসান মিরপুরের একটা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ত। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বাবার সাথে বের হতো। স্কুলে যাওয়ার পথে ছোট ছোট দোকান থেকে চানাচুর কিনে খেতে খেতে যেত। স্কুলে সে খুব মেধাবী ছিল না, তবে অসম্ভব পরিশ্রমী। ক্লাস ফাইভের ফাইনালে চতুর্থ হয়েছিল। বাড়ি ফিরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আব্বা, পরেরবার আরও ভালো করব। আপনি চিন্তা করবেন না।” বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “তুই যেমন আছিস তাতেই আমি খুশি।”
স্কুলে একটা ঘটনা সবাই মনে রেখেছিল। ক্লাসের এক ছেলে সোহেল তার টিফিন চুরি করেছিল। সোহেল খুব গরিব, তার বাবা অসুস্থ। অন্য ছেলেরা সোহেলকে মারতে চাইছিল। ইনসান সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “থামো সবাই। চুরি করা ঠিক না, কিন্তু খিদে পেলে বলতে হয়।” তারপর সে নিজের টিফিন সোহেলের সাথে ভাগ করে খেয়েছিল। সেই থেকে সোহেল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পাড়ায়ও এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে বলত, “ইনসান ভাইকে ডাকো, সে ঠিক করে দেবে।” একবার পাড়ার এক বুড়ো চাচা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ইনসান স্কুল ফেরত তার বাড়িতে গিয়ে পানি এনে দিয়েছিল, ওষুধ কিনে এনেছিল।
বয়স চোদ্দতে বড় সমস্যা এল। বাবার অফিসের উপরওয়ালা ঘুষের চাপ দিয়েছিলেন। বাবা রাজি হননি। ফলে সাসপেন্ড। বাড়িতে হঠাৎ টাকার অভাব। মা রান্নাঘরে চুপচাপ কাঁদতেন। রাহাত আর সুমি ছোট, তারা ভয়ে জড়িয়ে থাকত। ইনসান তখন ক্লাস নাইনে। সে রাত জেগে পড়ত, আর দিনে বাজার করে, ছোট ছোট টিউশনি খুঁজত। প্রথম টিউশনি পেল ক্লাস থ্রির এক ছেলেকে। মাসে আড়াই হাজার। সেই টাকায় বাড়ির চাল-ডাল চলত। ছয় মাস পর বাবা চাকরিতে ফিরলেন। কিন্তু ইনসানের সেই পরিশ্রম পরিবার কখনো ভোলেনি। মা বলতেন, “আমার বড় ছেলেটা যেন আল্লাহর রহমতে সবসময় ভালো থাকে।”
এইচএসসির সময় ইনসান আরও কঠিন পরিশ্রম করল। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত পড়ত। টেবিলে পানির বোতল আর বইয়ের স্তূপ। ফলাফল এল জিপিএ ৪.৭৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগে চান্স পেল। ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিন থেকেই চ্যালেঞ্জ। র‍্যাগিং। সিনিয়ররা নতুন ছাত্রদের হেনস্তা করছিল। ইনসান সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভাইয়েরা, আমরা সবাই শিক্ষার জন্য এসেছি। এভাবে করলে কি লাভ?” তার সাহস দেখে অনেক সিনিয়র সম্মান করতে শুরু করল। কেউ কেউ বলল, “ইনসান, তুই ঠিক আছিস।”
ইউনিভার্সিটিতেই পরিচয় হলো রিয়ার সাথে। রিয়া অর্থনীতি বিভাগে। শান্ত, লম্বা চুল, চোখে চশমা। লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসে পড়ত। প্রথমে কথা শুধু বই আর ক্লাস নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত। রিয়া বলল, “তোমার পরিবারের কথা বলো।” ইনসান সব খুলে বলল—বাবার সাসপেনশন, টিউশনি, ভাইবোনের দায়িত্ব। রিয়া মুগ্ধ। এক বৃষ্টির দিনে ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে রিকশায় আটকে পড়ল। রিয়া বলল, “ইনসান, তুমি সত্যিই আলাদা। অন্য ছেলেরা এত দায়িত্ব নেয় না।” ইনসান হেসে বলল, “আলাদা কিছু না রিয়া। শুধু মানুষের মতো চেষ্টা করি। জীবন তো একটাই।”
ইউনিভার্সিটি শেষ করে ইনসান একটা মাঝারি মার্কেটিং কোম্পানিতে জয়েন করল। শুরুর স্যালারি পনেরো হাজার। বাড়িতে টাকা দিত, রাহাতের পড়া দেখত। অফিসে তার স্বভাব একই। বস অযৌক্তিক টার্গেট দিলে ইনসান ডেটা আর আইডিয়া দিয়ে বুঝিয়ে বলত। অনেক সময় সফল হতো। কিন্তু প্রমোশনের সময় ফ্ল্যাটারি করা একজন তাকে টপকে গেল। ইনসান হতাশ হয়েছিল। বাড়ি ফিরে মাকে বলল, “মা, চিন্তা করবেন না। আল্লাহ ভালো করবেন। আমি আরও পরিশ্রম করব।” রাতে ফিরে সে ল্যাপটপ খুলে ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতে শুরু করল। ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্মে প্রোফাইল খুলল। প্রথম প্রজেক্টগুলো ছোট, পেমেন্ট কম। কিন্তু রিভিউ ভালো হতে লাগল। মাসে অতিরিক্ত বিশ-পঁচিশ হাজার আয় হতে শুরু করল।
রিয়ার সাথে সম্পর্ক গভীর হচ্ছিল। রিয়ার বাবা একদিন বাসায় ডাকলেন। দুপুরের খাবারের পর অনেক প্রশ্ন। ইনসান খোলাখুলি বলল তার পরিকল্পনা, পরিবারের দায়িত্ব। রিয়ার বাবা বললেন, “ছেলে, তোমার মতো দায়িত্বশীল ছেলে বিরল।” বিয়ে হলো খুব সাধারণভাবে। পাড়ার মসজিদে আকদ, বাড়িতে অল্প আত্মীয়স্বজন। কোনো বড় অনুষ্ঠান নয়। মা আয়েশা খুব খুশি। বিয়ের পর তারা মিরপুরেই ছোট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিল। রিয়া প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করত। সকালে ইনসান চা বানিয়ে রিয়াকে দিত, রাতে ফিরে দুজনে বসে দিনের কথা বলত। ছোট ছোট আনন্দ—শুক্রবারে একসাথে বাজার করা, রাতে একসাথে রান্না করা।
কিন্তু জীবন সবসময় সহজ নয়। অফিসে বড় প্রজেক্ট ফেল হলো। কোম্পানি লসে। অনেককে ছাঁটাই। ইনসানকে রাখা হলো কিন্তু স্যালারি দশ হাজারে নেমে গেল। বাড়িতে টেনশন। রিয়া বলল, “আমি আরও টিউশনি নেব। তুমি চিন্তা কোরো না।” ইনসান রাত জেগে কাজ করত। ফ্রিল্যান্স বাড়িয়ে আয় স্থিতিশীল করল। এ সময় রাহাত ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো কিন্তু একটা মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ডিপ্রেশনে পড়ল। পড়াশোনা খারাপ। ইনসান ভাইকে নিয়ে অনেক রাত জেগে কথা বলত। “রাহাত, জীবন ম্যারাথন। একটা ভুলে সব শেষ হয় না। আমি তো আছি।” তাকে কাউন্সেলরের কাছে নিয়ে গেল। ধীরে ধীরে রাহাত সুস্থ হলো।
সুমির বিয়ে। ইনসান নিজে পাত্র দেখল, পরিবার যাচাই করল, সবকিছু ঠিক করল। বোনের শ্বশুরবাড়িতে ছোটখাটো সমস্যা হলে ইনসান গিয়ে মিটিয়ে দিত। বিয়ের তিন বছর পর তাদের ছেলে আরিফের জন্ম। ইনসান সুপার ড্যাড। রাতে আরিফ কাঁদলে নিজে কোলে নিয়ে ঘুরত, গান গাইত। অফিস ফিরে খেলত, গল্প বলত। রিয়া হাসত, “তুমি আমার চেয়েও বেশি যত্ন নাও আরিফের।” কিন্তু বড় ধাক্কা—বাবা হার্ট অ্যাটাক। হাসপাতাল। বাইপাস লাগবে, খরচ পাঁচ লাখের উপর। ইনসান সব সঞ্চয় বের করল, রিয়ার কিছু গয়না বন্ধক রাখল। অপারেশন সফল। বাবা সুস্থ হয়ে ফিরলেন। ইনসান বাবার পাশে বসে বলল, “আব্বা, আমরা সবাই আছি।”
পাড়ায় একবার ভয়াবহ বন্যা। অনেক ঘর ডুবে গেল। ইনসান অফিসের কলিগদের সাথে টাকা তুলল, কম্বল-খাবার কিনে নিজে বিতরণ করল। কোনো ছবি তুলল না, নাম চাইল না। পাড়ার ইমাম সাহেব বললেন, “ইনসান, তোমার মতো মানুষ কম।”
চাকরিতে প্রমোশন হলো। টিম লিডার। নতুন কর্মীদের সাথে বন্ধুর মতো। একজনের বাবা অসুস্থ, ইনসান নিজের পকেট থেকে অ্যাডভান্স দিল। “ফেরত দেওয়ার তাড়া নেই।” আরিফ বড় হচ্ছিল। ইনসান প্রতিদিন শেখাত, “লেখাপড়া করো, কিন্তু মানুষ হওয়া আগে। মিথ্যা বলো না, অন্যকে সাহায্য করো।” স্কুল থেকে ফিরে আরিফ বলল, “বাবা, বন্ধুরা বলে তুমি আদর্শ বাবা।” ইনসান ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আদর্শ হওয়া মানে নিজেকে ঠিক রাখা, বাবা।”
রাহাত বিদেশে চাকরি পেল। যাওয়ার আগে বলল, “ভাইয়া, তুমি না থাকলে আমি এতদূর আসতাম না।” ইনসানের চোখ ভিজে গেল। “তোরা সবাই ভালো থাকলেই আমি ভালো।” সুমির সংসারে সমস্যা হলে ইনসান মিটিয়ে দিত। রিয়ার সাথে সম্পর্ক এখনও গভীর। ছোট ঝগড়া হলে শান্তভাবে বসে কথা বলত। বছর গড়াল। ইনসানের চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু দায়িত্ব একই। মসজিদে যায়, প্রতিবেশীর খোঁজ নেয়, অসুস্থদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।
তার জীবন কোনো বড় অ্যাচিভমেন্টের গল্প নয়। এটা সাধারণ একজন মানুষের গল্প—যে প্রতিদিন ছোট ছোট সততা, দায়িত্ব আর ভালোবাসা দিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পাড়ার বয়স্করা বলেন, “ইনসানের মতো ছেলে সবার থাকলে সমাজ বদলে যেত।” ইনসান নিজেকে আদর্শ বলে মনে করে না। সে শুধু চেষ্টা করে ভালো মানুষ হতে, প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্তে।

Comments

    Please login to post comment. Login