শহরের ব্যস্ত জীবনে রাহুলের দিনগুলো কাটত কাজ আর একাকীত্বের মধ্যে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস, তারপর ছোট্ট ঘরে ফিরে নীরবতা—এই ছিল তার জীবন। বন্ধুদের আড্ডা, হাসি-আনন্দ সবকিছু থেকেই যেন দূরে সরে গিয়েছিল সে। ভালোবাসা নামের অনুভূতিটাকেও সে বিশ্বাস করতে ভুলে গিয়েছিল।
একদিন বিকেলে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল। অফিস থেকে বের হয়ে রাহুল একটি পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের ছাউনির নিচে দাঁড়াল। বৃষ্টির ফোঁটা রাস্তার ধুলো ধুয়ে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই একটি মেয়ে দৌড়ে এসে ছাউনির নিচে দাঁড়াল।
মেয়েটির হাতে ছিল কিছু বই, আর মুখে ছিল বৃষ্টির জল মেশানো হাসি।
“আজ মনে হয় বৃষ্টি কাউকে ছাড়বে না,” মেয়েটি হেসে বলল।
রাহুল একটু অবাক হয়ে তাকাল। অনেক দিন পর কেউ তার সঙ্গে এভাবে কথা বলেছে।
“হয়তো বৃষ্টিরও কিছু পরিকল্পনা আছে,” রাহুল বলল।
মেয়েটি হাসল। “আপনি কি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন?”
রাহুল উত্তর দিল না। শুধু মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটির নাম ছিল মায়া। সে কাছের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করত। বৃষ্টির কারণে বাস আসছিল না, তাই দুজনের কথা শুরু হলো। প্রথমে সাধারণ কথা, তারপর ধীরে ধীরে জীবনের গল্প।
মায়া বলল, “জীবনে কিছু মানুষ আসে, যারা খুব অল্প সময় থাকে, কিন্তু অনেক স্মৃতি দিয়ে যায়।”
রাহুল হেসে বলল, “অল্প সময়ের মানুষদের কি সত্যিই মনে রাখা যায়?”
মায়া শান্তভাবে বলল, “কখনো কখনো অল্প সময়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।”
কথাটা রাহুলের মনে দাগ কাটল।
বৃষ্টি থামতে থামতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাসস্ট্যান্ড প্রায় ফাঁকা। মায়া বলল, “আজকের দিনটা অদ্ভুত সুন্দর।”
রাহুল বলল, “কেন?”
“কারণ আজ একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে এত কথা বললাম। মনে হচ্ছে অনেক দিনের পরিচয়।”
রাহুলের মনে হলো, এই মেয়েটির মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে।
হঠাৎ মায়ার ফোন বেজে উঠল। কথা শেষ করে সে একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রাহুল জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক আছে?”
মায়া বলল, “হ্যাঁ। আসলে কাল আমার এই শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে।”
রাহুল অবাক হলো। “চলে যাবেন?”
“হ্যাঁ। বাবার অসুস্থতার কারণে অন্য জায়গায় যেতে হচ্ছে।”
এক মুহূর্তে রাহুলের মন খারাপ হয়ে গেল। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়।
সে বুঝতে পারল না কেন এত খারাপ লাগছে।
মায়া বলল, “অদ্ভুত না? একজন মানুষকে কয়েক ঘণ্টায় চেনা যায়, আবার কয়েক বছরেও চেনা যায় না।”
রাহুল ধীরে বলল, “হয়তো কিছু সম্পর্ক সময় দিয়ে তৈরি হয় না, অনুভূতি দিয়ে তৈরি হয়।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, “আজকের দিনটা আমি মনে রাখব।”
রাহুল বলল, “আমিও।”
দুজনেই জানত, হয়তো আর দেখা হবে না। তবুও সেই মুহূর্তটা যেন থেমে ছিল।
বিদায় নেওয়ার আগে মায়া একটি ছোট্ট কাগজ রাহুলের হাতে দিল।
“এটা কী?”
“বাড়ি গিয়ে পড়বেন।”
মায়া চলে গেল। রাহুল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
বাড়ি ফিরে কাগজটা খুলে দেখল।
লেখা ছিল—
“প্রিয় অচেনা মানুষ,
জানি না আমাদের আবার দেখা হবে কিনা। কিন্তু আজ আপনি আমাকে বুঝিয়েছেন, পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছে যারা নীরবতার মধ্যেও কথা বলতে পারে।
একদিনের পরিচয়, কিন্তু মনে হচ্ছে একটা সুন্দর গল্প।
ভালো থাকবেন।
—মায়া”
রাহুল সেই কাগজটা যত্ন করে রেখে দিল।
দিন চলে গেল। মাস চলে গেল। কিন্তু মায়ার কথা সে ভুলতে পারল না।
সে বুঝল, ভালোবাসা সব সময় দীর্ঘ সময়ের উপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো একটি দিন, একটি মুহূর্ত, একটি হাসি—একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
দুই বছর পর রাহুল একটি বইয়ের দোকানে গেল। সেখানে হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠ শুনল।
“আজও কি বৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন?”
রাহুল ঘুরে তাকাল।
মায়া দাঁড়িয়ে আছে।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই চুপ।
তারপর রাহুল হাসল।
“তুমি ফিরে এসেছ?”
মায়া বলল, “হ্যাঁ। আর ভাবলাম, যে গল্প একদিনে শুরু হয়েছিল, সেটার শেষটা জানা দরকার।”
রাহুল বলল, “শেষ কেন? কিছু গল্প তো শুরু হওয়ার পরই সুন্দর হয়ে যায়।”
মায়ার চোখে জল এসে গেল।
সে বলল, “তুমি কি এখনো সেই কাগজটা রেখেছ?”
রাহুল পকেট থেকে পুরোনো কাগজটা বের করল।
মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“তুমি এটা এতদিন রেখেছ?”
রাহুল বলল, “কারণ এটা শুধু একটা কাগজ ছিল না। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনের স্মৃতি।”
মায়া মৃদু হাসল।
সেদিন আবার বৃষ্টি নামল।
দুজনেই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল।
রাহুল মনে মনে ভাবল, কখনো কখনো ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। কখনো কখনো একদিনই যথেষ্ট—যদি সেই দিনটা সত্যি হয়।
আর সেই একদিনের ভালোবাসাই হয়ে উঠতে পারে সারাজীবনের গল্প।
9
View