আমার প্রিয় খালা মুখ ঢেকে কথা বলেন। বালকবেলায় এটি নিয়ে ভীষণ ভাবনায় পড়েছি। বড়কালে জেনেছি খালার একটা বা দুটো দাঁত কোঁকড়ানো -যেটি তিনি লোকসমাজে দেখাতে চান না বলে হাতে মুখ ঢেকে কথা বলেন। খালা পেশায় শিক্ষক মানুষ। শিশুদের পড়ান। বাচ্চাদের সামনে মুখ ঢাকেন কিনা জানি না।
মাঠে মুখ ঢেকে কথা বলার জন্য লাল কার্ড দেখেছেন প্যারাগুয়ের প্লেয়ার আলমিরন। কিন্তু মুখ ঢেকে কথা বললে লাল কার্ড কেন?
ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের কানে কানে কিছু বলা নতুন কিছু নয়। উত্তেজনা, স্লেজিং, মানসিক চাপ তৈরি -এসব খেলার অংশ বহু বছর ধরেই। কিন্তু খেলার মাঠে কথা বলার সময় কোন প্লেয়ার নিজের মুখ জার্সি বা হাত দিয়ে ঢেকে ফেললে সন্দেহ তৈরি হয় আসলে তিনি কি বলছেন। কেন তিনি কথা বলার ভঙ্গি গোপন রাখছেন? ঠিক এই প্রশ্ন থেকেই বিশ্ব ফুটবলের আইন প্রণেতারা নতুন নিয়মের পথে হেঁটেছেন। চলতি বিশ্বকাপ থেকেই মুখ ঢেকে কথা বলার কারনে ফুটবলারদের লাল কার্ড দেখানোর বিধান কার্যকর করা হয়েছে। আর এই আইনের প্রথম প্রয়োগটি হয়েছে প্যারাগুয়ের মিগুয়েল আলমিরনের বিপক্ষে।
ফুটবলের আইন প্রণয়ন সংস্থা আইএফএবি বলেছে, প্রতিটি পরিস্থিতি রেফারের বিবেচনায় মূল্যায়িত হবে। রেফারি যদি মনে করেন আচরণটি সন্দেহজনক, উস্কানিমূলক বা খেলার স্বার্থের পরিপন্থী, তাহলে সরাসরি বহিষ্কারের ক্ষমতা তার হাতে থাকবে।
আধুনিক ফুটবলে প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দী হয়। তবু মুখ ঢেকে কথা বললে ঠিক কি বলা হয়েছে, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেই সুযোগ ব্যবহার করে কেউ যদি বর্ণবাদী, বৈষম্যমূলক বা ঘৃণামূলক মন্তব্য করেন, তাহলে প্রমাণ সংগ্রহ করাও জটিল হয়ে যায়।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতে, নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য মূলত প্রতিরোধ তৈরি করা। কোন খেলোয়ার যদি এমন কিছু বলেন যা প্রকাশ্যে বললে সমস্যা হতো, তখনই তিনি মুখ ঢাকার প্রয়োজন অনুভব করেন। লুকানোর কিছু না থাকলে মুখ ঢাকার প্রয়োজন নেই। হলে মুখ ঢেকে কথা বলার অভ্যাসটিকেই নিরুৎসাহিত করতে চায় সংস্থাটি।
হাজার বছরের সংযোজন-বিয়োজন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির নিরিখে আজকের বিশ্বসভ্যতা আধুনিক রূপ পেয়েছে। এখন যে আইনটি বলবৎ আছে সেটিও যথোপযুক্ত বিবেচিত না হতে পারে যদি যেকোনো প্রকার ছল বা চাতুরিতে বহুত্ববাদী মনুষ্যত্ব বাধাগ্রস্ত হয়, মানুষে মানুষে বৈষম্য বা বিভাজনের সামান্যতম রূপরেখাও প্রতিভাত হয়।
আমরা ফিফার নতুন আইনের নিরিখে দেখতেই পাচ্ছি, মানুষ যখন মুখ ঢেকে কথা বলে সেটি মানবোচিত বা মানুষের স্বভাবজাত আচরণ নয়। পারস্পরিক সংলাপের সময় আমি যখন মুখ খোলা রেখে কথা বলছি তখন অপরপক্ষ যদি মুখ ঢেকে রাখে সেটি পুরোদস্তুর আধুনিক সভ্যতা বিরোধী। মুখ ঢেকে রাখা মানুষটি আমার প্রতি ঘৃণাসূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে কিনা, আমার কথায় সে বিরক্ত হচ্ছে কিনা, আমি তার বেদনার কারণ হচ্ছি কিনা এর কিছুই মালুম করা যাবে না। পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার জন্য যেটি মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা।
ফিফার আইনটি হয়ত একশ্রেণীর বাঙালি ছাড়া আর সবার জন্য প্রযোজ্য। কারণ অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো, বৈষম্য প্রকাশ করা এবং বর্ণবাদী আচরণ আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। পরের বদনামে আমরা আত্মতৃপ্তি বোধ করি।ৎআইন দিয়ে এই বদ স্বভাব কেউই বদলাতে পারবে না।
যদিও ধর্মশাস্ত্রগুলো নারীর মুখ ঢেকে রাখায় কঠোর নির্দেশনা প্রদান বা বিধিনিষেধ আরোপ করে না তবু আমাদের ধর্মগুরুরা ফতোয়া দেন নারীর ওপর মুখ ঢেকে রাখা অবশ্য কর্তব্য। এরা এটা অনুধাবন করেন না যে, বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট কিংবা মেডিকেলের একজন ছাত্রী যখন উচ্চতর শিক্ষার জন্য অক্সফোর্ড বা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে -তখন সেখানকার রীতিনীতি ও প্রচলিত নিয়মের সাথে কিভাবে মুখঢাকা নারীটি নিজেকে খাপ খাওয়াবে। বাংলাদেশ তো গবেষণামূলক হায়ার স্টাডিজে এখনো সক্ষমতা অর্জন করেনি। নারীকে বাইরে যেতেই হবে। ইনফ্যাক্ট আমরা সবাই আন্তর্জাতিক মানুষ -দেশের তথাকথিত ট্যাবুর ঘেরাটোপে বন্দি থাকা মানুষের কৃতকর্ম হতে পারে না। অবশ্য তারা বলবে নারীর পড়ালেখার কী দরকার! নারী ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়বে -শুধু স্বামীর হিসাব ঠিক রাখবে আর সন্তান উৎপাদন ও পতিসেবাই তার একমাত্র ব্রত।
সমস্ত নৈতিকতা ও লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে ঘণিষ্ঠ সহযোগীর বউকে ভাগিয়ে নিয়ে আগের স্ত্রী সন্তানের অগোচরে হোটেলে গিয়ে হানিমুন করলে পরস্ত্রীর মুখ ঢাকবার জরুরত আছে বৈকি।
প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ-এর লেখা 'মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে' শীর্ষক একটি কবিতা আছে। কবিতাটির মূল সারমর্ম হলো আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের আত্মপরিচয় ও মানবিক সত্তা হারিয়ে যাওয়া। কিন্তু আজকের বাঙালি নারীর নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলতে বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য লাগছে না। মুখ ঢেকে রেখেই সে নিজেদেরকে পশ্চাৎপদতার নিমজ্জনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এমন দূরাবস্থা দূরীভূত করতে কে দেখাবে ওই মোক্ষম লাল কার্ড। যাতে আমরা শুদ্ধাচারী যানুষ হিসেবে পরস্পরের সামনে কথা বলবার ভঙ্গিমাটা না লুকিয়ে উভয়ে উভয়ের কাছে সৎ ও স্বতঃসিদ্ধ থাকি।
লেখক: সাংবাদিক
২১ জুন ২০২৬