Posts

গল্প

টাইটেল: ছায়াপুরের বুড়ো বটের রাত-বিরেতে কাণ্ড

June 22, 2026

MD Samiul Mirza

21
View

**গ্রামের নাম:** ছায়াপুর  
**বটগাছের নাম:** বুড়ো বট  
**চরিত্র:** রাফি, শুভ, তপু — তিনজনই ক্লাস সেভেন, একই বেঞ্চে বসে, টিফিন ভাগ করে খায়, আর ঝগড়া হলেও পাঁচ মিনিটে আবার দোস্ত।

---

ছায়াপুর গ্রামের কালীবিলের পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে **বুড়ো বট**। গাছটার বয়স কেউ জানে না। মা-চাচিরা বলে, তাদের দাদার দাদাও নাকি ছোটবেলায় এর ঝুরি ধরে ঝুলেছে। গুঁড়িটা এত মোটা যে তিনজন মিলেও জড়িয়ে ধরা যায় না। দিনের বেলা ছাগল বাঁধা হয়, বুড়ারা বিচার বসায়, কিন্তু সূর্য ডুবলেই সবাই বলে — "ওদিকে যাইস না, ব্রহ্মদৈত্য লাটিম ঘুরায়।"

স্কুল ছুটির পর সেদিন ক্রিকেট ম্যাচ। রাফির ছক্কায় বল উড়ে গিয়ে পড়ল একদম বুড়ো বটের কোটরে।

                            ( বল পড়ার পরে তাদের মধ্যে কথোপকথন)

**রাফি** : কাম সারছে! আমার আব্বার নতুন কেনা বল। না আনলে আজকে পিঠে ক্রিকেট পিচ বানাবে।  
**তপু** : ভাই, আমি আগেই কইছি এই গাছ ভালো না। পরশু রাতে দাদি স্বপ্নে দেখছে সাদা কাপড় পরা কে যেন ঝুরি বেয়ে নামতেছে।  
**শুভ** : তোর দাদি তো ঝালমুড়ি খাইয়া স্বপ্ন দেখে। আরে, ভূত থাকলে হেডমাস্টার স্যার এতদিনে বদলি হইতো না? স্যার তো রোজ সন্ধ্যায় এই পথেই সাইকেল চালায়।

তিনজন গুটি গুটি পায়ে গাছের নিচে গেল। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক আর বিলের ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাং। হঠাৎ বটের মগডাল থেকে ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দ।

**তপু** : ও মা গো! কইলাম না? ব্রহ্মদৈত্য দোল খাইতেছে!  
**রাফি** : দোস্ত, তুই দোয়া ইউনুস পড়। আমি বলটা নিয়া ভাগি।  
**শুভ** : খাড়া খাড়া। ভূত হইলে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করবো কেন? ভূত করবে ‘হাউ মাউ খাউ’। এইটা তো মনে হয়...  
**রাফি** : মনে হয় কী?  
**শুভ** : মনে হয় আমার পেট। দুপুরে খালার বাসায় পেট ভইরা গরুর গোশত খাইছি তো!

তপুর ভয় কাটে না, কিন্তু রাফি হেসে গড়াগড়ি খায়। শুভ ততক্ষণে সাহস করে একটা কঞ্চি দিয়ে কোটরে খোঁচা দেয়। সাথে সাথে ‘ফরররর’ করে এক ঝাঁক বাদুড় উড়ে বের হয়। আর কোটর থেকে ধপাস করে পড়ে রাফির বল, সাথে একটা পুরনো মাটির হাঁড়ি।

**তিনজন একসাথে** : ভূতের ডিম!!!  
**তপু** : না না, এইটা গুপ্তধন! সিনেমায় দেখছি, বটগাছের নিচে সোনার মোহর থাকে।  
**রাফি** : চুপ কর। হাঁড়ি ভাঙলে যদি ভূতের বাচ্চা বের হয়?  
**শুভ** : আরে বোকা, এইটা আমার দাদার আমলের দইয়ের হাঁড়ি মনে হয়। নানিরে জিগাইলে কইবো, যুদ্ধের সময় দই লুকাইয়া রাখছিল।

তপু কাঁপা হাতে হাঁড়ির মুখ খোলে। ভেতর থেকে বের হয় এক দলা শুকনো পাতা, দুইটা কাঁচের গুলি, আর একটা মরচে ধরা কৌটার ভিতর ছোট্ট একটা চিরকুট: *“যদি কেউ পাস, মনে রাখিস — ভয় পাইলেই ভূত, সাহস করলেই বন্ধু। — কাদের, ১৯৭১”*

তিনজন চুপ হয়ে যায়। বুকের ভেতরটা কেমন শিরশির করে ওঠে, তবে এবার ভয়ে না।

**শুভ** : বুঝলি রাফি, আব্বা ঠিকই কইছিল। যুদ্ধের সময় নানা-চাচারা এই বুড়ো বটে লুকাইতো। গুলি খেলতো, চিরকুট লিখতো।  
**রাফি** : তার মানে এই গাছ ভূতের না রে, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদু।  
**তপু** : তাহলে এতদিন আমি কারে ভয় পাইলাম? ধুর! আমার মান-ইজ্জত সব বিলে ধুইয়া গেল।

ঠিক তখনই আবার শব্দ। এবার ‘সোঁ সোঁ’ করে বাতাস, আর ঝুরিগুলো দুলে উঠে তপুর গায়ে সুড়সুড়ি দেয়।

**তপু** : ওরে বাবা! ব্রহ্মদৈত্য কাতুকুতু দেয়!  
**রাফি** : আরে এইটা বাতাস! তুই ভূতের সাথে কাতুকুতু খেলবি নাকি?  
**শুভ** : খেললে খেলুক। তপু ভয় পাইলে আমরা বিনা টিকিটে সার্কাস দেখি।

তিনজন হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ে। রাফি বলটা নেয়, শুভ চিরকুটটা পকেটে রাখে, আর তপু মাটির হাঁড়িটা বুকে জড়ায়।

**তপু** : দোস্ত, একটা বুদ্ধি আসছে। কালকে স্কুলে টিফিনের টাকা বাঁচাইয়া রং কিনুম। এই বুড়ো বটের গায়ে লিখুম — *“ভূতের বাড়ি না, ইতিহাসের পাঠশালা। বাদুড় ভাড়াটিয়া, মানুষ মালিক।”*  
**রাফি** : আর নিচে লিখবি — *“ব্রহ্মদৈত্য ঢোকা নিষেধ, শুধু বন্ধুরা স্বাগতম।”*  
**শুভ** : আর আমি আব্বার কাছে কইয়া একটা ছোট মাচা বানামু। বিকালে আমরা তিনজন এখানে বইসা হোমওয়ার্ক করুম। ভূত আসলে অঙ্ক করামু, পালাইবো।

সন্ধ্যার আজান পড়ে যায়। পশ্চিম আকাশ লাল। বুড়ো বটের ফাঁক দিয়ে আলো এসে ওদের মুখে পড়ে। গাছটাকে এখন আর দৈত্য লাগে না, লাগে গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মুরুব্বি — যে কোলে বসিয়ে গল্প শোনায়।

**রাফি** : চল, দেরি হইলে আজকে সত্যি পিঠে পিচ বানাবে।  
**তপু** : খাড়া, গাছটারে একটা সালাম দিয়া লই।  
**তিনজন একসাথে** : আসসালামু আলাইকুম, বুড়ো দাদু। কালকে আবার আসমু, মোমবাতি নিয়া।

ওরা দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। পেছনে বুড়ো বট দাঁড়িয়ে থাকে, ঝুরির ফাঁকে ফাঁকে বাদুড়, ইতিহাস আর তিন বন্ধুর হাসি-ভয়-ঠাট্টার সাক্ষী হয়ে।

---

**সারমর্ম:**  
ছায়াপুরের বুড়ো বটকে নিয়ে গ্রামে ব্রহ্মদৈত্যের গুজব। তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাফি, শুভ, তপু বল কুড়াতে গিয়ে ভয় পায়, হাসি-ঠাট্টা করে, আর শেষে আবিষ্কার করে গাছের কোটরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতি — কাঁচের গুলি আর একটা চিরকুট। ভয় কেটে গিয়ে ওরা বোঝে, এই গাছ ভূতের আস্তানা না, বরং গ্রামের ইতিহাস আর আশ্রয়ের প্রতীক। ঠাট্টা, ভয় আর বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে ওরা ঠিক করে গাছটাকে সম্মান জানাবে, সাইনবোর্ড লাগাবে, আর নিয়মিত এখানে আড্ডা দেবে। গল্পটা দেখায়, জানাশোনা বন্ধুরা একসাথে থাকলে ভয়ও হয়ে যায় মজার গল্প।

Comments

    Please login to post comment. Login