Posts

গল্প

গল্পের নাম: “টিফিন বক্স”

June 22, 2026

MD Samiul Mirza

43
View

((বাবা ও ছেলের সম্পর্ক))

---

“আব্বু, মোজা কই আমার?”  
“খাটের নিচে দেখ। কালকেই তো বললাম গুছিয়ে রাখতে।”  
“ধুর, পাই না। এক পাট নীল, এক পাট কালো পরে যাই?”  
“যা। স্যার ভাববে নতুন ফ্যাশন। টিফিন নিছিস?”  
“হুম। আজকে কী দিছো?”  
“ডিম ভাজি আর পরোটা। আর একটা ছোট্ট চিরকুট।”  
“চিরকুট! আবার? ক্লাসের সবাই হাসে আব্বু।”  
“হাসলে হাসুক। আমি তো আর ওদের আব্বু না। তোর আব্বু।”  
“আচ্ছা, দেরি হইতেছে। গেলাম।”  
“শোন, রাস্তা পার হবি দেখে। আর...”  
“আর কী?”  
“আজকে বিকালে তোর সাথে ক্রিকেট খেলব। কথা দিলাম।”  
“সত্যি? প্রমিজ?”  
“বাবাদের প্রমিজ ভাঙতে নাই। যা এখন।”

*দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। স্কুলের ঘণ্টা বাজে দূরে।*

---

**তারপর থেকে কাহিনী শুরু**

দুপুর ১টা ২০। সিরাজগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।  
ক্লাস থ্রি-এর রাহাত টিফিন বক্স খোলে। ডিম ভাজির নিচে ভাঁজ করা কাগজ।

*“আব্বু, আজকে যদি কেউ তোকে ‘মা নাই’ বলে খ্যাপায়, তুই বলবি — ‘আমার আব্বুই আমার মা-বাবা দুইটাই। আর সে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার।’ — ইতি, তোর আব্বু”*

রাহাত চিরকুটটা পকেটে ঢুকায়। পাশ থেকে সিফাত বলে ওঠে, “কিরে, তোর আব্বু আবার লাভ লেটার দিছে?”  
সবাই হেসে ওঠে। রাহাত কিছু বলে না। চুপচাপ খায়।

২টা ১০। ছুটির ঘণ্টা।  
স্কুল গেটে অন্য বাচ্চাদের মা-রা দাঁড়িয়ে। রাহাত একা একা হাঁটে। হঠাৎ পেছন থেকে সিফাত দৌড়ে আসে, ব্যাগ ধরে টান দেয়।  
“এই এতিম, তোর টিফিন বক্স কে দেয় রে?”  
রাহাতের হাত মুঠো হয়। বাবার কথা মনে পড়ে — ‘মারামারি করবি না, কিন্তু নিজের সম্মান ছাড়বি না’।  
“আমার আব্বু দেয়,” শান্ত গলায় বলে রাহাত। “আমার আব্বুই আমার মা-বাবা দুইটাই। আর সে বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার।”

সিফাত থতমত খেয়ে যায়। ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন হাততালি দেয়। স্যার বারান্দা থেকে দেখছিলেন।

**বিকাল ৫টা**  
মাঠে রাহাত আর তার আব্বু জামিল। জামিল রিকশা চালায়। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ট্রিপ মারে, তারপর বাসায় এসে রান্না করে, কাপড় ধোয়, রাহাতকে পড়ায়।

“আব্বু, আজকে সিফাতরে বলছি তুমি অলরাউন্ডার।”  
জামিল বল করে। “ব্যাট চালা। আর কী বলছিস?”  
“বলছি তুমি রান্নাও করো, রিকশাও চালাও, আবার আমার সাথে খেলো। তাই অলরাউন্ডার।”  
জামিলের বলটা ওয়াইড হয়। সে হাসে। “আর তুই? তুই কী?”  
“আমি? আমি তোমার ছেলে। এটাই আমার প্রফেশন।”

রাহাত ছক্কা মারে। বল গিয়ে পড়ে পাশের ডোবায়। দুজন দৌড় দেয় বল তুলতে।

**রাত ৯টা**  
জামিল রাহাতের খাতা দেখে। অঙ্কে ১২ তে ৭।  
“আব্বু, বকবা?”  
“না। কালকে সকালে আবার করব। এখন ঘুমা।”  
“আব্বু, তুমি যে সকালে রিকশা চালাও, কষ্ট হয় না?”  
“হয়। কিন্তু তোর টিফিন বক্সের ঢাকনা খোলার শব্দটা শুনলে সব কষ্ট ভ্যানিশ।”  
“আব্বু, আমি বড় হয়ে কী হবো?”  
“তুই বড় হয়ে ‘মানুষ’ হবি। আর আমি কী হবো জানিস?”  
“কী?”  
“তোর ছেলের দাদা। যাতে তাকেও বলতে পারি — ‘তোর আব্বুও একসময় টিফিন বক্সে চিরকুট পেত’।”

রাহাত ঘুমিয়ে যায়। জামিল টেবিলে বসে কালকের চিরকুট লেখে।

*“আব্বু, আজকে যদি অঙ্কে ভুল হয়, ভয় পাবি না। তোর আব্বুও একসময় নামতা ভুলে গিয়ে শাস্তি পাইছিল। পরে কী হইছে জানিস? তোর দাদা কান ধরে বলছিল — ‘ভুল করলেই মানুষ শেখে’। — ইতি, তোর আব্বু”*

**শেষ নয়**  
কারণ বাবা-ছেলের গল্প শেষ হয় না। শুধু টিফিন বক্সের ভেতর চিরকুটের লাইন বদলায়। ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস টেন, রিকশা থেকে চাকরি, তারপর একদিন রাহাতের নিজের ছেলে স্কুলে যায়।

আর ভোরবেলা জামিল ফোন দেয়, “কিরে, নাতির ব্যাগে চিরকুট দিছিস?”

এই গল্পের প্রফেশন একটাই — **বাবা হওয়া**। কোনো ছুটি নাই, কোনো বেতন নাই। শুধু ওভারটাইম ভালোবাসা।

তোমার কেমন লাগল এই ভার্সনটা? রাহাতের জায়গায় নিজেকে ভাবতে পারো?

Comments

    Please login to post comment. Login