একতারা ও ভাঙা কপালএকটি পূর্ণাঙ্গ আবেগঘন বাউল নাটকচরিত্রসমূহ:বাউল রতন: গ্রামের এক প্রতিভাবান কিন্তু দরিদ্র বাউল সাধক। প্রেম ও বিরহে তার জীবন কেটেছে।রহিমা: রতনের বাল্যকালের প্রেমিকা। সরল, ভাগ্যপীড়িত কিন্তু মনে-প্রাণে রতনের প্রতি উৎসর্গীকৃত।রহমান মিয়া: রহিমার বাবা। লোভী ও নিষ্ঠুর স্বভাবের লোক, যে টাকার লোভে মেয়ের জীবন ধ্বংস করে।হাজী মহসিন: এলাকার বৃদ্ধ, খিটখিটে মেজাজের এক প্রভাবশালী ধনী লোক (রহিমার জোরপূর্বক স্বামী)।মনসুর: রতনের একনিষ্ঠ বন্ধু এবং দোহার, যে রতনের সব সুখ-দুঃখের সাক্ষী।দৃশ্য ১: সুরের বাঁধন ও সোনালী অতীতস্থান: গ্রামের নদীর ধার, এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে।সময়: বিকেল বেলা। সূর্যের আলো তখনো নরম হয়ে আছে।(মঞ্চের আলো হালকা সোনালী। পটভূমিতে একতারার মিষ্টি সুর বাজছে। বাউল রতন বটগাছের গোড়ায় বসে চোখ বন্ধ করে গান গাইছে। তার চুলগুলো লম্বা, পরনে গেরুয়া বসন, গলায় পুঁতির মালা। পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনছে রহিমা। রহিমার পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে বুনো ফুল গোঁজা।)রতন: (গান গাইছে)"আমার মনের মানুষ গো, পাইলাম না আর খুঁজিয়া...যার লাগিয়া হইলাম বাউল, সে তো রইল না বুঝিয়া রে..."(গান শেষ করে রতন চোখ মেলে রহিমার দিকে তাকায়। রহিমা তখনো মগ্ন হয়ে আছে।)রতন: কী গো রহিমা? গানের মাঝেই কি ডুব দিলে নাকি? কিছু তো বলো?রহিমা: (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তোমার গান শুনলে না রতন, বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। মনে হয়, এই সুর যেন কোনোদিন ফুরিয়ে না যায়। যদি কোনোদিন এই সুর বন্ধ হয়ে যায়, আমি তো বাঁচবো না।রতন: (একতারাটা পাশে রেখে রহিমার হাত ধরে) ধুর পাগলী! সুর কি কখনো বন্ধ হয়? এই নদী যতদিন বইবে, এই বাতাসে যতদিন পাতা নড়বে, রতনের কণ্ঠে তোর নাম নিয়ে সুর ততদিন থাকবে। তুই আছিস বলেই তো আমার এই একতারা বাজে।রহিমা: কিন্তু রতন, আমার বড্ড ভয় করে। আমার বাবা দিন দিন কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। সারাক্ষণ শুধু টাকা আর পয়সার গল্প। আজ সকালেও লতিফ ঘটক আমাদের বাড়িতে এসেছিল। বাবা তার সাথে চুপিচুপি কী যেন কথা বলছিল।রতন: (কিছুটা চিন্তিত, তবে মুখে হাসি ধরে রেখে) রহমান চাচা একটু রাগী মানুষ, এই যা। কিন্তু তিনি তো তোকে ভালোবাসেন। আর আমি তো কোনো চোর-ডাকাত নই রহিমা। আমি বাউল হতে পারি, কিন্তু তোকে বুকে আগলে রাখার ক্ষমতা এই রতনের আছে। আমি গান গেয়ে, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে যা পাবো, তাতেই আমাদের সংসার সুখে কেটে যাবে।রহিমা: আমি তো কুঁড়েঘরেও তোর সাথে হাসিমুখে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবো রে রতন। কিন্তু বাবা কি তা বুঝবে? বাউলের একতারা দিয়ে তো আর চাল-ডাল কেনা যায় না, বাবার এই এক কথা।রতন: (রহিমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে) চিন্তা করিস না। আমি রহমান চাচার কাছে যাবো। উনার পায়ে ধরে বলবো, আমি দিনরাত খাটবো, গান ছাড়াও মাঠে কাজ করবো, তাও যেন তোকে আমার থেকে দূরে না সরিয়ে দেন। তুই শুধু আমার ওপর ভরসা রাখিস।রহিমা: আমার ভরসা তো একমাত্র তুই-ই রতন। তোকে ছাড়া এই জীবনের কোনো অর্থ নেই।(হঠাৎ দূর থেকে রহিমার বাবার কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—"রহিমা! ও রহিমা! কোথায় মরলি?" রহিমা চমকে ওঠে এবং তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ায়।)রহিমা: বাবা ডাকছে রতন! আমি যাই। সাবধানে থেকো। কাল আবার এই সময়ে কথা হবে।(রহিমা দ্রুত চলে যায়। রতন একতারাটা হাতে তুলে নিয়ে বিষণ্ণ চোখে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। মঞ্চের আলো আস্তে আস্তে আবছা হয়ে আসে।)দৃশ্য ২: টাকার দেয়াল ও নিয়তির নিষ্ঠুরতাস্থান: রহমান মিয়ার বাড়ির উঠান।সময়: পরদিন সকাল।(রহমান মিয়া একটা পিঁড়িতে বসে তামাক টানছে। লতিফ ঘটক সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছে। রহমান মিয়ার মুখ লোভী হাসিতে ভরা।)রহমান: তা লতিফ, হাজী মহসিন সাহেবের মতটা তাহলে পাকা তো? কোনো হেরফের হবে না তো আবার?লতিফ ঘটক: আরে রহমান ভাই, লতিফ ঘটকের কথায় কখনো ভুল হতে দেখছেন? হাজী সাহেব নিজের মুখে বলেছেন, রহিমাকে উনার পছন্দ হয়েছে। বিয়ের দিনই নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা আর রহিমার জন্য তিন ভরি সোনার গহনা আপনার হাতে তুলে দেবেন। আর আপনার ভাঙা ঘরটা পাকা করে দেওয়ার দায়িত্বও উনার।রহমান: (আনন্দে গদগদ হয়ে) আলহামদুলিল্লাহ! আমার কপাল খুলে গেল তাহলে। এই বুড়ো বয়সে এসে একটু সুখের মুখ দেখবো। ওই একতারা বাজানো ভিখারি রতনের হাত থেকে মেয়েটাকে বাঁচানো গেল।(এমন সময় বাউল রতন উঠানে এসে প্রবেশ করে। তার কাঁধে ঝোলা, একতারা হাতে। সে নম্রভাবে রহমান মিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়।)রতন: আসসালামু আলাইকুম, রহমান চাচা।রহমান: (চোখ কুঁচকে, তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে) উঁহু! বাউল সাহেব যে! সকাল সকাল আমার উঠানে কী মনে করে? এখানে কোনো গান-বাজনার আসর বসেনি, ভিক্ষা চাইলে অন্য বাড়ি যাও।রতন: আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি চাচা। আমি আপনার কাছে একটা বড় আশা নিয়ে এসেছি। আপনি তো জানেন, রহিমার সাথে আমার ছোটবেলা থেকে...রহমান: (রেগে চিৎকার করে উঠে দাঁড়িয়ে) থাম ব্যাটা ফকিন্নির পুত! তোর মুখে এত বড় কথা? আমার মেয়ের নাম মুখে আনার সাহস তোকে কে দিল? তুই একটা যাযাবর, দিন আনিস দিন খাস। তোর থাকার ঠিক নেই, খাওয়ার ঠিক নেই, তুই এসেছিস আমার মেয়ের ভাগ্য গড়তে?রতন: চাচা, আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু রহিমার কোনো কষ্ট হতে দেব না। আমি এখন থেকে মাঠে কাজ করবো, টাকা জমাবো। দয়া করে রহিমার জীবনটা এভাবে অন্য কোথাও...রহমান: মুখ সামলে কথা বল বাউল! আমার মেয়ের বিয়ে আমি এলাকার সবচেয়ে বড় ধনী হাজী মহসিন সাহেবের সাথে ঠিক করেছি। আগামী পরশুই বিয়ে। তুই তোর এই ছেঁড়া কাঁথা আর একতারা নিয়ে এখান থেকে দূর হ! যদি আর কোনোদিন আমার বাড়ির আশেপাশে তোকে দেখি, তবে ঠ্যাং ভেঙে নদীতে ভাসিয়ে দেব! লতিফ, একে ঘাড় ধরে বের করো তো!(লতিফ ঘটক রতনকে ধাক্কা দিয়ে উঠান থেকে বের করে দেয়। রতন কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে যায়। ঘরের ভেতর থেকে রহিমার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়—"বাবা, ও বাবা! এমন কাজ করো না বাবা! আমি রতনকে ছাড়া বাঁচবো না!" রহমান মিয়া ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে—"চুপ কর হারামজাদি! বেশি কথা বললে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবো!")(রতন মাটি থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে এক চরম অসহায়ত্ব। সে একতারাটা বুকে জড়িয়ে ধরে ধীর পায়ে মঞ্চের বাইরে চলে যায়। পটভূমিতে বেদনার এক করুণ সুর বেজে ওঠে।)দৃশ্য ৩: ভাঙা হৃদয় ও বাউলের বৈরাগ্যস্থান: গ্রামের ভাঙা কালভার্টের ওপর।সময়: রহিমার বিয়ের রাত। দূর থেকে সানাইয়ের করুণ সুর ভেসে আসছে।(রতন কালভার্টের ওপর একা বসে আছে। তার চুল-দাড়ি উসকোখুসকো। সে একতারাটা একপাশে ফেলে রেখেছে। তার বন্ধু মনসুর হ্যারিকেন হাতে তার পাশে এসে বসে।)মনসুর: রতন, নিজেকে এভাবে শেষ করে দিস না ভাই। তুই দুদিন ধরে কিচ্ছু খাসনি। একটু জল তো মুখে দে।রতন: (শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে) মনসুর, শুনতে পাচ্ছিস? ওই যে সানাই বাজছে। ওই সানাই যেন আমার বুকে তীরের মতো বিঁধছে রে। আজ রহিমার বিয়ে। একটা বুড়ো মানুষের কাছে টাকার লোভে রহমান চাচা ওকে বিক্রি করে দিল। আর আমি? আমি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। আমার টাকা নেই মনসুর, আমার কিচ্ছু নেই। টাকা না থাকলে কি মানুষের ভালোবাসার কোনো দাম থাকে না?মনসুর: তুই শান্ত হ রতন। নিয়তিকে কেউ বদলাতে পারে না। রহমান মিয়া লোভের অন্ধ খনিতে ডুবে গেছে। সে তোর এই পবিত্র ভালোবাসা বুঝবে না।রতন: (হঠাৎ একতারাটা হাতে নিয়ে পাগলের মতো হাসতে শুরু করে) ভালোবাসা? বাউলের আবার ভালোবাসা কিসের রে? বাউলের জীবন তো একতারার তারের মতোই একা। একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন আর সুর বের হয় না, আমার জীবনটাও তেমনি ছিঁড়ে গেছে মনসুর। আজ থেকে রতনের জীবনে আর কোনোদিন প্রেম আসবে না। আমি আর কোনোদিন ঘর বাঁধবো না। কোনোদিন কোনো নারীকে এই বুকে স্থান দেব না।মনসুর: একি বলছিস তুই রতন? তুই বিয়ে করবি না? তোর সংসার হবে না?রতন: না রে মনসুর, না। আমার বিয়ে আজ নিয়তি এক নিমেষে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। রহিমার জায়গাটায় অন্য কেউ কোনোদিন বসতে পারবে না। আজ থেকে এই একতারাই আমার বউ, এই গানই আমার সংসার। আমি চিরকালের জন্য এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো। যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না, যেখানে শুধু সুর থাকবে, কোনো টাকার পাহাড় থাকবে না।(রতন উঠে দাঁড়ায় এবং গান গাইতে গাইতে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে শুরু করে। তার কণ্ঠে এবার চরম আকুলতা ও বৈরাগ্য।)রতন: (গান গাইছে)"মানুষ একটা কলকব্জার গাড়ি...টাকার লোভে বিকাইলা রে মানুষ, দিলা বুকে বাড়ি..."(মনসুর হ্যারিকেন হাতে নিয়ে রতনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চোখের জল মোছে। মঞ্চের আলো পুরোপুরি নিভে যায়।)দৃশ্য ৪: দীর্ঘ বিরহ ও কালান্তরস্থান: গ্রামের সেই পুরোনো বটবৃক্ষের নিচে।সময়: প্রায় তিরিশ বছর পর। বিকেল বেলা।(মঞ্চে আবছা আলো। এখনকার রতন আর আগের মতো যুবক নেই। তার চুল-দাড়ি সব পেকে সাদা হয়ে গেছে। চামড়ায় বলিরেখা। তবে পরনে সেই গেরুয়া বসন আর হাতে সেই পুরোনো একতারা। সে বটগাছের নিচে বসে মৃদু স্বরে গুনগুন করছে। দীর্ঘ তিরিশ বছর সে দেশের বিভিন্ন মাজারে, বাউল আখড়ায় ঘুরে বেরিয়েছে, কিন্তু বিয়ে করেনি। মনসুর এখন বৃদ্ধ, সে লাঠিতে ভর দিয়ে রতনের পাশে এসে বসে।)মনসুর: রতন... ওরে রতন... চিনতে পারিস আমাকে?রতন: (চোখ মেলে তাকিয়ে একটু হেসে) মনসুর! তোকে চিনবো না কেন রে ভাই? এই দুনিয়ায় তুই ছাড়া আমার আর আপন কে আছে? তুই তো আমার সেই সোনালী দিনগুলোর সাক্ষী।মনসুর: তুই তিরিশটা বছর পর গ্রামে ফিরলি রতন। কিন্তু নিজের বলতে তো কিছুই রাখলি না। এই বুড়ো বয়সে তোর দিকে একটু তাকানোর মতো কেউ নেই। বিয়েটা যদি করতিস, আজ সন্তান-সংসার তোর পাশে থাকতো। কেন করলি না বল তো জীবনটা এভাবে ধ্বংস?রতন: জেনেশুনে কি কেউ নিজের জীবন ধ্বংস করে মনসুর? আমার মন তো সেই তিরিশ বছর আগেই ওই নদীর জলে ভেসে গেছে। যে অন্তরে একবার রহিমার নাম লেখা হয়ে গেছে, সেখানে কি আর কারো নাম লেখা যায়? আমি তো ভালোই আছি ভাই। এই একতারাটা এখনো আমার সাথে বেইমানি করেনি।মনসুর: তুই হয়তো জানিস না রতন, তোর সেই রহিমা...রতন: (চমকে উঠে) রহিমার কী হয়েছে মনসুর? ও কেমন আছে? ওর স্বামী, ওর সংসার?মনসুর: হাজী মহসিন তো বহু বছর আগেই মারা গেছেন। বুড়ো মানুষ ছিলেন, বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু রহিমার কপালে কোনো সুখ হয়নি। হাজী সাহেবের আগের পক্ষের ছেলে-মেয়েরা রহিমাকে ডাইনি বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওর বাবা রহমান মিয়াও টাকার গরমে অন্ধ হয়ে শেষ বয়সে সব হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছে। রহিমা এখন সম্পূর্ণ একা। কয়েকদিন আগেই ও এই গ্রামে ওর বাবার সেই পুরোনো ভাঙা ভিটায় ফিরে এসেছে।রতন: (চোখে জল চলে আসে) রহিমা ফিরে এসেছে? ও একা? হায় আল্লাহ! যে রহিমাকে আমি রাজপ্রাসাদে সুখে থাকবে ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিতাম, সে আজ এভাবে নিঃস্ব হয়ে গেল?মনসুর: হ্যাঁ রতন। ও এখন একবেলা খায় তো অন্য বেলা উপোস থাকে। সমাজ ওকে বিধবা, অলক্ষ্মী বলে দূরে ঠেলে দেয়। তুই একবার ওর সাথে দেখা করবি না রতন?রতন: আমার ভয় করে মনসুর। এই ভাঙা শরীর আর শুকনো মুখ নিয়ে আমি ওর সামনে দাঁড়াবো কী করে? ও কি আমাকে চিনতে পারবে?মনসুর: ভালোবাসা কখনো রূপ দেখে চেনা যায় না রে রতন। ও তোকে ঠিক চিনবে। তুই যা ওর কাছে।(রতন একতারাটা শক্ত করে ধরে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিনের জমানো আবেগ তার চোখে-মুখে প্রকাশ পায়।)দৃশ্য ৫: শেষ বয়সের মিলন ও আত্মিক বন্ধনস্থান: রহমান মিয়ার সেই পরিত্যক্ত, ভাঙা বাড়ির উঠান।সময়: গোধূলি লগ্ন। আকাশ লাল হয়ে আছে।(মঞ্চের এক কোণে এক বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। পরনে সাদা থান শাড়ি, চুলগুলো সম্পূর্ণ সাদা, মুখমণ্ডল জীর্ণ ও ক্লান্ত। ইনিই রহিমা। তিনি একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। উঠানে শুকনা পাতা বাতাসে উড়ছে।)(বাউল রতন ধীর পায়ে উঠানে এসে প্রবেশ করে। সে রহিমার দিকে তাকায়। রহিমার চোখ রতনের ওপর পড়ে। দুজনেই স্তব্ধ হয়ে যান। দীর্ঘ তিরিশ বছরের দূরত্ব যেন এক মুহূর্তে থমকে দাঁড়ায়।)রতন: (খুব নিচু ও কাঁপানো গলায়) রহিমা...রহিমা: (কণ্ঠস্বর চিনে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায়, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে) রতন? এ কি তুমি? তুমি বেঁচে আছ?রতন: হ্যাঁ রে রহিমা। এই অভাগা রতন এখনো বেঁচে আছে। শুধু তোকে একটিবার দেখার জন্য এই প্রাণটা নিয়তি আটকে রেখেছিল।রহিমা: (রতনের কাছে এসে তার পক্ক কেশ আর জীর্ণ হাত স্পর্শ করে কাঁদে) তুমি আমার জন্য নিজের জীবনটা এভাবে শেষ করে দিলে রতন? বিয়ে করলে না, সংসার করলে না? একটা যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ালে? কেন করলে এমন? আমি তো এক পাপী, যে বাবার কথায় টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলাম।রতন: তুই কোনো পাপ করিসনি রহিমা। তুই তো পরিস্থিতির শিকার ছিলি। আর বিয়ের কথা বলছিস? এই রতনের হৃদয়ে তো তুই ছাড়া আর কেউ কোনোদিন ছিল না, আর কোনোদিন থাকবেও না। তোকে না পেয়ে আমি হয়তো বাউল হয়েছি, কিন্তু আমার মনের মন্দিরে তুই-ই চিরকাল রানী হয়ে ছিলি।রহিমা: (রতনের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে) আমাকে ক্ষমা করে দাও রতন। আমার সেই ধন-সম্পদ, টাকা-পয়সা সব শেষ হয়ে গেছে। আজ আমি এক বেলা অন্নের জন্য মানুষের মুখাপেক্ষী। সমাজ আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার কেউ নেই রতন, কেউ নেই।রতন: (রহিমার মাথায় হাত বুলিয়ে, পরম মমতায় তাকে আগলে ধরে) কে বলেছে তোর কেউ নেই? এই রতন এখনো মরে যায়নি। আমাদের যুবতী বয়সে বিয়ে হয়নি তো কী হয়েছে? এই শেষ বয়সে এসে আমাদের আত্মা তো আবার এক হয়েছে। এই দুনিয়ার কোনো সমাজ, কোনো টাকার দেয়াল এখন আর আমাদের আলাদা করতে পারবে না।রহিমা: কিন্তু এই বুড়ো বয়সে মানুষ আমাদের কী বলবে রতন? সমাজ কি আমাদের একসাথে থাকতে দেবে?রতন: বাউলের কোনো সমাজ থাকে না রহিমা। বাউলের সমাজ হলো মন। তুই আজ থেকে এই বাউলের কুটিরে থাকবি। আমি তোর ভাঙা ঘরে সুর দেব, আর তুই আমার একতারার যত্ন নিবি। আমরা এই শেষ কটা দিন একসাথে কাটাবো। কোনো আনুষ্ঠানিক বিয়ের প্রয়োজন নেই আমাদের, আমাদের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধন।রহিমা: (চোখের জল মুছে হাসে) আমি আর কোথাও যাবো না রতন। এই একতারার সুরের মাঝেই আমি আমার বাকি জীবনটা বিলীন করে দেব।(রতন একতারাটা হাতে নেয় এবং মিষ্টি ও শান্ত সুরে গাইতে শুরু করে। রহিমা রতনের কাঁধে হাত রেখে পরম শান্তিতে চোখ বন্ধ করে।)