Author: #Yaxisus_Storyverse
Part2
চাঁদবি আর কিছু দূর এগোতেই হঠাৎ করেই বাতাস কেঁপে উঠল।
সামনের দিক থেকে মারামারির শব্দ ভেসে আসছে। যেন গাছ ভেঙে পড়ছে।
চাঁদবির বুকটা ধক করে উঠল।
সে থমকে গেল।
হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠল।
ভয় তাকে গ্রাস করতে চাইছিল।
কিন্তু ঠিক তখনই মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল—দুর্বল, অসহায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
চাঁদবি দাঁতে দাঁত চেপে ধরল।
— “ভয় পেলে চলবে না… আমাকে এগোতেই হবে।”
চাঁদবি তার ঘোড়াটিকে গাছের কাছে বেঁধে রাখল। তারপর মনের ভেতর সাহস জড়ো করে ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল, গাছ আর ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে দূর থেকে তাকায়
আর যা দেখল, তাতে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
হোটেলে দেখা সেই অদ্ভুত পোশাকের দু’জন মানুষ।
তাদের সামনে একদল নেকড়ের মতো ভয়ংকর Beast—চোখ লাল, দাঁত বের করা, শরীর থেকে কালচে ধোঁয়ার মতো কিছু উঠছে।
যুদ্ধ চলছিল।
ছেলেটি এক ঝটকায় Beast-এর মাথা চেপে মাটিতে আছড়ে ফেলল।
মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে হালকা হাসি দিয়ে আরেকটাকে লাথি মারতেই সেটা উড়ে গিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা খেল।
চাঁদবি ঢোক গিলে
— “এরা… এরা মানুষ তো?”
দু’জন মিলে Beast-গুলিকে যেভাবে ধরাশায়ী করছিল, দেখে মনে হচ্ছিল যেন এসব কিছুই না।
কিন্তু চাঁদবি জানত—তাঁদের জায়গায় সে থাকলে, এতক্ষণে Beast-এর দল তাকে খেলনার মতো ছিঁড়ে খেত।
হঠাৎ—
একটি মেয়েলি কণ্ঠ বাতাস চিরে ভেসে এল।
— “এই! লুকিয়ে লুকিয়ে আর কত দেখবি আমাদের?”
চাঁদবির মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।
তার শরীর জমে গেল।
— “ওরা আমাকে দেখলো কীভাবে?!”
সে তো অনেক দূরে, গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিল!
ভয়ে চাঁদবির গলা শুকিয়ে গেল। ঠোঁট চেপে ধরল।
এরা কি তাকে মেরে ফেলবে?
এক মুহূর্তের জন্য পালানোর কথা ভাবল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই ভাবল—এরা Cultivator।
এদের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়।
ঠিক তখনই মেয়েটি আবার গলা চড়িয়ে বলল—
— “কিরে! কানে শুনতে পাস না?”
চাঁদবি কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল—
— “জি… জি… শুনতে পাই। কানে শুনতে পাবো না কেনো?”
সে ধীরে ধীরে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
দু’জনের সামনে দাঁড়াতেই তার বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল।
মেয়েটি চোখ সরু করে তাকাল।
— “কে তুই? আমাদের লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিস কেন?”
চাঁদবি ঢোক গিলে বলল—
— “Umm… আসলে আমি Fenji Village থাকি। আমি এখানে Black Dinjin Flower এর খোজে এসছি… আমার মায়ের চিকিৎসার জন্য।”
কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
— “এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আপনাদের মারামারির শব্দ শুনে… কৌতূহল থেকে এগিয়ে এসেছি। আর কিছু না, বিশ্বাস করুন।”
মেয়েটির চোখে সন্দেহের ঝিলিক।
— “আমাদের কি বোকা ভেবেছিস?”
সে এক পা এগিয়ে এল।
— “তোকে দেখে তো Cultivation Power আছে বলে মনে হয় না। তাহলে এখানে মরতে এসেছিস?”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা।
— “সত্যি করে বল—তোর মতলব কী? নইলে এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবি না।”
চাঁদবি ভয়ে কেঁপে উঠলেও মাথা নিচু করল না।
— “দয়া করে বিশ্বাস করুন। আমি মিথ্যে বলছি না। আমাকে Black Dinjin Flower নিতেই হবে… না হলে আমার মা বাঁচবে না।”
সে তার মায়ের সম্পর্কে সব খুলে বলল—
আলো কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি মুখ খুলল—
— “থাম, আলো।”
তার কণ্ঠ শান্ত কিন্তু ভারী।
— “ছেলেটাকে যেতে দে।”
— “Uhh! ঠিক আছে।”
দু’জনেই ঘুরে হাঁটা শুরু করল।
ঠিক তখনই চাঁদবি সাহস করে বলে উঠল—
— “শুনুন!”
তারা থামল।
— “আমাকেও দয়া করে আপনাদের সাথে নিন। শুধু Black Dinjin Flower পেতে সাহায্য করুন। বিনিময়ে আমি যে কোনো কাজ করে দেবো।”
আলো ধীরে ঘুরে তাকাল।
— “তুই আমাদের কী কাজ করে দিবি?”
— “আপনারা যা বলবেন তাই।”
চাঁদবি হাত জোড় করল।
— “প্লিজ…”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আলো বলল—
— “হুম… ঠিক আছে চল, দেখি কি করতে পারিস তুই।”
— “ধন্যবাদ!”
চাঁদবির বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা হালকা হলো।
একাই Black Dinjin Flower খুঁজে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব—এটা সে জানত। তাই হুট করেই তাদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
কিছুক্ষণ পর...
হাঁটতে হাঁটতে চাঁদবি আড়চোখে আলোর দিকে তাকাল।
ভয়ের কারণে আগে ঠিক করে দেখেনি।
আলো পেছনে দু’হাত রেখে, হেলেদুলে হাঁটছে—একদম ছোট বাচ্চাদের মতো।
কিন্তু তার সৌন্দর্য… যেন রূপকথার পরী।
না— বরং তার চেয়েও বেশি অপরূপ।
তারপর সে তাকাল ছেলেটির দিকে।
—শান্ত, সুদর্শন, আর অদ্ভুত।
হঠাৎ আলো জিজ্ঞেস করল—
— “তা তোর নাম কী?”
— “আমি চাঁদবি দাফিন। আপনার?”
নাম শুনে আলো একটু থমকাল। চোখে বিস্ময়। কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলল না।
— “আমি আলো ইউরা।”
একটু থেমে—
— “আর ও হচ্ছে… উম্… আমার নিরামিষ ভাই। নাইদ ইউরা।” [উল্লেখ্য, নামের শেষে ‘ইউরা’ হচ্ছে তাদের Family Name]
চুপ করে থাকা নাইদ বলল—
— “তা তোমার পরিকল্পনা কী?”
চাঁদবি শান্ত গলায় বলল—
— “বিশেষ কিছু না। শুধু গ্রামে ফিরে শান্তিতে সাধারণ জীবন কাটাতে চাই।”
আলো হঠাৎ পেটে হাত দিয়ে কুঁচকে বলল—
— “নাইদ! আমার ক্ষুধা লাগছে। চল কিছু শিকার করি!”
চাঁদবি বলল—
— “আমার কাছে কিছু ফল আছে, চাইলে নিতে পারেন।”
আলোর চোখ জ্বলে উঠল।
— “কই?! দে দে দে!”
নাইদ বিরক্ত গলায় বলল—
— “এ আস্ত একটা পেটুক। ঘোড়ার ডিম দিলেও খেয়ে ফেলবে।”
আলো আপেল কামড়াতে কামড়াতে বলল—
— “উমম! চুপ থাক তুই।”
হালকা হাসির মধ্যে, অজানা এক অভিযাত্রার পথে তারা এগিয়ে যেতে লাগল।
তিনজন কথা বলতে বলতে এগিয়ে যেতে যেতে দূর থেকে সামনে একটি নদীর দেখা পায়। নদীর জলের ধারা মৃদু শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে, চারপাশে ছড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ এবং শান্ত আবহ।
নদীর দিকে তাকিয়ে নাইদ হালকা স্বরে বলে
—তা হলে মাছ শিকার করা যাক?
—হুম, যা।
আলোর কথা শেষ হতে না হতেই, চোখের পলক ফেলার আগেই নাইদ সামনে থেকে উধাও হয়ে যায়।
পরক্ষণেই চাঁদবি চোখের সামনে নাইদকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে যায়। তার চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা। এত দ্রুত সে কীভাবে সেখানে পৌঁছাল!
চাঁদবি অবাক দৃষ্টিতে নাইদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আলো হেসে বলে
—আরে ভয় পাস না। আচ্ছা বল তো, তুই কি কখনো তোর গ্রামের বাইরে যাসনি?
—না। আসলে বাবা-মা আমাকে কখনো বাইরে যেতে দেয়নি।
—ও, তার মানে তুই আগে কখনো Cultivators দেখিসনি। তাই এমন করে নাইদের দিকে তাকিয়ে ছিলিস।
—হ্যাঁ। তবে গ্রামের এক দাদির কাছে অনেক গল্প শুনেছি। তারা নাকি আকাশে উড়তে পারে, আরও কত কী। কিন্তু কেন জানি বাবা-মা এসব কথা শুনলে খুব রাগ করতো।
চাঁদবি আর আলো কথা বলতে বলতে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়। সেখানে এসে চাঁদবি আবারও বিস্মিত হয়। এই সামান্য সময়ের মধ্যেই নাইদ অনেকগুলো মাছ শিকার করে ফেলেছে। নদীর ধারে সেগুলো সাজানো দেখে চাঁদবির মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—এগুলো রান্না করবে কীভাবে?
শেষ পর্যন্ত পেটের কথা চেপে রাখতে না পেরে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলে
—আমরা এগুলো রান্না করবো কীভাবে? আমাদের তো রান্নার কোনো জিনিসপত্র নেই।
—আরে, তোকে এত কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না।
এই বলে আলো যেন কোথা থেকে রান্নার সব জিনিসপত্র বের করে ফেলে।
এবার চাঁদবি আর অবাক হয় না। তার কাছে ব্যাপারটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে—এদের জন্য এসব খুবই তুচ্ছ বিষয়।
নাইদ চাঁদবির দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার সুরে বলে
—বলেছিলাম না, এই পেটুক খাওয়ার জন্য সব কিছু করতে পারে। এত খেয়ে খেয়ে দিন দিন মোটা হয়ে যাচ্ছে।
—কি! আমি মোটা?—আলো চোখ বড় করে বলে
—লাথি মেরে নদীতে ফেলে দেবো বেয়াদব!
দুজনের এমন খুনসুটি দেখে চাঁদবি মনে মনে হেসে ওঠে। বুকের ভেতর কেমন একটা উষ্ণ অনুভূতি হয়—যেটা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
কিছুটা সাহস পেয়ে চাঁদবি বলে
—তাহলে আমি রান্না করবো। আমি ভালো রান্না করতে পারি।
চাঁদবির কথা শুনে আলো খুশি হয়ে বলে ওঠে
—ওও! তাই নাকি? তাহলে তো ভালোই। দেখি তুই কেমন রান্না করিস।
এরপর চাঁদবি মন দিয়ে Fish Fry বানাতে শুরু করে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধ।
এই সময় নাইদ চারপাশ একবার ভালো করে লক্ষ্য করে আলোর দিকে নিচু স্বরে বলে
—শোন, আমরা যদিও এখন জঙ্গলের একেবারে গভীরে নেই, তবুও সাবধানে থাকতে হবে।
একটু থেমে আবার যোগ করে
—এই এলাকায় Earth 2nd Stage-এর Beast থাকার সম্ভাবনা আছে। একটা Beast একা আক্রমণ করলে সমস্যা নেই, কিন্তু দল বেঁধে এলে ঝামেলা হতে পারে। তাই সতর্ক থাকা দরকার।
আলো আর নাইদের সাথে থাকতে থাকতে চাঁদবি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল—সে এখনো Black Crow Forest-এর ভেতরেই আছে।
কিছুক্ষণ পর Fish Fry তৈরি হয়ে গেলে চাঁদবি তা আলোর আর নাইদের দিকে এগিয়ে দেয়। তারপর একটু চিন্তিত চোখে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে—ভালো লাগবে তো?
ঠিক তখনই আলো এক কামড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে
—উম্মম… এটা আমার জীবনে খাওয়া সেরা Fish Fry!
আলো যেন মুহূর্তেই চাঁদবির রান্নার প্রেমে পড়ে যায়। নাইদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়—তার মুখের অভিব্যক্তিতেই বোঝা যায়, মাছ তারও খুব পছন্দ হয়েছে।
তাদের সন্তুষ্ট মুখ দেখে চাঁদবির বুকের ভেতর একরাশ স্বস্তি নেমে আসে।
কিন্তু সেই শান্ত আনন্দ বেশিক্ষণ টেকে না। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। জঙ্গলের নীরবতা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে ভারী নড়াচড়ার শব্দ আসে।
চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। নদীর কলকল শব্দ যেন এক মুহূর্তে চাপা পড়ে যায়। ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে গাছের ডাল ভাঙার শব্দ ভেসে আসে
চাঁদবির বুক ধক করে ওঠে। সে অবচেতনে এক কদম পিছিয়ে যায়।
নাইদ ধীরে দাঁড়িয়ে যায়। তার চোখে আগের সেই আলস্য নেই, বরং তীক্ষ্ণ সতর্কতা। আলোও হাসিখুশি ভাব ছেড়ে গম্ভীর হয়ে ওঠে।
ঝোপের ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে আসে বিশালাকৃতির Giant Monkey Beast. তাদের শরীর মোটা লোমে ঢাকা, লালচে চোখে অদ্ভুত হিংস্রতা।
চলবে…