Posts

গল্প

ছেলের অভাব, মেয়ের জবাব

June 22, 2026

Fahima Akter

5
View

সে অনেকদিন আগের কথা। কোন এক দেশে হৃদয় নামের এক ছেলে, তার বাবা হিমেল এবং মা রুনার সাথে বাস করত। 
তার বাবা মা একজন আরেকজনকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল, কিন্তু তার নানা নানী সেটাকে মেনে নেয় নি। তার যখন ৪-৫ বছর বয়স হয় তখন তার নানা নানু জোর করে তার মাকে তাদের কাছে নিয়ে যায় অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার জন্য। সেই শোকে তার বাবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। হৃদয় অসহায় হয়ে যায় দিন রাত কান্নাকাটি করত। তারপর তাকে তাকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেয় দূর সম্পর্কের এক দাদী রাহেলা বেগম। রাহেলা ছিল উধার মনের মানুষ। তার বিয়ের কয়েক বছর পর মেয়ে বাচ্চার জন্ম নেওয়ার কারণে শশুরের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় তাকে। তারপর রাহেলা বাপের বাড়িতে থাকতে শুরু করে, এখানে ওখানে কাজ করে মেয়েকে বড় করে। মেয়ে ছিল অনেক হাসিখুশি। রাহেলের ভাই বোনেরা মিলে মহা ধুমধামে বিয়ে দেয় মেয়েটিকে। রাহেলের মেয়ে ছিল তিন ছেলে মেয়ে। রাহেলার  বড় নাতনি পলি তার কাছেই থাকে। পলি আর হৃদয় একসাথে বড় হতে থাকে। হৃদয়ের বাবাকে দেখার মত কেউ নেই বলে কিছু লোক মানসিক হাসপাতালে রেখে এসে তাকে।
একদিন রাহেলা হৃদয় কে কাছে ডেকে বলে, 
"শুনছিলাম তোর বাবার নাকি অনেক জায়গা জমি আছে, আর কিছু জমানো টাকাও আছে, তা দিয়ে তো একটা ব্যবসা করতে পারতি, আর যদি জমিতে চাষ করতে তাহলে জমিগুলো ঠিক থাকতো। "
হঠাৎ এটা শুনে হৃদয় মন খারাপ করে বলে, 
"তুমি কি আমায় পর করে দিচ্ছ? "
তারপর রাহেলা বলে, 
"নারে পাগল না, আমার কাছে আমার পলি যেমন তুইও তেমন, আমি তোর ভালোর জন্যই বলছি আমার বয়স হয়েছে, কখন কি হয়ে যায় বলা যায় না। পলি না হয় তার বাবা-মার কাছে চলে যেতে পারবে কিন্তু তুই কোথায় যাবি?তাছাড়া তুই তোর বাবার একমাত্র ছেলে, সবকিছু তো তোরই দেখে রাখতে হবে "
তারপর হৃদয় বলে, 
"বুঝলাম, দাদি একটা কথা বলি, তোমার নাতনি পলির দায়িত্ব যদি আমি নিই তাহলে কি তুমি কষ্ট পাবে? "
এটা শুনে দাদী রাহেলা বলে, 
" এটা তুই কি বললি সত্যিই পলির দায়িত্ব নিবি? কিন্তু তার বাবা-মা কাছে জিজ্ঞেস করে  দেখি কি বলে তারা।"
তারপর রাহেলা পলির মা-বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে তাদের বিয়ে দেয় খুব সাধারণ ভাবে।এরপর হৃদয় পলিকে নিয়ে তার বাড়ি যায়। রাহেলাকেও বলেছিল তাদের সাথে আসতে কিন্তু আসেনি রাহেলা। হৃদয়ের বাড়িতে অনেক বছর কেউ থাকেনি বলে ধুলো-ময়লা জমেছিল সেগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে হৃদয় একটা কাঠের ছোট বাক্স খুঁজে পায়। বাক্স খুলে দেখে তার বাবা-মার ছবি।
ছবির নিচে দেখে কিছু পুরনো  জমির কাগজ-পত্র আর কিছু টাকা।
ভালই কাটছিল হৃদয় আর পলির দিন।পলি কাথা সেলাই এর কাজ করত।আর হৃদয় জমিতে সবজি চাষ করতো।সবজি বিক্রি করে কিছু টাকা জমায় আর তার বাবার টাকা গুলো একসাথে মিলিয়ে একটা ব্যবসা শুরু করে।খুব অল্পদিনেই অনেক টাকা পয়সা হয়ে যায়। হৃদয়ের কিছু টাকা দাদি রাহেলা কেউ পাঠাতো। এত টাকা পয়সা দেখে সে ভাবতো আমার যদি একটা ছেলে হতো তাহলে আমার সবকিছু দেখে রাখত সবকিছু আগলে রাখতো। কিন্তু তার কোন ছেলে হয় না। ছেলে ছেলে করতে করতে জন্ম হয় সাতটি মেয়ের।হৃদয় প্রথম দুই মেয়েকে পছন্দ করলেও বাকি পাঁচ মেয়েকে পছন্দ করত না।সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করতো তার ছোট মেয়েকে। কারণ ছোট মেয়ে যখন জন্মায় তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক ফসল  নষ্ট হয়। অনেক খরচ করতে হয় নতুন করে ফসল ফোলানোর জন্য আর টাকা পয়সা খরচ করতে গিয়ে ব্যবসার অনেক ক্ষতি হয়। তাই অপছন্দ করতো ছোট মেয়েটিকে। কিন্তু ছোট মেয়ে চাইতো সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে, তাদের পাশে ছেলে হয়ে থাকতে। ছেলেদের জামা কাপড় পরতো,ছেলেদের মত চলাফেরা করতো। তা দেখে তার বাবা তাকে বকাবকি করতো। একদিন সে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সবাই অনেক খুঁজে কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়না। সে একটা বাসের ছাদে উঠে  অনেক দূরে চলে যায়।  ছাদ থেকে নেমে হাঁটতে থাকে, হাঁটতে হাঁটতে রাত হয়ে যায়। কিন্তু কোথাও থাকার মত সাহস পায় না। তারপর রাস্তায় একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর তাকে একটা বুড়ো লোক এসে জিজ্ঞেস করে, 
“কি হয়েছে? ",“বাড়ি কোথায়?” “যাবে কোথায়? "
তারপর সে সবকিছু খুলে বলে, তারপর লোকটা সবকিছু শুনে তাকে লোকটার বাসায় নিয়ে যায় তার স্ত্রী তাকে দেখে বলে,
“কে তুমি? ",তোমার সাথে আমার চেন একজনের মুখের মিল খুঁজে পাচ্ছি। "
তারপর সে বলতে শুরু করে,
“ আমার বাবা হৃদয় আর মা পলি আমরা সাত বোন রিনা, রিমা, রিয়া, ডলি, মনি, শান্তা  আর আমি হলাম কান্ত। "
তারপর লোকটা স্ত্রী বলে, 
“ও তুমি মেয়ে! আমি ভেবেছি তুমি ছেলে, ও ছেলেদের পোশাকে কেন? "
কান্তা একটু হেসে বলে, 
“আমার বাবা চাইতো তার একটা ছেলে হোক, সব কিছুর দায়িত্ব নেক, তাই আমি আমার বাবার ছেলে হয়ে গেছি। "
এসব শুনে হাসতে হাসতে বলে,
“ আরে বোকা! মেয়েরাও চাইলে অনেক কিছু করতে পারে, জানো আমার ছেলে হৃদয় ও ছোটবেলা এমন করে কথা বলতো।"
তারপর কান্তা বলে, “আপনার ছেলে কই?কই থাকে? আপনার সাথে থাকে না? 
" না থাকে না। অনেক বছর আগে আমি  আমার ছেলে হৃদয়, আর স্বামী হিমেলের সাথে থাকতাম।আমার বাবা-মা আমাকে জোর করে নিয়ে যায় অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যাই ফুলবাড়ীতে, সেখানে গিয়ে জানতে পারি আমার ছেলে দূর সম্পর্কের এক দাদীর কাছে ভালো আছে আর আমার স্বামী হিমেল মানুষিক হাসপাতালে ভর্তি আছে,তারপর অনেক খুঁজতে খুঁজতে খুঁজে পাই আমার স্বামীকে, এরপর থেকে এখানেই আছি। এসব শুনে কান্তা  বলে, 
“তা হলে কি তোমরাই আমার দাদা দাদু? "
তারপর হৃদয়ের বাবা হিমেল বলে,
“ এই জন্যই তোমাকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল যেন আমাদের হৃদয় যেন দাঁড়িয়ে আছে, তাইতো কোন কিছু না ভেবে তোমাকে বাসায় নিয়ে এসেছি।"
কান্তা বলে,
“ চলনা আমার সাথে বাড়ি তোমাদেরকে দেখতে বাবা-মা অনেক খুশি হবে। ”
এটা শুনে হৃদয়ের বাবা-মা বলে, 
“থাক আমরা না যাই, অনেক বছর হয়ে গেছে এখন আর বাড়ি গিয়ে কি করব তাছাড়া তোমরা তো ভালোই আছো। 
কান্তা বলে,
“কোন কথা শুনতে চাই না। বাবা আমাকে অপছন্দ করে, তোমাদেরকে বাড়ি নিয়ে গেলে হয়তো অনেক খুশি হবে। তাই আমি আমার সাথে তোমাদেরকে নিয়েই যাব। "
তার পর অনেক বলাবলির পর তারা কান্তার সাথে কান্তার বাড়িতে যায়। বাড়ির সামনে গিয়ে কান্তা চিৎকার করে ডাকে আর বলে,  
“ মা ও মা দেখো কারা এসেছে কাদেরকে নিয়ে এসেছি!"
তারপর মা পলি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলে, “কথায় চলে গেছিস কাওকে কিছু না বলে,জানিস তোর বাবা তোকে কতবার খুঁজেছে? "
তারপর কান্তা বলে,
“কেন আমাকে বাবা খুঁজেছে,বাবা  আমাকে তো পছন্দই করেনা,"
তারপর হৃদয়ে সে ঘর থেকে তাকে একটা চড় মেরে বলে,
“কে বলেছে তোকে পছন্দ করি না, একটু বকা দিয়েছে বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যেত চলে যেতে হবে?"তার পর তার মা পলি তার পিছনে তাকিয়ে দেখে হৃদয়ের বাবা - মা কে। তারপর কান্তা কে জিজ্ঞেস করে, 
“ওরা কারা ? "
কান্তা বলে, 
“ওরা আমার দাদা-দাদু।"
পলি বলে,
“ দাদা দাদু মানে!"
তার পর হৃদয়ের বাবা-মা সব কিছু বুঝিয়ে বলে।হৃদয়ও বাবা-মা কে পেয়ে অনেক খুশি হয়। তার পর পলি বলে,
“আমি আবার নতুন করে বাবা-মা কে খুঁজে পেয়েছি।আমার বাবা- মা অনেক দূরে,তাই এখন থেকে আপনারাই আমার বাবা-মা।এতদিন আপনারা অনেক কষ্ট করেছেন। এখন থেকে আপনাদের ভালো রাখার দায়িত্ব আমার,আমাদের।এসব শুনে হৃদয় এর বাবা-মা অনেক খুশি হয়। আর বলে,
“আমাদের কোনো মেয়ে নেই,তোমরাইতো আমাদের সব কিছু।তুমিই তো আমাদের মেয়ে।তোমাকে অনেক আদর করব আবার শাসনও করবো।" 
তারপর সাত বোন  এসে বলে, 
“আমরাও আছি,দাদা-দাদু। "
তার পর এক সাথে সবাই অনেক অনেক হাশি-খুশি ভাবে থাকতে শুরু করে।
সমাপ্তি। 

Comments

    Please login to post comment. Login