টুলেট এবং দুই ব্যাচেলরবিকেলের তপ্ত রোদ ততক্ষণে মরে এসেছে, কিন্তু ঢাকার পিচঢালা রাস্তার ভ্যাপসা গরম আর ধুলোবালির উপদ্রব একটুও কমেনি। অফিস থেকে বের হয়ে সুজনের প্রতিদিনের রুটিন একটাই—গলির মোড়ে মোড়ে দেয়ালে সাঁটানো সাদা কাগজে কালো কালিতে লেখা ‘টু-লেট’ খোঁজা। এই এক বাসা খোঁজার চক্করে পড়ে সুজনের জীবন আজ অতিষ্ঠ। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই শহরে তার আর চাকরি করা হবে না। প্রতিদিন অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরটা টেনে টু-লেট দেখলেই সুজন এগিয়ে যায়। কিন্তু দারোয়ান বা বাড়িওয়ালার মুখে ওই একই চেনা প্রশ্ন, "ফ্যামিলিতে কয়জন?" আর সুজন যখনই আমতা আমতা করে বলে, "জি, আমি একা... ব্যাচেলর।" অমনি ওপাশ থেকে মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে যায়—"নাহ্, ব্যাচেলর ভাড়া হবে না।"সেদিনও সুজন কাঁধের ল্যাপটপ ব্যাগটা একপাশে ঝুলিয়ে, শার্টের হাতা গুটিয়ে একটা চারতলা বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। গেটের পাশে ঝুলছে একটা ঝকঝকে টু-লেট সাইনবোর্ড। ভেতরে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন সময় পাশ থেকে একটা চেনা গলা ভেসে এল, "আরে সুজন না?"সুজন চমকে তাকিয়ে দেখল, তার অফিসের কলিগ সুমিতা দাঁড়িয়ে আছে। সুমিতার চোখে-মুখেও একই রকম ক্লান্তির ছাপ, কপালে জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সুজন প্রথমে চাইল না দেখার ভান করে এড়িয়ে যেতে। এই জবুথবু অবস্থায় অফিসের কোনো নারী কলিগের সামনে পড়তে কারই বা ভালো লাগে! কিন্তু সুমিতা ততক্ষণে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুজন ধরা খেয়ে এক গাল কাঁচুমাচু হাসি দিয়ে বলল, "আরে সুমিতা! তুমি এখানে এই রোদের মধ্যে?"সুমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "যে কপাল নিয়ে এসেছি! সাবলেট খুঁজছি তিন মাস ধরে। ব্যাচেলর মেয়ে শুনলেই বাড়িওয়ালারা এমনভাবে তাকায় যেন কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। তোমার কী অবস্থা?"সুজন ব্যাগটা পিঠে সোজা করতে করতে বলল, "আমারও একই দশা। প্রতিদিন অফিস শেষে এই টু-লেট খুঁজতে খুঁজতে আমি ক্লান্ত। ভাবছি চাকরি-বাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাব। এই শহরে ব্যাচেলরদের কোনো স্থান নেই।"দুই কলিগ একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। দুজনের গন্তব্য এক, উদ্দেশ্য এক—একটা মাথার গোঁজার ঠাঁই। হাঁটতে হাঁটতে সুমিতা বলল, "আচ্ছা সুজন, একটা বুদ্ধি মাথায় এসেছে। বাড়িওয়ালারা তো ফ্যামিলি খোঁজে, তাই না? আমরা যদি দুজনে মিলে একটা ফ্ল্যাট খুঁজি? মানে... আমরা তো কলিগ। যদি বলি আমরা ভাই-বোন বা... অন্য কিছু?"সুজন থমকে দাঁড়াল। সুমিতার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার হুট করেই বুকের ভেতর কেমন যেন একটা দোলা লাগল। সুমিতা দেখতে বেশ মিষ্টি, কিন্তু অফিসের কাজের চাপে কখনো ওভাবে খেয়াল করা হয়নি। সুজন একটু হেসে বলল, "ভাই-বোন বললে তো এনআইডি কার্ড দেখতে চাইবে। তার চেয়ে বরং...""বরং কী?" সুমিতা চোখ বড় বড় করে তাকাল।"বরং যদি বলি আমরা খুব জলদিই বিয়ে করছি? আর এক মাস পরেই ফ্যামিলি শিফট হবে। এখন শুধু আমরা দুজন এসে ঘরটা গুছিয়ে নিচ্ছি?" সুজনের গলায় এক চিমটি দুষ্টুমি আর কিছুটা দ্বিধা ছিল।সুমিতার গাল দুটো ক্লান্তির মাঝেও সামান্য লাল হয়ে উঠল। সে মুখ নামিয়ে বলল, "আইডিয়াটা খারাপ না। কিন্তু নাটক করতে গিয়ে যদি ফেঁসে যাই?""ধুর! এই শহরে মাথা গোঁজার জন্য একটু আধটু অভিনয় করাই যায়," সুজন অভয় দিল।এরপর শুরু হলো দুই ব্যাচেলরের যৌথ মিশন। ক্লান্তি যেন নিমেষেই উবে গেল। এখন আর তারা একা নয়, দুজন মানুষ একসঙ্গে খুঁজছে। একটি বহুতল ভবনের সামনে এসে তারা থামল। পাঁচতলায় একটা টু-লেট। দারোয়ানকে বলতেই সে ওপরে নিয়ে গেল। ফ্ল্যাটটি চমৎকার, দক্ষিণমুখী জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস আসছে। ঢাকার এই গরমে সেই বাতাস যেন স্বর্গীয় অনুভূতি দিল।বাড়িওয়ালা এক বয়স্ক ভদ্রলোক। চশমার ওপর দিয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "কারা থাকবেন?"সুজন সুমিতার দিকে একবার তাকাল। সুমিতা আলতো করে সুজনের হাতটা ছুঁয়ে সাহস দিল। সুজন গলা ঝেড়ে বলল, "আরে আঙ্কেল, আমরা দুজন। আগামী মাসেই আমাদের বিয়ে। অফিসের কাছাকাছি বাসা খুঁজছিলাম। বিয়ে করেই এখানে উঠব।"ভদ্রলোকের গাম্ভীর্য কিছুটা কমল। তিনি সুমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মা, মাswitch তোমার বাড়ি কোথায়?" সুমিতা খুব গুছিয়ে উত্তর দিল। ভদ্রলোক খুশি হয়ে বললেন, "আচ্ছা ঠিক আছে। ফ্যামিলি হলে আমার কোনো আপত্তি নেই। অ্যাডভান্স বিশ হাজার টাকা, আর সামনের মাসের ৫ তারিখের মধ্যে উঠতে পারবেন।"বাসা থেকে বের হয়ে নিচে নামতেই সুমিতা সুজনের হাত ছেড়ে দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। "উফ সুজন! তুমি এত সুন্দর মিথ্যা বলতে পারো? আমি তো হেসেই ফেলতাম!"সুজন সুমিতার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিকেলের শেষ আলোটা সুমিতার মুখে এসে পড়েছে। সুজন একটু গম্ভীর হয়ে বলল, "মিথ্যা আর থাকল কই সুমিতা? এই কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তি আর তোমার সাথে কাটানো সময়টা আমাকে অন্য কিছু ভাবাচ্ছে।"সুমিতা থমকে গেল, "কী ভাবাচ্ছে?""ভাবছি, বাড়িওয়ালাকে বলা কথাটাই যদি সত্যি করে ফেলি? এই শহরে একা একা লড়াই করার চেয়ে, দুজন ব্যাচেলর এক হয়ে যদি একটা ফ্যামিলি গড়ে তুলি, ক্ষতি কী? তোমার কি আমাকে খুব অপছন্দ?" সুজনের গলার স্বর এবার বেশ নরম ও আন্তরিক।সুমিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রাস্তার কোলাহল, গাড়ির হর্ন—সব যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে সুজনের চোখের দিকে তাকাল, যেখানে কোনো ছলনা ছিল না, ছিল শুধুই এক অদ্ভুত আশ্রয় খোঁজার আকুলতা।সুমিতা আলতো হেসে বলল, "বাসার অ্যাডভান্সের টাকাটা কিন্তু অর্ধেক অর্ধেক দেব। আর হ্যাঁ, বিয়ের পর রান্নার দায়িত্ব কিন্তু তোমার।"সুজন আনন্দে সুমিতার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ঢাকার এই ধুলোবালি আর ক্লান্তিকর টু-লেট খোঁজার শেষটা যে এত সুন্দর একটা রোমান্টিক মোড় নেবে, তা সে কখনো কল্পনাও করেনি। অবশেষে দুই ব্যাচেলরের টু-লেট খোঁজার কষ্টের অবসান হলো, এক ছাদের নিচে এক নতুন জীবনের গল্প শুরু করার মাধ্যমে।