রাকিব ও রিয়া
প্রথম পর্ব: প্রথম দেখা থেকে ভালোবাসা
বসন্তের শেষ বিকেল। আকাশে হালকা মেঘ, চারদিকে নরম বাতাস। কলেজের মাঠে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দিচ্ছে। কেউ খেলছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে।
রাকিব মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে সাধারণ একটি ছেলে। পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু খুব বেশি বন্ধু নেই। নিজের স্বপ্ন আর পরিবারকে নিয়েই তার ছোট্ট পৃথিবী।
সেদিন হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থামল কলেজের গেটের দিকে।
একটি মেয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করছিল। সাদা-নীল পোশাকে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। মেয়েটির চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত ভাব।
রাকিব অজান্তেই তাকিয়ে রইল।
মেয়েটির নাম ছিল রিয়া।
সেদিন শুধু দেখাই হয়েছিল। কোনো কথা হয়নি।
কিন্তু রাতের বেলা ঘুমাতে যাওয়ার পরও রাকিবের মনে সেই মুখটাই ভেসে উঠছিল।
পরদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে আবার রিয়াকে দেখতে পেল সে।
রিয়া চুপচাপ বসে বই পড়ছিল।
অনেকক্ষণ দ্বিধা করার পর রাকিব এগিয়ে গেল।
"তুমি কি নতুন ভর্তি হয়েছো?"
রিয়া মাথা তুলে তাকাল।
"হ্যাঁ।"
"আমি রাকিব।"
"আমি রিয়া।"
সেই ছোট্ট পরিচয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হলো এক নতুন গল্প।
দিন যেতে লাগল।
প্রতিদিন দেখা হতো।
কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যান্টিনে, কখনো কলেজের করিডোরে।
ধীরে ধীরে তারা বন্ধু হয়ে গেল।
রিয়া ছিল খুব মেধাবী। সবসময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত।
আর রাকিব ছিল স্বপ্নবাজ।
সে একদিন বড় ব্যবসায়ী হতে চায়।
তাদের স্বপ্ন আলাদা হলেও একে অপরের প্রতি সম্মান ছিল অনেক।
একদিন ক্যান্টিনে বসে রিয়া বলল,
"তোমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?"
রাকিব একটু হেসে বলল,
"আমি এমন কিছু করতে চাই যাতে আমার বাবা-মা গর্ব করতে পারে।"
রিয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
সেই প্রথমবার সে অনুভব করল, রাকিব অন্যদের মতো নয়।
এরপর থেকে তাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হতে লাগল।
পরীক্ষার আগে একসঙ্গে পড়াশোনা, ক্লাস শেষে গল্প, মাঝে মাঝে কলেজের পাশের পার্কে হাঁটাহাঁটি—সব মিলিয়ে সুন্দর সময় কাটছিল।
কিন্তু তারা কেউই বুঝতে পারছিল না যে বন্ধুত্বের ভেতর অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।
একদিন প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো।
কলেজ ছুটি হয়ে গেছে।
সবাই চলে গেলেও রাকিব আর রিয়া ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
রিয়া হঠাৎ বলল,
"বৃষ্টি আমার খুব পছন্দ।"
রাকিব হাসল।
"আমারও।"
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
সেদিন প্রথমবার রাকিব অনুভব করল, রিয়ার সঙ্গে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকাও তার কাছে অনেক সুন্দর।
এরপর কেটে গেল আরও কয়েক মাস।
রিয়ার জন্মদিনে রাকিব তাকে একটি বই উপহার দিল।
বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
"স্বপ্ন দেখা মানুষদের জন্য।"
রিয়া বইটি বুকে জড়িয়ে ধরল।
সেদিন তার চোখে আনন্দের ঝিলিক ছিল।
রাতের বেলা রিয়া বইটি খুলে আবার সেই লেখাটা পড়ল।
অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝতে শুরু করল, রাকিব তার কাছে শুধু বন্ধু নয়।
অন্যদিকে রাকিবও নিজের অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করছিল।
সে রিয়াকে ভালোবাসে।
কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছিল।
যদি রিয়া তাকে প্রত্যাখ্যান করে?
যদি বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে যায়?
একদিন বিকেলে তারা নদীর পাড়ে হাঁটছিল।
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবে যাচ্ছিল।
চারদিকে লাল আভা।
হঠাৎ রাকিব থেমে গেল।
"রিয়া, একটা কথা বলব?"
"বলো।"
রাকিবের বুক কাঁপছিল।
"আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।"
কথাটা বলেই সে নিচের দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তার মনে হচ্ছিল সময় থেমে গেছে।
তারপর রিয়ার কণ্ঠ শোনা গেল।
"আমি অনেকদিন ধরে এই কথাটার অপেক্ষা করছিলাম।"
রাকিব অবাক হয়ে তাকাল।
রিয়ার চোখে জল।
কিন্তু সেই জল ছিল আনন্দের।
সে মৃদু হেসে বলল,
"আমিও তোমাকে ভালোবাসি, রাকিব।"
সেদিনের সূর্যাস্ত তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়ে রইল।
তারা জানত না সামনে কত বাধা অপেক্ষা করছে।
তারা জানত না সময় তাদের কতটা পরীক্ষা নেবে।
তবে তারা এটুকু জানত—
তারা একে অপরকে সত্যিই ভালোবাসে।
আর সেই ভালোবাসা নিয়েই শুরু হলো তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়...
(প্রথম পর্ব সমাপ্ত — পরের পর্বে পরিবারের বাধা, দূরত্ব ও সম্পর্কের নতুন মোড় আসবে।)
9
View