Posts

ফিকশন

মানুষ বড়ই বোকা

June 24, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

23
View

মানুষ বড়ই বোকা
পৃথিবী তার জন্মলগ্ন থেকেই ছিল এক অপূর্ব সবুজ আবরণে ঢাকা। বিশাল বনভূমি, ঘন জঙ্গল, নদী-নালার জাল, পাহাড়ের শ্রেণী আর সমুদ্রের অসীম নীল বিস্তার। মানুষ এই পৃথিবীতে এসে প্রথমে ছোট ছোট দলে বেঁচে ছিল, প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে। কিন্তু সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তারা নিজেদেরকে প্রভু ভাবতে শুরু করল। গাছ কাটা শুরু হল। প্রথমে কুঠার দিয়ে, পরে করাত, তারপর যন্ত্রপাতি দিয়ে। বন কেটে ক্ষেত তৈরি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। শিকড় উপড়ানো মাটির উর্বরতা নষ্ট করল, বৃষ্টির চক্র ব্যাহত হল, নদী শুকোতে লাগল। এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে, কিন্তু আধুনিক যুগে এসে তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মাটিতে এই বোকামির চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। দেশটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার ব-দ্বীপ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের আশ্রয়ে। একসময় সুন্দরবন ছিল ঘন, অজস্র প্রাণীর আবাস। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, অজস্র পাখি। কিন্তু মানুষের চাহিদা বাড়তে থাকায় গাছ কাটা শুরু হল। জ্বালানির জন্য, আসবাবের জন্য, চিংড়ি চাষের জন্য জমি তৈরির জন্য। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ কমতে কমতে এখন বিপন্ন। ১৯৭৫ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে শতাধিক বর্গকিলোমিটার ম্যানগ্রোভ হারিয়েছে ভারতীয় অংশে, বাংলাদেশেও একই অবস্থা। ম্যানগ্রোভ যে ঝড়ের প্রাকৃতিক বাধা, তা নষ্ট হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত আরও ভয়ংকর হয়েছে।
২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কথা ভাবুন। লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, ফসল নষ্ট, ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে মাঠে, মাটির উর্বরতা নষ্ট। সুন্দরবনের চারপাশের দ্বীপগুলোতে জমি ক্ষয় হচ্ছে, সমুদ্রের পানি বাড়ছে দ্বিগুণ গতিতে বিশ্ব গড়ের চেয়ে। লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে, ফসল উৎপাদন কমছে। ধানের জমি যেখানে একসময় সোনালি ফসলে ভরা থাকত, সেখানে এখন লবণের সাদা আস্তরণ। কৃষকরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, শহরে পাড়ি দিচ্ছে। নারীরা ঘর সামলাচ্ছে, শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই দৃশ্য শুধু সুন্দরবন নয়, পুরো উপকূলীয় বাংলাদেশের—খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, বরিশাল। লক্ষ লক্ষ একর জমি লবণাক্ত হয়ে গেছে গত চার দশকে।
বিশ্বব্যাপী এই গল্প একই। আমাজনের রেইনফরেস্ট কাটছে ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়ায় পাম অয়েলের জন্য, আফ্রিকায় কাঠের ব্যবসায়। প্রতি বছর এক কোটি হেক্টর বন উজাড় হচ্ছে। কার্বন নির্গত হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো নিচু দেশে এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, ঘন ঘন বন্যা, খরা, অসময়ের বৃষ্টি। মৌসুমী বায়ুর ধরন বদলে যাচ্ছে। কৃষকরা আর আগের মতো ফসল পাচ্ছে না। পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়েছে, ফলন কমছে।
গাছ কাটার সাথে সাথে মানুষ অস্ত্র তৈরি করেছে। পাথরের যুগ থেকে ধাতুর যুগ, বন্দুক, কামান, তারপর আণবিক বোমা। যুদ্ধের নামে পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ—ইউরোপের বন পুড়েছে, শহর ধ্বংস হয়েছে। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে শুধু মানুষ নয়, প্রকৃতি বিষাক্ত হয়েছে বিকিরণে। বাংলাদেশেও যুদ্ধের ছাপ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বন-জঙ্গল ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু তারপরও দেশ স্বাধীন হয়ে উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে একই ভুল করেছে।
আধুনিক যুগে শিল্পায়ন এসেছে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস, চামড়া শিল্প, ইটভাটা, কলকারখানা। ঢাকা, চট্টগ্রামের নদীগুলো—বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী—বিষাক্ত বর্জ্যে ভরা। কারখানার পানি ফেলা হচ্ছে নদীতে, মাছ মরছে, মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। বায়ু দূষণে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি। ইটভাটার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পের নির্গমন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বায়ু দূষণ, দূষিত পানি, সীসা—এসব কারণে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ অকালমৃত্যু, অসুস্থতার দিন কয়েক বিলিয়ন। জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ ক্ষতি।
উন্নয়নের নামে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। ইপিজেডগুলোতে কারখানা, কিন্তু পরিবেশের খেসারত দিচ্ছে স্থানীয় মানুষ। লিথিয়াম, কয়লার খনির জন্য বিদেশে বন কাটছে, বাংলাদেশেও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প সুন্দরবনের কাছে—দূষণের আশঙ্কা। মানুষ ভাবছে বিদ্যুৎ পেলে উন্নতি হবে, কিন্তু দূষণে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার বাড়ছে।
পুরো পৃথিবীতে এই চক্র। চীনের কারখানায় প্লাস্টিক তৈরি, সমুদ্রে প্লাস্টিকের দ্বীপ। আমেরিকার ফ্র্যাকিংয়ে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত। ইউরোপের ভোক্তা সংস্কৃতি—একবার ব্যবহার, ফেলে দেয়া। আফ্রিকায় খনি লুট। যুদ্ধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের জন্য, ইউক্রেনে গমের ক্ষেত পুড়ছে, বন ধ্বংস। প্রতি যুদ্ধে কার্বন নির্গমন বাড়ে, পরিবেশ নষ্ট হয়। সামরিক বাহিনীগুলোর নির্গমন বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ অপরিসীম। ১৭ কোটির বেশি মানুষ ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে। জমির চাপে বন কাটা, নদী ভরাট। ঢাকার চারপাশে জলাভূমি নষ্ট, বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। নদী দূষণে মাছের উৎপাদন কম, জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত। শিল্পের বর্জ্য, কৃষির রাসায়নিক সার—সব মিলে মাটি, পানি, বাতাস বিষাক্ত। শিশুরা সীসায় বিষাক্ত হচ্ছে, প্রজনন স্বাস্থ্য নষ্ট।
আধুনিকতার নামে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, এআই। কিন্তু এসবের পেছনে খনিজ সম্পদ লুট, বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পোড়ানো। ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ খরচ অপরিমিত। মানুষ ভাবছে সভ্য হয়েছে, কিন্তু পৃথিবীকে ধ্বংস করছে। জলবায়ু সম্মেলনে কথা বলে, কিন্তু নিজের দেশে কয়লা খনি খোলে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি, কিন্তু নির্গমন কম। ধনী দেশগুলো দূষণ করছে, গরিব দেশ ভুগছে।
সুন্দরবনের টাইগার কমছে, হরিণ কমছে, মাছ কমছে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট। মৌমাছি মরলে ফসলের পরাগায়ন বন্ধ। প্লাস্টিক সমুদ্রে ভাসছে, মাছের পেটে ঢুকছে। বাংলাদেশের উপকূলে লবণাক্ততা বেড়ে ২৬ শতাংশ বেড়েছে গত চার দশকে। দ্বীপগুলো ডুবে যাচ্ছে—১৯৬৪ সাল থেকে ২১০ বর্গকিলোমিটার জমি হারিয়েছে।
যুদ্ধের ধ্বংসলীলা চলছে বিশ্বজুড়ে। প্রতিটি যুদ্ধে বন পুড়ছে, মাটি বিষাক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ শান্তি চায়, কিন্তু জলবায়ু শরণার্থী তৈরি হচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে ভবিষ্যতে। শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে, স্লাম বাড়ছে, দূষণ বাড়ছে।
মানুষের এই স্বার্থপরতা চলছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। পরিবেশবাদীরা সতর্ক করছে, আন্দোলন করছে, কিন্তু কর্পোরেশন আর সরকারি লাভের চাকা থামছে না। জাতিসংঘে বৈঠক, কিন্তু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না। সবাই ভাবে “আমি না করলে অন্য করবে”। ফলে পৃথিবী অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের গ্রামে কৃষক রাসায়নিক সার দিয়ে মাটি মারছে, ফলন কমছে দীর্ঘমেয়াদে। নদীতে শিল্প বর্জ্য, মাছ মরছে। শহরে ধুলো-ধোঁয়ায় শ্বাস নেয়া দায়। শিশুরা অ্যাজমায় ভুগছে। এখনও মানুষ নতুন নতুন প্রকল্প নিচ্ছে—উড়াল সড়ক, পাওয়ার প্ল্যান্ট—কিন্তু পরিবেশের হিসাব নেই।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই। ইন্দোনেশিয়ার বন পুড়ছে, ব্রাজিলের আমাজন কাটছে, আফ্রিকার সাভানা নষ্ট। মেরু অঞ্চলে বরফ গলে নতুন ভাইরাস ছড়াচ্ছে। প্যান্ডেমিক এসেছে, আরও আসবে। কিন্তু মানুষ এখনও “উন্নয়ন” বলে গর্ব করে।
এই বোকামির চক্রে পৃথিবী ধীরে ধীরে অচল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশ যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার, সেখানে মানুষ এখনও একই পথে চলছে। সুন্দরবন যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে উপকূল রক্ষা করবে কে? লবণাক্ত পানি আরও ঢুকবে, ফসল আরও নষ্ট, মানুষ আরও উদ্বাস্তু।
এখনও কিছু সবুজ আছে। কিছু বন, কিছু নদী। কিন্তু দ্রুত কমছে। মানুষ যদি না বোঝে, তাহলে একদিন শুধু ধুলো, ধোঁয়া, লবণাক্ত মাটি আর ধ্বংসাবশেষ থাকবে। মানুষ বড়ই বোকা, কারণ সে নিজের বাসস্থানকেই ধ্বংস করছে। পৃথিবী তার মা, কিন্তু সে মাকে মারছে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত চিত্র দেখলে বোঝা যায় কতটা গভীর এই সমস্যা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় আসে, বাঁধ ভাঙে, লবণ পানি ঢোকে। কৃষকেরা নতুন লবণসহিষ্ণু ফসলের চেষ্টা করে, কিন্তু উৎপাদন কম। জেলেরা সমুদ্রে গিয়ে কম মাছ পায়, প্লাস্টিক জালে জড়ায়। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা দূষিত বাতাসে কাজ করে, রোগে ভোগে। শহরের মানুষ ট্রাফিক জ্যামে ধোঁয়া শ্বাসে নেয়। গ্রামে নদীর পানি খাওয়া যায় না।
বিশ্বব্যাপী কর্পোরেশনগুলো লাভের জন্য বন কাটে, খনি খোঁড়ে। ধনী দেশের ভোক্তারা পণ্য কেনে, দূষণের খেসারত গরিব দেশ দেয়। বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য বিদেশে যায়, কিন্তু দেশের নদী মরে। এই অসমতা চলছে। যুদ্ধের খরচে অস্ত্র তৈরি হয়, পরিবেশ রক্ষায় টাকা কম।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। শিক্ষা বাড়ছে, কিন্তু পরিবেশ শিক্ষা কম। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। দুর্নীতি, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিবেশকে বিক্রি করছে। ফলে সুন্দরবন সংকুচিত, নদী মৃতপ্রায়, বাতাস বিষাক্ত, মাটি অনুর্বর।
এই গল্প চলতে থাকবে যতদিন না মানুষ বোঝে যে অগ্রগতি মানে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ নয়, বরং সহাবস্থান। কিন্তু এখন পর্যন্ত, মানুষ বড়ই বোকা।

Comments

    Please login to post comment. Login