Posts

গল্প

ফেরি ঘাটের মেয়েটিকে দেখে টাসকি খেয়ে গেলাম।

June 24, 2026

Shafin pro

28
View

তখনও পিরিজপুরের কচা নদীর বুকে কপালে তিল পরা লঞ্চ আর কাঠের তৈরি পুরোনো ফেরিগুলোই ছিল এপার-ওপার করার একমাত্র ভরসা। বরিশাল থেকে পিরিজপুর হয়ে বাসের জার্নি মানেই ছিল ধুলাবালি আর ঝাঁকুনিতে হাড়গোড় এক করা এক মহাযজ্ঞ। ঠিক ৩২ বছর আগের এক তপ্ত দুপুরে, পিরিজপুর ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পকেট ফাঁকা, মাথায় চড়া রোদ, আর মেজাজটা তখন খিটখিটে।ঠিক তখনই ফেরি থেকে নামল সে।পরনে ছিল হালকা আসমানি রঙের সুতির শাড়ি, চুলে একটা সাধারণ ক্লিপ গোঁজা, আর চোখে এক জোড়া মায়াবী কালো হরিনীর মতো দৃষ্টি। রোদের তাপে তার ফর্সা কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল, আর সে আলতো করে আঁচল দিয়ে মুখটা মুছছিল। চারপাশের বাসের হর্ন, হকারদের চিৎকার আর ঘাটের কাদা-পানি যেন এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। আমার চারপাশ তখন স্লো-মোশন! আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম। গ্রামের ভাষায় যাকে বলে একেবারে ‘টাশকি’ খাওয়া। আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধু মন্টু আমার হাঁ করা মুখের সামনে হাত নেড়ে বলল, "কী রে মনা, মাছি ঢুকবে তো! গিলছিস কেন ওভাবে?"আমি মন্টুর জ্যাকেট খামচে ধরে ফিসফিসিয়ে বললাম, "মন্টু, এই মেয়েটি যেই হোক, একেই আমার জীবনের জন্য দরকার। একে না পেলে আমি এ জীবনে আর বিয়েই করব না।"মন্টু একটা খৈনি মুখে চেপে বলল, "আরে রাখ তোর দরকার! মেয়েটার পেছনে ওই যে চারটা যমদূতের মতো ভাই দাঁড়িয়ে আছে দেখছিস? সাইজ দেখলে তোর রোমান্স জানলা দিয়ে পালাবে।"কিন্তু প্রেমে পড়া মন কি আর সাইজ বোঝে? খোঁজ নিয়ে জানা গেল মেয়ের নাম সুপ্তি। বরিশালের এক বনেদি ও কড়া পরিবারের মেয়ে। তার বাবা আর ভাইয়েরা এলাকায় এতই কড়া যে, কোনো ছেলের পক্ষে সুপ্তির বাড়ির আশেপাশে ঘেঁষা মানেই সোজা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। কিন্তু আমার মাথায় তখন পিরিজপুরের সেই ফেরিঘাটের আসমানি শাড়ি পরা রূপটাই ঘুরপাক খাচ্ছে।শুরু হলো আমার পাগলামি। বন্ধুদের সহায়তায় সুপ্তির এক বান্ধবীর মাধ্যমে চিঠি চালাচালি শুরু হলো। আমার চিঠির ভাষা ছিল চরম রোমান্টিক আর কিছুটা সস্তা সিনেমার মতো। লিখেছিলাম—"সুপ্তি, তুমি যদি রাজি থাকো, তবে এই কচা নদীর জল শুকিয়ে গেলেও আমাদের প্রেম শুকাবে না।" সুপ্তি পরে আমাকে বলেছিল, আমার ওইসব অদ্ভুত চিঠি পড়ে সে নাকি হাসতে হাসতে বিছানা থেকে পড়ে গিয়েছিল! তবে হাসির আড়ালেই কখন যে সেও আমার প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করল, তা আমরা কেউই টের পাইনি।প্রেম তো হলো, কিন্তু বিয়ের কথা তুলতেই সুপ্তির বাড়ির আকাশ ভেঙে পড়ল। তার বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন, "কোনো ছন্নছাড়া ছেলের হাতে মেয়ে দেব না।" শুধু তা-ই নয়, তড়িঘড়ি করে এক সপ্তাহের মধ্যে বরিশালের এক মস্ত বড় জমিদারের প্রবাসী ছেলের সঙ্গে সুপ্তির বিয়ে ঠিক করে ফেললেন।খবর পেয়ে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সুপ্তি কেঁদে কেঁদে খবর পাঠাল, "যদি পারো আমাকে নিয়ে যাও, নয়তো চিরকালের মতো ভুলে যাও।"আমি বুঝলাম, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না, আঙুল বাঁকা করতেই হবে। অর্থাৎ, সুপ্তিকে তুলে নিয়ে পালাতে হবে!পরিকল্পনা মোতাবেক বিয়ের ঠিক আগের রাতে মন্টুর মামার একটা পুরোনো, ভাঙাচোরা নসিমন গাড়ি (স্থানীয় তিন চাকার যান) জোগাড় করলাম। মন্টু ড্রাইভার, আর আমি পেছনের সিটে খাটিয়া পাতার মতো করে বসে আছি। রাত তখন আড়াইটা। সুপ্তিদের বাড়ির পেছনের বড় আমগাছের তলায় আমরা গাড়ি নিয়ে ওত পেতে রইলাম। সুপ্তির কথা ছিল পেছনের জানালা দিয়ে সুপারি বাগানের মধ্য দিয়ে পালিয়ে আসবে।রাত তিনটে বেজে গেল, সুপ্তির দেখা নেই। আমার বুক তখন ধড়ফড় করছে। এমন সময় বাগানের শুকনো পাতায় মচমচ শব্দ হলো। অন্ধকারে দেখলাম একটা অবয়ব এগিয়ে আসছে। আমি ফিসফিস করে বললাম, "সুপ্তি! সুপ্তি!"কোনো উত্তর নেই। অবয়বটা আরও কাছে আসতেই আমি আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম। কিন্তু জড়িয়ে ধরতেই বুঝলাম, এটা সুপ্তি হতে পারে না! এর গায়ে কেমন যেন তামাকের গন্ধ আর শরীরটা শক্ত।হঠাৎ একটা খসখসে গলা বলে উঠল, "কে রে বাবা? এত রাতে আমাগো বাগানে কী করোস?"ওরে বাপরে! ওটা সুপ্তি ছিল না, ছিল সুপ্তিদের বাড়ির বুড়ো পাহারাদার কাসেম আলী!ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা হওয়ার জোগাড়। মন্টু গাড়ি স্টার্ট দিতেই যাবে, ঠিক তখনই সুপ্তি অপর পাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। তার হাতে একটা ছোট পোটলা। আমি কাসেম আলীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে সুপ্তির হাত ধরে এক ঝটকায় নসিমনে তুলে নিলাম। কাসেম আলী চিৎকার করে উঠল, "ডাকাত! ডাকাত! মাইয়া নিয়া গেল রে!"মন্টু তখন নসিমনের এক্সিলারেটর পুরো চেপে ধরেছে। ধোঁয়া উড়িয়ে, বিকট শব্দ করে গাড়ি ছুটল পিরিজপুরের দিকে। পেছনে তখন সুপ্তির ভাইদের টর্চের আলো আর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সেই রাতের রোমাঞ্চ আর ভয়ের কথা ভাবলে আজ ৩২ বছর পরও আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। একদিকে পাশে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা সুপ্তির কাঁপা কাঁপা হাত, অন্যদিকে পেছনে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাড়া করা এক ঝাঁক শ্বশুরবাড়ির লোক।আমরা ভোরে পিরিজপুরের এক দূরসম্পর্কের খালার বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। সকালে কোনোমতে এক কাপড়ের ওপর কাজি ডেকে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর সুপ্তির কান্না আর থামে না। একদিকে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট, অন্যদিকে আমার মতো এক বাউন্ডুলের সাথে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়। আমি সুপ্তির হাত দুটি শক্ত করে ধরে বলেছিলাম, "সুপ্তি, পিরিজপুরের ঘাটে যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছি, সেদিনই আমার ভাগ্য তোমার সাথে জুড়ে গেছে। তোমাকে কখনো কাঁদতে দেব না।"আজ সেই ঘটনার পর ৩০টি বছর পার হয়ে গেছে। আমাদের বিয়ের বয়স এখন তিন দশক পেরিয়ে ৩২ বছরে পা দিয়েছে।আজকের অলস দুপুরে আমাদের দোতলার বারান্দায় বসে আমরা দুজনে চা খাচ্ছি। সুপ্তির চুলে এখন রুপোলি রঙের ছোঁয়া, চোখের কোণে জমেছে বয়সের বলিরেখা। আমারও চুলে পাক ধরেছে, ভুড়িটা একটুখানি এগিয়ে এসেছে। সুপ্তি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "কী ভাবছ ওমন করে?"আমি হাসলাম। বললাম, "ভাবছি সেই রাতের কথা। আচ্ছা, কাসেম আলীকে যে ধাক্কাটা দিয়েছিলাম, বুড়ো কি খুব চোট পেয়েছিল?"সুপ্তি হেসে কুটিপাটি। বলল, "চোটের কথা ছাড়ো! তুমি যে ভয়ে আমার বদলে কাসেম আলীকে জড়িয়ে ধরে ‘আমার জান’ বলে ডেকেছিলে, সেই কথা মনে আছে? বুড়ো নাকি পরদিন সারা গ্রামে বলে বেড়িয়েছিল, চোর সুপ্তিকে নিতে আসে নাই, চোর আইছিল ওরে আলিঙ্গন করতে!"আমাদের হাসিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল। এই ৩০-৩২ বছরের সংসার জীবনটা কিন্তু সবসময় এত হাসির ছিল না। শুরুতে চরম অর্থকষ্ট গিয়েছে, সুপ্তির পরিবার আমাদের মেনে নেয়নি বহু বছর। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় যখন পকেটে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না, সুপ্তি তার সাধের কানের দুলটা খুলে আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, "সংসার তো আমাদের দুজনের, একার কেন ভাবো?" সেদিন সুপ্তির বুকে মাথা রেখে আমি এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছিলাম। সেই কান্না ছিল পরম প্রাপ্তির, এক গভীর আবেগের।আজ আমাদের ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে, নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে। সুপ্তির বাপের বাড়ির লোকেরাও বহু আগে আমাদের মেনে নিয়েছেন। এখন জামাই হিসেবে সেখানে আমার খাতির দেখার মতো!আমি চায়ের কাপটা টেবিলটিতে রেখে সুপ্তির সেই চেনা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। হাতটা এখন আর আগের মতো নরম নেই, সংসারের নানা খাটুনিতে কিছুটা খসখসে হয়েছে। কিন্তু এই হাতের স্পর্শেই আমার গত ৩২ বছরের প্রতিটি দিন শান্তিতে কেটেছে। সুপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "যদি আবার নতুন কোনো জন্ম থাকে, তবে আবারও আমি পিরিজপুরের সেই ফেরিঘাটেই দাঁড়াব। আর আবারও তোমাকে দেখেই টাশকি খেয়ে বলব—এই মেয়েটিকেই আমার দরকার।"সুপ্তি লজ্জায় মাথা নিচু করল, ঠিক ৩২ বছর আগের সেই আসমানি শাড়ি পরা মেয়েটির মতোই। তার চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে সুখের আর আবেগের এক ফোঁটা জল। আমাদের ৩০ বছরের বেশি সময়ের এই সংসার শুধু বছরের হিসাব নয়; এটি হাসি, কান্না, রোমাঞ্চ আর এক অপরিসীম ভালোবাসার মহাকাব্য।গল্পটি আপনাদের কেমন লেগেছে জানাবেন। ধন্যবাদ।

Comments

    Please login to post comment. Login