Posts

গল্প

ছয় বছরের অপেক্ষা

June 24, 2026

Fahima Akter

9
View

ভুল নম্বরের মানুষটা
সব গল্পের শুরুটা সুন্দর হয় না।
কিছু গল্প শুরু হয় ভুল থেকে।
ফাইজার গল্পটাও তেমনই।
একটা সাধারণ সন্ধ্যা ছিল। বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ। ফোন হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে একটা নম্বরে কল দিয়েছিল ফাইজা। কিন্তু নম্বরটা ভুল ছিল।
ওপাশ থেকে একজন বলল,
— হ্যালো?
ফাইজা একটু থমকে গেল।
— সরি, ভুল নম্বর।
বলেই কল কেটে দিল।
গল্পটা সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু হয়নি।
কয়েক মিনিট পর আবার ফোন বেজে উঠল।
একই নম্বর।
ফাইজা রিসিভ করতেই অপরিচিত কণ্ঠটা বলল,
— ভুল নম্বর মানুষদেরও কি একটা ধন্যবাদ পাওয়ার অধিকার নেই?
ফাইজা বিরক্ত হয়ে বলল,
— কেন?
— কারণ আজ সারাদিনে প্রথম কেউ আমাকে ফোন দিয়েছে।
সেদিন ফাইজা হাসেনি।
তবু কলটা কেটে দেয়নি।
সেখান থেকেই শুরু।
ধীরে ধীরে পরিচয়।
ছোট ছোট কথা।
তারপর বড় বড় কথা।
জীবন নিয়ে কথা।
স্বপ্ন নিয়ে কথা।
অভিমান নিয়ে কথা।
রাত জেগে থাকা নিয়ে কথা।
ছেলেটার নাম ছিল রায়হান।
অদ্ভুত এক মানুষ।
যেন বইয়ের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা কোনো চরিত্র।
কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়ার আগে গল্প বলত।
কোনো সমস্যার কথা বললে উপদেশ দিত।
কখনো কবিতা শোনাত।
কখনো ইতিহাস।
কখনো আবার রাত তিনটায় ফোন করে বলত,
— জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস কী?
ফাইজা বিরক্ত হয়ে বলত,
— আবার শুরু করলে?
— অপূর্ণ ইচ্ছা।
ফাইজা রাগ করত।
কিন্তু শুনত।
রায়হান ছিল জ্ঞান দিতে ভালোবাসা মানুষ।
আর ফাইজা ছিল চুপচাপ।
নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারত না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে ছেলেটার কাছে সব বলে ফেলত।
একদিন ফাইজা খুব কেঁদেছিল।
বাড়ির একটা সমস্যা নিয়ে।
রায়হান সেদিন কিছু বলেনি।
শুধু ফোনের ওপাশে চুপ করে ছিল।
তারপর বলেছিল,
— কাঁদো। আমি আছি।
এই তিনটা শব্দ সেদিন ফাইজার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় ছিল।
দিন গড়িয়ে মাস।
মাস গড়িয়ে বছর।
তারা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে গেল।
কিন্তু একটা ব্যাপার কখনো বদলাল না।
তারা কখনো দেখা করেনি।
রায়হানের বাড়ি অনেক দূরে।
প্রথম বছর বলেছিল,
— দেখা হবে।
দ্বিতীয় বছর বলেছিল,
— একটু সময় দাও।
তৃতীয় বছর বলেছিল,
— পরিস্থিতি ভালো না।
চতুর্থ বছর বলেছিল,
— খুব শীঘ্রই।
পঞ্চম বছর বলেছিল,
— কথা দিচ্ছি।
ষষ্ঠ বছরেও বলেছিল,
— এবার সত্যিই দেখা হবে।
ফাইজা অপেক্ষা করেছিল।
একদিন না।
একমাস না।
ছয়টা বছর।
এই ছয় বছরে কত কিছু বদলে গেছে।
ফাইজার চুল বড় হয়েছে।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ পড়েছে।
অনেক মানুষ এসেছে।
অনেক মানুষ চলে গেছে।
কিন্তু রায়হান রয়ে গেছে।
একটা কণ্ঠস্বর হয়ে।
একটা অভ্যাস হয়ে।
একটা অপেক্ষা হয়ে।
মাঝে মাঝে ফাইজা রাগ করত,খুব রাগ।ফোন ধরে বলত,
— তোমার সব কথাই মিথ্যে।
রায়হান হাসত।
— সব?
— সব।
— তাহলে আমার এই কথাটাও?
— কোনটা?
— আমি তোমার খেয়াল রাখি।
ফাইজা চুপ করে যেত।
কারণ মিথ্যে হলে এত বছর কেউ কারও রাত জাগা সঙ্গী হয় না।
একদিন ফাইজা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
রায়হান সারা রাত ঘুমায়নি।
প্রতি ঘণ্টায় ফোন করেছে।
মেসেজ দিয়েছে।
বকেছে।
রাগ করেছে।
ফাইজা তখন বুঝেছিল, দূরত্ব সবসময় উদাসীনতা না।
তবু একটা প্রশ্ন থেকে যেত।
"যদি এত খেয়াল রাখো, তাহলে দেখা করো না কেন?"
এই প্রশ্নের উত্তর কখনো পায়নি সে।
সময়ের সাথে সাথে অপেক্ষা ক্লান্ত হয়ে যায়।
মানুষ না।
অপেক্ষা।
ফাইজা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে গেল।
আগের মতো ফোনের জন্য অপেক্ষা করত না।
রাত জেগে থাকত না।
অভিমানও করত না।
কারণ কিছু অভিমান এত পুরোনো হয়ে যায় যে সেগুলো আর অভিমান থাকে না।
নীরবতা হয়ে যায়।
এক রাতে রায়হান ফোন করে বলল,
— ঘুমাওনি?
— না।
— কী ভাবছ?
ফাইজা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— জানো, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের দূরের মানুষ।
ওপাশে কোনো উত্তর এল না।
শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
অনেকক্ষণ পর রায়হান বলল,
— যদি কোনোদিন দেখা না হয়?
ফাইজা হালকা হাসল।
কষ্টের হাসি।
— তাহলে কী হয়েছে?
— কষ্ট পাবে না?
— পেয়েছি তো। অনেকবার পেয়েছি।
আবার নীরবতা।
তারপর ফাইজা ধীরে ধীরে বলল,
— সব গল্প একসাথে থাকার জন্য লেখা হয় না, রায়হান। কিছু গল্প শুধু মনে থাকার জন্য লেখা হয়।
সেদিনের পরও তাদের কথা হয়েছে।
ফোন এসেছে।
খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
হাসাহাসি হয়েছে।
পুরোনো স্মৃতি নিয়ে মজা হয়েছে।
কিন্তু ফাইজা আর অপেক্ষা করেনি।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—
রায়হান হয়তো তার জীবনের ভালোবাসা ছিল না।
কিন্তু ভালোবাসার চেয়েও একটু বেশি কিছু ছিল।
একটা অভ্যাস।
একটা মায়া।
একটা নিরাপদ আশ্রয়।
একটা ভুল নম্বর।
যে ভুলটা ঠিক হয়ে গেলে হয়তো গল্পটাই আর থাকত না।
আজও মাঝরাতে ফোন বেজে উঠলে ফাইজা কখনো কখনো চমকে ওঠে।
মনে হয়, হয়তো রায়হান।
হয়তো আবার নতুন কোনো জ্ঞান দেবে।
হয়তো বলবে,
"অপূর্ণতারও একটা সৌন্দর্য আছে।"
আর তখন ফাইজা মৃদু হেসে ফেলে।
কারণ ছয় বছর পর সে বুঝেছে,
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে পূর্ণতা দিতে নয়।
অপূর্ণতার অর্থ শেখাতে।

Comments

    Please login to post comment. Login