প্রতিদিন দেশের আনাচকানাচ থেকে খবর আসছে শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। মসজিদে হুজুরকে খাবার দিতে গেছে চার বছরের মেয়েশিশু -তার রক্ষা নাই। মাদ্রাসার হোস্টেলে আছে ৭ বছরের ছেলেশিশু তার পায়ুপথ ক্ষতবিক্ষত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বুড়ো শিক্ষক হোয়াটসঅ্যাপে ঘোষণা দিয়ে তাদের নারী শিক্ষার্থীদের কাছে অবৈধ যৌন সংসর্গ চেয়েছেন। এদের মধ্যে যিনি শ্মশ্রুমণ্ডিত ও কপালে প্রার্থনার দাগ বহন করছেন -তিনি আবার নিজ এলাকায় নারী মাদ্রাসা চালান।
মাদ্রাসার আবাসিক হোস্টেল, প্রার্থনালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও অনাচার থেমে নেই। এমনকি বেশ কয়েকটি এলাকায় অযাচারের ঘটনাও ঘটছে। জন্মদাতা পিতাও নিজ কন্যার জীবনে নরক নামিয়ে দিতে দ্বিধা করছে না।
আমরা বাংলাদেশিরা কতকিছু নিয়ে গর্ব করি। খাবার বাদ দিয়ে অস্ত্র কেনার স্বপ্ন দেখি। প্রতিবেশি ভারতকে রোজ ঊনসত্তরবার দখল করি। কিন্তু মাদ্রাসার একজন ছেলেশিশুর পায়ুপথ রক্ষার ব্যাপারে একটা শব্দও ব্যয় করি না। জাতিগতভাবে আমরা এমন হলাম কী করে? এতটা নির্বিকার, নির্দয়, নিষ্ঠুর ও নির্লজ্জ হলাম কেমন করে?
বাংলাদেশে মাদ্রাসায় বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের পেছনে সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনস্তাত্ত্বিকরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করেছেন।
আবদ্ধ পরিবেশ এবং জবাবদিহিতার অভাব বড় একটি কারণ। অনেক আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা বাইরের জগৎ ও পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি এবং কঠোর জবাবদিহিতার অভাব অপরাধীদের জন্য একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে।
ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও অন্ধ আনুগত্যও অন্যতম কারণ। শিক্ষক বা বড় ভাইদের প্রতি শিক্ষার্থীদের অন্ধ আনুগত্য এবং প্রশ্নহীন বাধ্যতার একটি সংস্কৃতি থাকে। এই অসম ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা শিশুদের ওপর চড়াও হয় এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য করে।
সামাজিক ট্যাবু ও লোকলজ্জার ভয় গুরুতর একটি কারণ। যৌনতা এবং যৌন নিপীড়ন নিয়ে সমাজে এক ধরনের গোপনীয়তা কাজ করে। ভুক্তভোগী শিশুরা লোকলজ্জা বা পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করে অনেক সময় বিষয়টি কাউকে বলতে পারে না, যা অপরাধীদের বারবার অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।
আইনি প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তির অভাব রাষ্ট্রের তরফে বড় ব্যর্থতা। এই ধরনের স্পর্শকাতর অপরাধের ক্ষেত্রে অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সময়মতো আইনি পদক্ষেপ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
মানসিক বিকৃতি ও সর্বমহলে সচেতনতার অভাবও এর জন্য দায়ী। অপরাধীদের ব্যক্তিগত মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি এবং শিশুদের নিজস্ব সুরক্ষাবোধ বা 'গুড টাচ-ব্যাড টাচ' সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা না থাকা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং যেখানেই জবাবদিহিতার অভাব ও বদ্ধ পরিবেশ থাকে, সেখানেই শিশুদের সুরক্ষাহীনতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
একজন মা যখন শোনেন তিনি তার সন্তানকে যার কাছে শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন ওই শিক্ষক নামের শ্বাপদটিই তার সন্তানের শরীর ও মনস্তত্ত্বকে ধ্বংস করে দিয়েছে -তখন ওই মায়ের মনের অবস্থা কী হয় আমরা সবাই বুঝি। নরপশুদেরকে তাৎক্ষণিক জুতোপেটার ভিডিও অনেকসময় ভাইরাল হয়।
তবে এর পেছনে অপরাধীর যতটা না দায় -তারও অধিক দায় অভিভাবক ও পিতা-মাতার। আপনি যখন বুঝেই চলেছেন সময় খুব খারাপ। বাঙালির মনোজগতে বছরজুড়ে উন্মত্ত ভাদ্রমাস চলছে -এমন বাস্তবতায় আপনার অবুঝ সন্তানকে কোনো ভয়াল দর্শন হায়েনার খোয়াড়ে কেন পাঠাবেন? কেন আপনার ছেলেশিশুকে মাদ্রাসার বোর্ডিং এর মতো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে রেখে আসবেন? কেন আপনার কন্যাকে পুরুষশাসিত মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতে পাঠাবেন?
বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে ভালো পড়াশোনা হয়। ওখানকার শিক্ষকরা পাবলিক সার্ভিস কমিশন ফেইস করে এসে পাঠদানে প্রবেশ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসেই আরবি ভাষা ও ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক। একবার ভেবে দেখবেন আপনার পরকাল ভাবনায় সন্তানের জীবনকে ইহলৌকিক নরকের লাকড়ি বানিয়ে তুলছেন কিনা? নিজের স্বর্গ খরিদ করার জন্য প্রিয় সন্তানকে ঘুটি বানাচ্ছেন কিনা? যদি এমনটা করেন -তো আপনার শাস্তি হওয়া সবার আগে জরুরি। আপনার ব্যক্তিগত পুণ্য, সততা, হিতবাদিতা, পরোপকার, দয়া, মমতা, মহানুভবতা, ত্যাগ ও ধর্মাচার দিয়ে ঈশ্বরের সান্নিধ্য কামনা করেন। সন্তানকে কোথাও কোনোভাবেই বাজি ধরবেন না প্লিজ। শিশুদেরকে দয়া করুন। তাদেরকে মুক্তি দিন। আল্লাহ্'র দোহাই লাগে।
লেখক: সাংবাদিক
২৪ জুন ২০২৬