হারিয়ে যাওয়া সুখ
শাকিল ছাদের কিনারায় বসে একটা সিগারেট ধরাল। তার বয়স পঁয়ত্রিশ। রাতের ঢাকা শহরের আলোগুলো নিচে জ্বলছে, কিন্তু তার চোখের সামনে শুধু অন্ধকার। ধোঁয়া ছেড়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একসময় এই ছাদে বসে সে স্বপ্ন দেখত, হাসত, গান গাইত। এখন শুধু স্মৃতি। যৌবনের সেই অবাধ আনন্দ, সেই অকারণ উন্মাদনা, সেই প্রেমের ঝড়—সবকিছু যেন কোনো সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়। আর এখন? এখন শুধু ক্লান্তি, দায়িত্বের ভার, আর এক অসীম শূন্যতা। তার মনে পড়ে সেই কলেজের প্রথম দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। সবুজ ঘাস, পুরনো ভবন, আর চারদিকে যুবক-যুবতীদের হাসির শব্দ। শাকিল তখন উনিশ। লম্বা, ফর্সা, চোখে দুষ্টুমি। সকালবেলা উঠেই সে বন্ধুদের সাথে মাঠে জগিং করত। ঘাম ঝরিয়ে ফিরে এসে রাহাত, সোহেল আর ইমনের সাথে চায়ের দোকানে বসত। “রে শাকিল, তোর এই হাসিটা দেখলে মেয়েরা লাইন দিয়ে দাঁড়াবে,” রাহাত বলত হাসতে হাসতে। শাকিল হাসত, তার হাসিতে ছিল যৌবনের পূর্ণতা। তারা আড্ডা দিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো রাজনীতি, কখনো সিনেমা, কখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন। টাকা ছিল না, কিন্তু আনন্দ ছিল অফুরন্ত। একটা সস্তা সিগারেট ভাগ করে খাওয়া, দুটো চা, আর বন্ধুদের সাথে অট্টহাসি—এটাই ছিল তাদের জীবনের বিলাসিতা। ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির সামনে প্রথম দেখা সুমির সাথে। সুমি সাহিত্যের ছাত্রী। লম্বা কালো চুল, চোখে স্বপ্নের ছায়া, হাসিতে মধুরতা। শাকিল একটা বই হাতে নিয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “জীবনানন্দের এই বইটা পড়েছেন?” সুমি মুখ তুলে তাকাল, হেসে বলল, “পড়িনি, কিন্তু শুনেছি অনেক। আপনি বলুন তো কেমন?” সেই থেকে শুরু। প্রথম কথা বলা, তারপর প্রতিদিন লাইব্রেরির সামনে দেখা হওয়া। শাকিল তাকে বইয়ের গল্প শোনাত, সুমি শুনত মুগ্ধ হয়ে। সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে বসে তারা কথা বলত। শাকিল বলত তার স্বপ্নের কথা—বড় চাকরি, বিদেশ যাওয়া, নিজের মতো করে জীবন কাটানো। সুমি হাসতে হাসতে বলত, “তুমি তো এখনই রাজপুত্র। তোমার সাথে থাকলে আর কী লাগে?” তাদের প্রেম ধীরে ধীরে গভীর হলো। বৃষ্টির দিনে তারা রিকশায় করে পুরো শহর ঘুরত। শাকিল সুমির হাত ধরে বলত, “এই বৃষ্টি আমাদেরই জন্য।” সুমি তার কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকত। একদিন রাতে ক্যাম্পাসের নির্জন জায়গায় তারা প্রথম চুমু খেল। শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলা করছিল। যৌবনের সেই অনুভূতি—অসীম শক্তি, অসীম আনন্দ। তারা হাত ধরে হাঁটত, গান গাইত, স্বপ্ন দেখত। বন্ধুরা সব জানত। রাহাত বলত, “শাকিল, তোর প্রেম দেখলে আমারও মনে হয় বিয়ে করে ফেলি।” তারা সবাই মিলে ছাদে উঠে গান গাইত। শাকিল গিটার বাজাত, “তোমার জন্য” গানটা গাইলে সুমি তার দিকে তাকিয়ে হাসত। কলেজ লাইফের সেই দিনগুলো ছিল সোনালি। সকালে ক্লাস, তারপর ক্যান্টিনে আড্ডা। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলা। শাকিল দৌড়াত, গোল দিত, বন্ধুরা চিৎকার করে উঠত। সন্ধ্যায় সুমির সাথে লুকিয়ে দেখা। কখনো তারা ক্যাম্পাসের পেছনের নদীর ধারে বসে থাকত। চাঁদের আলোয় সুমির মুখ দেখে শাকিলের মনে হতো পৃথিবীতে আর কোনো সুখ নেই। তারা পরিকল্পনা করত ভবিষ্যতের। “আমরা একসাথে ঘুরব পুরো দেশ,” শাকিল বলত। সুমি বলত, “তোমার সাথে যেকোনো জায়গায়।” একবার তারা বন্ধুদের সাথে পাহাড়ে গেল। সারারাত আগুন জ্বালিয়ে গান গাওয়া, হাসি, নাচ। শাকিল সুমিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “এই মুহূর্তটা চিরকাল থাকুক।” ঠান্ডা হাওয়া, তারকাভরা আকাশ, আর তাদের যৌবনের উত্তাপ। সেই রাতে তারা অনেক কাছাকাছি হয়েছিল। শরীরের স্পর্শ, প্রেমের গভীরতা—সবকিছু যেন যৌবনের সবচেয়ে মধুর উপহার। ফিরে এসে তারা আরও বেশি করে একে অপরকে ভালোবাসত। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হলো। শাকিল চাকরি পেল একটা বেসরকারি কোম্পানিতে। প্রথম বেতন পেয়ে সুমিকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গেল। সুমি বলল, “তুমি এখন সত্যিকারের মানুষ।” তাদের বিয়ে হলো। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর ছিল স্বপ্নের মতো। ছোট ফ্ল্যাটে সংসার। সকালে সুমি চা বানিয়ে দিত, শাকিল তার কপালে চুমু খেয়ে অফিস যেত। সন্ধ্যায় ফিরে দুজনে মিলে রান্না করত, হাসত, গল্প করত। শাকিল এখনও সুমিকে জড়িয়ে ধরে বলত, “তোমাকে পেয়ে আমার জীবন পূর্ণ।” তারা প্রায়ই বাইরে ঘুরতে যেত। কক্সবাজারে সমুদ্রের ধারে দৌড়াদৌড়ি, সিলেটে চা বাগানে হাঁটা। যৌবনের আনন্দ এখনও ছিল, শুধু একটু দায়িত্ব যোগ হয়েছিল। তারপর এলো রিয়ান। ছেলে জন্মের দিন শাকিলের চোখে জল। সে ছেলেকে কোলে নিয়ে বলল, “তুই আমাদের সুখের প্রতীক।” প্রথম কয়েক মাস রাত জেগে ছেলেকে দেখা, কিন্তু সুমির সাথে হাসি-ঠাট্টা চলত। শাকিল বলত, “আমরা তিনজন মিলে পুরো পৃথিবী জয় করব।” সেই সময়টাও ছিল সুন্দর। অফিসের চাপ ছিল, কিন্তু বাড়ি ফিরে সুমি আর রিয়ানের মুখ দেখে সব ভুলে যেত। কিন্তু সময় বদলাতে শুরু করল। শাকিলের বয়স ত্রিশ পার হলো। অফিসের টার্গেট বাড়ল, বসের চাপ বাড়ল। সকালে উঠে তাড়াহুড়ো করে অফিস, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা, সারাদিন মিটিং, ইমেইল, রিপোর্ট। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত। রিয়ান তখন বড় হচ্ছে। “বাবা, আজকে আমার সাথে খেলবে?” ছেলে জিজ্ঞাসা করত। শাকিল ক্লান্ত গলায় বলত, “কালকে রে বাবা।” কিন্তু কাল আর আসত না। সুমির সাথে সম্পর্কও বদলে যাচ্ছিল। এখন আর সেই রোমান্টিক কথা নেই। বেশিরভাগ সময় টাকা, সংসারের খরচ, ছেলের স্কুল। ঝগড়া হতো ছোট ছোট বিষয়ে। শাকিল চিৎকার করত, সুমি চুপ করে কাঁদত। পরে শাকিল অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতা বাড়ছিল। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে শাকিল যেন একদম ভেঙে পড়ল। সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে সে চমকে উঠত। চুলে সাদা, চোখের নিচে কালি, শরীরে ক্লান্তির ছাপ। অফিসে নতুন যুবক কর্মীরা আসছে। তাদের চোখে সেই একই আগুন, যেটা একসময় শাকিলের ছিল। তারা হাসছে, আড্ডা দিচ্ছে, স্বপ্ন দেখছে। শাকিল তাদের দেখে মনে মনে কষ্ট পেত। “এই সময় আর ফিরবে না,” সে ভাবত। তার টিমের পারফরম্যান্স নিয়ে বস চাপ দিত। “শাকিল, আরও পরিশ্রম করো।” সে মাথা নিচু করে শুনত। বাড়িতে ফিরে দেখত রিয়ান অসুস্থ, ডাক্তারের ফি দিতে হবে। সুমি বলত, “টাকা কোথায় পাব?” শাকিল চুপ করে থাকত। রাতে বিছানায় শুয়ে সে স্মৃতির ঝড়ে ভাসত। যৌবনের সেই দিনগুলো এখন যন্ত্রণা হয়ে ফিরে আসত। সেই বৃষ্টিতে ভেজা রিকশার রাইড, সেই পাহাড়ের আগুনের পাশে গান, সেই সমুদ্রের ঢেউয়ে দৌড়—সবকিছু যেন ছুরির মতো বিঁধত। “কেন সব হারিয়ে গেল?” সে ভাবত। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু কাজ। অফিস, বাসা, আবার অফিস। ছেলেকে সময় দিতে পারে না। রিয়ান এখন বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার সাথে দূরত্ব বেড়েছে। “বাবা তুমি কখনো আমার সাথে ফুটবল খেলো না,” ছেলে বলত অভিমান করে। শাকিলের বুকে ব্যথা করত। সুমির সাথে আর কথা বলতে ইচ্ছে করত না। সম্পর্কটা যেন রুটিন হয়ে গেছে। খাওয়া, ঘুম, ঝগড়া, চুপ করে থাকা। যৌবনের সেই উন্মাদ প্রেম, সেই অকারণ হাসি—সব শেষ। একদিন অফিস থেকে ফিরে শাকিল ছাদে উঠল। পুরনো ডায়েরি খুলল। প্রতিটা পাতায় যৌবনের গল্প। সুমির সাথে প্রথম দেখা, প্রথম চুমু, পাহাড়ের রাত, কক্সবাজারের সমুদ্র। সে পড়তে পড়তে কেঁদে ফেলল। “সেই শাকিল কোথায় গেল? সেই হালকা মন, সেই অসীম শক্তি?” এখন সে একজন বাবা। দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়া একজন মানুষ। চাকরির চাপে শরীর ভেঙে যাচ্ছে, সংসারের চাপে মন ভেঙে যাচ্ছে। বন্ধুরা এখন সবাই ব্যস্ত। রাহাত বিদেশে, সোহেল নিজের ব্যবসায়। কেউ আর আগের মতো আড্ডা দেয় না। রাত গভীর হলে শাকিল ছাদ থেকে নামত। বাড়িতে ঢুকে দেখত সুমি ঘুমিয়ে আছে, রিয়ান তার ঘরে। সে একা বসে ভাবত—জীবনটা কীভাবে এতটা বদলে গেল। যৌবনের আনন্দগুলো যেন স্বপ্ন ছিল। এখন বাস্তব শুধু জ্বালা। টাকার চিন্তা, ভবিষ্যতের চিন্তা, স্বাস্থ্যের চিন্তা। শরীরে ব্যথা, মনে অশান্তি। সে জানত, এই জীবন আর বদলাবে না। ছেলেকে বড় করতে হবে, সংসার চালাতে হবে। কিন্তু ভেতরের সেই ছেলেটা, যে বৃষ্টিতে ভিজে প্রেম করত, এখনও কাঁদে। কয়েক মাস পর একটা ছুটি পেয়ে শাকিল সুমি আর রিয়ানকে নিয়ে পুরনো ক্যাম্পাসে গেল। জায়গাটা একই আছে। সেই পুকুরপাড়, সেই গাছ। শাকিল সুমির হাত ধরল। “মনে আছে সব?” সুমি চোখে জল নিয়ে হাসল, “সব মনে আছে। কিন্তু সেই দিন আর ফিরবে না।” রিয়ান দৌড়াদৌড়ি করছিল। শাকিল তাকে কোলে তুলে বলল, “বাবা, তোর যৌবনটা নষ্ট করিস না। আনন্দ কর। সময় চলে গেলে আর ফিরবে না।” সন্ধ্যায় ফিরতে ফিরতে শাকিল বুঝল—সুখ হারায়নি, শুধু রূপ বদলেছে। যৌবনের সুখ ছিল উন্মাদনার, এখনকার সুখ শুধু স্মৃতিতে। কিন্তু সেই স্মৃতিগুলোই এখন তার জ্বালা। ছাদে বসে সে আবার ডায়েরিতে লিখল, “হারিয়ে যাওয়া সুখ আসলে কখনো হারায় না। সেটা শুধু স্মৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকে। আর সেই স্মৃতি আমাদের চালিয়ে নেয়, যতক্ষণ না শেষ নিঃশ্বাস।” জীবন চলতে থাকে। শাকিল প্রতিদিন অফিস যায়, বাড়ি ফেরে, ছেলেকে দেখে, সুমির সাথে কথা বলে। কিন্তু তার ভেতরে সেই যৌবনের শাকিল এখনও বেঁচে আছে—যে হাসতে চায়, প্রেম করতে চায়, অকারণে আনন্দ করতে চায়। কিন্তু বাস্তব তাকে আর সেই সুযোগ দেয় না। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সে বুঝেছে, যৌবন একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। শুধু জ্বালা থেকে যায়, আর অসংখ্য স্মৃতি যা কাঁদায়, যা পোড়ায়, যা মনে করিয়ে দেয়—সেই হারিয়ে যাওয়া সুখের কথা। এখনও কখনো কখনো ছাদে বসে সে সিগারেট খায়। দূরের আলোগুলো দেখে। আর মনে মনে বলে, “যদি আরেকবার ফিরে যেতে পারতাম সেই কলেজের দিনে...” কিন্তু সময় নির্মম। সে শুধু চুপ করে বসে থাকে। তার চোখে যৌবনের আনন্দের ছায়া, আর বর্তমানের জ্বালার অন্ধকার। জীবন এভাবেই চলবে। সুখের স্মৃতি নিয়ে, জ্বালার বোঝা বয়ে।