Posts

উপন্যাস

বাবার আদেশ ছিল মায়ের প্রতি খেয়াল রাখা।

June 27, 2026

Shafin pro

23
View

আকাশে ওড়া স্বপ্ন: এক মায়ের রাজকীয় উপাখ্যানপ্রথম অধ্যায়: ভাঙা কুঁড়েঘর ও বাবার শেষ বিদায়শ্রাবণের অবিরাম বৃষ্টি সেদিন ঝরছিল। বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি জীর্ণ ঘরের চাল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল ঘরের কোণায় পেতে রাখা অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচিতে। সেই মৃদু ‘টন টন’ শব্দের চেয়েও তীব্র ছিল বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধ রহমান সাহেবের বুকের ভেতরের গোঙানি। লিভারের ক্যানসার তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। ঘরে কোনো দামি ওষুধ নেই, এমনকি ডাক্তার ডাকার মতো টাকাও নেই।পঁচিশ বছরের তরুণ সোহেল বাবার মাথার পাশে বসে তখন কাঁদছিল। তার পকেটে মাত্র সতেরো টাকা। দুদিন ধরে শহরের আনাচে-কানাচে ঘুরেও একটা সাধারণ চাকরি জোগাড় করতে পারেনি সে। অনার্স পাস করা সার্টিফিকেটটা যেন এক টুকরো মূল্যহীন কাগজ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।রহমান সাহেব অত্যন্ত দুর্বল হাতে সোহেলের হাতটা ধরলেন। তার চোখ দুটো ছিল অপরাধবোধে ভরা। ফিসফিস করে বললেন, "সোহেল, আমি তোকে কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না রে বাপ। শুধু তোর মাকে রেখে গেলাম। তোর মায়ের পায়ের নিচে তোর বেহেশত। আমার একটাই আদেশ—তোর মাকে কখনো কষ্ট দিস না। আমি যেভাবে আগলে রেখেছিলাম, তুই তার চেয়েও বেশি সেবা করিস।"সেদিনই মাঝরাতে রহমান সাহেব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। কোনো দামি কাফনের কাপড় জোড়েনি, প্রতিবেশীদের দয়ায় জানাজা আর দাফন সম্পন্ন হলো। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সোহেল সেদিন প্রথম অনুভব করল এক চরম শূন্যতা এবং এক বিশাল পাহাড়সম দায়িত্বের বোঝা।বাবার মৃত্যুর পর মা রাবেয়া খাতুন যেন জীবন্ত লাশ হয়ে গেলেন। স্বামীর শোকে দিনরাত কাঁদতেন। আর সোহেল ছটফট করত এক টুকরো রুজি-রোজগারের জন্য। বাবার দেওয়া শেষ আদেশটি তার বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধে ছিল—"মায়ের সেবা করিস।" কিন্তু সোহেল কী দিয়ে সেবা করবে? অভাবের সংসারে সকালের ভাত জুটলে রাতের তরকারি জুটত না। মা যখন ছেঁড়া শাড়িটা সেলাই করতেন, তখন সোহেলের বুকটা ফেটে যেত। সে নিজেকে বলত, "আমি ব্যর্থ। বাবার একটা আদেশও আমি পালন করতে পারছি না।"দ্বিতীয় অধ্যায়: অন্ধকারের দিনগুলো ও মায়ের চোখের জলপরের তিন বছর ছিল সোহেলের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। সে একটা ছোট কাপড়ের দোকানে সামান্য বেতনে সেলসম্যানের কাজ পেল। সেই যৎসামান্য টাকায় চাল-ডাল কিনতেই হিমশিম খেতে হতো।একদিন মা রাবেয়া খাতুনের তীব্র জ্বর এলো। বৃদ্ধ বয়সের শরীর, পুষ্টির অভাব। সোহেল মাকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে গেল। সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মা ক্লান্ত হয়ে মেঝেতেই বসে পড়লেন। সোহেল যখন এক গ্লাস পানি এনে মায়ের মুখে দিল, মা মলিন হেসে বললেন, "তুই ব্যস্ত হোস না বাবা, আমি ঠিক আছি।"মায়ের সেই মলিন হাসি সোহেলের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে মনে মনে ভাবল, ‘যে বয়সে মায়ের নরম বিছানায় শুয়ে থাকার কথা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কথা, সেই বয়সে মা আমার মতো এক অপদার্থ ছেলের জন্য হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে বসে আছে! প্রয়োজন হলে আমি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা পরিশ্রম করব, তাও মায়ের মুখে রাজকীয় হাসি ফোটাবো।’অভাবের কারণে আত্মীয়-স্বজনরাও তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কোনো বিয়ে বা অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হতো না। এমনকি দু-একজন ধনী আত্মীয় বাড়িতে এলে রাবেয়া খাতুনকে করুণার চোখে দেখতেন। মা মুখে কিছু না বললেও সোহেল মায়ের চোখের ভেতরের সেই অপমান স্পষ্ট দেখতে পেত। সোহেল বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে একা একা কাঁদত আর বলত, "বাবা, আমি পারছি না। আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু আমি হার মানব না। আমি মায়ের ভাগ্যের চাকা ঘোরাবোই।"তৃতীয় অধ্যায়: ভাগ্যের চাকা এবং উত্থানের গল্পসোহেল বুঝতে পারল, শুধু গায়ের খাটুনি দিয়ে বা অন্যের অধীনে চাকরি করে মায়ের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়। তাকে বড় কিছু করতে হবে। সে নিজের জমানো মাত্র কয়েক হাজার টাকা এবং এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু ধার নিয়ে পুরোনো ল্যাপটপ কিনল। রাত জেগে সে ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং এবং গ্লোবাল আইটি বিজনেসের কাজ শিখতে শুরু করল।দিনের বেলা দোকানে কাজ আর রাত জেগে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা—সোহেলের চোখে তখন ঘুমের চেয়েও বড় ছিল মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন। মা রাতে জেগে উঠে দেখতেন ছেলে টেবিলে মাথা নিচু করে কাজ করছে। মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, "আর কত খাটবি বাবা? শরীরটা তো শেষ হয়ে যাবে।" সোহেল মায়ের হাতটা জড়িয়ে ধরে বলত, "মা, আর মাত্র কটা দিন। তুমি শুধু দোয়া করো।"পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। সোহেলের তৈরি একটি সফটওয়্যার প্রজেক্ট আমেরিকার এক বড় কোম্পানির নজরে পড়ে গেল। তারা সোহেলকে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অফার করল। সেই প্রথম সোহেলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ টাকার অঙ্ক দেখল।কিন্তু সোহেল সেখানেই থেমে থাকল না। সে সেই টাকা দিয়ে নিজের একটি টেক-স্টার্টআপ বা আইটি ফার্ম তৈরি করল। প্রথম বছর কঠোর সংগ্রামের পর, দ্বিতীয় বছরে তার কোম্পানিতে দেশ-বিদেশের বড় বড় ক্লায়েন্ট যুক্ত হতে লাগল। সোহেলের বুদ্ধিমত্তা, সততা আর মায়ের দোয়ায় ব্যবসার চাকা তরতর করে ঘুরতে শুরু করল। কয়েক বছরের মধ্যে সোহেল দেশের অন্যতম শীর্ষ তরুণ উদ্যোক্তায় পরিণত হলো। টাকার অভাব নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।চতুর্থ অধ্যায়: মায়ের মুখে হাসি এবং আত্মীয়দের ভিড়সোহেলের উন্নতির চাকা যখন পুরোদমে ঘুরতে শুরু করল, তখন চারপাশের পৃথিবীটাও বদলে গেল। সোহেল প্রথমে শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় একটি আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি কিনল। মায়ের ঘরটা সাজাল বিশ্বের সবচেয়ে আরামদায়ক আসবাবপত্র দিয়ে।যে আত্মীয়রা একসময় দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত, এখন তারা প্রতিদিন সোহেলের বাড়িতে ভিড় করতে লাগল। মা রাবেয়া খাতুন এখন দামি রেশমি শাড়ি পরেন, চোখে-মুখে বার্ধক্যের ক্লান্তি থাকলেও এখন এক ধরনের রাজকীয় আভা খেলা করে।এখন আত্মীয়দের কোনো আড্ডায় গেলে রাবেয়া খাতুন দুই হাত ভরে কথা বলেন। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে মুখ উজ্জ্বল করে গর্বের সাথে বলেন, "আমার ছেলে ওমুক কোম্পানির মালিক! আমার ছেলে ঢাকা শহরে এত বড় বাড়ি করেছে। আমার সোহেল আমারে রানীর মতো রাখে।" মায়ের এই গর্বিত কণ্ঠস্বর শুনতে সোহেলের খুব ভালো লাগত।মা এখন আর শুধু নিজের সুখেই মগ্ন নন। সোহেল মাকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা দেয় শুধু দান-খয়রাত করার জন্য। মা এখন দুই হাত ভরে গরিব, মিসকিন আর দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য করেন। এলাকার এতিমখানায় খাবার পাঠানো, দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের খরচ দেওয়া—সব এখন রাবেয়া খাতুনের হাত দিয়েই হয়। মানুষ এখন রাবেয়া খাতুনকে দেখলেই সম্মানে দাঁড়িয়ে যায়।মায়ের যাতায়াতের জন্যও সোহেল কোনো খামতি রাখেনি। মা এখন সাধারণ কোনো গাড়িতে চড়েন না, তার জন্য সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে পাজেরো জিপ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেই বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে মা যখন গ্রামে যান, তখন পুরো গ্রামের মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ঢাকার বাইরে বা দেশের অন্য প্রান্তে নিজের মেয়েদের (সোহেলের বোনদের) বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য মা এখন আর বাস বা ট্রেনের ঝক্কি পোহান না। সোহেল মায়ের জন্য সবসময় বিমানের বিজনেস ক্লাসের টিকিট কাটে। মা বিমানে চড়ে রাজকীয় হালে মেয়েদের বাড়ি যান এবং ফিরে আসেন।পঞ্চম অধ্যায়: অসন্তুষ্ট মন ও আকাশছোঁয়া সংকল্পবাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সোহেল তার মায়ের জন্য পৃথিবীর সব সুখ এনে দিয়েছে। একজন ছেলের পক্ষে মায়ের জন্য যা যা করা সম্ভব, সোহেল তার সবটাই করেছে। কিন্তু সোহেলের নিজের মনের ভেতর এক অদ্ভুত অশান্তি বিরাজ করছিল। সে রাতে একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।সে ভাবত, "পাজেরো গাড়ি? বিমান? এ তো সাধারণ ধনী মানুষরাও পারে। কিন্তু আমার মা তো সাধারণ নন। আমার মা সেই নারী, যিনি আমার জন্য ছেঁড়া শাড়ি পরেছেন, না খেয়ে থেকেছেন। আমার বাবা যে আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, তার কোটি ভাগের এক ভাগও তো আমি বাবার বেঁচে থাকতে করতে পারিনি। বাবা দেখে যেতে পারেননি তাঁর স্ত্রী আজ কতটা সুখে আছেন।"সোহেলের মন এতেও সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, মায়ের জন্য করা এই সেবা এখনও অপর্যাপ্ত। একদিন রাতে সে মায়ের ঘরে গেল। মা তখন জায়নামাজে বসে দোয়া শেষ করেছেন। সোহেল মায়ের কোলে মাথা রেখে বসল।মা বললেন, "কী রে বাবা? কোনো চিন্তা আছে তোর মনে? আল্লাহ তো তোরে সব দিছে, আমারেও সুখে রাখছে। আর কী চাস?"সোহেল মায়ের হাতটা নিজের গালে ছুঁইয়ে বলল, "না মা, আমি এখনও তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। এই যে তুমি বিমানে করে আপাদের বাড়ি যাও, বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতেও তো জ্যামে পড়তে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমার মন এতে শান্তি পায় না।"মা হেসে বললেন, "পাগল নাকি ছেলেটা! আর কী করবি আমার জন্য?"সোহেল দৃঢ় কণ্ঠে মনে মনে বলল, ‘যেদিন আমি আমার মাকে একটা আস্ত হেলিকপ্টার কিনে দিতে পারব, যাতে আমার মা নিজের বাড়ির ছাদ বা আঙিনা থেকে উড়াল দিয়ে সরাসরি আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে নামতে পারে; কোনো জ্যাম নেই, কোনো অপেক্ষা নেই—সেদিন হয়তো আমি ভাবতে পারি যে মায়ের জন্য সামান্য কিছু করতে পেরেছি।’ষষ্ঠ অধ্যায়: বাবার আত্মা এবং চূড়ান্ত মুক্তি (উপসংহার)সোহেল এখন একটি নতুন প্রজেক্টে হাত দিয়েছে। তার লক্ষ্য আগামী দুই বছরের মধ্যে নিজের ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় করা, যাতে সে মায়ের জন্য ব্যক্তিগত একটি হেলিকপ্টার এবং নিজস্ব হ্যালিপ্যাড তৈরি করতে পারে। সে চায় তার মা যখনই ইচ্ছা করবে, আকাশে ডানা মেলে মেয়ের বাড়ি যাবে, আত্মীয়দের বাড়ি যাবে। গ্রামের মানুষ আকাশ পানে তাকিয়ে বলবে, "ঐ দেখো, রাবেয়া খাতুন আকাশে উড়ে যাচ্ছেন ওনার ছেলের দেওয়া হেলিকপ্টারে!"সোহেল বিশ্বাস করে, যেদিন সে মায়ের হাতে সেই হেলিকপ্টারের চাবি তুলে দিতে পারবে এবং মা পরম তৃপ্তিতে আকাশে উড়াল দেবেন, সেদিন ওপার থেকে তার বাবার আত্মা সত্যি শান্তি পাবে। রহমান সাহেব সেদিন জান্নাত থেকে মুচকি হেসে বলবেন, "সোহেল, তুই আমার আদেশ শুধু পালনই করিসনি, তুই আমার মাথা পৃথিবীর বুকে উঁচু করেছিস। তুই সত্যিই তোর মায়ের বেহেশত জয় করেছিস।"মায়ের প্রতি সন্তানের এই ভালোবাসা কোনো জাগতিক সীমায় বাধা পড়তে পারে না। সোহেলের এই অনন্ত যাত্রা চলতে থাকবে, যত দিন না সে তার মায়ের স্বপ্নকে আকাশের সীমানায় পৌঁছে দিতে পারছে। কারণ, মায়ের মুখের এক চিলতে হাসির মূল্য কোটি টাকা বা হেলিকপ্টারের চেয়েও অনেক বেশ। উপন্যাসটি আপনাদের কেমন লাগলো লিখে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ

Comments

    Please login to post comment. Login