গ্রামের একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল পুরোনো চৌধুরী জমিদার বাড়ি। বাড়িটা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে নানা গল্প ছিল। কেউ বলত সেখানে রাতে পায়ের শব্দ শোনা যায়, কেউ বলত দ্বিতীয় তলার একটি জানালায় মাঝরাতে আলো জ্বলে ওঠে।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, প্রতি বছর ঠিক আষাঢ় মাসের প্রথম বৃষ্টির রাতে জানালার পাশে সাদা শাড়ি পরা একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত।
রিয়াদ এসব গল্প বিশ্বাস করত না।
একদিন তার বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে সে সেই জমিদার বাড়িতে রাত কাটাতে গেল।
রাত বাড়তে লাগল।
হঠাৎ দ্বিতীয় তলার সেই জানালায় আলো জ্বলে উঠল।
রিয়াদ সাহস করে উপরে উঠল।
ঘরে ঢুকে সে দেখল, একটি পুরোনো কাঠের টেবিলের উপর ধুলো জমা একটি ডায়েরি রাখা।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
"আমি মেঘলা। যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ো, তাহলে জেনে রেখো আমি কাউকে ভয় দেখাতে এখানে থাকিনি। আমি শুধু আমার বাবার জন্য অপেক্ষা করছি।"
রিয়াদ অবাক হয়ে পরের পাতাগুলো পড়তে লাগল।
জমিদার বাড়ির মালিকের একমাত্র মেয়ে ছিল মেঘলা। এক ভয়াবহ বন্যার সময় তার বাবা গ্রামের মানুষদের বাঁচাতে নৌকা নিয়ে বের হয়েছিলেন।
যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন,
— "জানালায় আলো জ্বালিয়ে রেখো, আমি আলো দেখে ফিরে আসব।"
কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি।
তবুও মেঘলা প্রতিরাতেই জানালায় আলো জ্বালিয়ে রাখত।
একদিন অপেক্ষা করতে করতেই অসুস্থ হয়ে সে মারা যায়।
কিন্তু তার সেই অপেক্ষা যেন শেষ হয়নি।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—
"যদি বাবা ফিরে আসে, তাকে বলো আমি রাগ করিনি। শুধু একটু অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।"
রিয়াদের চোখ ভিজে উঠল।
ঠিক তখনই জানালার বাইরে বিদ্যুৎ চমকালো।
সে দেখল, উঠোনের মাঝখানে একজন ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসছে।
পরের মুহূর্তেই সে মিলিয়ে গেল বৃষ্টির মধ্যে।
পরদিন সকাল থেকে আর কখনো সেই জানালায় আলো জ্বলতে দেখা যায়নি।
গ্রামের মানুষ বলে,
কিছু অপেক্ষার শেষ হয় দেখা দিয়ে, আর কিছু অপেক্ষার শেষ হয় খবর পৌঁছে দিয়ে।
25
View