এক ছিল ছোট্ট শহর শিউলিপুর। সেই শহরের একই পাড়ায় পাশাপাশি দুটি বাড়ি। এক বাড়িতে থাকতেন একজন ডাক্তার, আর অন্য বাড়িতে একজন স্কুলশিক্ষক।
ডাক্তারের মেয়ের নাম ছিল মেহরিন। আর শিক্ষকের মেয়ের নাম তানহা।
দুজনের জন্মের ব্যবধান ছিল মাত্র কয়েক মাস। তাই তারা শুধু বন্ধু ছিল না, যেন একে অপরের শৈশবের অর্ধেক অংশ।
মেহরিনের মা মজা করে বলতেন,
— "তোমরা দুজন আলাদা বাড়িতে থাকো কেন? এক বাড়িতেই থাকলেই তো হতো।"
তানহা হেসে উত্তর দিত,
— "আমরা বড় হয়ে পাশাপাশি বাড়ি বানিয়ে থাকবো।"
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলত,
— "আর আমাদের বাচ্চারাও বন্ধু হবে।"
তারপর দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়ত।
শৈশবের বিকেলগুলো কেটে যেত কাঁঠাল গাছের নিচে পুতুলের বিয়ে দিয়ে, বৃষ্টির পানিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে, আর পরীক্ষার আগের রাতে একে অপরকে পড়া বুঝিয়ে।
একবার স্কুলে যাওয়ার পথে তানহা হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে ফেলেছিল।
মেহরিন নিজের রুমাল দিয়ে রক্ত মুছে দিয়েছিল।
তানহা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
— "ব্যথা করছে খুব।"
মেহরিন বলেছিল,
— "আমি আছি না? তুই কাঁদিস না।"
সেদিন থেকে তানহার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল, পৃথিবীতে সবাই চলে গেলেও মেহরিন থাকবে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই বড় হতে লাগল।
মেহরিন পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, ঠিক তার ডাক্তার বাবার মতো। আর তানহা ছিল স্বপ্নবিলাসী।
তানহার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।
সে প্রায়ই জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত,
— "জানিস মেহরিন, একদিন একটা রাজকুমার আসবে। সে আমাকে খুব ভালোবাসবে। তারপর আমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে।"
মেহরিন হেসে বলত,
— "রাজকুমার এখন আর ঘোড়ায় চড়ে আসে না, বুঝলি? এখন মোটরসাইকেলে আসে।"
দুজনেই হেসে উঠত।
কিন্তু তানহা সত্যিই বিশ্বাস করত, তার জীবনে একদিন এমন কেউ আসবে, যে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষ করে নেবে।
বছর কেটে গেল।
শৈশবের মাঠ হারিয়ে গেল, কাগজের নৌকার জায়গায় এল বাস্তবতার হিসাব।
দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠল।
একদিন একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে মেহরিনের পরিচয় হয় এক সাধারণ ছেলের সঙ্গে। ছেলেটির নাম ছিল আরিব।
ছেলেটি রাজকুমার ছিল না।
তার সাদা ঘোড়া ছিল না।
বড় কোনো চাকরি বা বিশাল বাড়িও ছিল না।
কিন্তু তার কথা বলার ভঙ্গিতে এক ধরনের শান্তি ছিল।
মেহরিনের কথা মন দিয়ে শুনত সে।
মেহরিন হাসলে সেও হাসত।
আর মেহরিন চুপ করে থাকলে সে জিজ্ঞেস করত,
— "সব ঠিক আছে তো?"
কয়েক মাসের পরিচয়ের পর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ের দিন তানহা মেহরিনের হাত শক্ত করে ধরে ছিল।
মেহরিন বলেছিল,
— "কাঁদছিস কেন?"
তানহা হেসে বলেছিল,
— "খুশির কান্না।"
কিন্তু সে জানত, এই কান্নার ভেতরে অন্য কিছুও আছে।
সেদিন রাতে মেহরিন চলে গেল নতুন জীবনে।
আর তানহা ফিরে এল নিজের ঘরে।
ঘরে ঢুকে সে অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিল।
তারপর মনে পড়ল, এই সময়টায় তো মেহরিনের সঙ্গে গল্প করার কথা ছিল।
আজ আর ফোন আসবে না।
আজ আর কেউ বলবে না,
— "চল ছাদে যাই।"
আজ আর কেউ বলবে না,
— "তোর জন্য ফুচকা রেখে দিয়েছি।"
ঘরটা হঠাৎ করেই অনেক বড় মনে হতে লাগল।
আর সে নিজেকে খুব ছোট।
দিন যেতে লাগল।
মেহরিন নতুন সংসারে ব্যস্ত হয়ে উঠল।
সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।
শুধু তানহার সন্ধ্যাগুলো আর আগের মতো ছিল না।
সে মাঝে মাঝে পুরোনো ছবিগুলো দেখত।
একটা ছবিতে দুজনের হাতে আইসক্রিম।
আরেকটায় বৃষ্টিতে ভেজা দুই পাগল মেয়ে।
আরেকটায় স্কুল ড্রেস পরে দুজনের মুখভরা হাসি।
তানহা বুঝতে পারল,
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক প্রেম নয়, তবুও ভালোবাসার চেয়ে কমও নয়।
একদিন বিকেলে মেহরিন হঠাৎ এসে হাজির হলো তানহার বাড়িতে।
তানহা অবাক হয়ে বলল,
— "তুই!"
মেহরিন হেসে বলল,
— "বিয়ে করেছি, হারিয়ে যাইনি কিন্তু।"
তারপর ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল।
ভেতরে ছিল দুইটা ছোট্ট চাবির রিং।
একটায় লেখা ছিল "Best Friend"
আর অন্যটায় লেখা ছিল "Forever"
মেহরিন বলল,
— "রাজকুমার আসলে তোকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যায়নি, আমাকে শুধু জীবনের আরেকটা দায়িত্ব দিয়েছে।"
তানহা চুপ করে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "জানিস, ছোটবেলায় ভাবতাম একদিন রাজকুমার আসবে। এখন বুঝি, সব গল্পের রাজকুমার মানুষকে নিয়ে যায় না। কখনো কখনো সে শুধু বুঝিয়ে দেয়, কিছু মানুষকে হারানো যায় না, তারা শুধু জীবনের অন্য অধ্যায়ে চলে যায়।"
সেদিন সন্ধ্যায় দুজন আবার ছাদে বসেছিল।
আকাশে হালকা বাতাস ছিল।
অনেকদিন পর তানহার মনে হলো,
একাকীত্ব মানে সবসময় মানুষ হারিয়ে ফেলা নয়।
কখনো কখনো একাকীত্ব মানে শুধু জীবনের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।
আর সত্যিকারের বন্ধুত্ব?
সেটা দূরত্বে কমে না।
সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।
বরং মানুষের জীবনের সবচেয়ে নীরব দিনগুলোতে, ঠিক ছায়ার মতো পাশে থেকে যায়। ❤️
9
View