লেখক: সঞ্জীব রায়
বর্ষার রাত। আকাশে ঘন কালো মেঘ। বজ্রপাতের আলোয় মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী রাজবাড়ি। গ্রামের মানুষ সেই রাজবাড়িকে ডাকত—"কান্নার প্রাসাদ"।
কারণ, প্রতি পূর্ণিমার রাতে সেখানে শোনা যেত এক অদ্ভুত কান্নার শব্দ। কেউ বলত, মৃত রাজার আত্মা কাঁদে। কেউ বলত, গুপ্তধনের অভিশাপ। আবার কেউ বিশ্বাস করত, রাজবাড়ির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক রহস্য, যা প্রকাশ পেলে পুরো গ্রামের ইতিহাস বদলে যাবে।
এই রহস্যের টানেই কলকাতার তরুণ সাংবাদিক অরিন্দম সেন পৌঁছাল রাজবাড়িতে।
গ্রামের প্রবীণ মানুষ হরিপদ বললেন, — "বাবা, রাত হলে ওই প্রাসাদে যেও না। যে গেছে, সে আর আগের মতো ফিরে আসেনি।"
অরিন্দম হেসে বলল, — "আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। সত্যিটাই জানতে এসেছি।"
রাত বারোটা বাজতেই সে হাতে টর্চ, ক্যামেরা আর একটি নোটবুক নিয়ে ঢুকে পড়ল রাজবাড়ির ভাঙা ফটক দিয়ে।
চারদিকে ধুলো, মাকড়সার জাল, ভাঙা মূর্তি। হঠাৎ...
"আ...আ...আ..."
একটা বুকফাটা কান্না!
শব্দটা যেন ভেসে এল প্রাসাদের গভীর দিক থেকে।
অরিন্দম সাহস করে এগিয়ে গেল।
দেখল, সিংহাসন কক্ষের মাঝখানে একটা পুরোনো সিংহাসন। তার সামনে মেঝেতে খোদাই করা অদ্ভুত প্রতীক।
হঠাৎ তার টর্চ নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে আবার সেই কান্না।
কিছুক্ষণ পর টর্চ জ্বলে উঠতেই সে অবাক।
সিংহাসনে বসে আছে রাজকীয় পোশাক পরা এক বৃদ্ধ!
মাথায় মুকুট, চোখে জল।
অরিন্দম কাঁপা গলায় বলল, — "কে... কে আপনি?"
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, — "আমি রাজা নই... আমি এক পাপী মানুষ।"
বলেই মিলিয়ে গেলেন।
অরিন্দম ভাবল, হয়তো আলো-আঁধারির বিভ্রম।
কিন্তু মেঝেতে পড়ে ছিল একটি সোনার আংটি।
পরদিন গ্রামের ইতিহাস শিক্ষক মাধববাবু আংটিটি দেখে স্তম্ভিত।
— "এটা তো রাজা অনিরুদ্ধের রাজমোহর!"
ইতিহাস অনুযায়ী, রাজা অনিরুদ্ধ হঠাৎ এক রাতে নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ জানত না তাঁর শেষ পরিণতি।
অরিন্দম রাজবাড়ির পুরোনো লাইব্রেরি ঘেঁটে পেল একটি ছেঁড়া ডায়েরি।
সেখানে লেখা—
"যদি কেউ এই লেখা পড়ে, তবে জেনে রেখো, আমি বিশ্বাসঘাতকের শিকার। আমার সবচেয়ে কাছের মানুষই আমাকে বন্দি করেছে।"
শেষ পাতাটি ছেঁড়া।
রাতে আবার অরিন্দম গেল প্রাসাদে।
এবার কান্নার শব্দ আরও স্পষ্ট।
সে শব্দ অনুসরণ করতে করতে পৌঁছাল ভূগর্ভস্থ এক গোপন কক্ষে।
সেখানে মরচে ধরা লোহার দরজা।
দরজা খুলতেই তীব্র ঠান্ডা বাতাস।
ঘরের মাঝখানে একটি কঙ্কাল।
কঙ্কালের হাতে সেই একই রাজমোহরের চিহ্ন।
অরিন্দম বুঝল, এটাই রাজার দেহাবশেষ।
ঠিক তখনই পিছন থেকে শোনা গেল—
— "ওখানে কী খুঁজছ?"
ঘুরে দেখল গ্রামের জমিদার বংশের উত্তরসূরি দেবব্রত দাঁড়িয়ে।
তার হাতে বন্দুক।
— "অনেক বছর ধরে এই রহস্য চাপা আছে। আজ তুমিও এখানেই থাকবে।"
অরিন্দম বুঝল, দেবব্রতের পূর্বপুরুষই রাজাকে হত্যা করেছিল।
ঠিক তখনই আবার সেই কান্না।
ঘর কেঁপে উঠল।
বন্দুকটা দেবব্রতের হাত থেকে পড়ে গেল।
দেয়ালের গোপন অংশ খুলে বেরিয়ে এল একটি লোহার সিন্দুক।
তার মধ্যে ছিল রাজ্যের নথি, যেখানে স্পষ্ট লেখা—
"বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি রুদ্রদেব আমাকে হত্যা করতে চায়।"
দেবব্রত চিৎকার করে উঠল, — "না! এগুলো কেউ দেখতে পারবে না!"
সে সিন্দুক তুলতে গিয়েই পা পিছলে গভীর খাদে পড়ে গেল।
নিস্তব্ধতা।
তারপর...
একটি দীর্ঘশ্বাস।
অরিন্দম দেখল সেই বৃদ্ধ আবার দাঁড়িয়ে।
এবার তাঁর চোখে আর জল নেই।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— "সত্য প্রকাশ হয়েছে। আমার কান্না আজ শেষ।"
ধীরে ধীরে তাঁর অবয়ব আলো হয়ে মিলিয়ে গেল।
পরদিন পুলিশ এসে কঙ্কাল, নথি ও গুপ্তকক্ষ উদ্ধার করল।
ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণিত হলো, কঙ্কালটি সত্যিই রাজা অনিরুদ্ধের।
চারশো বছরের পুরোনো রহস্যের সমাধান হলো।
রাজবাড়িটি পরে ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে সংরক্ষিত হয়।
গ্রামের মানুষ আর কোনোদিন সেই কান্নার শব্দ শোনেনি।
তবে আজও পূর্ণিমার রাতে কেউ যদি রাজবাড়ির সামনে দাঁড়ায়, বাতাসে ভেসে আসে যেন এক শান্ত ফিসফিসানি—
"সত্যকে কখনও চিরকাল লুকিয়ে রাখা যায় না।"
— সমাপ্ত —
