Posts

উপন্যাস

না পাওয়া ভালোবাসা

June 28, 2026

Md Josam

Original Author Md Shamim Skder

Translated by Md Shamim Skder

27
View

( প্রিয় বন্ধুরা এই গল্পটি একটু সত্য ঘটনার উপর নির্মাণ করা, এই গল্পটি আপনাদের সুবিধার জন্য প্রিমিয়াম না রেখে ফ্রি করা হয়েছে, তাই আমি আশা রাখব আপনারা এই উপন্যাসে একটি হলেও মন্তব্য করে যাবেন)+

না পাওয়া ভালোবাসা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনের রাস্তাটা বিকেলের শেষ আলোয় লালচে হয়ে উঠেছিল। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছিল, তার আলোয় পুরনো ভবনগুলোর দেওয়ালে লম্বা ছায়া পড়ছিল। নাবিল তার পুরনো, ফেটে যাওয়া জুতোটা পায়ে গলিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল। প্রতি পদক্ষেপে জুতোর সোল থেকে একটা অস্বস্তিকর শব্দ বের হচ্ছিল—চ্যাঁচ্যাঁ, চ্যাঁচ্যাঁ—যেন তার জীবনের সব কষ্ট, সব দুঃখ পায়ের নিচে চাপা পড়ে আছে আর প্রতিবাদ করছে। তার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগটা ভারী হয়ে ঝুলছিল। ভেতরে বইয়ের স্তূপ, হাতে লেখা নোটসের খাতা, কয়েকটা পুরনো কলম আর একটা ছোট্ট ওয়াটার বটল। ক্লাস শেষ হয়েছে প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে, কিন্তু সে লাইব্রেরির এক কোণে বসে অন্যদের নোটস থেকে কপি করছিল। তার নিজের নোটস তো সবসময় সবচেয়ে পরিষ্কার, বিস্তারিত আর সুন্দর হাতের লেখায় ভরা। কিন্তু অন্যদের সাহায্য করতে গেলে নিজেরও রিভিশন হয়, আর সবচেয়ে বড় কথা—এতে কিছু টাকাও আসে। আজ রাতে মিরপুরের দিকে যেতে হবে দুটো ছেলেকে পড়াতে। বাস ভাড়া বাঁচানোর জন্য হেঁটেই যাবে সে, যদিও শরীরটা আজ বেশি ক্লান্ত লাগছে। কয়েকদিন ধরে ঘুম কম হয়েছে। রাত জেগে পড়া, সকালে উঠে টিউশনির প্রিপারেশন, তারপর ক্লাস—এই চক্রে তার শরীরটা ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল।
নাবিলের জন্ম নেত্রকোনার একটা ছোট গ্রামে, যেখানে ধানের খেত আর নদীর পাড় ঘিরে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। বাবা ছিলেন একটা মুদির দোকানের মালিক। ছোটখাটো দোকান, কিন্তু গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাত। বছর পাঁচেক আগে হার্ট অ্যাটাক হয়ে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। দোকান বিক্রি করে চিকিৎসা করাতে হয়েছে, এখন বাবা শয্যাশায়ী। মা একা ধানের জমিতে কাজ করেন, দুই বোনকে স্কুলে পাঠানোর দায়িত্বও তার উপর। নাবিল ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। গ্রামের স্কুলে প্রতি বছর প্রথম স্থান পেত। সকালে খেতে যাওয়ার আগে বই পড়া, রাতে কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়া—এটাই ছিল তার জীবন। এসএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করার পর এইচএসসিতেও একই সাফল্য। স্কলারশিপ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়। কিন্তু ঢাকায় আসার পর থেকে জীবনটা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। হলে সিট পায়নি, তাই ধানমন্ডির একটা পুরনো, স্যাঁতসেঁতে বাসায় একটা ছোট্ট রুম ভাড়া নিয়েছে। রুমটা এত ছোট যে একটা সিঙ্গল বিছানা আর একটা টেবিল রাখার পর হাঁটার জায়গা প্রায় নেই। দেওয়ালে চুন খসে পড়ে, ছাদ থেকে পানি পড়ে বর্ষাকালে। রান্না করতে হয় নিজেই, প্রায়ই শুধু ভাত আর ডাল দিয়ে চলে। মাঝে মাঝে ডিম কিনে খায়, মাছ বা মাংস বিলাসিতা। প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়, বাবার ওষুধ, বোনদের স্কুল ফি, মায়ের হাতখরচ—সব মিলিয়ে তার ছোট্ট বৃত্তটা টানটান হয়ে থাকে।
প্রথম বর্ষের ক্লাসে প্রথম দিনই পূর্ণিমাকে দেখেছিল নাবিল। ক্লাসরুমে সে সামনের সারিতে বসেছিল, চোখে একাগ্রতা। পূর্ণিমা পেছনের দিকে একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরে ঢুকেছিল, তার লম্বা চুল খোলা, হাঁটার ভঙ্গিটা যেন পুরো ঘরটাকে আলো করে দিয়েছিল। তার হাসিটা সংক্রামক, চোখ দুটোতে একটা উজ্জ্বলতা। বন্ধুরা তার চারপাশে ভিড় করত। পূর্ণিমা ঢাকার মিরপুরের একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা সরকারি অফিসার, মা কলেজের শিক্ষক। তারা একটা ভালো ফ্ল্যাটে থাকেন, গাড়ি আছে, সপ্তাহান্তে বেড়াতে যান, ছুটিতে কখনো কখনো কক্সবাজার বা সিলেট। নাবিল দূর থেকে দেখত শুধু। সে কখনো তাদের আড্ডায় যোগ দিত না। তার পোশাক পুরনো, জুতো ফাটা, কথা বলার সময়ও লজ্জা পেত। ক্লাসের পর সে একা একা লাইব্রেরিতে চলে যেত, বা ক্যাম্পাসের কোনো নির্জন জায়গায় বসে নোটস তৈরি করত।
প্রথম কথা হয়েছিল দ্বিতীয় সপ্তাহে। গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য গ্রুপ ভাগ করা হয়েছিল। পূর্ণিমা তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল, “নাবিল ভাই, তুমি কি এই অর্থনৈতিক মডেলের অংশটা নেবে? তোমার তো সবকিছু খুব ভালো লাগে।” নাবিল অবাক হয়ে গিয়েছিল। সে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়েছিল। সেই থেকে তারা নোটস শেয়ার করতে শুরু করল। পূর্ণিমা প্রায়ই বলত, “তোমার হ্যান্ডরাইটিংটা এত সুন্দর, আর ব্যাখ্যা এত পরিষ্কার যে আমি না পড়লেও বুঝে যাই।” নাবিল লজ্জায় লাল হয়ে যেত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল। সে পূর্ণিমার কথা ভাবত রাতে, তার হাসি মনে পড়ত লাইব্রেরিতে বসে। তার ছোট্ট রুমের দেওয়ালে চোখ রেখে সে কল্পনা করত, যদি সে একটু সামর্থ্যবান হতো, তাহলে হয়তো পূর্ণিমার সাথে একসাথে হাঁটতে পারত ক্যাম্পাসের রাস্তায়, কফি খেতে পারত কোনো দোকানে। কিন্তু বাস্তবতা তাকে টেনে নামাত। সে গরিব ঘরের ছেলে, পরিবারের একমাত্র আশা। পূর্ণিমার জীবন তার থেকে অনেক দূরের।
দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল নিয়মিত রুটিনে। সকালে উঠে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলা। “মা, বাবার ওষুধ চলছে? বোনদের পড়াশোনা কেমন? খাবার ঠিকমতো খাচ্ছ?” মা সবসময় বলতেন, “তুই নিজেরটা দেখ। আমরা ঠিক আছি। তোর বাবা একটু ভালো আছে আজকে।” কথা শেষ করে চা বানিয়ে খেয়ে ক্লাসে যাওয়া। ক্লাসে সে সবসময় সামনে বসত। প্রফেসররা তার প্রশ্নের উত্তর শুনে মুগ্ধ হতেন। “নাবিল, তোমার অ্যানালিসিসটা খুব ডিপ। তুমি ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু করবে।” সেমিস্টার ফাইনালে সে সবসময় ফার্স্ট হয়। কিন্তু কেউ জানত না, রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত সে পড়ে, তারপর ভোরে উঠে টিউশনির প্রিপারেশন নেয়। তার টিউশনির ছাত্ররা মিরপুরের মধ্যবিত্ত পরিবারের। সেখান থেকে পাওয়া টাকায় বাসা ভাড়া, খাবার আর বাড়িতে টাকা পাঠানো চলে। কখনো কখনো টিউশনি শেষে ফেরার পথে সে রাস্তার পাশের দোকান থেকে একটা বিস্কুট কিনে খেত, আর ভাবত—এভাবেই চলছে জীবন।
দ্বিতীয় বর্ষে সম্পর্কটা আরেকটু গভীর হলো। একদিন বৃষ্টির দিনে ক্লাস শেষে পূর্ণিমা তার ছাতাটা ভুলে গিয়েছিল। নাবিল তার পুরনো ছাতাটা শেয়ার করল। দুজনে হেঁটে যাচ্ছিল ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে। বৃষ্টির ফোঁটা ছাতায় পড়ে টুপটাপ শব্দ করছিল। পূর্ণিমা বলছিল তার পরিবারের কথা, কীভাবে তার বাবা তাকে সবসময় উৎসাহ দেন, মা রান্না করে তার প্রিয় খাবার। নাবিল শুধু শুনছিল। তারপর সে তার গ্রামের কথা বলল একটু। গ্রামের নদী, ধানখেত, ছোটবেলার স্কুল—কিন্তু পুরোটা বলেনি। পূর্ণিমা সহানুভূতির সাথে শুনেছিল। “তুমি এত কষ্ট করে পড়ো, তাই এত ভালো রেজাল্ট করো। আমি তোমার মতো হতে পারলে ভালো হতো।” সেই রাতে নাবিলের ঘুম আসেনি। সে ছোট্ট রুমে শুয়ে ভাবছিল, যদি সে একটু সামর্থ্যবান হতো, তাহলে হয়তো পূর্ণিমাকে কোনো ছোট উপহার দিতে পারত, বা তার সাথে একটা সিনেমা দেখতে যেতে পারত। কিন্তু বাস্তব তো নির্মম। তার পকেটে টাকা নেই, পরিবারের দায়িত্ব আছে।
তৃতীয় বর্ষে নাবিলের বাবার অবস্থা আরও খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। টাকার জন্য সে অতিরিক্ত দুটো টিউশনি নিয়েছে। শরীর ভেঙে পড়ছে, মাথা ঘুরছে কখনো কখনো, কিন্তু পড়াশোনা ছাড়েনি। পূর্ণিমার সাথে লাইব্রেরিতে বসা বেড়েছে। তারা একসাথে রিসার্চ করত, বইয়ের পাতা উলটাত, নোটস শেয়ার করত। পূর্ণিমা কখনো কখনো তার জন্য চা কিনে আনত। “তুমি সবসময় আমাকে হেল্প করো, আজ আমি করি।” নাবিলের হৃদয়টা ভরে উঠত। সে ভালোবাসত পূর্ণিমাকে। গভীরভাবে। তার প্রতিটা হাসি, প্রতিটা কথা, তার চোখের দৃষ্টি সবকিছু মনে গেঁথে যেত। কিন্তু বলতে পারছিল না। ভয়ে, লজ্জায়, বাস্তবতায়। রাতে বিছানায় শুয়ে সে অনেকবার ভেবেছে কথাটা বলবে, কিন্তু সকাল হলে সাহস হারিয়ে ফেলত।
অবশেষে সাহস করল। তৃতীয় বর্ষের শেষের দিকে, বর্ষাকাল। ক্যাম্পাসের পেছনের বাগানে বসে তারা কথা বলছিল। বৃষ্টি শুরু হয়েছে হালকা। গাছের পাতায় পানি ঝরছে। পূর্ণিমা তার পরীক্ষার প্রেশারের কথা বলছিল। নাবিলের হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “পূর্ণিমা, আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব বেশি। তোমার সাথে সারা জীবন কাটাতে চাই।” পূর্ণিমা চুপ করে গেল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর সে বলল, “নাবিল, তুমি খুব ভালো ছেলে। আমি তোমার বুদ্ধিমত্তা, তোমার পরিশ্রম দেখে অবাক হয়ে যাই। কিন্তু আমাদের জীবন তো এক না। আমার বাবা-মা কখনো রাজি হবেন না। তুমি গরিব ঘরের। তোমার পরিবারের অবস্থা আমি জানি। কীভাবে চলবে আমাদের? সংসার চালানো, ভবিষ্যৎ... আমি সরি। আমরা বন্ধু হয়ে থাকি।”
নাবিলের পৃথিবীটা যেন থেমে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। চোখে পানি চলে এসেছিল, কিন্তু সে চেপে রাখল। পূর্ণিমা উঠে চলে গেল। বৃষ্টি জোরে শুরু হয়েছিল। নাবিল বসে রইল। তার পোশাক ভিজে গেল, কিন্তু সে নড়ল না। সেই রাতে রুমে ফিরে খাওয়া হয়নি। সে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল। কান্নার পর উঠে বই খুলল। পরীক্ষা আসছে। জীবন থেমে নেই।
পরের দিন ক্লাসে পূর্ণিমা স্বাভাবিক ছিল। যেন কিছুই হয়নি। নাবিলও চেষ্টা করল হাসতে, কথা বলতে। কিন্তু ভেতরে একটা গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। সে আরও বেশি পড়তে শুরু করল। টিউশনি বাড়াল। বাবার চিকিৎসার টাকা পাঠাতে হবে। বোনদের লেখাপড়া চালাতে হবে। কয়েক মাস পর পূর্ণিমা অন্য একটা ছেলের সাথে ঘুরতে শুরু করল। ছেলেটা বড় ব্যবসায়ীর সন্তান, গাড়ি আছে, সবসময় আপডেটেড ফোন, দামি জামা। নাবিল দূর থেকে দেখত। কষ্ট হতো, খুব কষ্ট। কিন্তু সে মেনে নিয়েছিল।
ফাইনাল ইয়ারে নাবিলের সাফল্য আরও বেড়েছে। তার একটা রিসার্চ পেপার আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রফেসররা বলেন, “নাবিল, তুমি অনেক দূর যাবে।” সে মাস্টার্সের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন জুতোটা নতুন কিনেছে, কিন্তু সেই পুরনো কষ্টটা সাথে নিয়েই চলছে। পূর্ণিমা গ্র্যাজুয়েশনের পর চলে গেছে অন্য শহরে। যোগাযোগ নেই। নাবিল কখনো কখনো ক্যাম্পাসের সেই বাগানে বসে ভাবে। না পাওয়ার কষ্টটা কখনো যায় না। এটা তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সে এগিয়ে চলেছে তার লক্ষ্যের দিকে, পরিবারকে সামনে নিয়ে। কিন্তু হৃদয়ের একটা কোণা সবসময় খালি থেকে যাবে। সেই ভালোবাসা, সেই রিজেকশন, সেই গরিব হওয়ার যন্ত্রণা। না পাওয়া কষ্টের গল্প এভাবেই চলতে থাকে।


এক গ্রামের দরিদ্র যুবকের নীরব হৃদয়ে জেগে ওঠা নিষিদ্ধ প্রেমের গভীর বেদনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নময় ক্যাম্পাসে, দারিদ্র্যের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার করুণ কাহিনি।
প্রেম ও বাস্তবতার নির্মম সংঘাতে ভেঙে যাওয়া এক সংবেদনশীল আত্মার অশ্রুসিক্ত যাত্রা।
না পাওয়া ভালোবাসার চিরন্তন যন্ত্রণা ও অদম্য স্বপ্নের আন্তর্জাতিক মানের হৃদয়স্পর্শী উপন্যাস।

Comments

    Please login to post comment. Login