Posts

গল্প

পানির জ্বীন

June 29, 2026

Saifh Ahmed

10
View

সালটা ২০২৩। সিনহার দাদু হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ায়, সিনহা আর তার দিদা তাড়াহুড়ো করে রাতের লঞ্চে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। লঞ্চের কেবিনে দিদা শুয়ে পড়ার পর সিনহার কেমন যেন দমবন্ধ লাগছিল। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা। লঞ্চের বাইরে নদীর শীতল হাওয়া খাওয়ার জন্য সে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে লঞ্চের ছাদে উঠে এল।

​চারদিক একদম সুনসান। নদীর কালো জল চিরে লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে, আর ইঞ্জিনের একটানা গুমগুম শব্দ পরিবেশটাকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। ছাদে সিনহা ছাড়া আর কেউ নেই। কুয়াশার কারণে দূরের কিছুই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।

​হঠাৎ সিনহার কানের কাছে খুব পরিচিত একটা গলা ভেসে এল, “কিরে সিনহা, এত রাতে এখানে একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

​সিনহা চমকে পেছনে তাকাল। দেখল তার দিদা দাঁড়িয়ে আছে। সিনহা কিছুটা অবাক হয়ে বলল, “তুমি না ঘুমাচ্ছিলে দিদা? এখানে এলে কেন?”

দিদা খুব শান্ত গলায় বলল, “তোর জন্য চিন্তা হচ্ছিল, তাই উঠে এলাম।”

​দিদার সাথে কথা বলতে বলতে সিনহা ছাদের এক কোণায় থাকা ওয়াশরুমের দিকে এগোলো। বেসিনের কল ছেড়ে চোখেমুখে একটু পানি দেওয়ার পর, সিনহা স্বভাববশত সামনের পুরনো, কিছুটা ঘোলাটে আয়নাটার দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই তার মেরুদণ্ড বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল।

​আয়নায় সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার ঠিক পাশেই যেখানে দিদার দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে কেউ নেই! আয়নার ভেতর জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা!

​সিনহা চরম আতঙ্কে পাশে তাকাল। হ্যাঁ, দিদা তো পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সিনহা ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা চোখে আবার আয়নার দিকে তাকাল। এবার আয়নায় সে যা দেখল, তাতে তার গলার কাছে একটা চিৎকার আটকে গেল।

​আয়নার ভেতরে সিনহার পাশে দিদা নেই, বরং দাঁড়িয়ে আছে এক বীভৎস রূপের নারী। তার শরীর বেয়ে শ্যাওলা আর নদীর কালো পানি ঝরছে, চোখ দুটো আগুনের মতো লাল, আর গায়ের চামড়া গলিত! সেই ভয়ংকর অবয়বটি আয়নার ভেতর থেকে সিনহার দিকে তাকিয়ে বিকৃতভাবে হাসছে।

​সিনহার মনে হলো তার হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। অবচেতনভাবেই সিনহার মুখ থেকে বিড়বিড় করে উচ্চারিত হতে লাগল 'আয়াতুল কুরসি'। আয়াত পড়া শুরু করতেই সেই অবয়বটি রাগে যেন ফুঁসতে লাগল। এরপর সিনহার চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

​জ্ঞান ফেরার পর সিনহা নিজেকে আবিষ্কার করল হাসপাতালের বিছানায়। পাশে তার বাবা-মা আর দিদা চিন্তিত মুখে বসে আছে। সে জানতে পারল, পুরো দুই দিন সে অচেতন ছিল। লঞ্চের স্টাফরা তাকে ছাদে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিল।

​সুস্থ হওয়ার পর সিনহাকে গ্রামের এক অভিজ্ঞ হুজুরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সিনহার মুখে সব শুনে হুজুর গভীর চিন্তায় পড়ে যান। তিনি জানান, নদীর ওই নির্দিষ্ট জায়গাটিতে এক প্রকার দুষ্ট জিন বা 'পানির ডাইনি'র আনাগোনা আছে। তারা সাধারণত গভীর রাতে একা থাকা মানুষদের রূপ ধরে ধোঁকা দেয় এবং নদীর পানিতে টেনে নিয়ে যায়। সিনহা সেদিন তার দিদার রূপে থাকা সেই ডাইনির কবলেই পড়েছিল। তবে সিনহার মুখ থেকে বের হওয়া পবিত্র 'আয়াতুল কুরসি'-ই তাকে সেই রাত্রের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে।

​আজও যখন রাতের বেলা লঞ্চের কোনো সাইরেন সিনহার কানে ভেসে আসে, তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে আয়নার সেই ভয়ংকর লাল চোখ দুটো!

Comments

    Please login to post comment. Login