সবুজ ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে সরু মাটির আলপথ গিয়ে মিশেছে গ্রামীণ জনপদে। সেই পথ ধরে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে ছোট্ট এক শিশু। তার দুহাতে পরম মমতায় জড়ানো একটি বিড়াল। আর ঠিক তার পেছন পেছন, যেন নীরব এক অতন্দ্র প্রহরী, হেঁটে চলেছে সুন্দর এক সজারু। পিঠভরা ধারালো কাঁটা নিয়েও প্রাণীটি আজ আশ্চর্য শান্ত। শিশুটির নিষ্পাপ স্নেহের স্পর্শে যেন সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেছে নিজের স্বভাব, বিসর্জন দিয়েছে সব ভয় আর হিংস্রতার স্মৃতি। শিশুর পদপ্রান্তে নিজের মুখটি রেখে জানিয়ে দিচ্ছে মানুষের সাথে প্রাণীর অতুল্য সম্প্রীতি।
দৃশ্যটি এতটাই অপার্থিব যে, মনে হয় কোনো রূপকথার পাতা থেকে হেঁটে এসে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিও কোটি কোটি মানুষের চোখে এনে দিয়েছে বিস্ময়, মনে ছড়িয়ে দিয়েছে অনাবিল মুগ্ধতা। বিশ্ব মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে এই অপার্থিব দৃশ্যটি।
তবে এই মুগ্ধতার গল্প বাংলাদেশের নয়; এর জন্ম শ্রীলঙ্কার এক শ্যামল প্রান্তরে। ভিডিওর ছোট্ট রাজকন্যাটি যখন আদুরে কণ্ঠে কথা বলছিল, তখন তার মুখে ঝরছিল সিংহলি ভাষার মধুর সুর -যেন চারপাশের প্রকৃতিও সেই ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছিল নিজের ছন্দ।
গত ১২ জুন শ্রীলঙ্কার প্রভাত সিলভা প্রথম ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করেন। সিংহলি ভাষায় লেখা ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, ‘ছোট ভাই তার বোনের সঙ্গে কুবুরুতে (ধানক্ষেতে) যাচ্ছে!’
এই দৃশ্য যেন আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয় -মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক কখনো কখনো এমন এক নির্মল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানাতে পারে।
প্রাণির প্রতি বহু নির্মমতার বদনাম বাঙালির ললাট লিখন। সম্প্রতি নরসিংদীতে নিরীহ নিরুপদ্রব এক কুকুরের গলায় ইট বেঁধে চরম নিষ্ঠুরতায় ব্রিজ থেকে খরস্রোতা নদীতে ফেলে দিতে দেখলাম। খোদ প্রাণিপ্রেমী প্রধানমন্ত্রীকে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হলো। এর আগে বাগেরহাটের খান জাহান আলীর মাজারেও আমরা একই ঘটনা দেখেছি। ক্ষুধার্ত কুমিরের মুখে বেঁধে রাখা হয় জীবন্ত কুকুর। কুকুরটি বাঁচার আকুতি নিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত মায়াভরা চোখে মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এমনসব দৃশ্য দেখে দেখে আমাদের চোখ যখন লাল হয়ে যাচ্ছিল -সেসময় শ্রীলঙ্কার এই কোমল মায়ের প্রেমকাব্য আমাদের মন ও মগজের জন্য যেন সবুজ স্বস্তি।
ভালো থাকো মায়াবতী কইন্যা।
ভালো থেকো বিড়াল।
ভালো থেকো গো সুন্দর সজারু।
লেখক: সাংবাদিক
২৯ জুন ২০২৬