Posts

চিন্তা

বর্ষা বন্দনায় মেঘমেদুর সুর

June 29, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

27
View

কোক স্টুডিও বাংলা এবার বর্ষা বন্দনায় 'মেঘ' শীর্ষক একটি ফিউশন গান উপস্থাপন করেছে। শায়ান চৌধুরী অর্ণবের প্রযোজনায় মিউজিক প্রেজেন্টেশনটির চুলচেরা বিশ্লেষণ হতে থাকবে। সমালোচনায় ভালো মন্দ যাই হোক -আখেরে সেটি শিল্পের জন্য নিশ্চয়ই মঙ্গলময় হবে।

গানটিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সোনার তরী' কবিতার কয়েকটি চরণ রাখা হয়েছে। কবিতার ওপর সুর চড়িয়ে অন্য আঙ্গিকের গানের সাথে মিলিয়ে পরিবেশন করা হয়েছে। গানটি আমাদের কর্ণকুহরকে অতটা প্রশান্তি না দিলেও এতটুকু যাতনাও সৃষ্টি করেনি।

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই -ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের এই কবিতাটিকে অনেকেই হয়ত রাবীন্দ্রিক সুরের আবহে শুনতে চেয়েছেন। তাদের কাছে কোক স্টুডিও বাংলার পরিবেশনা ভালো লাগেনি।

ইউটিউবে পরিবেশিত গানটির ডেসক্রিপশনে কোক স্টুডিও বাংলা লিখেছে, আষাঢ়ের আকাশ আর বৃষ্টির লুকোচুরিতে প্রকৃতি যখন খুঁজে পেয়েছে সজীবতা। তখনই কোক স্টুডিও বাংলা হিজন ফোর এসেছে মেঘ নিয়ে, যেখানে সুরের আবেশে সেলিব্রেট করা হবে, প্রিয় ঋতু বর্ষা।

স্মরণ দত্তের কথা আর মোহাম্মদ সোয়েব-এর শাস্ত্রীয় সুরের মেলবন্ধনে অর্নব সৃষ্টি করছেন মেঘের এক নতুন ভুবন। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কিংবদন্তি মিয়াঁ তানসেনের সৃষ্ট বর্ষার রাগ 'মিয়াঁ কি মালহার'।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী 'সোনার তরী' এখানে নতুন মাত্রা পেয়েছে স্ল্যাম পোয়েট্রির ছন্দে। এর সঙ্গে মাশা'র হৃদয়ছোঁয়া কণ্ঠ, মৌসুমী'র আবেগময় স্ট্রিংস আর সারগাম মিলিয়ে তৈরি হয়েছে, বর্ষার এক নতুন সাউন্ডস্কেপ।

আষাঢ়ের এমন নানান অনুভূতির এক্সপ্রেশন হলো মেঘ, যেখানে ঋতুর এই আত্মপ্রকাশ শুধু দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। আর এখানেই কিছু সুর হয়ে যায় রিয়াল ম্যাজিক।

রবিঠাকুরের কবিতা স্ল্যাম পোয়েট্রি তথা র‌্যাপ সঙ্গীতের আদলে নাটকীয়ভাবে পরিবেশন করবার পশ্চিমা ব্যাপারটি রবীন্দ্র শুদ্ধাচারে নিবিষ্টদের ভালো লাগেনি।

ঐতিহ্যকে আপনি আঁকড়ে ধরবেন ঠিক আছে, তাই বলে আধুনিকতার রহিত চিন্তা কেন করতে হবে? শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা বা গান তো কেবলই উপাসনা বা আরাধনার জন্য না। তার গান উপলব্ধি ও বিনোদনের মিশেলে অনুধাবন করতে হয়। পরিবর্তনকে বাদ দিয়ে মৌলবিষয়ে আটকে থাকাটা কখনোই তাই ভক্তিবাদের শুভ লক্ষণ নয়। বরং সেটা হয় চরম গোঁড়ামির নামান্তর।

খোদ রবীন্দ্রনাথ নিজে কি শিল্পে ফিউশন বিরোধী ছিলেন? কখনোই না। আন্তর্জাতিকতাবাদ ও মানবিকতায় বিশ্বাসী রবিঠাকুর ছিলেন চিরকালীন উত্তরাধুনিক মানুষ।

শিল্পে ফিউশন বা পূর্ব ও পশ্চিমের সুরের মিশ্রণ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার ও অনুকরণীয়। তিনি প্রাচ্যের নিজস্বতার সাথে পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন এবং বিশ্বাস করতেন, কোনো শিল্পই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না; বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদান শিল্পের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে।

তিনি মনে করতেন, সংকীর্ণতা পরিহার করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্প ও ভাবধারাকে গ্রহণ করা উচিত। 'পূর্ব ও পশ্চিম' প্রবন্ধে তিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার সাথে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও মননের সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি নিজে 'বাল্মীকি প্রতিভা' ও 'কাল-মৃগয়া'-র মতো গীতি-নাট্যগুলোতে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের সাথে আইরিশ ও স্কটিশ সুরের সফল মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।

শিল্পে কোনো ভৌগোলিক বা জাতীয় সীমানা থাকা উচিত নয়, তাই বিদেশি সুর বা রীতির সংমিশ্রণকে তিনি দোষের মনে করেননি। তাঁর গানে বিদেশি সুর হয়ে উঠেছিল সুরের এক নতুন বৈচিত্র্য। তাঁর মতে, অন্য কোনো সংস্কৃতি থেকে উপাদান নেওয়ার অর্থ এই নয় যে নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দেওয়া। বরং নিজের শেকড়ের শক্তিতে দাঁড়িয়ে তাকে বিশ্বমঞ্চের উপযোগী করে তোলাটাই ছিল তাঁর আদর্শ।

'পূর্ব ও পশ্চিম' প্রবন্ধের প্রারম্ভে কবিগুরু লিখেছেন, ভারতবর্ষের ইতিহাস কাহাদের ইতিহাস। একদিন যে শ্বেতকায় আর্যগণ প্রকৃতির এবং মানুষের সমস্ত দুরূহ বাধা ভেদ করিয়া ভারতবর্ষে প্রবেশ করিয়াছিলেন, যে অন্ধকারময় সুবিস্তীর্ণ অরণ্য এই বৃহৎ দেশকে আচ্ছন্ন করিয়া পূর্বে পশ্চিমে প্রসারিত ছিল তাহাকে একটা নিবিড় যবনিকার মতো সরাইয়া দিয়া ফলশস্যে-বিচিত্র আলোকময় উন্মুক্ত রঙ্গভূমি উদ্‌ঘাটিত করিয়া দিলেন, তাঁহাদের বুদ্ধি শক্তি ও সাধনা একদিন এই ইতিহাসের ভিত্তিরচনা করিয়াছিল। কিন্তু, এ কথা তাঁহারা বলিতে পারেন নাই যে, ভারতবর্ষ আমাদেরই ভারতবর্ষ।

তিনি আরো লিখেন, আমরা বৃহৎ ভারতবর্ষকে গড়িয়া তুলিবার জন্য আছি। আমরা তাহার একটা উপকরণ। কিন্তু উপকরণ যদি এই বলিয়া বিদ্রোহ প্রকাশ করিতে থাকে যে, আমরাই চরম, আমরা সমগ্রের সহিত মিলিব না, আমরা স্বতন্ত্র থাকিব, তবে সকল হিসাবেই ব্যর্থ হয়। বিরাট রচনার সহিত যে-খণ্ড সামগ্রী কোনোমতেই মিশ খাইবে না, যে বলিবে আমিই টিঁকিতে চাই, সে একদিন বাদ পড়িয়া যাইবে। যে বলিবে আমি স্বয়ং কিছুই নই, যে-সমগ্র রচিত হইতেছে তাহারই উদ্দেশে আমি সম্পূর্ণভাবে উৎসৃষ্ট, ক্ষুদ্রকে সে-ই ত্যাগ করিয়া বৃহতের মধ্যে রক্ষিত হইবে। ভারতবর্ষেরও যে-অংশ সমস্তের সহিত মিলিতে চাহিবে না,যাহা কোনো-একটা বিশেষ অতীত কালের অন্তরালের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া অন্য-সকল হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকিতে চাহিবে, যে আপনার চারি দিকে কেবল বাধা রচনা করিয়া তুলিবে, ভারত-ইতিহাসের বিধাতা তাহাকে আঘাতের পর আঘাতে হয় পরম দুঃখে সকলের সঙ্গে সমান করিয়া দিবেন, নয় তাহাকে অনাবশ্যক ব্যাঘাত বলিয়া একেবারে বর্জন করিবেন।

রবীন্দ্রনাথ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদকে 'দানবিক' বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, দেশের চেয়ে বড় হলো মানবতা। তিনি মনে করতেন, সংকীর্ণ দেশাত্মবোধ বিশ্বমানবিকতার পথে বড় অন্তরায়।

'ভারত তীর্থ' কবিতায় রবিঠাকুর তাই তো যথার্থই বলেন,
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে—
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।

আমরা আশা করব অর্ণবের গানটি নতুন স্রোতার মনোভাণ্ডারে ঔদার্যের খেরোখাতা খুলে দেবে। যেখানে সংকীর্ণতা জায়গা হারিয়ে রাবীন্দ্রিক সুরেই বলবে, 
এসো শ্যামল সুন্দর, 
আনো তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা।

লেখক: সাংবাদিক 
২৯ জুন ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login