কারখানায় নতুন যোগ দিয়েছিল রায়হান। কথাবার্তায় ভদ্র, হাসিখুশি আর সবার সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারত। সেই সুযোগেই পরিচয় হয় সহকর্মী মেঘলার সঙ্গে।
মেঘলা ছিল সহজ-সরল মনের মেয়ে। রায়হানের যত্ন, খোঁজখবর আর মিষ্টি কথায় সে বিশ্বাস করতে শুরু করল-রায়হানও তাকে ভালোবাসে। অথচ রায়হানের মনে ভালোবাসা নয়, ছিল স্বার্থের হিসাব। সে বুঝে গিয়েছিল, মেঘলা তাকে বিশ্বাস করে। তাই মাঝেমধ্যে নানা অজুহাতে টাকা চাইত-কখনও বন্ধুর অসুস্থতা, কখনও পারিবারিক সমস্যা, আবার কখনও মাসের শেষে টাকার টান। ভালোবাসার মানুষ ভেবে মেঘলা নিজের হাতখরচ থেকে টাকা দিত।
সময়ের সঙ্গে মেঘলা বুঝল, ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করা দরকার। তাই আগের মতো আর টাকা দিতে পারছিল না। এদিকে রায়হানের স্বার্থে আঘাত লাগল। সে ধীরে ধীরে মেঘলাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। ফোন কম ধরত, কথা কম বলত, দেখা হলেও ব্যস্ততার অজুহাত দিত।
এরই মধ্যে একদিন কারখানায় খবর ছড়িয়ে পড়ল-রায়হানের বিরুদ্ধে আগে একটি ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত না গেলেও অভিযোগের কথা কর্মস্থলে আলোচনায় চলে আসে। রায়হান বুঝে গেল, এই খবর ছড়িয়ে পড়লে তার সম্মান ও চাকরি দুটোই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তখন সে আরেকটি নাটক সাজাল।
সবার সামনে এমন আচরণ করতে লাগল যেন মেঘলার সঙ্গে তার গভীর মনোমালিন্য হয়েছে। একদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, - "এই কারখানায় আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। যাকে এত ভালোবাসলাম, সেই-ই আমাকে বুঝল না। তাই চলে যাচ্ছি।"
সহকর্মীদের অনেকেই ভাবল, ভালোবাসার কষ্টে রায়হান চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মেঘলাকেই দোষ দিতে লাগল।
কিন্তু সত্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রায়হান জানত, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে শিগগিরই সবাই জানতে পারবে। তাই সে নিজের ভাবমূর্তি বাঁচাতে ভালোবাসার নাটককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল। যেন মানুষ সত্যটা নয়, তার বানানো গল্পটাই বিশ্বাস করে।
মেঘলা অনেক কেঁদেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো সত্যিই তাদের সম্পর্ক ভেঙে গেছে। কিন্তু পরে একে একে সব ঘটনা মিলিয়ে বুঝতে পারল-যে মানুষকে সে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল, সে কখনো তাকে ভালোবাসেইনি। তার কাছে মেঘলা ছিল শুধু টাকার উৎস, আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ফেলে দেওয়ার মতো একজন মানুষ।
সেদিন মেঘলার চোখে জল ছিল, কিন্তু সেই জল ছিল না হারানো ভালোবাসার জন্য। ছিল একজন ভণ্ড মানুষের মুখোশ খুলে যাওয়ার বেদনা।