Posts

চিন্তা

বৈশ্বিক সেনা কন্টিনজেন্টগুলোর নামকরণের ভিত্তিটা কী?

June 30, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

18
View

নবগঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটেলিয়ন’ এর অধীনে চারটি কোম্পানি গঠিত হয়েছে যেগুলোর নাম রাখা হয়েছে ইসলামের ৪ খলিফা আবুবকর(রা.), ওসমান(রা.), ওমর(রা.) ও আলী(রা.) এর নামে। এছাড়াও এই ব্যাটেলিয়নের অধীনে আরও দুটি নারী কোম্পানি প্রস্তাব করা হয়েছে। অনুমোদিত হলে সে দুটির নাম হবে হযরত আয়েশা (রা.) এবং হযরত ফাতেমা (রা.) এর নামে।

• ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কন্টিনজেন্ট বা রেজিমেন্টগুলোর নামকরণ প্রধানত ঐতিহ্য, অঞ্চল, জাতিগোষ্ঠী এবং ঐতিহাসিক যুদ্ধজয়ের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই নামকরণেরীতিগুলো অনুসরণ করা হয়েছে
উদাহরণ: শিখ রেজিমেন্ট (Sikh Regiment), রাজপুতনা রাইফেলস (Rajputana Rifles), ডোগরা রেজিমেন্ট (Dogra Regiment) এবং মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি। আসাম রেজিমেন্ট (Assam Regiment), বিহার রেজিমেন্ট (Bihar Regiment), মাদ্রাজ রেজিমেন্ট (Madras Regiment) এবং লাদাখ স্কাউটস। দ্য ব্রিগেড অব দ্য গার্ডস (Brigade of The Guards) এবং প্যারাশুট রেজিমেন্ট। ইত্যাদি।

• পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কন্টিনজেন্ট বা ইউনিটগুলোর নামকরণ করা হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, যোদ্ধা গোষ্ঠীর নাম এবং পদাতিক বা সাঁজোয়া (আর্মার্ড) কাঠামোর সংমিশ্রণে।
উদাহরণ: পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, বালোচ রেজিমেন্ট, এবং সিন্ধু রেজিমেন্ট। ৫ম পাঞ্জাব, ১২তম বেলুচ। ১৯শ ল্যান্সার, ২৪শ ক্যাভালরি। ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট, আজাদ কাশ্মীর রেজিমেন্ট, এবং মুজাহিদ ফোর্স। ইত্যাদি।

• সৌদি আরবের সামরিক কন্টিনজেন্ট বা ইউনিটগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রে প্রধানত রাজকীয় ঐতিহ্য, বিশিষ্ট রাজপরিবারের সদস্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং ভৌগোলিক অঞ্চলের সংমিশ্রণ অনুসরণ করা হয়।
উদাহরণ: ইমাম মোহাম্মদ বিন সৌদ মেকানাইজড ব্রিগেড এবং প্রিন্স সাদ আব্দুল রহমান মেকানাইজড ব্রিগেড। মক্কা, তাবুক, মদিনা বা কিং খালিদ ইউনিট। 'আর্মার্ড' (Armored), 'মেকানাইজড' (Mechanized), 'প্যারাট্রুপার' (Paratrooper) বা 'রয়েল গার্ড' (Royal Guard) কন্টিনজেন্ট। ১ম ব্যাটালিয়ন, ৪৫তম আর্মড ব্রিগেড। ইত্যাদি।

• মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ইউনিট বা কন্টিনজেন্টগুলোর নামকরণ একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করে করা হয়। ইউনিটগুলোর নাম মূলত তাদের আকার, গঠন এবং কাজের পরিধি অনুযায়ী সংখ্যা ও বর্ণমালার সমন্বয়ে গঠিত হয়। 
উদাহরণ: আর্মি, কোর এবং ডিভিশনগুলো সাধারণত ক্রমবাচক সংখ্যা (যেমন: First, Third, 82nd) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। ডিভিশনের অধীনে থাকা ব্রিগেড বা ব্যাটালিয়নগুলোর নামকরণেও ক্রম এবং মূল ডিভিশনের নাম উল্লেখ থাকে (যেমন: 1st Brigade, 1st Infantry Division)। সদর দপ্তরে বিভিন্ন কার্যনির্বাহী বিভাগ (যেমন- Personnel, Intelligence, Operations) বোঝাতে S বা G দিয়ে শুরু হওয়া পদ (যেমন: S1 থেকে S6) ব্যবহৃত হয়। কোনো নির্দিষ্ট অস্থায়ী মিশন বা অভিযানের জন্য গঠিত কন্টিনজেন্টগুলোকে Task Force (যেমন: Task Force Sinai) বলা হয়।

• যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীতে (British Army) কোনো কন্টিনজেন্ট বা ইউনিট গঠনের সময় তাদের নাম মূলত নির্দিষ্ট ভূমিকা, ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহ্য, এবং পূর্বসূরি বাহিনীর ইতিহাস বা বংশানুক্রমের সংমিশ্রণে রাখা হয়।
উদাহরণ: The Royal Regiment of Scotland, The Yorkshire Regiment)। সৈনিকদের যুদ্ধের ধরন বা ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে নাম দেওয়া হয়, যেমন— Rifles (রাইফেলধারী), Cavalry (ক্যাভালরি/অশ্বারোহী), বা Parachute Regiment। রাজকীয় সম্মান বা বীরত্ব বোঝাতে নামের শুরুতে 'Royal', 'King's', বা 'Queen's' শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।

তবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্টের অনেক অনানুষ্ঠানিক ডাকনাম (nickname) আছে, যেগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, কৃতিত্ব ও সৈনিকদের রসবোধ। যেমন, Argyll and Sutherland Highlanders-কে শব্দের খেলায় মজা করে "Agile and Bolton Wanderers" বলা হতো, যা Bolton Wanderers F.C.-এর নামের প্রতি একটি রসাত্মক ইঙ্গিত। 87th Regiment of FootBattle of Barrosa-এ একটি ফরাসি সাম্রাজ্যিক ঈগল (Aigle) দখল করায় তারা "The Aiglers" নামে পরিচিতি পায়। Prince Albert's Own Leicestershire Yeomanry-কে "The Albert Lesters" এবং "God's Own" বলা হতো, কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে দীর্ঘদিন ফ্রন্টে অবস্থান করেও ১৯১৫ সালের ১৩ মে পর্যন্ত তাদের কোনো সৈনিক যুদ্ধে নিহত হননি। আর Army Service Corps-এর সদস্যদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে "Ally Sloper's Cavalry" বলা হতো, জনপ্রিয় কমিক চরিত্র Ally Sloper-এর নাম অনুসারে, যা মূলত সরাসরি যুদ্ধের বদলে রসদ ও পরিবহন দায়িত্বে নিয়োজিত এই বাহিনীকে ঘিরে সৈনিকদের রসিকতার পরিচয়বাহী।

নবগঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটেলিয়ন’-এর কোম্পানিগুলোর নাম ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নামে নামকরণের যৌক্তিকতা সমর্থকদের কাছে নেতৃত্ব, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, আত্মত্যাগ ও আদর্শিক চরিত্রের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 
তবে যেহেতু বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার তথা বহুধর্মীয় রাষ্ট্র, তাই সমালোচকদের মতে রাষ্ট্রীয় সামরিক ইউনিটের নামকরণে এমন ব্যক্তিত্ব বা প্রতীক বেছে নেওয়া অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে, যা সব নাগরিকের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। ফলে এই নামকরণের যৌক্তিকতা মূলত রাষ্ট্রের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোভাব, ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়কে একপাক্ষিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে চূড়ান্ত বিচারে নামকরণ বড় বিষয় নয়, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম ও জনগণের জন্য সেবাটাই আসল কথা।

লেখক: সংবাদিক  
৩০ জুন ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login